আপনার শৈশব-কৈশোর কেমন ছিল? আমাদের বাড়ি ফরিদপুর। তবে বাবার চাকরিসূত্রে জন্মেছি বগুড়ায়; ১৯৪৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর। সেখান থেকে কুমিল্লা হয়ে, ১৯৫২ সালের দিকে বাবার পোস্টিং হলো পাকিস্তানের করাচিতে। তাই করাচিতেই আমার শৈশব কেটেছে। পড়াশোনাও সেখানেই শুরু। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়তাম সেন্ট জোসেফ স্কুলে। আমাদের পাড়াটিকে বলা হতো সরকারি পাড়া। প্রচুর বাঙালি পরিবার ছিল ওখানে। আমরা থাকতাম সরকারি কলোনিতে। স্কুলে তেমন বাঙালি ছিল না। তবে করাচিতে তখন ছিল উপমহাদেশীয় সব জাতির মানুষের বসবাস। প্রত্যেকটা কমিউনিটি তাদের সংস্কৃতিচর্চা করত। পোশাক দেখেই বলে দেওয়া যেত কে বাঙালি, কে পাঞ্জাবি। ছিল মুক্ত পরিবেশ। স্কুল থেকে বাসায় ফিরে খেলতে বের হয়ে যেতাম। ১৯৫০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে করাচিতে নজরুল একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হলো। সেটিই ছিল আমাদের সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্রস্থল। সেখানে গান শিখতাম। আলতাফ মাহমুদ, শেখ লুতফর রহমান—এঁরা আমাদের গান শেখাতেন। আমাদের বাসায় নিয়মিতই শিল্পী-সাহিত্যিকদের আড্ডা বসত। তাই ছোটবেলায় অনেক গুণীজনের দেখা পেয়েছি। মুস্তাফা নূরউল ইসলামের একটি লেখায় আমাদের বাসার বর্ণনা আছে। রুনা লায়লার পরিবার আমাদের কলোনিতেই থাকত। ওর বড় বোন দিনা লায়লা ছিল আমার বাল্যবন্ধু। কলোনিতে আমাদের বিরাট দাপট ছিল। আমরা দুই-তিন ঘণ্টার জন্য সাইকেল ভাড়া করে চালাতাম। স্কুলের বিশেষ স্মৃতি মনে পড়ে? পাকিস্তানে আমরা চাইলেও বাংলা পড়তে পারতাম না। ইংরেজি মাধ্যম হলেও স্কুলে উর্দু সাবজেক্টটি পড়তেই হতো। কেন যেন এই ভাষাটি আমার পছন্দ ছিল না; হয়তো পরিবেশের কারণে। ফলে স্কুলে আমি এই একটা সাবজেক্টে টেনেটুনে পাস করতাম। আমাদের উর্দু শিক্ষক এক দিন বললেন, ‘তুমি এর চেয়ে বেশি নম্বর পাবে না।’ বললাম, ‘আপনি দয়া করে আমাকে ফেল করাবেন না বলে এই নম্বরটা দিচ্ছেন। এটা তো আমাদের ভাষা না।’ তিনি বললেন, ‘অন্য দেশের ভাষা জানতে তোমার ইচ্ছা করে না? ভাষা জানতে তো কোনো অপরাধ নাই।’ বলে দিলাম, ‘অপরাধ নাই, কিন্তু আমার আগ্রহও নাই!’ রাস্তাঘাটে চলাফেরার জন্য যতটুকু প্রয়োজন, শুধু ততটুকুই শিখে নিয়েছিলাম। সেখান থেকে এসএসসি পাস করে ১৯৬৪ সালে আমি বাংলাদেশে ফিরে এলাম। ভর্তি হলাম চারুকলার প্রিন্টিং অ্যান্ড ড্রয়িং বিভাগে। তখন আমি ঢাকার মিন্টো রোডে, চাচার বাসায় থাকতাম। কারণ আমার পরিবার দেশে ফিরেছে আরো পরে, ১৯৬৮ সালে। চারুকলার দিনগুলো কেমন ছিল? অঙ্ক আর আঁকাআঁকি—এ দুটি বিষয় ছোটবেলা থেকেই আমার খুব প্রিয়। গোটা পাকিস্তানে তখন আর্ট কলেজ ছিল দুটি—লাহোরের ন্যাশনাল আর্ট কলেজ আর আমাদের ঢাকা চারুকলা। আমি নিজ দেশেই চলে এলাম। আমার সৌভাগ্য, শিক্ষক হিসেবে জয়নুল আবেদিনকে পেয়েছি। যদিও আবেদিন স্যার আমাদের কোনো ক্লাস