আমরা জলবায়ু সংকট নিয়ে প্রতিদিন কথা বলছি। সংবাদে দেখছি, কোথাও দাবদাহে মানুষ মারা যাচ্ছে অথবা কোথাও বন্যায় জনপদ ভেসে যাচ্ছে। ইউরোপের সাম্প্রতিক দাবদাহে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই তীব্র গরম এখন আর ব্যতিক্রম নয়, এটি নতুন বাস্তবতা। এল নিনোর প্রভাব বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা, খাদ্য উৎপাদন এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। প্রশ্ন হলো, আমরা এসব ঘটনাকে শুধু খবর হিসেবে নেব, নাকি ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা হিসেবে বুঝব?
আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হলো, আমরা এখনো জলবায়ু পরিবর্তনকে অনেকাংশে পরিবেশগত বিষয় হিসেবে দেখি—যেন এটি গাছপালা, নদী, সমুদ্র বা বরফ গলার গল্প। অথচ বাস্তবতা হলো, জলবায়ু সংকট এখন টিকে থাকার প্রশ্ন। এটি আর শুধু প্রকৃতির সংকট নয়, এটি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, খাদ্য, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তার সংকট। একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক। আকাশে মেঘ আছে, বৃষ্টি হতে পারে—এটি জেনেও আপনি ছাতা ছাড়া বের হলেন। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি এলো, আপনি ভিজে গেলেন। আমরা একে হয়তো দুর্ভাগ্য বলি। কিন্তু এটি আসলে আমাদের প্রস্তুতির অভাব। জলবায়ু সংকটের ক্ষেত্রেও আমরা আজ ঠিক এই অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছি। আমরা জানি, তাপপ্রবাহ বাড়বে, বন্যা হবে, নদী ভাঙবে, খাদ্যের দাম বাড়বে, ডেঙ্গু ছড়াবে, শহরে জলাবদ্ধতা হবে। কিন্তু তবু আমাদের আচরণ, আমাদের পরিকল্পনা, এমনকি আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনেও সেই প্রস্তুতির ছাপ খুব কম।
এটি কি শুধু ভাগ্যের দোষ, নাকি আমাদের অপ্রস্তুতির ফল? ঠিক এখানেই আসে জলবায়ু সাক্ষরতার প্রশ্ন। আমরা কি সত্যি জানি তীব্র গরমের সময় কিভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখতে হয়? আমরা কি জানি বন্যার ঝুঁকিতে থাকা এলাকায় জরুরি প্রস্তুতি কী হওয়া উচিত? আমরা কি জানি দূষিত পানি কী ধরনের রোগ ছড়াতে পারে? আমরা কি জানি বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা কিভাবে জলাবদ্ধতা বাড়ায়? আমরা কি বুঝি একটি দাবদাহ শুধু আবহাওয়ার বিষয় নয়, বরং একটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও জরুরি অবস্থা? যদি এসবের উত্তর আমাদের কাছে পরিষ্কার না হয়, তাহলে আমরা শুধু জলবায়ু ঝুঁকিতে নই, আমরা তথ্যগতভাবেও ঝুঁকিতে আছি।
বাংলাদেশের মতো দেশে এই প্রশ্ন আরো গুরুত্বপূর্ণ। গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ মানুষ জলবায়ুজনিত কারণে দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত হতে পারে। এই সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যতের সামাজিক ও নগর বাস্তবতার একটি বড় সংকেত। কারণ নদীভাঙা, ভূমিহীন এই মানুষগুলো কোথায় যাবে? উত্তর খুবই সহজ—শহরে। কিন্তু ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যানে যখন শহরকে ক্লাইমেট স্মার্ট করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে, তখন জলবায়ুসচেতন নাগরিক ছাড়া তা কিভাবে সম্ভব? একই প্ল্যানে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে অভিযোজনের জন্য ২৩ হাজার কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি প্রয়োজন। গভীরভাবে ভাবলে, এই সংখ্যা শুধু অর্থের হিসাব নয়, এটি আমাদের ঝুঁকির গভীরতার প্রতিফলন।
