• ই-পেপার

ভোটের ইতিহাস সংরক্ষণের ধারাবাহিকতায় ফিরছে ইসি

  • কাজী হাফিজ

গ্লোবাল সাউথের উত্থান ও বৈশ্বিক মেরুকরণের নতুন বাস্তবতা

ড. সুজিত কুমার দত্ত

গ্লোবাল সাউথের উত্থান ও বৈশ্বিক মেরুকরণের নতুন বাস্তবতা

বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতি বর্তমানে এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকেন্দ্রিক পশ্চিমা নেতৃত্ব প্রাধান্য বিস্তার করলেও একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে সেই বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলো যাদের সম্মিলিতভাবে গ্লোবাল সাউথ বলা হয় ক্রমশ বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি নতুন ধরনের মেরুকরণ বা বহুমেরু শক্তি-ভারসাম্যের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাস নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি, বাণিজ্য, উন্নয়ন ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ রূপকেও প্রভাবিত করছে।

গ্লোবাল সাউথের উত্থানের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলো অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। গত দুই দশকে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশই এই উন্নয়নশীল অঞ্চলগুলো থেকে আসছে। একসময় বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ মূলত জি৭-ভুক্ত উন্নত দেশগুলোর হাতে থাকলেও এখন উদীয়মান অর্থনীতিগুলো বৈশ্বিক উৎপাদন, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তার করছে। ফলে অর্থনৈতিক শক্তির কেন্দ্র ধীরে ধীরে পশ্চিম থেকে পূর্ব ও দক্ষিণের দিকে সরে যাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিকল্প আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বিকাশ। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ মনে করে, এসব প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পর্যাপ্ত নয়। ফলে ব্রিকস, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের মতো বিকল্প আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সহযোগিতামূলক কাঠামো গুরুত্ব অর্জন করছে। এসব উদ্যোগ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন ও উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থায় ভারসাম্য আনার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গ্লোবাল সাউথের উত্থানের দ্বিতীয় প্রধান চালিকাশক্তি হলো ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাস। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীনের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ আর কোনো একক শক্তির সঙ্গে নিঃশর্তভাবে অবস্থান নিতে আগ্রহী নয়। বরং তারা নিজেদের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি বা কৌশলগত স্বাধীনতার ধারণাকে আরো শক্তিশালী করেছে। অর্থাৎ উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পক্ষ বেছে নেওয়ার পরিবর্তে বহুমাত্রিক অংশীদারির মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণের চেষ্টা করছে।

এই প্রেক্ষাপটে ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো প্ল্যাটফর্ম নতুন গুরুত্ব অর্জন করেছে। এসব জোট পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প নয়, বরং একটি অধিক ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমেরু আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রিকসের সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন শক্তিকেন্দ্র গড়ে উঠছে। ফলে বিশ্বরাজনীতি আর একক পরাশক্তির নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে না; বরং একাধিক আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির সমন্বয়ে নতুন শক্তির সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলো ঐতিহাসিক রূপান্তর এবং ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের দাবি। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণী ফোরামে অধিক প্রতিনিধিত্বের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের যুক্তি হলো, বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতার প্রতিফলন; কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থায় সংস্কার এনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বরকে আরো কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারজনিত বৈষম্য দূর করার প্রশ্নেও সোচ্চার। জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি স্থানান্তর, খাদ্য নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রে তারা ন্যায্য হিস্যার দাবি করছে। উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা, জলবায়ু অর্থায়ন এবং টেকসই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রশ্নও এখন গ্লোবাল সাউথের কূটনৈতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তবে গ্লোবাল সাউথের এই উত্থান চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। এর অন্যতম কারণ হলো অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য ও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা। গ্লোবাল সাউথ কোনো একক রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক জোট নয়; বরং এটি বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও কৌশলগত অগ্রাধিকারসম্পন্ন রাষ্ট্রগুলোর একটি বিস্তৃত সমষ্টি। ফলে নেতৃত্বের প্রশ্নে ভারত, চীন, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে মতপার্থক্য ও প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। একই সঙ্গে অনেক দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সুশাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ভিন্নতা থাকায় অভিন্ন অবস্থান গ্রহণ সব সময় সহজ হয় না।

অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ বৈষম্য, প্রযুক্তিগত নির্ভরশীলতা এবং জলবায়ু ঝুঁকি এখনো গ্লোবাল সাউথের বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক দেশ এখনো উচ্চ প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় উন্নত অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে টেকসই করতে হলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর আরো গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতা নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই নিয়ে এসেছে। একদিকে বহুমুখী কূটনীতি, আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য বৈচিত্র্য এবং উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে; অন্যদিকে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতা থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা অর্জন করতে পারে।