নেননি। তবে তাঁর একটি বিশেষ গুণ ছিল। তিনি সব ছাত্র-ছাত্রীকে খেয়াল করে দেখতেন। তারপর একেকজনকে ডেকে তাঁর কাছে বসাতেন। তার সঙ্গে আন্তরিকভাবে আলাপ করতেন। কোন জিনিস ভালো লাগছে, কোনটা লাগছে না, কোনটা কঠিন মনে হচ্ছে—জানতে চাইতেন। এখনো মনে আছে, ছবি আঁকাআঁকিতে কিছু সমস্যা হচ্ছিল আমার। আবেদিন স্যার আমাকে যেভাবে দেখিয়ে দিয়েছিলেন, তার পর থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আঁকতে পেরেছি। তিনি সবার প্রতি এতই আন্তরিক ছিলেন, প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রী মনে করত—আবেদিন স্যার তাকে খুব ভালোবাসেন। শিক্ষক রফিকুন নবীর প্রথম ব্যাচের ছাত্রী আমি। দ্বিতীয় বর্ষে হাশেম খান এবং তৃতীয় বর্ষে সৈয়দ আনোয়ারুল হক ও কাজী আবদুল বাসেতকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি। চতুর্থ ও পঞ্চম বর্ষে পেয়েছি আমিনুল ইসলামকে। প্রিন্ট মেকিংয়ে পেয়েছি শফিউল্লাহ ও মোহাম্মদ কিবরিয়াকে। কিবরিয়া স্যারের মতো এত জ্ঞানী, এত বিষয় সম্পর্কে জানা মানুষ আমি কখনোই দেখিনি। শাস্ত্রীয় সংগীত, সাহিত্য, রাজনীতি, দর্শন—সব বিষয়ে অগাধ জ্ঞান ছিল তাঁর। সোম থেকে শুক্রবার—সপ্তাহে পাঁচ দিন ক্লাস হতো আমাদের। আর্ট কলেজটা তখন ছোট ছিল। আমরা মেয়েরাও সংখ্যায় কম ছিলাম। সবাই আমাদের খুব স্নেহ করতেন। সিনিয়রদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল ভাই-বোনের মতো। আবুল বারক আলভী, শাহাদত চৌধুরী—এঁরা ছিলেন চারুকলায় আমার এক বছরের সিনিয়র। তাঁদের সঙ্গে আমাদের ‘তুমি তুমি’ সম্পর্ক। নারী-পুরুষের মধ্যে তখন পার্থক্য ছিল না। আমাদের কখনোই কোনো বিরূপ অভিজ্ঞতার মুখে পড়তে হয়নি। রাস্তায় বেশ মুক্তচিত্তে হাঁটতাম। রিকশায় ঘুরতাম। ঢাকা শহর খুব সুন্দর শহর ছিল তখন। আর বিনোদনের জন্য সিনেমা দেখতে যেতাম। বলাকা ও নাজ সিনেমা হলে দুপুর ১টা কি ২টায় বিশেষ কোনো সিনেমা দেখাতো। বেশির ভাগই বিদেশি সিনেমা। স্টুডেন্টেদের জন্য ছিল ডিসকাউন্ট। অন্যদের জন্য টিকিট যেখানে আড়াই টাকার মতো, ছাত্র হিসেবে আমাদের লাগত এক টাকা কয়েক পয়সা। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৯—চারুকলায় সত্যিকার অর্থেই ভীষণ আনন্দের সময় কেটেছে আমার। আপনার কর্মজীবন শুরু বিজ্ঞাপনী সংস্থায়। জীবনে কোনো কিছু পরিকল্পনা করে করিনি। আমার সব কিছুই আপনা-আপনি ঘটে যায়। চারুকলা থেকে পাস করে ১৯৬৯ সালেই বিজ্ঞাপনী সংস্থা বিটপীর আর্ট ডিপার্টমেন্টে যোগ দিলাম। আমরা কয়েকজন মতিঝিলপাড়ায় বেশ দাপটের সঙ্গে কাজ করতাম। তখন তো কম্পিউটার ছিল না। সব আমাদের হাতে করতে হতো। আমাদের সময় ক্যানভাস পাওয়া যেত না। এখনকার এইসব যন্ত্র বা নরম কাঠও তখন ছিল না। হার্ডবোর্ড নিয়ে শিরীষ কাগজ দিয়ে ঘষতাম। তারপর আঠা দিয়ে ওটাকে প্রিপেয়ার করতাম। এরপর আমরা ছবি আঁকতাম। আর ছিল কেরোসিন কাঠ। কাজ করতে গিয়ে হাত কেটে যেত। একসময় বুঝতে পারলাম, মেয়েদের কম বেতন দেওয়া