আমরা এরই মধ্যে দেখেছি, ঢাকার মতো শহরগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক চাপের মুখে ক্রমেই আরো অরক্ষিত হয়ে উঠছে। বস্তির বিস্তার ঘটছে, বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র হচ্ছে, অতিরিক্ত গরমে শ্রমঘণ্টা কমছে, আর জলবায়ু সংবেদনশীল রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ডেঙ্গু সংক্রমণ ও মৃত্যু উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ডেঙ্গু এখন শুধু একটি মৌসুমি রোগ নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের বাস্তব সংকটে রূপ নিয়েছে। এই বাস্তবতায় জলবায়ু অভিযোজন এখন আর শুধু নীতিনির্ধারকদের একার কাজ নয়, এটি এখন ঘরবাড়িতে আলোচনার বিষয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ ও চর্চার বিষয়, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা সংস্কৃতির অংশ এবং নাগরিক জীবনের বাস্তবতা। আমরা যদি শিশুদের তীব্র গরমে কিভাবে নিরাপদ থাকতে হয় তা শেখাতে না পারি, তাহলে তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে। একজন শিক্ষক যদি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে মৌলিক ধারণাই না রাখেন, তাহলে তাঁর শিক্ষার্থীরাও ঝুঁকি মোকাবেলার দক্ষতা অর্জন করতে পারবে না। অফিস-আদালতের কর্মীরা যদি তাপজনিত ঝুঁকি মোকাবেলার উপায় কিংবা বিশুদ্ধ পানির নিরাপত্তা সম্পর্কে না জানেন, তাহলে তাঁরাও ঝুঁকির মুখে পড়বেন। একজন রিকশাচালক, একজন নির্মাণ শ্রমিক, পথের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জন্য জলবায়ু সাক্ষরতা আর কোনো উচ্চাভিলাষী বিষয় নয়, এটি এখন বেঁচে থাকার হাতিয়ার। চলতি সময়েই আমরা দেখছি অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, পাহাড়ধস এবং এমনকি অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকায়ও আকস্মিক বন্যার ঘটনা। বার্তাটি স্পষ্ট—জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন আর দূরের কোনো আশঙ্কা নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

আমাদের সবচেয়ে বড় ঘাটতি সচেতন প্রস্তুতির ক্ষেত্রে। আমরা এখনো জলবায়ু পরিবর্তন জনিত অভিযোজনকে মূলধারায় আনতে পারিনি। আমাদের স্কুলে-কলেজে এ বিষয়গুলো এখনো অনেকাংশে উপেক্ষিত, আর একই কারণে বেশির ভাগ মানুষের ধারণা, এটি তাদের জীবনের বিষয়ও নয়। আমাদের বেশির ভাগ অফিস-আদালতে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্রস্তুতির কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। আমাদের নগরে জনসম্পৃক্ততা ও সচেতনতা তৈরির কাঠামো এখনো দুর্বল। এমনকি পরিবারেও এসব আলোচনা খুব সীমিত। অথচ অভিযোজন শুরু হয় সচেতনতা দিয়ে। মানুষ যদি না জানে কী ধরনের বিপত্তি আসছে, তাহলে তারা প্রস্তুত হবে কিভাবে? আর প্রস্তুতি না থাকলে টিকে থাকার সক্ষমতা তৈরি হবে কোথা থেকে? বিশ্বের অনেক দেশ এই বাস্তবতাকে অনেক আগেই বুঝেছে। জাপানে দুর্যোগ প্রস্তুতি শুধু সরকারের কাজ নয়, এটি সামাজিক সংস্কৃতির অংশ। স্কুলের শিশু থেকে অফিসকর্মী—সবাই জানে জরুরি অবস্থায় কী করতে হবে। ২০০৩ সালের প্রাণঘাতী দাবদাহের পর ফ্রান্সসহ ইউরোপের অনেক দেশ হিট অ্যাকশন প্ল্যান চালু করেছে। কারণ তারা বুঝেছে, গরম শুধু আবহাওয়ার বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের সংকট। নেদারল্যান্ডস বন্যাকে শুধু ঠেকানোর চেষ্টা করেনি, তারা শহরকে পানির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নতুনভাবে পরিকল্পনা করেছে। অর্থাৎ বিশ্ব এখন ঝুঁকির সঙ্গে বাঁচতে শিখছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি শিখছি?
