• ই-পেপার

বৈশ্বিক যোগাযোগ বাড়াতে ৪৪ বিমানবন্দর তৈরি করবে ভারত

তাপপ্রবাহ ও দাবানলের দ্বিমুখী সংকটে স্পেন-ফ্রান্স

অনলাইন ডেস্ক
তাপপ্রবাহ ও দাবানলের দ্বিমুখী সংকটে স্পেন-ফ্রান্স
ছবি : রয়টার্স

স্পেন ও ফ্রান্সে আবারও তীব্র তাপপ্রবাহের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হতে পারে।

স্পেনের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, এই তাপপ্রবাহ অন্তত রবিবার পর্যন্ত চলতে পারে। একই সঙ্গে দেশজুড়ে চরম দাবানলের ঝুঁকির সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বর্তমানে দমকলকর্মীরা দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন।

ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিরোন্দ ও লঁদ এলাকায় তাপপ্রবাহের কারণে ‘হলুদ সতর্কতা’ জারি করা হয়েছে। বুধবার পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে জিরোন্দের বড় দাবানল নিয়ন্ত্রণের কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

বোর্দো শহরের মেয়র টমাস ক্যাজেনভ বলেন, শহর থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে একটি বড় দাবানল জ্বলছে। তাই সম্ভাব্য সব পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে আরো মানুষকে সরিয়ে নিয়ে আশ্রয় দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। দাবানলের কারণে ফ্রান্সে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার এবং স্পেনে ১ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমে একটি বড় আগুন এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে।

দাবানলকবলিত জিরোন্দ অঞ্চল পরিদর্শনের সময় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ বলেন, দেশটি একেবারে নজিরবিহীন দাবানলের মুখোমুখি হয়েছে। তার মতে, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল।

ম্যাখোঁ জানান, লঁদ অঞ্চলের একটি ছোট দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও পাশের জিরোন্দ অঞ্চলে আগুন নেভানোর চেষ্টা এখনও চলছে। ফ্রান্সে দাবানল কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও নতুন তাপপ্রবাহের কারণে পরিস্থিতি আবারও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দাবানলকবলিত এলাকা পরিদর্শনের সময় প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ বলেন, অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা কিছু অগ্রগতি করেছেন। তবে তাপমাত্রা আবার বাড়বে এবং প্রবল বাতাস বইতে পারে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ বলেন, দাবানল এমনভাবে ছড়াচ্ছে যেনো এর নিজেরই একটি জীবন রয়েছে।

বোর্দোর দক্ষিণে সেস্তাস শহরের মেয়র জেরোম স্টেফি বিবিসিকে বলেন, এটি শতাব্দীর সবচেয়ে বড় দাবানল হতে পারে। তিনি জানান, মাত্র দুই দিন আগে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় রাতের মধ্যে তার শহর থেকে ১৭ হাজার বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত ওই অঞ্চলে ৪২ হাজার হেক্টরের বেশি বনভূমি পুড়ে গেছে এবং ২৪০টি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে।

স্টেফি বলেন, ‘আমাদের শহরের পরিস্থিতি সত্যিই ভয়াবহ।’

তার মতে, আগুনের বিস্তার আগের তুলনায় ধীর হলেও বিপদ এখনও কাটেনি। বাতাসে উড়ে যাওয়া জ্বলন্ত অঙ্গার বা বাতাসের দিক পরিবর্তনের কারণে যে কোনো সময় নতুন করে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। তিনি জানান, আগুন ঠেকাতে প্রতিরক্ষামূলক ফায়ারব্রেক তৈরিতে সব ধরনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন।

এদিকে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকোর্নু বলেছেন, দেশটি নজিরবিহীন দাবানলের মৌসুম পার করছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ১৬ হাজার ৮৫ হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে এবং ১৩ হাজার ৫৬৬টি দাবানলের ঘটনা ঘটেছে।

তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, প্রতি ১০টি দাবানলের মধ্যে ৯টিই মানুষের কারণে ঘটেছে। এর বেশিরভাগই অসাবধানতার ফল। যেমন, জ্বলন্ত সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ফেলে দেওয়া, বারবিকিউ ব্যবহার বা যথাযথ সতর্কতা ছাড়া বিভিন্ন ধরনের কাজ করা।

ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকোর্নু বলেছেন, সব দাবানল দুর্ঘটনাবশত ঘটেনি। কিছু আগুন ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো হয়েছে বলেও সন্দেহ করা হচ্ছে। তিনি জানান, ৬ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত দাবানল-সংক্রান্ত ঘটনায় ১৬২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে ফ্রান্সের ভার, ল্যান্ডেস এবং কর্সিকা দ্বীপের ওত-কর্সসহ আরো কয়েকটি এলাকায় দাবানল জ্বলছে।