সব মিলিয়ে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো আজ আর শুধু আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় নয়; তারা বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়েছে। বিশ্বরাজনীতি ধীরে ধীরে এক মেরু থেকে বহু মেরু ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে ক্ষমতা, প্রভাব ও নেতৃত্ব আরো বিস্তৃতভাবে বণ্টিত হবে। এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় নতুন সমীকরণ তৈরি করবে। ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থায় গ্লোবাল সাউথের ভূমিকা শুধু সংখ্যাগত নয়; বরং ন্যায্যতা, অন্তর্ভুক্তি এবং ভারসাম্যপূর্ণ বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তা ক্রমেই আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিচালক, হংকং রিসার্চ সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ-বাংলাদেশ সেন্টার

জলবায়ু সাক্ষরতা : এখন টিকে থাকার প্রশ্ন

এস এম সৈকত

জলবায়ু সাক্ষরতা : এখন টিকে থাকার প্রশ্ন

আমরা জলবায়ু সংকট নিয়ে প্রতিদিন কথা বলছি। সংবাদে দেখছি, কোথাও দাবদাহে মানুষ মারা যাচ্ছে অথবা কোথাও বন্যায় জনপদ ভেসে যাচ্ছে। ইউরোপের সাম্প্রতিক দাবদাহে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই তীব্র গরম এখন আর ব্যতিক্রম নয়, এটি নতুন বাস্তবতা। এল নিনোর প্রভাব বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা, খাদ্য উৎপাদন এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। প্রশ্ন হলো, আমরা এসব ঘটনাকে শুধু খবর হিসেবে নেব, নাকি ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা হিসেবে বুঝব?

আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হলো, আমরা এখনো জলবায়ু পরিবর্তনকে অনেকাংশে পরিবেশগত বিষয় হিসেবে দেখিযেন এটি গাছপালা, নদী, সমুদ্র বা বরফ গলার গল্প। অথচ বাস্তবতা হলো, জলবায়ু সংকট এখন টিকে থাকার প্রশ্ন। এটি আর শুধু প্রকৃতির সংকট নয়, এটি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, খাদ্য, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তার সংকট। একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক। আকাশে মেঘ আছে, বৃষ্টি হতে পারেএটি জেনেও আপনি ছাতা ছাড়া বের হলেন। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি এলো, আপনি ভিজে গেলেন। আমরা একে হয়তো দুর্ভাগ্য বলি। কিন্তু এটি আসলে আমাদের প্রস্তুতির অভাব। জলবায়ু সংকটের ক্ষেত্রেও আমরা আজ ঠিক এই অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছি। আমরা জানি, তাপপ্রবাহ বাড়বে, বন্যা হবে, নদী ভাঙবে, খাদ্যের দাম বাড়বে, ডেঙ্গু ছড়াবে, শহরে জলাবদ্ধতা হবে। কিন্তু তবু আমাদের আচরণ, আমাদের পরিকল্পনা, এমনকি আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনেও সেই প্রস্তুতির ছাপ খুব কম।

এটি কি শুধু ভাগ্যের দোষ, নাকি আমাদের অপ্রস্তুতির ফল? ঠিক এখানেই আসে জলবায়ু সাক্ষরতার প্রশ্ন। আমরা কি সত্যি জানি তীব্র গরমের সময় কিভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখতে হয়? আমরা কি জানি বন্যার ঝুঁকিতে থাকা এলাকায় জরুরি প্রস্তুতি কী হওয়া উচিত? আমরা কি জানি দূষিত পানি কী ধরনের রোগ ছড়াতে পারে? আমরা কি জানি বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা কিভাবে জলাবদ্ধতা বাড়ায়? আমরা কি বুঝি একটি দাবদাহ শুধু আবহাওয়ার বিষয় নয়, বরং একটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও জরুরি অবস্থা? যদি এসবের উত্তর আমাদের কাছে পরিষ্কার না হয়, তাহলে আমরা শুধু জলবায়ু ঝুঁকিতে নই, আমরা তথ্যগতভাবেও ঝুঁকিতে আছি।

বাংলাদেশের মতো দেশে এই প্রশ্ন আরো গুরুত্বপূর্ণ। গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ মানুষ জলবায়ুজনিত কারণে দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত হতে পারে। এই সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যতের সামাজিক ও নগর বাস্তবতার একটি বড় সংকেত। কারণ নদীভাঙা, ভূমিহীন এই মানুষগুলো কোথায় যাবে? উত্তর খুবই সহজশহরে। কিন্তু ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যানে যখন শহরকে ক্লাইমেট স্মার্ট করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে, তখন জলবায়ুসচেতন নাগরিক ছাড়া তা কিভাবে সম্ভব? একই প্ল্যানে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে অভিযোজনের জন্য ২৩ হাজার কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি প্রয়োজন। গভীরভাবে ভাবলে, এই সংখ্যা শুধু অর্থের হিসাব নয়, এটি আমাদের ঝুঁকির গভীরতার প্রতিফলন।

