• ই-পেপার

যেসব অভ্যাস ইবাদতে বিঘ্নতা সৃষ্টি করে

নবদম্পতিকে শুভেচ্ছা জানিয়ে যে দোয়া পড়বেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
নবদম্পতিকে শুভেচ্ছা জানিয়ে যে দোয়া পড়বেন
সংগৃহীত ছবি

বিয়ে শুধু দুটি মানুষের একসঙ্গে বসবাসের সূচনা নয়; এটি দুটি হৃদয়, দুটি পরিবার এবং দুটি জীবনের পবিত্র বন্ধন। ইসলামের দৃষ্টিতে দাম্পত্য জীবন আল্লাহ তাআলার এক মহান নিয়ামত, যার ভিত্তি হলো ভালোবাসা, দয়া, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং তাকওয়া। তাই একজন মুসলমানের নতুন জীবনের শুরু হওয়া উচিত আল্লাহর রহমত, বরকত ও কল্যাণের দোয়ার মাধ্যমে। 

আমাদের সমাজে নবদম্পতিকে শুভেচ্ছা জানানোর নানা রকম বাক্য প্রচলিত আছে। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের এমন একটি দোয়া শিখিয়েছেন, যা শুধু শুভ কামনাই নয়; বরং দাম্পত্য জীবনের স্থায়ী সুখ, বরকত ও কল্যাণের জন্য আল্লাহর দরবারে সর্বোত্তম প্রার্থনা। তাই বিয়ের প্রতিটি অনুষ্ঠানে তা পাঠ করার অভ্যাস গড়ে তোলা আমাদের সবার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। দোয়াটি হলো-

بَارَكَ اللَّهُ لَكَ، وَبَارَكَ عَلَيْكَ، وَجَمَعَ بَيْنَكُمَا فِي خَيْرٍ

উচ্চারণ : ‘বারকাল্লাহু লাকা, ওয়া বারকা আ’লাইকা, ওয়া জামাআ’ বাইনাকুমা ফি খাইরিন।’
অর্থ : ‘আল্লাহ তোমাকে বরকত দান করুন, তোমার ওপর বরকত নাজিল করুন এবং তোমাদের উভয়কে কল্যাণের সঙ্গে একত্রে রাখুন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২১৩০)

সমাজচিন্তায় যে মুসলিম দার্শনিকের অবদান অনবদ্য

ইসলামী জীবন ডেস্ক
সমাজচিন্তায় যে মুসলিম দার্শনিকের অবদান অনবদ্য
সংগৃহীত ছবি

মুসলিম বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে নাসিরুদ্দিন তুসি এক অনন্য নাম। তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহু শাখায় অসামান্য অবদান রাখেন। একজন গণিতবিদ হিসেবে তাঁর কৃতিত্ব সবার ঊর্ধ্বে। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মারাগা গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র, যা বৈজ্ঞানিক চিন্তার বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীকালে এই বিদ্যালয়ের অর্জনগুলো সমরখন্দে একাধিক গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিদ্যালয়ের উত্থানের পথ সুগম করে।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী নাসিরুদ্দিন তুসি গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসাশাস্ত্র, নীতিশাস্ত্রসহ বহু বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত ‘আখলাকে নাসিরি’ সর্বাধিক ব্যাখ্যা-রচিত গ্রন্থগুলোর অন্যতম। নীতিশাস্ত্রবিষয়ক পরবর্তী গবেষণা ও রচনার গতিপথ নির্ধারণে গ্রন্থটির যুগান্তকারী অবদান আছে। নাসিরুদ্দিন তুসি এই বইয়ে তাঁর পূর্বসূরি চিন্তাবিদ ইবন মিসকাওয়াইহ, আল ফারাবি ও ইবনে সিনার বিকশিত নৈতিক, রাজনৈতিক ও নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সুসংবদ্ধ একটি বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর মধ্যে পুনর্ব্যাখ্যা ও সমন্বয় করেছেন। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে রচিত অসংখ্য নীতিশাস্ত্রবিষয়ক গ্রন্থে তাঁর গভীর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

