রাত শুধু দিনের সমাপ্তি নয়; বরং আগামী দিনের সূচনাও বটে। তাই আপনার রাত যেভাবে কাটবে, আপনার সকালও অনেকাংশে তেমনই হবে। আর আপনার সকালগুলো যেমন হবে, ধীরে ধীরে আপনার জীবনও তেমন হয়ে উঠবে। তাই রাতকে গাফেলত, অলসতা ও গুনাহের সময় না বানিয়ে ইবাদত, আত্মসমালোচনা, জিকির, কোরআন তিলাওয়াত এবং আগামী দিনের প্রস্তুতির সময় বানানো জরুরি। মূলত রাতের যেসব অভ্যাস আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে সেগুলো হলো-
১. অকারণে রাত জাগা
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে সাধারণ সমস্যাগুলোর একটি হলো অপ্রয়োজনীয় রাত জাগা। মোবাইল ফোন, ফেসবুক, ইউটিউব, গেমস বা বন্ধুদের সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডার কারণে অনেকেই রাত গভীর পর্যন্ত জেগে থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এশার পর অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা অপছন্দ করতেন। অতিরিক্ত রাত জাগার ফলে যেসব ক্ষতি হয়—
১. ফজরের সালাত ছুটে যায়।
২. শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে।
৩. মনোযোগ কমে যায়।
৪. কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়।
৫. ইবাদতে অলসতা আসে।
২. মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি
অনেক মানুষ ঘুমানোর আগ পর্যন্ত মোবাইল স্ক্রল করতে থাকে। এক ভিডিও থেকে আরেক ভিডিও, এক পোস্ট থেকে আরেক পোস্ট—এভাবেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যায়। এটি শুধু সময় নষ্ট করে না; বরং মনকে অস্থির করে, চিন্তাশক্তি কমিয়ে দেয় এবং ধীরে ধীরে মানুষকে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৩৬)
৩. ঘুমানোর আগে গুনাহে লিপ্ত হওয়া
অনেকেই রাতকে গোপন পাপের সময় বানিয়ে ফেলে। অশ্লীলতা দেখা, হারাম চ্যাটিং, গীবত, গান-বাজনা বা অন্যান্য গুনাহে রাত কাটায়। সমস্যা হলো, মানুষ যে অবস্থায় ঘুমায়, অনেক সময় তার হৃদয় সেই অবস্থাতেই অভ্যস্ত হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ যে অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, কিয়ামতের দিন তাকে সে অবস্থাতেই উঠানো হবে।’ (সহিহ মুসলিম)
৪. আত্মসমালোচনা না করা
নেককারদের অন্যতম অভ্যাস ছিল দিনের শেষে নিজের হিসাব নেওয়া। ওমর (রা.) বলতেন— ‘নিজেদের হিসাব নাও, তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগেই।’ দিন শেষে যদি আমরা চিন্তা করি—
১. আজ কী ভালো কাজ করেছি?
২. কী ভুল করেছি?
৩. কার হক নষ্ট করেছি?
৪. কীভাবে আগামীকাল আরও ভালো হব?
তাহলে আমাদের জীবন অনেক বেশি সুন্দর ও সফল হবে। ইনশাআল্লাহ।
৫. ঘুমানোর আগে জিকির ও দোয়া ত্যাগ করা
রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘুমানোর আগে বিভিন্ন দোয়া ও জিকির পাঠ করতেন। যেমন—
১. আয়াতুল কুরসি পাঠ করা
২. সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস করা
৩. ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ ও ৩৪ বার আল্লাহু আকবার বলা
৬. তাহাজ্জুদের গুরুত্বকে অবহেলা করা
তাহাজ্জুদ হলো মুমিনের অন্যতম শক্তি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা রাতের নামাজ আদায় কর; কারণ এটি তোমাদের পূর্ববর্তী নেককারদের অভ্যাস ছিল।’ (তিরমিজি)
তাহাজ্জুদ হৃদয়কে জীবিত করে, গুনাহ মাফের কারণ হয় এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম।
৭. ফজরের প্রস্তুতি ছাড়া ঘুমানো
অনেক মানুষ ঘুমানোর সময় ফজরের জন্য কোনো প্রস্তুতি নেয় না। ফলে ফজর কাজা হয়ে যায়। অথচ একজন সচেতন মুমিন—
১. সময়মতো ঘুমায়,
২. অ্যালার্ম সেট করে,
৩. পরিবারকে জাগানোর ব্যবস্থা করে,
৪. ফজরের নিয়ত নিয়ে ঘুমায়।
মনে রাখবেন, হয়তো আজকের রাতই আমাদের জীবনের শেষ রাত। তাই ঘুমানোর আগে অন্তত একবার নিজের হৃদয়কে জিজ্ঞেস করুন, ‘যদি আজই আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হয়, তাহলে আমি কি প্রস্তুত?’ আল্লাহ তাআলা আমাদের বুঝার তাওফিক দান করুক। আমিন।