আমরা এরই মধ্যে দেখেছি, ঢাকার মতো শহরগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক চাপের মুখে ক্রমেই আরো অরক্ষিত হয়ে উঠছে। বস্তির বিস্তার ঘটছে, বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র হচ্ছে, অতিরিক্ত গরমে শ্রমঘণ্টা কমছে, আর জলবায়ু সংবেদনশীল রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ডেঙ্গু সংক্রমণ ও মৃত্যু উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ডেঙ্গু এখন শুধু একটি মৌসুমি রোগ নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের বাস্তব সংকটে রূপ নিয়েছে। এই বাস্তবতায় জলবায়ু অভিযোজন এখন আর শুধু নীতিনির্ধারকদের একার কাজ নয়, এটি এখন ঘরবাড়িতে আলোচনার বিষয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ ও চর্চার বিষয়, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা সংস্কৃতির অংশ এবং নাগরিক জীবনের বাস্তবতা। আমরা যদি শিশুদের তীব্র গরমে কিভাবে নিরাপদ থাকতে হয় তা শেখাতে না পারি, তাহলে তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে। একজন শিক্ষক যদি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে মৌলিক ধারণাই না রাখেন, তাহলে তাঁর শিক্ষার্থীরাও ঝুঁকি মোকাবেলার দক্ষতা অর্জন করতে পারবে না। অফিস-আদালতের কর্মীরা যদি তাপজনিত ঝুঁকি মোকাবেলার উপায় কিংবা বিশুদ্ধ পানির নিরাপত্তা সম্পর্কে না জানেন, তাহলে তাঁরাও ঝুঁকির মুখে পড়বেন। একজন রিকশাচালক, একজন নির্মাণ শ্রমিক, পথের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জন্য জলবায়ু সাক্ষরতা আর কোনো উচ্চাভিলাষী বিষয় নয়, এটি এখন বেঁচে থাকার হাতিয়ার। চলতি সময়েই আমরা দেখছি অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, পাহাড়ধস এবং এমনকি অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকায়ও আকস্মিক বন্যার ঘটনা। বার্তাটি স্পষ্টজলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন আর দূরের কোনো আশঙ্কা নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

জলবায়ু সাক্ষরতা : এখন টিকে থাকার প্রশ্ন

আমাদের সবচেয়ে বড় ঘাটতি সচেতন প্রস্তুতির ক্ষেত্রে। আমরা এখনো জলবায়ু পরিবর্তন জনিত অভিযোজনকে মূলধারায় আনতে পারিনি। আমাদের স্কুলে-কলেজে এ বিষয়গুলো এখনো অনেকাংশে উপেক্ষিত, আর একই কারণে বেশির ভাগ মানুষের ধারণা, এটি তাদের জীবনের বিষয়ও নয়। আমাদের বেশির ভাগ অফিস-আদালতে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্রস্তুতির কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। আমাদের নগরে জনসম্পৃক্ততা ও সচেতনতা তৈরির কাঠামো এখনো দুর্বল। এমনকি পরিবারেও এসব আলোচনা খুব সীমিত। অথচ অভিযোজন শুরু হয় সচেতনতা দিয়ে। মানুষ যদি না জানে কী ধরনের বিপত্তি আসছে, তাহলে তারা প্রস্তুত হবে কিভাবে? আর প্রস্তুতি না থাকলে টিকে থাকার সক্ষমতা তৈরি হবে কোথা থেকে? বিশ্বের অনেক দেশ এই বাস্তবতাকে অনেক আগেই বুঝেছে। জাপানে দুর্যোগ প্রস্তুতি শুধু সরকারের কাজ নয়, এটি সামাজিক সংস্কৃতির অংশ। স্কুলের শিশু থেকে অফিসকর্মীসবাই জানে জরুরি অবস্থায় কী করতে হবে। ২০০৩ সালের প্রাণঘাতী দাবদাহের পর ফ্রান্সসহ ইউরোপের অনেক দেশ হিট অ্যাকশন প্ল্যান চালু করেছে। কারণ তারা বুঝেছে, গরম শুধু আবহাওয়ার বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের সংকট। নেদারল্যান্ডস বন্যাকে শুধু ঠেকানোর চেষ্টা করেনি, তারা শহরকে পানির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নতুনভাবে পরিকল্পনা করেছে। অর্থাৎ বিশ্ব এখন ঝুঁকির সঙ্গে বাঁচতে শিখছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি শিখছি?