‘আখলাকে নাসিরি’র প্রথম অংশ তাহজিবুল আখলাকে ইবনে মিসকাওয়াইহের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব সুস্পষ্ট; দ্বিতীয় অংশ তাদবিরুল মানাজিলে ইবন সিনার চিন্তাধারার প্রতিফলন; আর তৃতীয় অংশ সিয়াসাতুল মুদুন বা রাষ্ট্র ও নগর-পরিচালনা অধ্যায়ে আল ফারাবির রাজনৈতিক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত। যেহেতু মানুষ পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া জীবনধারণ করতে পারে না, তাই তাকে অবশ্যম্ভাবীভাবে একত্রে বসবাস করতে হয়। তুসির মতে, মদিনা বা নগর বলতে কেবল একটি ভৌগোলিক বসতি বোঝায় না; বরং সেখানে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে বিদ্যমান বিশেষ ধরনের সামাজিক সম্পর্ক ও সমষ্টিগত সংগঠনকেই বোঝায়।

এই বিশেষ সামাজিক ব্যবস্থার ন্যায়ভিত্তিক পরিচালনাকেই তুসি সিয়াসাহ বা রাজনীতি নামে অভিহিত করেছেন। তাঁর ভাষায়—এ কারণেই শাসনব্যবস্থার কর্তব্য হলো প্রত্যেক মানুষকে তার ন্যায্য ও প্রাপ্য অবস্থানে সন্তুষ্ট রাখা, প্রত্যেককে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করা, কাউকে যেন অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করতে বা অন্যের ওপর অবৈধ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না দেওয়া এবং প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত কাজে নিয়োজিত করা। এ ধরনের পরিচালনাকেই রাজনীতি বলা হয়।


নাসিরুদ্দিন তুসি নগরের সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসকে চারটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। প্রতিটি শ্রেণিকে চারটি প্রাচীন মৌলিক উপাদান আগুন, পানি, বায়ু ও মাটির একটির সঙ্গে সম্পর্কিত করেছেন। তিনি ‘কলমের মানুষ’ অর্থাৎ আলেম, ফকিহ, বিচারক, আরিফ (জ্ঞানের অধিকারী), কবি ও প্রকৌশলীদের নিয়ে গঠিত শ্রেণিকে পানির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, যেমন পানি জীবনধারণের মৌলিক উপাদান, তেমনি ধর্মীয় ও পার্থিব উভয় ধরনের জীবনই এই শ্রেণির অবদানের মাধ্যমে টিকে থাকে ও বিকশিত হয়।

জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত শ্রেণিকে তিনি অগ্নির সঙ্গে সম্পর্কিত করেছেন। অন্যদিকে পেশাজীবী, কারিগর ও ব্যবসায়ী সংক্ষেপে অর্থনৈতিক লেনদেন এবং শ্রমবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে তিনি বায়ুর প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেছেন। আর কৃষিকাজ, খাদ্য উৎপাদন এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত শ্রেণিকে তিনি মাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। তাঁর একটি নগরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম মৌলিক শর্ত হলো রাজনীতি যেন এই চারটি উপাদানের মধ্যে যথাযথ ভারসাম্য বজায় রাখে।

নাসিরুদ্দিন তুসির মতে, মানুষ আত্মা ও দেহ উভয়ের সমন্বয়ে গঠিত। কিন্তু আত্মা যেহেতু ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় না, তাই দেহের সঙ্গে তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও তার অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয় না। এ ছাড়া প্রতিটি সত্তাই নিজের স্বজাতীয় বস্তুর মাধ্যমে শক্তি অর্জন করে এবং তার বিপরীতের দ্বারা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই নীতির ভিত্তিতে তুসি বলেন, আত্মা যতই জড় ও দৈহিক বিষয় থেকে দূরে সরে আসে, ততই সে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সুতরাং আত্মার পরিপূর্ণতার অভিযাত্রা মূলত বস্তুজগৎ ও দেহকেন্দ্রিক আসক্তি থেকে ক্রমেই মুক্ত হওয়ার একটি যাত্রা। এই অভিযাত্রায় মানুষকে তার তিনটি স্বতন্ত্র শক্তিকে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তা হলো—ক. বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি, যা চিন্তা ও ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত।

খ. কামনা বা আকাঙ্ক্ষাশক্তি, যা ইচ্ছা, আকর্ষণ ও ভোগপ্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

গ. ক্রোধশক্তি, যা রাগ, প্রতিরোধ ও বিকর্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তুসির মতে, প্রত্যেক সত্তার পরিপূর্ণতা নিহিত রয়েছে তার প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মক্ষমতার পূর্ণ বাস্তবায়নে। সুতরাং মানুষের কাছ থেকে প্রত্যাশিত বিষয় হলো সে যেন স্বেচ্ছায় এমন প্রচেষ্টা চালায়, যার মাধ্যমে তার আত্মা এই পরিপূর্ণতার অবস্থায় পৌঁছতে পারে। এই প্রচেষ্টা একই সঙ্গে সুখ ও নৈতিক উৎকর্ষ অর্জনের সাধনা।