সমস্যা সব সময় নীতির ঘাটতিতে থাকে না। বাংলাদেশের ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যানে (২০২৩-২০৫০) এরই মধ্যে ১১৩টি অগ্রাধিকারমূলক অভিযোজন উদ্যোগ নির্ধারণ করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জন্য জলবায়ুসংশ্লিষ্ট বাজেটকাঠামোও তৈরি হয়েছে এবং প্রতিবছর সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের হিসাব রাখা হচ্ছে। অর্থাৎ পরিকল্পনাও আছে, সম্পদ বরাদ্দের ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, এই নীতিগুলোর বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণ, নারী, তরুণ এবং নাগরিক সমাজ কতটা কার্যকরভাবে যুক্ত হচ্ছে? এখানেই নীতি ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ পরামর্শ গ্রহণ আর জনগণের প্রকৃত মালিকানা এক বিষয় নয়। মানুষ কি শুধু মতামত দিয়েছে, নাকি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের অংশীদারও হয়েছে? এখন এই প্রশ্নটি গুরুত্বের সঙ্গে করার সময় এসেছে।
অন্যদিকে আমরা প্রায়ই জলবায়ু সহনশীলতা বলতে অবকাঠামো; যেমন—বাঁধ, ড্রেন, আশ্রয়কেন্দ্র, সবুজায়ন তৈরি বুঝি। এগুলো অবশ্যই দরকার। কিন্তু সহনশীল জনপদ শুধু কংক্রিট দিয়ে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় জ্ঞান দিয়ে, অভ্যাস দিয়ে, মানুষের মধ্যে ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা দিয়ে, আর সম্মিলিত দায়বদ্ধতা দিয়ে। আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে—আমরা কি জলবায়ুবিষয়ক আলাপকে শুধু সেমিনার, কনফারেন্স কিংবা আনুষ্ঠানিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখব, নাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ঘরবাড়ি, কর্মক্ষেত্র এবং রাজপথের আলোচনায় নিয়ে যাব? কারণ জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের সংকট নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই বাস্তবতার ভাষা শিখছি, নাকি বিপর্যয়ই আমাদের তা শিখিয়ে দেবে?
লেখক : নির্বাহী পরিচালক, সিরাক-বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক নীতি বিশ্লেষক



আসল বিস্ফোরণটা ঘটল আশির দশকে, যা বাংলাদেশের সমাজ ও প্রযুক্তির ইতিহাসে এক বড় সন্ধিক্ষণ। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের সময় রঙিন টিভির আগমন ফুটবলকে এ দেশে এক অভূতপূর্ব তুঙ্গে নিয়ে যায়। মেক্সিকো বিশ্বকাপ যখন এ দেশের ড্রয়িংরুমে রঙিন পর্দায় হাজির হলো, ঠিক তখনই বাঙালি তার ফুটবল ঈশ্বরকে খুঁজে পেল
এই ঐতিহাসিক ও রূপান্তরকামী অর্জনের কৃতিত্ব কোনো একক নেতা বা সংগঠনের নয়, বরং প্রত্যেক নাগরিকের, যারা মিছিল করেছে, প্রতিবাদ করেছে, প্রার্থনা করেছে, কর্মীদের আশ্রয় দিয়েছে, সত্য ছড়িয়েছে কিংবা শুধু ভয়কে 