হয়। চাকরিটা আমার আর ভালো লাগছিল না। তাই ছেড়ে দিলাম। মডেলিংও করেছেন। আলভী, শাহাদত—এঁরা ক্যামেরায় হাত পাকিয়েছেন আমার ওপর। তখন ‘ললনা’ নামের একটা ম্যাগাজিন ছিল। ওটার কাভার মডেল হিসেবে ভালো কাউকে সহজে পাওয়া যেত না। প্রচলিত ছিল, ভালো ঘরের মেয়েরা ছবি তুলতে দেবে না। পত্র-পত্রিকায় ছবি ছাপা হলে তাদের বিয়ে হবে না। আমি এসব পাত্তা দিইনি। বিয়ে না হলে নাই! আমি প্রায়ই ম্যাগাজিনের মডেল হতাম। এমনকি বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপনেরও মডেল হয়েছি, ১৯৭২ সালে। সব ফ্রি। কেউ টাকা দেননি! সবাই চিনতেন তো আমাকে; বলতেন, ‘খুশী, একটু মডেলিং করো।’ মানা করতাম না। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো কেমন ছিল? ১৯৬৮ সাল থেকেই আমরা ধানমণ্ডিতে থাকি। ভাগ্য ভালো, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই বাবা চাকরি থেকে অবসর নিয়েছিলেন। যেহেতু এটি সদ্য সাবেক সরকারি কর্মকর্তার বাড়ি, তাই একটু নিরাপদ বোধ করছিলাম। তবে কিছুদিন পরপরই পাকিস্তানি আর্মিরা সার্চ করতে আসত। মা তখন পরিস্থিতি সামাল দিতেন। আমরা ছিলাম ছয় ভাই-বোন। মা আমাদের ছাদে পাঠিয়ে দিতেন। সার্চ শেষে, ঘরে ঢুকে দেখতাম সব কিছু তছনছ। বই-খাতা, আলমারির কাপড়চোপড় সব মাটিতে। সেই দিনগুলোতে আমাদের কাজ ছিল রেডিও শোনা, বই পড়া আর লুডু লেখা। কিছু স্কেচ করেছি ঠিকই, তবে ছবি আঁকতে মন চাইত না। যে মেয়ে দুই-এক দিন বের হতে না পারলেই অস্থির হয়ে যায়, তার ৯ মাস এক ধরনের আটকে থাকা—আমার জন্য এ ছিল এক দমবন্ধ অভিজ্ঞতা। তাই ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না! উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যোগ দিলেন কখন? ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদের সঙ্গে আগে থেকেই পরিচয় ছিল। স্বাধীনতার ঠিক পরপরই তিনি জানতে চাইলেন, ‘তুমি এখন কী করবে?’ জানালাম, সদ্যঃস্বাধীন দেশটি তো ধ্বংসস্তূপ হয়ে আছে, দেখি, পুনর্বাসনের জন্য কিছু একটা কাজ করব। আবেদ ভাইয়েরা লন্ডন ও আমেরিকা গিয়ে প্রচুর টাকা ফান্ডে এনেছিলেন। শরণার্থী শিবিরে ওষুধ, খাবার আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়েছিলেন তাঁরা। বললেন, ‘আমাদের কিছু টাকা বেঁচে গেছে। সেই টাকায় আমরা কিছু কাজ করব। তুমি আমাদের হেল্প করো। তুমি জয়েন করো আমাদের সঙ্গে।’ আমরা তিন-চারজন জয়েন করলাম। ওনার অফিসের একটা রুম আমরা ব্যবহার করতাম। সেটিই ব্র্যাকের প্রথম অফিস। তার পর অফিসের জন্য বাসা খোঁজা, ব্র্যাকের নামকরণ, রেজিস্ট্রেশন—এসবের মধ্য দিয়ে ব্র্যাক প্রতিষ্ঠিত হলো। আমরা কাজ করছিলাম ঢাকায়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া, মুক্তিযোদ্ধা কিছু তরুণ যোগ দিলেন। যুদ্ধে সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। আমরা পুনর্বাসনের জন্য ২০০টি গ্রাম বেছে নিলাম। ওখানে আমাদের প্রথম কাজ ছিল সব কিছু সার্ভে করা। সরকার তখন সমন্বয় মিটিং করত। তখন বাংলাদেশে মাত্র দুটি সংস্থা ছিল—গণস্থাস্থ্য কেন্দ্র ও ব্র্যাক। ব্র্যাকের অফিস হিসেবে আমরা মগবাজারে একটা বাসা নিলাম। ব্র্যাকের প্রথম লোগোটাও আমারই করা। ১৯৭৩ সালে আবেদ ভাই আমাকে বললেন, ‘খুশী, তুমি মাস্টার্স করে ফেলো।’ তখন ঢাকায় মাস্টার্স কোর্স ছিল না। তাই বিদেশে যেতে হবে। আমি আবেদ ভাইকে বললাম, ‘যাওয়ার আগে আমি মাঠপর্যায়ে ঘুরে আসতে চাই। এত দিন ঠিক কোথায় সময় দিয়েছি, কাদের জন্য কাজ করেছি—নিজ চোখে দেখে আসতে চাই।’ আবেদ ভাই বললেন, ‘তুমি শহুরে মানুষ। গ্রামে কোনো দিন থাকোনি। এটা পারবে না।’ তবু আমি গেলাম। ঢাকা থেকে ট্রেনে শ্রীমঙ্গল, সেখান থেকে দুই ঘণ্টা বাসে করে শেরপুর ঘাট নামের একটি জায়গায়, ওখান থেকে লঞ্চ ছাড়ত সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। তার পর আরো দুই-তিন ঘণ্টায় সিলেট শহরে যেতে হতো। আর আমাদের গন্তব্য তো ছিল আরো দুর্গম পথে, আরো দূরে। কোনো কারণে লঞ্চ মিস করলে সারা রাত ওখানে কাটানোর মতো কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তা ছাড়া তখন কোনো একা মেয়ের পক্ষে হোটেলে থাকার মতো পরিবেশও তৈরি হয়নি। তবু আমি সব জায়গায় একাই যেতাম। সেখানে যাওয়ার পর কী সিদ্ধান্ত নিলেন? যাওয়া পর জানিয়ে দিলাম, মাস্টার্স করব না, এখানেই থাকব। ১৯৭৪ সালে আবেদ ভাইকে জোর করলাম, ‘আমাকে ফিল্ডেই পোস্টিং দেন। ফিল্ডে কোনো মেয়ে নেই। আমি শুরু করলে, দেখাদেখি অন্য মেয়েরাও আসবে।’ তিনি বললেন, ‘গ্রামের লোকজন তোমাকে গ্রহণ করবে না। তুমি তো বেড়াতে গেছ। বিদ্যুৎ ছাড়া, পানি ছাড়া তুমি থেকেছ। এটা দুই-তিন দিনের জন্য একটা রোমান্টিসিজম। ওখানে পোস্টিং হলে তোমাকে রোমান্টিসিজম ছাড়া থাকতে হবে।’ তাঁকে আমি রাজি করালাম। আবেদ ভাই আমাকে পাঠালেন আনন্দপুর গ্রামে। শেরপুর ঘাট থেকে লঞ্চে ছয় ঘণ্টা পাড়ি দিয়ে মারকুলি গ্রাম। সেখান থেকে ১০ মাইল দূরে আমার পোস্টিং। বর্ষাকালে নৌকা চলত। তখন তো ইঞ্জিনচালিত নৌকা ছিল না, চার ঘণ্টা লেগে যেত। ঝড় উঠলে তো কথাই নেই! শীতকালে আমাদের সেই ১০ মাইল পথ হেঁটে যেতে হতো। রাস্তা নেই। জমিনের আইল ধরে হেঁটে যেতাম। কতবার যে হোঁচট খেয়ে পড়েছি! বাঁশের সাঁকো পার হতে হতো। মাটিতে ঘুমাতাম। দেখতাম, স্যান্ডেলে সাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে। এমনকি লেপের ভেতরেও সাপ ঢুকে যেত। হাওরে বা পুকুরে গোসল করে কাপড় বদলাতে হতো। ভেজা শাড়ি থেকে শুকনো শাড়ি পরা। আগে শাড়ি পরতাম না। গ্রামে গিয়েই এগুলো শিখেছি। হারিকেন কিভাবে জ্বালাতে হয়, তেল কিভাবে ভরতে হয়, শলতে কতখানি ওঠাতে হয়, চিমনিটাকে কিভাবে পরিষ্কার করতে হয়—এগুলোও শেখা হয়ে গেছে। আমি ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত একটানা ওখানেই ছিলাম। মাঝে পাঁচ মাসের জন্য জামালপুর গিয়েছিলাম। কেমন ছিল গ্রামীণ জীবন? গ্রামে যাওয়ার পর মনে হলো, বইয়ে যতটুকু পড়েছি, বাস্তব আরো বেশি