বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতি বর্তমানে এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকেন্দ্রিক পশ্চিমা নেতৃত্ব প্রাধান্য বিস্তার করলেও একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে সেই বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলো যাদের সম্মিলিতভাবে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বলা হয় ক্রমশ বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি নতুন ধরনের মেরুকরণ বা বহুমেরু শক্তি-ভারসাম্যের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাস নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি, বাণিজ্য, উন্নয়ন ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ রূপকেও প্রভাবিত করছে।
গ্লোবাল সাউথের উত্থানের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলো অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। গত দুই দশকে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশই এই উন্নয়নশীল অঞ্চলগুলো থেকে আসছে। একসময় বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ মূলত জি৭-ভুক্ত উন্নত দেশগুলোর হাতে থাকলেও এখন উদীয়মান অর্থনীতিগুলো বৈশ্বিক উৎপাদন, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তার করছে। ফলে অর্থনৈতিক শক্তির কেন্দ্র ধীরে ধীরে পশ্চিম থেকে পূর্ব ও দক্ষিণের দিকে সরে যাচ্ছে।
এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিকল্প আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বিকাশ। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ মনে করে, এসব প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পর্যাপ্ত নয়। ফলে ব্রিকস, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের মতো বিকল্প আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সহযোগিতামূলক কাঠামো গুরুত্ব অর্জন করছে। এসব উদ্যোগ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন ও উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থায় ভারসাম্য আনার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গ্লোবাল সাউথের উত্থানের দ্বিতীয় প্রধান চালিকাশক্তি হলো ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাস। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীনের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ আর কোনো একক শক্তির সঙ্গে নিঃশর্তভাবে অবস্থান নিতে আগ্রহী নয়। বরং তারা নিজেদের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বা কৌশলগত স্বাধীনতার ধারণাকে আরো শক্তিশালী করেছে। অর্থাৎ উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পক্ষ বেছে নেওয়ার পরিবর্তে বহুমাত্রিক অংশীদারির মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণের চেষ্টা করছে।
এই প্রেক্ষাপটে ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো প্ল্যাটফর্ম নতুন গুরুত্ব অর্জন করেছে। এসব জোট পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প নয়, বরং একটি অধিক ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমেরু আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রিকসের সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন শক্তিকেন্দ্র গড়ে উঠছে। ফলে বিশ্বরাজনীতি আর একক পরাশক্তির নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে না; বরং একাধিক আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির সমন্বয়ে নতুন শক্তির সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলো ঐতিহাসিক রূপান্তর এবং ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের দাবি। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণী ফোরামে অধিক প্রতিনিধিত্বের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের যুক্তি হলো, বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতার প্রতিফলন; কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থায় সংস্কার এনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বরকে আরো কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারজনিত বৈষম্য দূর করার প্রশ্নেও সোচ্চার। জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি স্থানান্তর, খাদ্য নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রে তারা ন্যায্য হিস্যার দাবি করছে। উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা, জলবায়ু অর্থায়ন এবং টেকসই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রশ্নও এখন গ্লোবাল সাউথের কূটনৈতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তবে গ্লোবাল সাউথের এই উত্থান চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। এর অন্যতম কারণ হলো অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য ও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা। গ্লোবাল সাউথ কোনো একক রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক জোট নয়; বরং এটি বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও কৌশলগত অগ্রাধিকারসম্পন্ন রাষ্ট্রগুলোর একটি বিস্তৃত সমষ্টি। ফলে নেতৃত্বের প্রশ্নে ভারত, চীন, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে মতপার্থক্য ও প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। একই সঙ্গে অনেক দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সুশাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ভিন্নতা থাকায় অভিন্ন অবস্থান গ্রহণ সব সময় সহজ হয় না।
অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ বৈষম্য, প্রযুক্তিগত নির্ভরশীলতা এবং জলবায়ু ঝুঁকি এখনো গ্লোবাল সাউথের বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক দেশ এখনো উচ্চ প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় উন্নত অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে টেকসই করতে হলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর আরো গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতা নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই নিয়ে এসেছে। একদিকে বহুমুখী কূটনীতি, আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য বৈচিত্র্য এবং উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে; অন্যদিকে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতা থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা অর্জন করতে পারে।
সব মিলিয়ে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো আজ আর শুধু আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় নয়; তারা বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়েছে। বিশ্বরাজনীতি ধীরে ধীরে এক মেরু থেকে বহু মেরু ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে ক্ষমতা, প্রভাব ও নেতৃত্ব আরো বিস্তৃতভাবে বণ্টিত হবে। এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় নতুন সমীকরণ তৈরি করবে। ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থায় গ্লোবাল সাউথের ভূমিকা শুধু সংখ্যাগত নয়; বরং ন্যায্যতা, অন্তর্ভুক্তি এবং ভারসাম্যপূর্ণ বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তা ক্রমেই আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিচালক, হংকং রিসার্চ সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ-বাংলাদেশ সেন্টার



নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, সংসদ নির্বাচনসহ যেকোনো নির্বাচনের পরিসংখ্যান প্রতিবেদন নির্বাচনী ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। যেকোনো কর্মযজ্ঞের পরিসংখ্যান একই কর্মের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি অপরিহার্য অংশ। এটি প্রকাশ না করাটা দুঃখজনক। এক ধরনের দায়িত্বহীনতাও বটে। বিশেষ করে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়াটা বা প্রকাশের ন্যূনতম উদ্যোগ না নেওয়াটা নির্বাচনের নামে প্রহসনকে আড়াল করার অপচেষ্টারই নামান্তর। 


গত ১৭ জুন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটিকে মেনে নেয়নি ইসরায়েল। সেই সঙ্গে ইরানের চাওয়াকে মেনে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসরায়েলকে বাধ্য করা হয় লেবাননের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতিতে যেতে। যে যুদ্ধটি ইসরায়েলের অনেক পরিকল্পনা এবং চেষ্টার ফল, সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি। একই সঙ্গে সাময়িক যুদ্ধবিরতির এই পথ ধরে যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী কোনো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, সেটি হবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া পরোক্ষ স্বীকারোক্তি। বিষয়গুলো ইসরায়েলের জন্য গভীর ভাবনার। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, যিনি ট্রাম্পকে এত দিন ধরে ইরানকে তাঁদের অভিন্ন শত্রু বলে যে ধারণা দিয়ে এসেছেন, সেই ইরান এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে, ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নতুন এক বাস্তবতার সৃষ্টি হবে, যার আলোকে উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে হয়তো ইরানকেই তাদের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে মেনে নেবে