উল্লেখ, নাসিরুদ্দিন তুসি বিজ্ঞানী ও দার্শনিক হিসেবে সর্বমহলে বারিত হলেও ধর্মবিশ্বাসে তিনি শিয়া মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। ফলে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের অনুসারী আলেমরা তাঁর নিন্দা করে থাকেন। 

ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে

রাতের আমলই বদলে দেবে আপনার ভবিষ্যৎ

মুফতি ওমর বিন নাছির
রাতের আমলই বদলে দেবে আপনার ভবিষ্যৎ
সংগৃহীত ছবি

দিনের ব্যস্ততা শেষে যখন পৃথিবী নিস্তব্ধ হয়ে যায়, যখন কোলাহল স্তব্ধ হয়ে আসে এবং মানুষ আপন আপন ঘরে ফিরে যায়, তখন নেমে আসে রাত। এই রাত শুধু বিশ্রামের সময় নয়; এটি একজন মুমিনের জন্য আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং রবের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার এক মহামূল্যবান সুযোগ। দিনের ব্যস্ততায় মানুষ অনেক কিছু ভুলে যায়, কিন্তু রাত তাকে নিজের ভেতরের মানুষটির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

রাত এমন একটি সময়, যখন বাহ্যিক শব্দ কমে যায় এবং অন্তরের শব্দ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন মানুষ তার ভুলগুলো নিয়ে ভাবতে পারে, নিজের আমল পর্যালোচনা করতে পারে, গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হতে পারে এবং আগামী দিনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে। এজন্যই ইসলামে রাতের গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি রাতকে করেছি আবরণস্বরূপ এবং দিনকে করেছি জীবিকা অর্জনের সময়।’ (সুরা : নাবা, আয়াত : ১০-১১)


পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, ‘তারা রাতের অল্প অংশই নিদ্রায় কাটাত এবং শেষরাতে ক্ষমা প্রার্থনা করত।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ১৭-১৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতের ইবাদতকে এত গুরুত্ব দিতেন যে তাঁর পা পর্যন্ত ফুলে যেত। তখন আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘আল্লাহ তো আপনার পূর্বাপর সব গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন, তবুও আপনি এত কষ্ট করেন কেন?’ তিনি বললেন, ‘তাহলে কি আমি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?’ (সহিহ বুখারি)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের রব নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আছে যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছে যে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আছে যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৪৫, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭৫৮)

আজকের বাস্তবতা হলো, যে রাত আমাদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যম হওয়ার কথা ছিল, সেই রাতই অনেকের জন্য গাফেলত, মোবাইল আসক্তি, উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিং, সিরিজ-নাটক দেখা এবং সময় অপচয়ের সময়ে পরিণত হয়েছে। বাস্তবতা হলো, একজন মানুষের ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ধারিত হয় তার রাতের অভ্যাস দ্বারা। যে ব্যক্তি রাতকে ইবাদত, জ্ঞানার্জন ও আত্মসমালোচনায় ব্যয় করে, তার জীবন ধীরে ধীরে আলোকিত হয়ে ওঠে। আর যে ব্যক্তি রাতকে গুনাহ ও গাফেলতিতে নষ্ট করে, সে নিজের অজান্তেই ক্ষতির পথে এগিয়ে যায়। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। আমিন। 

ইসলামের দৃষ্টিতে

শিশুর জেদ : কারণ ও প্রতিকার

আতাউর রহমান খসরু
শিশুর জেদ : কারণ ও প্রতিকার
সংগৃহীত ছবি

শিশুর জেদ মা-বাবার বড় দুশ্চিন্তার কারণ। মা-বাবা ও অভিভাবক না সহ্য করতে পারেন শিশুর অযৌক্তিক জেদ, না পারেন তাকে কঠোরভাবে শাসন করতে। ফলে কখনো তারা হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেন। আবার কখনো তাদের অতি কঠোরতায় বখে যায় আদরের সন্তান। ইসলাম সর্বাবস্থায় শিশুর প্রতি কোমল আচরণের পরামর্শ দেয়। শিশু জেদি হলে তার প্রতিপালনে বাস্তবমুখী আচরণ ও মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়।

 শিশু জেদি হয় কেন

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিশু জেদি হয়ে জন্মগ্রহণ করে না, বরং পারিপার্শ্বিক কারণে তারা জেদি হয়। জেদি শিশুর সঙ্গে যথোপযুক্ত আচরণ করতে চাইলে প্রথমেই এসব কারণ বুঝতে হবে। চিকিৎসক, গবেষক ও প্রাজ্ঞ লোকেরা শিশুর জেদের কিছু কারণ বর্ণনা করেন। তা হলো—