অন্যদিকে, প্রতিবেশী স্পেনে রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানলের কারণে টানা পঞ্চম দিনের মতো জাতীয় জরুরি অবস্থা বহাল রয়েছে।

বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চলের দাবানলে ইতোমধ্যে ২৭ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে। ২৪ ও ২৬ জুলাই তোলা স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, আলমরক্স, ভিলা দেল প্রাডো এবং সান মার্টিন দে ভালদেইগ্লেসিয়াস এলাকায় শুরু হওয়া কয়েকটি ছোট আগুন একত্রিত হয়ে মাত্র দুই দিনের মধ্যে একটি বড় দাবানলে পরিণত হয়েছে। এতে পোড়া এলাকার পরিধিও দ্রুত বেড়েছে।

স্থানীয় কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই অঞ্চল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের মুখোমুখি হয়েছে। এদিকে ইউরোপের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ছে। ইউরোপ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ, যেখানে উষ্ণতার হার বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে ইউরোপে গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন ও তীব্র হচ্ছে। পাশাপাশি পানির ওপর চাপ বাড়ছে এবং দাবানলের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতিও বাড়ছে।
 

মোদির ভিডিও সরানোর ঘটনায় ভারতের কাছে ক্ষমা চাইল মেটা

অনলাইন ডেস্ক
মোদির ভিডিও সরানোর ঘটনায় ভারতের কাছে ক্ষমা চাইল মেটা
সংগৃহীত ছবি

ভারতে ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি ভিডিও কিছু সময়ের জন্য সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় সরকারের কাছে ক্ষমা চেয়েছে মেটা। প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে ভুল করে ভিডিওটি ব্লক করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
 
বিষয়টি সম্পর্কে জানেন এমন কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, মেটা ভারত সরকারকে ব্যাখ্যা দিয়েছে এবং পরে ভিডিওটি আবারও ফেসবুকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। মেটার এক মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, 'ভুলবশত এই কনটেন্ট সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। পরে সেটি আবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।' সূত্রগুলো জানিয়েছে, ভারত সরকার ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। ভিডিওটি কেন সরানো হয়েছিল এবং মেটার দেওয়া ব্যাখ্যা কতটা গ্রহণযোগ্য, তা যাচাই করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে মেটার প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডেকে পাঠানো হতে পারে বলেও সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে ভারতের সরকার বা মেটা আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেনি।

গত ২৩ জুলাই ফেসবুকে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়। ভিডিওতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) আয়োজিত একটি শিক্ষার্থী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দেওয়া বক্তব্য ছিল। সেখানে তিনি তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেনারেশন জির উদ্দেশে কথা বলেন। নিজের বক্তব্যে মোদি জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করতে সরকার আরো কঠোর পদক্ষেপ নেবে।

ভিডিওটি আবার চালু করার আগে ভারতের কিছু ব্যবহারকারী একটি নোটিশ দেখতে পান। সেখানে বলা হয়, আইনি অনুরোধের কারণে ওই অঞ্চলে ভিডিওটি সীমিত করা হয়েছে। তবে মেটা পরে জানায়, ভিডিও সরানোর পেছনে কোনো ইচ্ছাকৃত সিদ্ধান্ত ছিল না। প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে এটি ভুলভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ভিডিওটি সরানোর আগে সেটি কয়েক মিলিয়ন বার দেখা হয়েছিল। পরে আবার ব্যবহারকারীদের জন্য ভিডিওটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।


 

ভারত

‘ককরোচ’ আন্দোলনের পর এবার ইন্সটাগ্রামে জনপ্রিয় হচ্ছে ‘ই২০ জনতা পার্টি’

অনলাইন ডেস্ক
‘ককরোচ’ আন্দোলনের পর এবার ইন্সটাগ্রামে জনপ্রিয় হচ্ছে ‘ই২০ জনতা পার্টি’
ছবি : রয়টার্স

ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলোচনায় আসা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র পর এবার ইথানল-মিশ্রিত ই২০ জ্বালানির বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন একটি ডিজিটাল আন্দোলন শুরু হয়েছে। ‘ই২০ জনতা পার্টি’ নামে এই গোষ্ঠী দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

প্রতিবেদন প্রকাশের সময় ইন্সটাগ্রামে ‘ই২০ জনতা পার্টি’র অনুসারীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১৮ হাজারের বেশি, যা দ্রুত বাড়ছে।

