স্পেন ও ফ্রান্সে আবারও তীব্র তাপপ্রবাহের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হতে পারে।
স্পেনের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, এই তাপপ্রবাহ অন্তত রবিবার পর্যন্ত চলতে পারে। একই সঙ্গে দেশজুড়ে চরম দাবানলের ঝুঁকির সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বর্তমানে দমকলকর্মীরা দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিরোন্দ ও লঁদ এলাকায় তাপপ্রবাহের কারণে ‘হলুদ সতর্কতা’ জারি করা হয়েছে। বুধবার পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে জিরোন্দের বড় দাবানল নিয়ন্ত্রণের কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বোর্দো শহরের মেয়র টমাস ক্যাজেনভ বলেন, শহর থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে একটি বড় দাবানল জ্বলছে। তাই সম্ভাব্য সব পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে আরো মানুষকে সরিয়ে নিয়ে আশ্রয় দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। দাবানলের কারণে ফ্রান্সে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার এবং স্পেনে ১ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমে একটি বড় আগুন এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে।
দাবানলকবলিত জিরোন্দ অঞ্চল পরিদর্শনের সময় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ বলেন, দেশটি একেবারে নজিরবিহীন দাবানলের মুখোমুখি হয়েছে। তার মতে, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল।
ম্যাখোঁ জানান, লঁদ অঞ্চলের একটি ছোট দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও পাশের জিরোন্দ অঞ্চলে আগুন নেভানোর চেষ্টা এখনও চলছে। ফ্রান্সে দাবানল কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও নতুন তাপপ্রবাহের কারণে পরিস্থিতি আবারও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দাবানলকবলিত এলাকা পরিদর্শনের সময় প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ বলেন, অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা কিছু অগ্রগতি করেছেন। তবে তাপমাত্রা আবার বাড়বে এবং প্রবল বাতাস বইতে পারে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ বলেন, দাবানল এমনভাবে ছড়াচ্ছে যেনো এর নিজেরই একটি জীবন রয়েছে।
বোর্দোর দক্ষিণে সেস্তাস শহরের মেয়র জেরোম স্টেফি বিবিসিকে বলেন, এটি শতাব্দীর সবচেয়ে বড় দাবানল হতে পারে। তিনি জানান, মাত্র দুই দিন আগে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় রাতের মধ্যে তার শহর থেকে ১৭ হাজার বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত ওই অঞ্চলে ৪২ হাজার হেক্টরের বেশি বনভূমি পুড়ে গেছে এবং ২৪০টি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে।
স্টেফি বলেন, ‘আমাদের শহরের পরিস্থিতি সত্যিই ভয়াবহ।’
তার মতে, আগুনের বিস্তার আগের তুলনায় ধীর হলেও বিপদ এখনও কাটেনি। বাতাসে উড়ে যাওয়া জ্বলন্ত অঙ্গার বা বাতাসের দিক পরিবর্তনের কারণে যে কোনো সময় নতুন করে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। তিনি জানান, আগুন ঠেকাতে প্রতিরক্ষামূলক ফায়ারব্রেক তৈরিতে সব ধরনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন।
এদিকে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকোর্নু বলেছেন, দেশটি নজিরবিহীন দাবানলের মৌসুম পার করছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ১৬ হাজার ৮৫ হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে এবং ১৩ হাজার ৫৬৬টি দাবানলের ঘটনা ঘটেছে।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, প্রতি ১০টি দাবানলের মধ্যে ৯টিই মানুষের কারণে ঘটেছে। এর বেশিরভাগই অসাবধানতার ফল। যেমন, জ্বলন্ত সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ফেলে দেওয়া, বারবিকিউ ব্যবহার বা যথাযথ সতর্কতা ছাড়া বিভিন্ন ধরনের কাজ করা।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকোর্নু বলেছেন, সব দাবানল দুর্ঘটনাবশত ঘটেনি। কিছু আগুন ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো হয়েছে বলেও সন্দেহ করা হচ্ছে। তিনি জানান, ৬ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত দাবানল-সংক্রান্ত ঘটনায় ১৬২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে ফ্রান্সের ভার, ল্যান্ডেস এবং কর্সিকা দ্বীপের ওত-কর্সসহ আরো কয়েকটি এলাকায় দাবানল জ্বলছে।
অন্যদিকে, প্রতিবেশী স্পেনে রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানলের কারণে টানা পঞ্চম দিনের মতো জাতীয় জরুরি অবস্থা বহাল রয়েছে।
বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চলের দাবানলে ইতোমধ্যে ২৭ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে। ২৪ ও ২৬ জুলাই তোলা স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, আলমরক্স, ভিলা দেল প্রাডো এবং সান মার্টিন দে ভালদেইগ্লেসিয়াস এলাকায় শুরু হওয়া কয়েকটি ছোট আগুন একত্রিত হয়ে মাত্র দুই দিনের মধ্যে একটি বড় দাবানলে পরিণত হয়েছে। এতে পোড়া এলাকার পরিধিও দ্রুত বেড়েছে।
স্থানীয় কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই অঞ্চল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের মুখোমুখি হয়েছে। এদিকে ইউরোপের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ছে। ইউরোপ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ, যেখানে উষ্ণতার হার বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে ইউরোপে গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন ও তীব্র হচ্ছে। পাশাপাশি পানির ওপর চাপ বাড়ছে এবং দাবানলের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতিও বাড়ছে।





