শক্তিশালী টাইফুন বাভির আঘাতের আশঙ্কায় চীন ও তাইওয়ানে ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় উপকূলীয় এলাকার জেলেরা নৌকা নিয়ে বন্দরে আশ্রয় নিয়েছেন। বাসিন্দারা বন্যার পানি ঠেকাতে বালুর বস্তা সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েছেন। অন্যদিকে কৃষকেরা দ্রুত মাঠ থেকে ফসল ঘরে তুলছেন।
আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, বাভি গত কয়েক বছরের মধ্যে এই অঞ্চলে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়গুলোর একটি হতে পারে। এদিকে বাভি তাইওয়ানের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় দক্ষিণ চীনে টাইফুন মায়সাকের ধ্বংসযজ্ঞের পর উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে আঘাত হানা মায়সাকে অন্তত ৩৯ জন নিহত হয়েছেন। আরো কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন। তাইওয়ানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাছ ধরার শহর সুয়াওতে শত শত মাছ ধরার নৌকা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বন্দরে ভিড় করেছে। তিন মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার একটি মাছ ধরার নৌকার অধিনায়ক চেন মিং-হুই বলেন, বাইরে এখন আবহাওয়া শান্ত মনে হলেও পরিস্থিতি খুব দ্রুত বদলে যেতে পারে। তিনি বলেন, এখন আকাশ পরিষ্কার দেখে কেউ যেন ভুল না করেন। এ ধরনের টাইফুন খুবই ভয়ংকর হতে পারে। আগের ঝড়ে অনেক নৌকা ডুবে গিয়েছিল। পুরো শহর পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল।
তাইওয়ানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাভির প্রভাবে রাজধানী তাইপের উত্তরের পাহাড়ি এলাকায় এক মিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে। সম্ভাব্য উদ্ধার ও ত্রাণকাজে অংশ নিতে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রায় ২৯ হাজার সেনাকে প্রস্তুত রেখেছে। কর্তৃপক্ষের মতে, ২০২৪ সালের কং-রে টাইফুনের পর এটি তাইওয়ানে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী টাইফুন হতে পারে। কং-রে টাইফুনে তিনজনের মৃত্যু হয়েছিল। চীনের জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্র জানিয়েছে, বাভির বাতাসের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ২০০ কিলোমিটার। ঝড়টির বিস্তৃতি সবচেয়ে চওড়া অংশে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার, যা প্রায় ফ্রান্সের সমান। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বাভি উত্তর তাইওয়ানের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে শনিবার সন্ধ্যায় চীনের পূর্বাঞ্চলের ফুজিয়ান প্রদেশে আঘাত হানতে পারে। তাইওয়ানের কেন্দ্রীয় আবহাওয়া প্রশাসনের পূর্বাভাসকারী জেসন চ্যাং বলেন, সাম্প্রতিক কয়েক বছরে এত বড় আকারের টাইফুন দেখা যায়নি। তার মতে, আকারের দিক থেকে ১৯৮৭ সালের পর এটি তাইওয়ানে আঘাত হানা সবচেয়ে বড় ঝড় হতে যাচ্ছে। টাইফুনের কারণে তাইওয়ানের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তাওইয়ান শনিবার দেশটির সব আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ছেড়ে যাওয়া ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে।
বাভির প্রভাব শুধু চীন ও তাইওয়ানেই নয়, জাপানেও পড়তে পারে। জাপানের আবহাওয়া সংস্থা ওকিনাওয়ার বাসিন্দাদের শুক্রবার ও শনিবার সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলেছে। প্রবল বাতাস, ভারি বৃষ্টি, ভূমিধস, বন্যা এবং জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। জাপান এয়ারলাইনস শুক্রবারের ৫০টি ফ্লাইট বাতিল করেছে। এতে প্রায় ৭ হাজার ৬০০ যাত্রীর ভ্রমণ পরিকল্পনা ব্যাহত হবে। অল নিপ্পন এয়ারওয়েজও ৩৪টি ফ্লাইট বাতিল করেছে। এতে প্রায় ১ হাজার ৮০০ যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। শনিবারও আরো কিছু ফ্লাইট বাতিল করা হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চীন, তাইওয়ান ও জাপানে শক্তিশালী ঝড়ের ঝুঁকি বাড়ছে। এ বছর সম্ভাব্য এল নিনোর প্রভাবে সমুদ্রের তাপমাত্রা আরো বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে আরো শক্তিশালী এবং ঘন ঘন টাইফুন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাণিজ্যিক আবহাওয়া পূর্বাভাস প্রতিষ্ঠান আকুওয়েদারের বিশেষজ্ঞ জেসন নিকোলস বলেন, বৃহস্পতিবার থেকে বাভির বাতাসের গতি কিছুটা কমতে পারে। তবে শুক্রবার থেকে সোমবার পর্যন্ত এটি তাইওয়ান ও পূর্ব চীনে বিপজ্জনক অবস্থায়ই থাকবে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় গবেষক শিয়াংবো ফেং বলেন, বাভি দীর্ঘ সময় ধরে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ পানির ওপর অবস্থান করেছে। সেখান থেকে এটি প্রচুর শক্তি ও আর্দ্রতা সংগ্রহ করেছে। তাই স্থলভাগে আঘাত করলে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেক বড় হতে পারে। তিনি আরো বলেন, ঝড়টির গতিপথে সামান্য পরিবর্তন হলেও ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেড়ে যেতে পারে।
বাভির জন্য প্রস্তুতি চললেও দক্ষিণ চীনের অনেক এলাকা এখনো টাইফুন মায়সাকের ধ্বংসযজ্ঞ সামাল দিতে ব্যস্ত। মায়সাকের অবশিষ্ট অংশ থেকে চীনের মধ্যাঞ্চলের হুবেই প্রদেশে অন্তত দুটি স্থলভাগের ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছে। এতে সেখানে বড় ধরনের বন্যা হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গুয়াংসি অঞ্চলের বিভিন্ন শহরে মানুষ নতুন ঝড় আঘাত হানার আগেই নিজেদের ঘরবাড়ি ও জীবন স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, অনেক মানুষ নিজেদের ফ্ল্যাট থেকে বের হতে দ্বিতীয় তলার জানালা দিয়ে উদ্ধারকর্মীদের সহায়তায় নিচে নামছেন। আবার অনেকে কোমরসমান পানিতে নেমে ঘর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উদ্ধার করছেন। দুর্গম এলাকায় জরুরি খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছে দিতে উদ্ধারকর্মীরা ড্রোন ব্যবহার করছেন।
বেইজিং নিউজের প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, বিনইয়াং কাউন্টির একটি খামারে সারি সারি মৃত শূকর পড়ে রয়েছে। টানা দুই দিন পানির নিচে ডুবে থাকার কারণে প্রাণীগুলোর দেহ ফুলে গিয়ে পচতে শুরু করেছে। চীনের গ্লোবাল টাইমস জানিয়েছে, গুয়াংসি অঞ্চলের গুইগাং চিড়িয়াখানায় বন্যার পানিতে তিনটি সিংহ মারা গেছে। এছাড়া জেব্রা, সজারু, টিয়া, র্যাকুনসহ প্রায় ১০০টি প্রাণী এখনো নিখোঁজ রয়েছে।