এই গোষ্ঠীর দাবি, সাধারণ মানুষকে ছাড়মূল্যে ১০০ শতাংশ বিশুদ্ধ (অমিশ্রিত) পেট্রোল বেছে নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি তারা কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহনমন্ত্রী নিতিন গড়করির পদত্যাগও দাবি করছে। তবে সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, ইথানলবিহীন পেট্রোলে ফিরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।

বর্তমানে ভারতে বিক্রি হওয়া পেট্রোলের নাম ই২০। এতে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানো থাকে। সরকারের দাবি, এই জ্বালানি পরিবেশবান্ধব এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত। অন্যদিকে, সমালোচকদের অভিযোগ, ই২০ ব্যবহারে গাড়ির মাইলেজ কমে যায় এবং ইঞ্জিনের ক্ষতি হতে পারে।

তবে সরকার বলছে, পরীক্ষাগার ও বাস্তব ব্যবহারের তথ্য অনুযায়ী ই২০ জ্বালানি ইঞ্জিনের কোনো ক্ষতি করে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে সরকার স্বীকার করেছে, ই১০ উপযোগী পুরোনো গাড়িতে ই২০ ব্যবহার করলে মাইলেজ কিছুটা কমতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র আলোচিত ডিজিটাল আন্দোলনের পর ‘ই২০ জনতা পার্টি’র উত্থান সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক জনমতের নতুন প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

উল্লেখ্য, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র আন্দোলনের পর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। এরপর গত সপ্তাহে সংগঠনটি তাদের প্রায় এক মাসের আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয়।
 

জাপানে মসজিদ নির্মাণ ঘিরে বিতর্ক, বাড়ছে অভিবাসন ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা

অনলাইন ডেস্ক
জাপানে মসজিদ নির্মাণ ঘিরে বিতর্ক, বাড়ছে অভিবাসন ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা
ছবি : রয়টার্স

জাপানের কানাগাওয়া প্রিফেকচারের উপকূলীয় শহর ফুজিসাওয়ায় প্রথম মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। টোকিও থেকে প্রায় এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত এই শহরে কেউ মসজিদ নির্মাণকে স্বাগত জানাচ্ছেন, আবার কেউ সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

প্রস্তাবিত মসজিদটি একটি খোলা মাঠে নির্মাণ করা হবে। দীর্ঘদিনের বাসিন্দা নরিকা ইজুমিজাওয়া বলেন, নতুন এই পরিবর্তনের ফলে এলাকার সামাজিক পরিবেশ কীভাবে বদলাবে, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে অভিবাসন নিয়ে চলমান বিতর্কও তার উদ্বেগের একটি কারণ।

জাপানে জন্মহার কমে যাওয়া, জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং শ্রমিক সংকটের কারণে বিভিন্ন খাতে বিদেশি কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। এর ফলে দেশটিতে বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মের মানুষের উপস্থিতিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ফুজিসাওয়ার মসজিদ বিতর্ক আসলে জাপানে অভিবাসন, ধর্মীয় বৈচিত্র্য ও সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে চলা বৃহত্তর আলোচনারই প্রতিফলন।

চলতি বছরের শুরুতে প্রস্তাবিত মসজিদের বিরুদ্ধে স্থানীয় রেলস্টেশনের সামনে বিক্ষোভ হয়। বিক্ষোভকারীদের একাংশের দাবি, কাছের একটি শিন্তো মন্দিরের তুলনায় বড় আকারের মসজিদ স্থানীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মসজিদকে কেন্দ্র করে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। 

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, কয়েকটি মসজিদে আপত্তিকর ফোনকল ও ই-মেইলও পাঠানো হয়েছে। এর প্রতিবাদে বিদ্বেষবিরোধী সংগঠনগুলো ‘বিদ্বেষ নয়’ স্লোগানে পাল্টা কর্মসূচি পালন করেছে। তবে সবাই মসজিদ নির্মাণের বিরোধিতা করছেন না। প্রস্তাবিত মসজিদের বিপরীতে একটি কফি শপের মালিক হিরোকি সুজুকা বলেন, সমর্থন বা বিরোধিতার আগে ইসলাম ও মুসলিমদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা উচিত।

তার ভাষায়, ‘আমি মসজিদের কট্টর সমর্থক বা বিরোধী নই। তবে ইসলাম, মুসলিমদের জীবনধারা ও তাদের মূল্যবোধ সম্পর্কে জানলে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়বে। খোলা মন নিয়ে একে অপরকে বোঝার মধ্য দিয়েই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব।’