১. স্বভাবজাত কারণ : শিশুর কিছু কিছু জেদ স্বভাবজাত। শিশুদের ভাষা ও অভিব্যক্তি প্রকাশে সীমাবদ্ধতা থাকায় তারা কখনো কখনো জেদকে ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে। যেমন মা-বাবা বা অভিভাবকরা শিশুর প্রতি মনোযোগী না হলে, তাকে অবহেলা বা উপেক্ষা করলে শিশু জেদ দেখাতে পারে। কখনো ভয় পাচ্ছে এমন কাজ তার ওপর চাপিয়ে দিলেও শিশু জেদ দেখাতে পারে।

২. প্রতিপালনের ত্রুটি : মা-বাবা ও অভিভাবকদের ভুল প্রতিপালন, আচরণ ও শাসনের কারণেও শিশু জেদি হয়ে উঠতে পারে। যেমন—শিশুর প্রতি কথায় কথায় রাগ প্রকাশ করলে, বড়রা পরস্পরের প্রতি বেশি জেদ দেখালে, শিশুর যৌক্তিক দাবি প্রত্যাখ্যান করলে, পরিবারে সে বৈষম্য ও অবিচারের শিকার হলে শিশু জেদি হয়ে উঠতে পারে।

৩. পরিবেশগত কারণ : শিশু মন্দ সঙ্গ ও পরিবেশের কারণেও জেদি হয়ে উঠতে পারে। সে যদি তার কোনো বন্ধু বা খেলার সাথিকে জেদ দেখাতে এবং তা দেখিয়ে দাবি আদায় করতে দেখে তাতে তার ভেতরও জেদ প্রকাশের প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

৪. স্বাস্থ্যগত কারণ : চিকিৎসকরা বলেন, জেনেটিক বা পরিবেশগত কারণের বাইরেও স্বাস্থ্যগত ত্রুটির কারণেও শিশুর অতিরিক্ত জেদ হতে পারে। যেমন—শিশুর এপিলেপসি (খিঁচুনির) বা এডিএইচডির সমস্যা থাকলে শিশুরা অতিরিক্ত জেদ দেখাতে পারে।

জেদি শিশুর প্রতি আচরণ

ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুর বোধ-বুদ্ধি পরিপক্ব হওয়া পর্যন্ত তার সব কথা, কাজ ও আচরণ ক্ষমার যোগ্য। তাই যে শিশু ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝে না তার প্রতি ধৈর্য ও সহনশীলতা প্রদর্শন এবং কোমল আচরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর যে শিশু বুঝমান তার প্রতি স্নেহ ও অকঠোর শাসনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিম্নে ইসলামের নির্দেশনা তুলে ধরা হলো—

১. স্নেহ ও মমতা প্রদর্শন : শিশু জেদি হলেও ইসলাম তার প্রতি কোমল ও স্নেহের আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে ছোটকে স্নেহ ও বড়কে সম্মান করে না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৪৩)

২. ধৈর্য ও সহনশীলতা : ইসলাম শিশুর প্রতি সর্বোচ্চ সহনশীল আচরণের নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে। আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বীয় কন্যা জয়নব (রা.)-এর মেয়ে উমামাকে কোলে নিয়ে নামাজ আদায় করতেন। তিনি যখন সিজদা করতেন তাকে নামিয়ে রাখতেন এবং যখন দাঁড়াতেন কোলে তুলে নিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫১৬)

৩. উত্তম আচরণ ও পরিবেশ : শিশুরা অনুকরণপ্রিয়, তারা চারপাশের মানুষগুলো থেকে আচরণ শেখে। তাই শিশুর সঙ্গে এবং তার উপস্থিতিতে তেমন আচরণ করা উচিত যেমন তার কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয়। এটা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কর্মকৌশল ছিল। পবিত্র কোআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘রাসুলের জীবনে তোমাদের জন্য আছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ২১)

৪. সন্তানদের ভেতর ইনসাফ : পারিবারিক জুলুম, অবিচার ও অবহেলা শিশুকে জেদি ও এক রোখা করে তুলতে পারে। তাই ইসলাম সন্তানদের ভেতর ইনসাফ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের ভেতর ইনসাফ করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৫৮৭)