সমস্যা সব সময় নীতির ঘাটতিতে থাকে না। বাংলাদেশের ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যানে (২০২৩-২০৫০) এরই মধ্যে ১১৩টি অগ্রাধিকারমূলক অভিযোজন উদ্যোগ নির্ধারণ করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জন্য জলবায়ুসংশ্লিষ্ট বাজেটকাঠামোও তৈরি হয়েছে এবং প্রতিবছর সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের হিসাব রাখা হচ্ছে। অর্থাৎ পরিকল্পনাও আছে, সম্পদ বরাদ্দের ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, এই নীতিগুলোর বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণ, নারী, তরুণ এবং নাগরিক সমাজ কতটা কার্যকরভাবে যুক্ত হচ্ছে? এখানেই নীতি ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ পরামর্শ গ্রহণ আর জনগণের প্রকৃত মালিকানা এক বিষয় নয়। মানুষ কি শুধু মতামত দিয়েছে, নাকি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের অংশীদারও হয়েছে? এখন এই প্রশ্নটি গুরুত্বের সঙ্গে করার সময় এসেছে।

অন্যদিকে আমরা প্রায়ই জলবায়ু সহনশীলতা বলতে অবকাঠামো; যেমনবাঁধ, ড্রেন, আশ্রয়কেন্দ্র, সবুজায়ন তৈরি বুঝি। এগুলো অবশ্যই দরকার। কিন্তু সহনশীল জনপদ শুধু কংক্রিট দিয়ে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় জ্ঞান দিয়ে, অভ্যাস দিয়ে, মানুষের মধ্যে ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা দিয়ে, আর সম্মিলিত দায়বদ্ধতা দিয়ে। আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়েআমরা কি জলবায়ুবিষয়ক আলাপকে শুধু সেমিনার, কনফারেন্স কিংবা আনুষ্ঠানিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখব, নাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ঘরবাড়ি, কর্মক্ষেত্র এবং রাজপথের আলোচনায় নিয়ে যাব? কারণ জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের সংকট নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই বাস্তবতার ভাষা শিখছি, নাকি বিপর্যয়ই আমাদের তা শিখিয়ে দেবে?

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, সিরাক-বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক নীতি বিশ্লেষক

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের নতুন অধ্যায়

ড. ফরিদুল আলম

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের নতুন অধ্যায়

ইরানকে পরমাণু কর্মসূচির বাইরে রাখা নিয়ে যে যুদ্ধের শুরুটা হয়েছিল, এই পর্যায়ে এটা এসে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দাবি ও পাল্টা দাবি কেন্দ্রিক নতুন সংঘাতে। গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যকার স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি ভেস্তে যায় হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানিবাহী ট্যাংকারে ইরানের হামলা এবং পরবর্তীকালে ইরানের ১৭০টি স্থাপনা লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় এবং সেই হামলার জবাবে কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনে পরিচালিত ইরানের পাল্টা হামলার মধ্য দিয়ে। সর্বশেষ ইরান আবারও গ্রিসের পতাকাবাহী একটি কনটেইনারবাহী জাহাজে হামলা করলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কমপক্ষে ১৪০টি স্থানে বিমান হামলা চালায়। এর জবাবে আগের ঘোষণা অনুযায়ী ইরান পাল্টা হামলা চালায় মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনায়। এসব হামলায় তারা জর্দান, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার, রাডার ব্যবস্থাপনা, বিমানবাহী রণতরির সহায়তা ও জ্বালানি স্থাপন কেন্দ্র, মার্কিন পঞ্চম নৌবহর এবং যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে একতরফা চুক্তির যুগ এখানেই শেষ এবং সেই সঙ্গে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়ে দিয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন হস্তক্ষেপ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।

পরিস্থিতি বলে দিচ্ছে যে হরমুজ নিয়ে এই সংঘাত এখন পুরোটাই ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মাঝে কিছুটা স্বস্তি বিরাজ করলেও যুক্তরাষ্ট্রের নিশ্চয়তা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন উত্তেজনার কারণে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আবারও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বিশ্বের তেল এবং পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ এই রুটটি ঘিরে নতুন সৃষ্ট এই অনিশ্চয়তা যুদ্ধের নতুন যে অধ্যায়ের সূচনা করল। শিগগিরই মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনাপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এটি বন্ধ হওয়ার লক্ষণ খুবই সীমিত। ইরানে কঠোর হামলা এবং প্রয়োজনে বেসামরিক স্থানে ব্যাপক হামলা চালানো হবে মর্মে অতীতের মতো ট্রাম্পের স্বভাবসুলভ ঘোষণার পর নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছিল, তা এখন আরো ছড়িয়ে পড়ছে।

