ইসলাম মানুষকে ঈমান ও তাকওয়া অর্জনের পাশাপাশি জ্ঞানচর্চা, সুচিন্তা, গবেষণা, পর্যবেক্ষণ ও মানবকল্যাণমূলক উদ্ভাবনের প্রতি গুরুত্বারোপ করে। মানবজাতির জন্য নাজিলকৃত সর্বশ্রেষ্ঠ সংবিধান মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের প্রথম আয়াত নাজিল হয় ‘পড়ো’ শব্দ দিয়ে। এরপর অসংখ্য আয়াতে মানুষকে চিন্তা করতে, পর্যবেক্ষণ করতে, শিক্ষা গ্রহণ করতে এবং সৃষ্টিজগতের রহস্য অনুধাবন করতে আহবান জানানো হয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’
(সুরা : আলাক, আয়াত : ১)
কোরআন-হাদিসের মৌলিক জ্ঞানার্জন ছাড়া ইসলাম পালন করাও সম্ভব নয়। তাই ইসলামের প্রথম নির্দেশই ছিল শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানের পথে অগ্রসর হওয়া। পবিত্র কোরআন-হাদিসের নির্দেশিত পদ্ধতিতে জ্ঞানার্জন ও গবেষণার মধ্যে ঈমানের পূর্ণতা আসে। তাদের মধ্যে মহান আল্লাহর বড়ত্ব, মহব্বত ও ভয়ের সৃষ্টি হয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ জ্ঞানী ব্যক্তিদের ব্যাপারে বলেছেন, ‘যারা আল্লাহকে স্মরণ করে দাঁড়িয়ে, বসে ও কাত হয়ে এবং আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে। (বলে) হে আমাদের রব, তুমি এসব অনর্থক সৃষ্টি করোনি। তুমি পবিত্র মহান। সুতরাং তুমি আমাদেরকে আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৯১)
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের পর্যবেক্ষণ, অনুসন্ধান ও বাস্তব জগতের গবেষণার প্রতি উৎসাহ দিতে গিয়ে বলেন, ‘বলো তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করো, অতঃপর লক্ষ করো কিভাবে আল্লাহ সৃষ্টির সূচনা করেছেন, অতঃপর আল্লাহ সৃষ্টি করবেন পরবর্তী সৃষ্টি, আল্লাহ সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ২০)
সুবহানাল্লাহ! জ্ঞানার্জন ও গবেষণা শুধু মানুষের ঈমানই দৃঢ় করে না, বরং পৃথিবীবাসীর বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে নতুন নতুন উদ্ভাবনের শক্তি জোগায়, যা ঈমান-আমল ঠিক রেখে বিশুদ্ধ নিয়তে করলে অত্যন্ত সওয়াবের কাজ হতে পারে। পাশাপাশি তা হালাল রিজিক অর্জনেও সহায়ক হতে পারে। মহান আল্লাহর প্রেরিত অনেক নবী-রাসুলও তৎকালীন যুগের বিভিন্ন উদ্ভাবনী কাজে দক্ষ ছিলেন; যেমন—ইদ্রিস (আ.) কাপড় সেলাইয়ে দক্ষ ছিলেন। নুহ (আ.) কাঠের নিখুঁত কাজে দক্ষ ছিলেন, এমনকি তিনি তাঁর উম্মতকে মহাপ্লাবন থেকে রক্ষা করতে আল্লাহর নির্দেশে বিশাল নৌকা তৈরি করেছিলেন। দাউদ (আ.) যুদ্ধাস্ত্র, লৌহবর্ম ও দেহবস্ত্র প্রস্তুত করতে দক্ষ ছিলেন, যা তৎকালীন যুগে যুদ্ধকালীন নিরাপত্তার ধারণাই পাল্টে দিয়েছিল।
এমনকি একসময় মুসলিমরাও নতুন নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে পৃথিবীর জ্ঞান-বিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল। মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগে চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, প্রকৌশল, কৃষি, নগর পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বমানের উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছিল। তাই মুমিনের উচিত, নিজের ঈমান-আমল ঠিক রাখার পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করা। নতুন নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে জনকল্যাণে লিপ্ত থাকার চেষ্টা করা। তথ্য-প্রযুক্তির দুনিয়ায়ও নিজেদের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করা। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে উদ্ভাবন মানে দ্বিনের মধ্যে নতুন ইবাদত প্রবর্তন (বিদআত) নয়; বরং আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান ও মেধা কাজে লাগিয়ে মানুষের জীবন সহজ করা, সমস্যা সমাধান করা এবং বৈধ উপায়ে সভ্যতার উন্নয়ন ঘটানোর চেষ্টা করা।
আজকের মুসলিম সমাজ যদি পবিত্র কোরআনের ‘পড়ো’, ‘চিন্তা করো’—এই আহবানগুলোকে জীবনের কর্মসূচি বানাতে পারে, তাহলে তারা আবারও জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিশ্বের নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে, ইনশাআল্লাহ। কারণ ইসলাম শুধু অতীতের গৌরব স্মরণ করতে শেখায় না; বরং জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও শিক্ষা দেয়।