৫. ভালো কাজের প্রশংসা : শিশুরা প্রশংসা শুনতে পছন্দ করে। তাই সে কোনো ভালো করলে তার প্রশংসা করা এবং উৎসাহ দেওয়া উচিত। এতে তার ভেতর ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে উঠবে। পবিত্র কোরআনে মুমিনদের ভালো কাজের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার পথ করে দেবেন এবং তাকে ধারণাতীত উৎস থেকে দান করবেন জীবিকা।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ২-৩)

৬. জেদের বিপরীতে জেদ নয় : অনেক সময় মা-বাবা ও অভিভাবক সন্তানের সঙ্গে জেদাজেদিতে লিপ্ত হন। এটা অনুচিত ও অগ্রহণযোগ্য। কেননা অবুঝ শিশু ও অভিভাবক কখনো সমান নয়। ইসলামের শিক্ষা হলো মন্দের পরিবর্তে ভালো। অর্থাৎ শিশু জেদ দেখালে অভিভাবক তাকে যুক্তি ও উপদেশের মাধ্যমে বোঝাবেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত করো উত্কৃষ্ট দ্বারা, ফলে তোমার সঙ্গে যার শত্রুতা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো।’ (সুরা : হা-মিম-সাজদা, আয়াত : ৩৪)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই কোমলতা যেকোনো বিষয়কে সুন্দর করে এবং তা ত্যাগ করলে যেকোনো বিষয় কদর্য হয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৪৭৮)

৭. ন্যায়সংগত শাসন : ইসলাম শিশুর সঙ্গে প্রথমে কোমল আচরণের নির্দেশ দেয়। কিন্তু শিশুর সংশোধন না হলে ন্যায়সংগত শাসনের অনুমতি দেয়। তা হলো শিশুর বয়স, পরিপক্বতা ও অবাধ্যতার মাত্রা বিবেচনা করে অকঠোর শাসন ও শাস্তি প্রদান করা। শাস্তি শুধু শারীরিক আঘাত নয়, বরং ভর্ৎসনা ও তিরস্কারও শাসন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদেরকে নামাজের আদেশ দাও এবং ১০ বছর হলে তাদেরকে নামাজের জন্য প্রহার কোরো। আর বিছানায় তাদের মধ্যে দূরত্ব রাখো।’(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৫)

৮. প্রয়োজনে চিকিৎসা : শিশুর জেদকে সব সময় স্বভাবজাত ও বংশগত বিষয় ভাবা উচিত নয়। শিশু অতিরিক্ত জেদ দেখালে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং তার নিয়মিত চিকিৎসা করতে হবে। ইসলাম প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণে উৎসাহিত করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক রোগের প্রতিষেধক আছে। রোগী যখন সঠিক প্রতিষেধক লাভ করে তখন আল্লাহর নির্দেশে সে আরোগ্য লাভ করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২২০৪)

শিশুর জেদ সামলানোর উপায়

অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রাজ্ঞ আলেমরা জেদি শিশুকে সামলাতে নিম্নের পরামর্শগুলো দেন—

১. শিশুর প্রয়োজন ও আবেগ বুঝতে চেষ্টা করুন। তার কথা ও মতামতকে গুরুত্ব দিন।

২. শিশুর ভাষা ও অভিব্যক্তিগুলো পর্যালোচনা করুন। যেন জেদ দেখানোর আগেই তার সমস্যার সমাধান করা যায়।

৩. শিশুর প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করুন। তার প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করুন। অহেতুক সমালোচনা পরিহার করুন।

৪. শিশুর প্রতি কার্পণ্যহীন ভালোবাসা প্রকাশ করুন। সাধারণত শিশুরা স্নেহ ও ভালোবাসা লাভে আগ্রহী হয়ে থাকে।

৫. শিশুর কাজের সীমা নির্ধারণ করে দিন। নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত তাকে স্বাধীনতা দিন। প্রয়োজনে ধীরে ধীরে তা সংকুচিত করুন।

৬. জেদের সময় শিশুকে অবকাশ দিন। জেদ কমে এলে তাকে স্নেহ, মমতা ও যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে বলুন।

৭. যথাসম্ভব শারীরিক শাস্তি পরিহার করুন।

সর্বোপরি আল্লাহর কাছে অধিক পরিমাণে দোয়া করুন। কেননা যেকোনো বিষয়ে আল্লাহর ইচ্ছাই চূড়ান্ত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ দোয়া শিখিয়েছেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করো, যারা হবে আমাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর এবং আমাদেরকে করো মুত্তাকিদের জন্য অনুসরণযোগ্য।’ (সুরা : ফোরকান, আয়াত : ৭৪)

আল্লাহ সন্তানের ব্যাপারে সব মা-বাবার দুশ্চিন্তা দূর করে দিন। আমিন।