এরই মধ্যে নতুন করে কথার বোমা ফাটিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন যে তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে ইরান। যদিও এটি নিয়ে তিনি সরাসরি ইসরায়েলি কোনো সূত্রকে উদ্ধৃত করেননি, বরং মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের কথা বলতে চেয়েছেন, তবে বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে যে ইসরায়েলের গোয়েন্দারা এ ধরনের তথ্য সরবরাহ করেছে ট্রাম্পকে। তারা জানিয়েছে যে ইরানের কিলিং টার্গেটের এক নম্বরে ট্রাম্পের নাম রয়েছে। এটি নিয়ে তিনি যে কিছুটা চিন্তিত, সেটি তাঁর পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়েই পরিষ্কার হয়েছে। আরব সাগরে অবস্থানরত মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে নতুন করে অস্ত্রে সজ্জিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও প্রয়োজনে ইরানে হামলার জন্য আরো অস্ত্র প্রস্তুত করা হয়েছে বলা জানা গেছে। এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় একযোগে এক হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নির্দেশ দিয়ে রাখা হয়েছে।  এখানে উল্লেখ্য যে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ৪০ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মজুদকৃত অস্ত্রের একটি বড় অংশ ব্যবহার করা হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হয়েছিল। আর সেটি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে যেতে ট্রাম্পের একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছিল। এখন এই সময়ের মধ্যে তাঁরা আবারও নতুন অস্ত্র উৎপাদন করে নিজেদের ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণে অনেকটাই সক্ষম করে তুলেছেন। সেই অর্থে এই সাময়িক বিরতিটিকে যুদ্ধের একটি অন্যতম কৌশল হিসেবে দেখা যেতে পারে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের নতুন অধ্যায়গত ১৭ জুন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটিকে মেনে নেয়নি ইসরায়েল। সেই সঙ্গে ইরানের চাওয়াকে মেনে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসরায়েলকে বাধ্য করা হয় লেবাননের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতিতে যেতে। যে যুদ্ধটি ইসরায়েলের অনেক পরিকল্পনা এবং চেষ্টার ফল, সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি। একই সঙ্গে সাময়িক যুদ্ধবিরতির এই পথ ধরে যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী কোনো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, সেটি হবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া পরোক্ষ স্বীকারোক্তি। বিষয়গুলো ইসরায়েলের জন্য গভীর ভাবনার। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, যিনি ট্রাম্পকে এত দিন ধরে ইরানকে তাঁদের অভিন্ন শত্রু বলে যে ধারণা দিয়ে এসেছেন, সেই ইরান এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে, ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নতুন এক বাস্তবতার সৃষ্টি হবে, যার আলোকে উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে হয়তো ইরানকেই তাদের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে মেনে নেবেএসবই ইসরায়েলের জন্য একটি দুঃসংবাদ। এটি তাদের বিস্তৃত ভূখণ্ডের দাবিকেই শুধু খাটো করবে না, তাদের ভবিষ্যৎ অস্তিত্বকেও চ্যালেঞ্জ করে বসবে।

এই সবকিছু মাথায় নিয়ে ইসরায়েল নতুন করে ছক কষতে থাকে, যার অন্যতম ফল হচ্ছে ট্রাম্পকে এটি বিশ্বাস করানো যে তাঁর জীবন সংশয়ে আছে। রাজনীতিতে অনেকটাই অপরিণত ট্রাম্প খুব সহজেই এটি বিশ্বাস করে ফেলেছেন। নতুন করে ইরানে আরো বৃহত্তর পরিসরে হামলার কথা ভাবছেন, এমনকি ইরানের অস্তিত্ব ধুলার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। যেকোনো রাজনীতিবিদের জন্যই যুদ্ধের মতো বড় সিদ্ধান্তে গেলে নিজের প্রাণ সংশয়ের কথা মাথায় নিয়েই তা করতে হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে যে এই যুদ্ধের প্রায় পুরোটা সময়ই স্বয়ং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বাংকারের ভেতর আত্মগোপনে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের হত্যা করা হয়েছে। এটি নিয়ে যদি ইরান প্রতিশোধপরায়ণ হয়, তাহলে কি সেটি খুব আশ্চর্যের বিষয় হবে? মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসের কড়া নিরাপত্তা জালের ভেতর থেকে ট্রাম্প হয়তো ভেবেছেন, তাঁর জন্য কোনো রকম হুমকি প্রযোজ্য নয়।      

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক, যার ওপর ভিত্তি করে দুই পক্ষের মধ্যে পরবর্তী ৬০ দিন আরো অধিকতর আলোচনার মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা, এই স্মারকটি অকার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে কার্যত দুই পক্ষ আবারও যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থায় উপনীত হলো। এর ফলে এর আগে ইরানের সম্পদ ছাড়, হরমুজ প্রণালি থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের যে ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল, এর কোনো কিছুই আর রইল না। বিষয়টি দুশ্চিন্তার হলেও ইরানের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সে রকম উদ্বেগ প্রদর্শন করা হয়নি, উপরন্তু ভবিষ্যতে যেকোনো মার্কিন হামলার সমুচিত জবাবের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে এই আলোচনায় অন্যতম মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারের একটি প্রতিনিধিদল তেহরান সফর করে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরুর আহবান জানিয়েছে। ইরানের কোনো রকম প্রতিক্রিয়ার আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন যে ইরান আবারও আলোচনা শুরুর জন্য অনুনয় করছে এবং তিনি এতে রাজি হয়েছেন। ট্রাম্পের এই দাবিকে নাকচ করে দিয়েছে ইরান। আমরা এর আগেও দেখেছি, একটি চুক্তির জন্য ইরান মরিয়া হয়ে আছে’—এ ধরনের কথা বলেছিলেন ট্রাম্প। পরবর্তী সময়ে দেখা গেল যুক্তরাষ্ট্র একটি যুদ্ধবিরতির স্বার্থে অনেকটা ছাড় দিয়েই ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে উপনীত হলো।

চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র তিন সপ্তাহের কাছাকাছি সময়ে এসে এই চুক্তিটি বাতিল করার যে ঘোষণা ট্রাম্প দিলেন, এর পেছনে ইসরায়েলের স্পষ্ট প্রভাব লক্ষণীয়। যদিও এটিও বলা হচ্ছে যে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে যে বিচ্ছিন্ন হামলার ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেটি ইরানের কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠী দ্বারা সম্পাদিত, এর পেছনে ইরানের শাসকদের কোনো সবুজ সংকেত ছিল না। এখানে এটি বলা যেতে পারে যে ইসরায়েল রাষ্ট্র যেমন চাইছে না, ইরানের ভেতর প্রতিশোধকামী কিছু গোষ্ঠীও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিটিকে মেনে নিতে চাইছে না। এখানেই সংকটের মূল বিষয়টি নিহিত। এ ক্ষেত্রে এই ভুল-বোঝাবুঝি নিরসনে দুই পক্ষের বার্তাবাহকের মাধ্যমে আলোচনা পরিত্যাগ করে সরাসরি কথা বলা উচিত। এই আলোচনায় প্রয়োজনে পাকিস্তান ও কাতারের মতো দেশের উপস্থিতিতেই দুই পক্ষ একে অন্যের কাছে নিজেদের সদিচ্ছার বিষয়গুলো এবং কোথায় কোথায় সীমাবদ্ধতাগুলো রয়েছে, সেগুলো নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে পারে। মনে রাখা দরকার যে যুদ্ধটি যদি আবারও পুরো মাত্রায় শুরু হয়, তাহলে এর মধ্য দিয়ে কার্যত কোনো পক্ষেরই বিজয়ী হওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না, বরং উপসাগরীয় দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো ইরানের খুব সহজ নিশানায় পরিণত হয়ে ক্ষতির পাল্লা তাদের জন্যই ভারী হবে। অন্যদিকে ইরানের অবকাঠামোর ক্ষতিসহ ব্যাপক সংখ্যায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির শঙ্কা থেকে যাবে। সুতরাং যুদ্ধের নতুন এই অধ্যায় থেকে বের হয়ে নতুন করে পুরোদমে সরাসরি আলোচনা শুরু করাটাই হবে সময়ের সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত।

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় 

লাতিন ফুটবল পুরাণের খোঁজে

ড. আলা উদ্দিন

লাতিন ফুটবল পুরাণের খোঁজে

ফুটবল বিশ্বকাপের সময় এলেই বাংলাদেশ এক অদ্ভুত রূপ ধারণ করে। এই রূপান্তরের কোনো অর্থনৈতিক বা যৌক্তিক সমীকরণ নেই। ভৌগোলিক মানচিত্রে যে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের অবস্থান এ দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, যাদের ভাষা আমাদের চেনা নয়, যাদের কৃষ্টি-কালচারের সঙ্গে আমাদের রোজকার জীবনের বিন্দুমাত্র সংযোগ নেইতাদের জয়-পরাজয়ে এ দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃত্স্পন্দন থমকে যায়। বাংলাদেশ ফুটবল দল ফিফা র‌্যাংকিংয়ে অনেক পিছিয়ে, কখনো বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পায়নি। অথচ বিশ্বকাপের এক মাস এ দেশে যে উন্মাদনা তৈরি হয়, তা দেখলে কোনো বিদেশির পক্ষে আন্দাজ করাই অসম্ভব যে এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের কোনো দলই নেই। বিশ্বের আর কোথাও কোনো ভিনদেশি দলকে নিয়ে এমন সর্বগ্রাসী আবেগ, এমন নিঃশর্ত উন্মাদনা আর পাড়া-মহল্লায় তর্কের ঝড় ওঠার নজির মেলা ভার। এই যে নিজের দেশকে ছাপিয়ে অন্য দেশের পতাকাকে বুকে টেনে নেওয়া, টাকা খরচ করে ছাদে বিশালাকার পতাকা ওড়ানো কিংবা দল হেরে গেলে ভাত না খেয়ে ঘরে বসে থাকাএ কি শুধুই বিনোদন, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের বাঙালি সমাজের গভীর কোনো মনস্তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সত্য?