ওসাকায় প্রায় ৩৯ বছর ধরে বসবাস করছেন শ্রীলঙ্কা থেকে আসা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মহিউদ্দিন। ১৯৮৭ সালে তিনি অর্থনৈতিক সুযোগের খোঁজে জাপানে আসেন। প্রথমে রত্নপাথরের ব্যবসা এবং পরে ব্যবহৃত গাড়ি রপ্তানির ব্যবসায় যুক্ত হন।

মহিউদ্দিন বলেন, তিনি যখন জাপানে আসেন, তখন বিদেশি বাসিন্দা কম ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলিমদের প্রতি কিছু মানুষের নেতিবাচক মনোভাব বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই ‘জাপান ছেড়ে চলে যাও’ বা ‘নিজের দেশে ফিরে যাও’ ধরনের মন্তব্য দেখা যায়। এমনকি কিছু মানুষ মসজিদে এসে মুসল্লিদের অপমানও করেন।

তিনি জানান, ব্যক্তিগতভাবে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা অনুভব না করলেও মুসলিমদের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন তিনি লক্ষ্য করেছেন। তার মতে, মুসলিমদের ‘সন্ত্রাসী’ বলা, বোমা তৈরির অভিযোগ তোলা কিংবা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার মতো মন্তব্য আগের তুলনায় বেড়েছে।

মহিউদ্দিন বলেন, এসব পরিস্থিতিতে তারা ধৈর্য ধরে শান্ত আচরণ করার চেষ্টা করেন। তার মতে, অনেক জাপানির ইসলাম সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। তবে মুসলিম সম্প্রদায়ও স্থানীয় সমাজের সঙ্গে আরো বেশি যোগাযোগ ও নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে পারলে এই দূরত্ব কমবে।

অন্যদিকে সাইতামা প্রিফেকচারের ইয়াশিও মসজিদের প্রতিনিধি শাকিল মোহাম্মদ বলেন, জাপানে বসবাসকারী বিদেশিদের অবশ্যই দেশটির আইন ও সামাজিক নিয়ম মেনে চলা উচিত। তিনি বলেন, আবর্জনা নির্ধারিত নিয়মে আলাদা করা, পার্কিং আইন মানা, সাইকেল চালানোর সময় হেলমেট ব্যবহার এবং দৈনন্দিন সৌজন্যবোধের মতো বিষয়গুলো মুসলিম সম্প্রদায় গুরুত্ব দিয়ে অনুসরণ করে।

তিনি জানান, ইয়াশিও এলাকায় পাকিস্তানি সম্প্রদায়ের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেকে এলাকাটিকে রসিকতার ছলে ‘ইয়াশিও-স্তান’ বলে ডাকেন। তার মতে, কিছু মানুষের খারাপ আচরণের জন্য পুরো একটি সম্প্রদায়কে দোষারোপ করা উচিত নয়।

জনসংখ্যা সংকট ও শ্রমিকের অভাব মোকাবিলায় জাপান ক্রমেই বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। এর ফলে দেশজুড়ে অভিবাসন, জাতীয় পরিচয় এবং সামাজিক সংহতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

জাপানে মুসলিম সম্প্রদায় নিয়ে গবেষণা করা ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হিরোফুমি তানাদার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ দেশটিতে বিদেশি বাসিন্দা ও ইসলাম গ্রহণকারী জাপানিসহ মুসলিমের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছেছে। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জাপানে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। তাদের বেশিরভাগই চীন, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপাইন থেকে এসেছেন। একই সময়ে বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা রেকর্ড ২৫ লাখ ৭০ হাজারে পৌঁছায়। অন্যদিকে, ওই বছর জাপানের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ কমে যায়।

দীর্ঘদিন ধরে জাপান সরকার দেশটিকে অভিবাসীনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ না করে অস্থায়ী কর্মসংস্থানভিত্তিক ভিসা ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, এই নীতিই কার্যত একটি ‘গোপন অভিবাসন ব্যবস্থা’ তৈরি করেছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সরকার অভিবাসন নীতিতে আরো কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে বিদেশি নাগরিকদের ভিসা ফি প্রায় পাঁচ গুণ বাড়ানো হয়। পাশাপাশি ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা জোরদারে ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস এজেন্সিতে অতিরিক্ত প্রায় ২৩০ জন কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সীমা নির্ধারণের বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাপান এখন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে জাতীয় পরিচয় ও সামাজিক সংহতি বজায় রেখে কতটা বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করা সম্ভব, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

তবে ফুজিসাওয়ার বাসিন্দা নরিকা ইজুমিজাওয়া শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেছেন, তার কোনো মুসলিম প্রতিবেশীর সঙ্গে কখনও ব্যক্তিগতভাবে নেতিবাচক অভিজ্ঞতা হয়নি। তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, হয়তো আমি শুধু অজানাকেই ভয় পাই।’