এই বিস্ময়কর ফুটবল সংস্কৃতির শিকড় খুঁজতে আমাদের ফিরে যেতে হবে সময়ের এক ধারাবাহিক বিবর্তনে, যেখানে বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাসের সঙ্গে দল পছন্দের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ১৯৭০ সালে ব্রাজিল যখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়, তখন বাকি দলগুলোর আগেই তারা বাংলাদেশে এক ধরনের প্রাথমিক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। তবে সে সময় মানুষের ঘরে ঘরে টিভির সংখ্যা ছিল ভীষণ কম। এর ওপর সত্তরের দশকের শুরুতে ভয়াবহ বন্যা আর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে এই ভালো লাগাটা সবার মাঝে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে পড়ার বা প্রাতিষ্ঠানিক জনপ্রিয়তা পাওয়ার সুযোগ পায়নি। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক সহিংসতা ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশে খুব বেশি জনপ্রিয়তা পায়নি। সেবার অবশ্য বিজয়ী হয়েছিল পশ্চিম জার্মানি। এরপর ১৯৭৮ সালে যখন আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হলো, তখন সাদা-কালো টিভির হাত ধরে তারা এ দেশের মানুষের নজরে আসে, তখনো বাংলাদেশে টেলিভিশনের সংখ্যা ছিল সীমিত। ফলে উন্মাদনাটা নির্দিষ্ট কিছু গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

লাতিন ফুটবল পুরাণের খোঁজেআসল বিস্ফোরণটা ঘটল আশির দশকে, যা বাংলাদেশের সমাজ ও প্রযুক্তির ইতিহাসে এক বড় সন্ধিক্ষণ। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের সময় রঙিন টিভির আগমন ফুটবলকে এ দেশে এক অভূতপূর্ব তুঙ্গে নিয়ে যায়। মেক্সিকো বিশ্বকাপ যখন এ দেশের ড্রয়িংরুমে রঙিন পর্দায় হাজির হলো, ঠিক তখনই বাঙালি তার ফুটবল ঈশ্বরকে খুঁজে পেলতিনি ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা। সেবার আর্জেন্টিনার এই বিশ্বজয় ব্রাজিলের পাশাপাশি আর্জেন্টিনাকেও এ দেশের মানুষের হৃদয়ে সমান জনপ্রিয় দলে পরিণত করে। ম্যারাডোনা ও আর্জেন্টিনার এই নতুন উন্মাদনা আগে থেকে সুপ্ত থাকা ব্রাজিল ও পেলে প্রীতিকে এক চিরন্তন প্রতিপক্ষ হিসেবে জাগিয়ে তোলে এবং ফুটবল-ভাবনা সমাজে প্রায় সমভাগে বিস্তৃত হয়ে পড়ে।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, ব্রাজিলের পাসিং নৈপুণ্য আর খেলার শৈল্পিক ধরন তো ছিলই, পাশাপাশি আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে ফুটবলের জাদুকর কালো মানিক পেলের ওপর লেখা প্রবন্ধটি শিশুদের মনে শৈশব থেকেই লাতিন ফুটবলের প্রতি এক গভীর মোহ তৈরি করে দিয়েছিল। ফলে ১৯৮৬ সালের পর থেকে এ দেশের সমাজ অবচেতনেই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েএকদল ব্রাজিলের নান্দনিক ফুটবলের ভক্ত, অন্য দল ম্যারাডোনার অতিমানবীয় জাদুর অনুসারী। এই যে শৈশবের ভালো লাগা আর স্মৃতির মেলবন্ধন, তা-ই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাহিত হয়ে আজকের এই মহীরুহে পরিণত হয়েছে।

তবে এই আবেগের গভীরতা শুধু খেলার মাঠের নান্দনিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে রয়েছে এক অবদমিত রাজনৈতিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব। বাঙালি জাতি হিসেবে দীর্ঘকাল উপনিবেশবাদের শৃঙ্খলে বন্দি ছিল। শোষণ, বঞ্চনা আর অধিকার আদায়ের লড়াই আমাদের ইতিহাসের অংশ। ফলে অবচেতনেই মানুষ শোষিতের পক্ষে দাঁড়াতে ভালোবাসে। আশির দশকে যখন লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর ফুটবল এ দেশে জনপ্রিয় হচ্ছে, তখন বাঙালি আসলে ইউরোপের পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে লাতিন আমেরিকার ফুটবলারদের নান্দনিক লড়াইয়ের মাঝে নিজেদেরই এক ধরনের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছিল।

ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যারাডোনার সেই একক লড়াই কিংবা ফকল্যান্ড যুদ্ধের ক্ষত বুকে নিয়ে আর্জেন্টিনার ফুটবলীয় প্রতিশোধবাঙালির কাছে তা শুধু খেলা ছিল না, তা ছিল শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের এক পরম বিজয়। বাংলাদেশের মানুষ ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির চেয়ে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে একাত্মতা বোধ করে বেশি। কারণ উভয়ের ইতিহাস ও যন্ত্রণার গল্পটা একই সুতায় গাঁথা। ম্যারাডোনা বা পেলের সেই খাটো গড়ন, দারিদ্র্য জয় করে বিশ্বজয়ের গল্প আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। তাই লাতিন আমেরিকার শৈল্পিক ছন্দোময় নান্দনিক ফুটবল পরাশক্তিগুলো বাংলাদেশের কাছে এক অদৃশ্য যুদ্ধজয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ সমাজের আরেকটি চিরন্তন বৈশিষ্ট্য হলো সামাজিক গোত্রবাদ বা এক ধরনের যৌথ আবেগ। আমাদের সমাজে মানুষ একা বাঁচতে চায় না, সে সব সময় কোনো না কোনো দলের অংশ হতে চায়। রাজনীতি হোক বা পাড়ার ক্লাববাঙালি নিজের একটি দলগত পরিচয় খুঁজতে ভালোবাসে। ফুটবল বিশ্বকাপ আমাদের এই দলগত পরিচয় প্রকাশের সবচেয়ে বড় মঞ্চ এনে দেয়। যখন একজন মানুষ তার বাড়ির ছাদে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকা উড়ায়, তখন সে আসলে সমাজকে বার্তা দেয় যে সে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অংশ। এই পতাকা উড়ানো বা জার্সি পরা শুধু একটি দলকে সমর্থন করা নয়, এটি হচ্ছে নিজের অস্তিত্ব ও আবেগকে দৃশ্যমান করার এক আকুল প্রয়াস। এক অদ্ভুত সুন্দর কৌতুকও এ সমাজে দেখা যায়; কখনো কখনো সাধারণ মানুষ চট করে এমন সব দেশের পতাকা কিনে বসে, যেমনহন্ডুরাস বা আইসল্যান্ড, যাদের নামও হয়তো তারা আগে শোনেনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে এই অদ্ভুত সমর্থন কখনো কখনো এত দূর গড়ায় যে সেই সুদূর হন্ডুরাসের মানুষও অভিভূত হয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট দলকে সমর্থন করা শুরু করে। এই যে সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের এক অদ্ভুত আত্মিক যোগাযোগ, তা শুধু বাঙালির এই অকৃত্রিম ও শর্তহীন আবেগের কারণেই সম্ভব।

অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, এই উন্মাদনা কি তবে শুধুই এক ধরনের পলায়নপর মানসিকতা? আমাদের দেশের নিজস্ব ফুটবলের যখন এই জরাজীর্ণ দশা, তখন অন্য দেশের জন্য এই প্রাণ বিসর্জন দেওয়া কি এক ধরনের হীনম্মন্যতা নয়? কিন্তু গভীর সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, এটি হীনম্মন্যতা নয়, বরং এটি হলো বিনোদনের চরম সংকটগ্রস্ত একটি সমাজে আনন্দের এক পাক্ষিক উৎসব। সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে যখন বিনোদনের সুযোগ সীমিত, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন আর নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা যখন মানুষকে ক্লান্ত করে তোলে, তখন বিশ্বকাপ ফুটবল আসে এক পশলা মেঘের মতো। এই এক মাস মানুষ তার সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে একটি সম্পূর্ণ অচেনা দেশের জয়ে আনন্দে মেতে উঠতে পারে, আবার পরাজয়ে কাঁদতে পারে। এই কান্না বা হাসি মানুষকে তার বাস্তব জীবনের জাঁতাকল থেকে সাময়িক মুক্তি দেয়। এটি এক ধরনের সামষ্টিক থেরাপি, যা পুরো সমাজকে একসঙ্গে হাসায় এবং কাঁদায়। তবে এই ভিনদেশি দলের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা কিন্তু নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসাকে বিন্দুমাত্র খাটো করে না। এ দেশের সাধারণ মানুষকে যদি প্রশ্ন করা হয়যদি কখনো বাংলাদেশ ফুটবল দল বিশ্বকাপে খেলে এবং প্রতিপক্ষ যদি হয় আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল, তবে তারা কাকে সমর্থন করবে? উত্তর আসে দ্বিধাহীন চিত্তেবাংলাদেশ। আমাদের ক্রিকেট দল যখন বিশ্বমঞ্চে লড়ে, তখন এই পুরো দেশ এক রঙে, অর্থাৎ লাল-সবুজে একাকার হয়ে যায়। সেখানে কোনো ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার অস্তিত্ব থাকে না। সুতরাং এই বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে যে উন্মাদনা, তা দেশপ্রেমের অভাব নয়, বরং তা হলো খেলাধুলার প্রতি বাঙালির এক চিরন্তন, আদিম এবং নিঃশর্ত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

যেদিন বাংলাদেশ সত্যি ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে, সেদিন হয়তো পাড়া-মহল্লায় এই ভিনদেশি পতাকাগুলোর মেলা আর দেখা যাবে না। সেদিন দেশজুড়ে উড়বে শুধু একটিই পতাকাআমাদের লাল-সবুজ। কিন্তু যত দিন না সেই স্বপ্ন সত্যি হচ্ছে, তত দিন বাঙালি এই লাতিন আমেরিকার বা ফ্রান্স, জার্মানি বা অন্য কোনো দেশের ফুটবল জাদুকরদের পায়েই সঁপে দেবে তার সব আবেগ, আর প্রতি চার বছর পর বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়ে প্রমাণ করবেফুটবল আসলেই কোনো সীমানা মানে না, আর তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো এই বাংলাদেশ।

লেখক : নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়