কঠিন। ট্রেনের টিকিট পাওয়া যে একটা সংগ্রাম—এ কথা আগে জানা ছিল না আমার। কখনো শাড়ি পরেই জানালা দিয়ে উঠতে হতো। আর ডাকাতি তো হতোই। তবু সবচেয়ে ভালো লাগত স্থানীয় মানুষদের আন্তরিকতা। এরা সবাই ভূমিহীন। এরা সবাই বুঝে গিয়েছিল, তাদের মানুষের মর্যাদাই দেওয়া হয় না। আমার কাজ ছিল তাদের সংগঠিত করা। ওদের মধ্যে অনেকেই ছিল বিধবা নারী। কারো কারো স্বামী যুদ্ধে শহীদ বা শরণার্থী শিবিরে টাইফয়েড-কলেরায় মারা গেছে। এই বিধবাদের মধ্যে হিন্দু কিশোরী-তরুণী ছিল প্রচুর। সমাজ ওদের ওপর কত যে বোঝা দিয়ে রেখেছে—আমার ধারণাই ছিল না। অমানবিক জীবন ছিল ওদের। যৌননিপীড়ন তো ছিলই। পুলিশ এবং প্রশাসনও হেনস্থা করত। আমি তখন দৌড়ে গিয়ে প্রতিবাদ করে আসতাম। প্রয়োজনে ডিসি অফিসে যেতাম। তখন তো মোবাইল ফোন ছিল না। ওয়্যারলেসে ডিসিকে ফোন করে কমপ্লেইন জানাতাম অথবা চিঠি পাঠাতাম। পুরুষরা ছিল শ্রেণিগতভাবে ক্ষেতমজুর ও জেলে। নিজেদের নৌকা ও জাল না থাকায় মহাজনের কাছে ধার করে নিত। বিনিময়ে সব মাছ মহাজনকে দিতে হতো। আমি এসব নারী-পুরুষকে সংগঠিত করা শুরু করলাম। ব্র্যাক ছাড়লেন কেন? মহাজন শ্রেণিটা খুব প্রকট ছিল। ব্র্যাক তখন শুরু করল মাইক্রোক্রেডিট। তখনো গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ড. মুহাম্মদ ইউনূস তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমি তাঁর কাছে গেলাম। মাইক্রোক্রেডিটকে খুবই সমস্যাপূর্ণ মনে হলো আমার। এর কারণে মানুষের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বদলে গেল। আমি টাকা দিই আর টাকা ওঠাই—এটাই মুখ্য হয়ে উঠল। এতগুলো বছর যে একসঙ্গে থাকলাম, সেই সম্পর্কটা চাপা পড়ে যেতে থাকল। কারণ তারা টাকা দিতে পারছে না। আবেদ ভাইকে বললাম, ‘আমি মাইক্রোক্রেডিটে বিশ্বাস করি না। সংগঠন করে এরা নিজ পায়ে দাঁড়াক—এটাই চাই।’ ১৯৭৯ সালে আবেদ ভাই বললেন, ‘ঠিক আছে, দেখ তোমরা তোমাদের বিপ্লব করতে পারো কি না।’ আমার সঙ্গে আরো কয়েকজন ছিলেন, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের সময় কাজ করেছেন। আমাদের কাছে তাঁরা ট্রেনিং নিতে এলেন। আমরা কাজ শুরু করলাম। এক বছরের মধ্যে প্রথমে একজন কর্মী পেলাম। তারপর ১৩ জন হলো। দেখলাম, সবাই তাঁদের সুবিধা ছেড়ে আমাদের সঙ্গে কাজ করতে চাচ্ছেন। তখন আবেদ ভাই বুঝলেন, দুই ধরনের প্রকল্প একসঙ্গে চলবে না। তাই ব্র্যাক ছেড়ে দিলাম। ‘নিজেরা করি’র শুরুর গল্পটা কেমন? ১৯৭৪ সালে এ সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কয়েকজন নারী। তবে পরে তাঁরা দেশ থেকে চলে যান। শুধু রেজিস্ট্রেশন নম্বর আর নামটাই ছিল। আমি ভাবলাম, এটাকেই আবার শুরু করি। তার পর থেকে ৩৮ বছর ধরে এটা নিয়েই আছি। ১৯৭৯ সালে ব্র্যাকে চেষ্টা করে দেখেছিলাম, মাইক্রোক্রেডিট ছাড়াই সাফল্য পাওয়া সম্ভব। তারপর তো ব্র্যাকে থাকা হলো না। এটাও ঠিক, আমরা থাকলে আজকে ব্র্যাক এত বড় প্রতিষ্ঠান হতো না। আন্তর্জাতিক হতো না। টোটালি চেঞ্জ হয়ে যেত। আমরা তো আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে প্রচুর তর্ক করতাম। আমরা চলে যাওয়ার পর কেউ আর তর্কও করে না। আমরা আবেদ ভাইকে বলতাম, ‘যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হবে—কেন আপনার আইডিয়াটা সঠিক?’ যাহোক, আমরা এখনো কোনো সার্ভিস ফি নিই না। মাইক্রোক্রেডিটের বিরুদ্ধে আছি তো বটেই। আমাদের সংগঠনগুলো নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে। সঞ্চয় করছে। আমরা সরাসরি বলে দিয়েছি, কোনো কর্মীকে টাকা দেবেন না। এটা আপনাদের টাকা। এ কারণেই ‘নিজেরা করি’। শুরুতে অনেকেই বলেছেন, এটি এক বছরও টিকবে না। তারপর দেখি, অনেকেই এ রকম সংগঠন শুরু করেছিলেন; বরং তারাই টিকতে পারেননি। অন্যরা টিকতে পারেনি কেন? আসলে কাজটি খুব কঠিন। আমরা বাছাই করে নিয়েছি—কাদের ফান্ড নেব, কাদেরটা নেব না। অনেকেই আমাদের ফান্ড দিতে চেয়েছেন। আমরা তাঁদের পরীক্ষা করে দেখেছি। বলেছি, প্রতিটি পয়সার হিসাব দিতে আমি রাজি আছি। টাকার ব্যাপারে আমি খুবই ক্লিয়ার। ছোটবেলায় বাবা শিখিয়েছেন, ‘আমি তোমাদের লেখাপড়া শিখিয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড় করাব। তোমরা ধনী হতে চাইলে, তোমাদের ইচ্ছা। তোমরা যা করতে চাও, যে কাজে তোমাদের সন্তুষ্টি—সেটা তোমাদের ইচ্ছা। মানুষ কী বলে তা নিয়ে মাথা ঘামাবে না। নিজের অন্তর কী বলে—সেটাই বিশ্বাস করো, সেটাই করো।’ যেচে দিতে আসা টাকা ফিরিয়ে দিয়েছি বলে অনেকেই অবাক হয়েছেন। বলে দিয়েছি, যেটা হজম করতে পারব না, সেটা নিয়ে লাভ নেই। মানুষের তো একটা ক্ষমতা আছে। আমাদের কর্মীরা সাংঘাতিক রকমের ডেডিকেটেড হওয়ার কারণ, আমরা এমন লোকদেরই রেখেছি, যাঁদের তৈরি করতে পারব। আমরা যে খুব ভালো করছি—তা নয়; তবে আদর্শটা ধরে রেখেছি। আমাদের নিয়মনীতিগুলো ধরে রেখেছি। দ্বিতীয়ত, খুবই স্পষ্ট কাঠামোগত পরিবর্তন না হলে দারিদ্র্য কোনো দিন যাবে না; মানুষের নীতিবোধও বিকশিত হবে না। পিতৃতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এ দুটিই সবচেয়ে বড় বাধা। শুরুতে আপনারা কে কে ছিলেন? আমরা ত্রিশজনের মতো ছিলাম। আমার পদবিটা খেয়াল করবেন, ‘নির্বাহী পরিচালক’ নয়; বরং ‘সমন্বয়কারী’। অনেকেই এখনো বলে, ‘তুমি কেন নিজেকে নির্বাহী পরিচালক বলো না।’ আমি বলেছি, আমি তো নীতিতে নির্বাহী নই। কেননা আমাদের সংস্থায় নির্বাহী পদটি, প্রথাটি নেই। দ্বিতীয়ত, আমি পরিচালক না। আমি সমন্বয় করি। কী কাজ কিভাবে করতে হবে, সেটা কে কিভাবে করছে—সেসবের সমন্বয়কারী। আমি যেহেতু ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করেছি, প্রপোজাল লিখতে পারি, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা করতে পারি—সম্ভবত এসব কারণেই আমাকে সমন্বয়কারী নির্বাচন করা হয়েছে। শুরুতে তিনজন ছিলাম মূল নেতা। আমি সমন্বয় করব, একজন প্রশিক্ষণ দেবেন, আরেকজন মাঠপর্যায়ের সংগঠন দেখবেন। এখন ‘নিজেরা করি’তে আমি ছাড়া তাঁদের কেউই নেই। এর মধ্যে ছিলেন আমার স্বামী কামাল উদ্দিন। আমরা যেদিন বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলাম, ঠিক করলাম স্বামী-স্ত্রী একই সংগঠনে কাজ করব না। সবাইকে নিয়ে বসে বললাম, ‘আমাদের মধ্যে কে থাকবে—তোমরা ঠিক করো।’ সবাই আমাকেই থাকতে বলল। তাই কামাল এখন নিজের আরেকটি এনজিওতে কাজ করে। অন্যদিকে, তৃতীয়জন ছিলেন মো. আবদুস সবুর। পরে তিনি এক থাই নারীকে বিয়ে করে থাইল্যান্ডে চলে গেছেন। সেখানেই এনজিও করছেন। যাঁদের সঙ্গে শুরু করেছিলাম—এমন মাঠকর্মীদের অনেকেই এখনো ‘নিজেরা করি’তে রয়ে গেছেন। এখন আড়াই লাখের মতো সদস্য রয়েছে আমাদের। এর পাশাপাশি নানা সময়ে বিভিন্ন কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সিপিডিতে (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) একেবারে শুরু থেকেই আছি। এটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান ভাবছিলেন, কিছু একটা করতে হবে। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমি যোগ দিয়েছি। এএলআরডিতে (অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) কাজ করতে খুবই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। সেসব সংস্থা ও সংগঠন অধিকার নিয়ে কাজ করছে—এটি তাঁদের প্ল্যাটফর্ম। এটির মাধ্যমে আমরা অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন পাস করাতে পেরেছি। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের অধিকার নিয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল চিটাগাং হিল ট্র্যাকস কমিশন’-এ কাজ করছি। অন্যদিকে ‘ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং’ নামের একটি নারীবাদী প্ল্যাটফর্মেও কাজ করছি আমি। অনেক প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে আপনার সরাসরি ওঠাবসা। আবার একেবারেই প্রত্যন্ত অঞ্চলের অশিক্ষিত মানুষদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছেন। এঁদের মধ্যে চিন্তার মৌলিক পার্থক্য কোথায়? চিন্তার ক্ষেত্রে বিরাট পার্থক্য। যাকে প্রান্তিক বলা হয়, যাকে একেবারেই আমলে আনা হয় না, যাকে মানুষ হিসেবে কোনো অধিকার দেওয়া হয় না, বঞ্চিত করা হয়—এমন মানুষদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে, আলাপ করতে গিয়ে দেখলাম, ওনারা অনেক ওপেন। মানবিক তো বটেই। আলাপ-আলোচনা করতে গেলে, বিশ্লেষণ করতে গেলে, তর্ক করতে গেলে তাঁরা সেটি গ্রহণ করেন। অন্যদিকে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অধ্যাপক অজয় রায় আমার কাছে এক প্রেরণার নাম। উগ্রবাদীদের হামলায় নিজের সন্তানকে (অভিজিৎ রায়) হারিয়েও, চিন্তায় তিনি একেবারেই আপস করেননি। সবার কথা বলব না, তবে এমন কয়েকজন বুদ্ধিজীবী এখনো বাংলাদেশে আছেন, যাঁদের আমি সমীহ করি। জীবনকে কিভাবে দেখেন? আমি প্রথমেই মানুষ। সব মানুষকে শ্রদ্ধা করাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় কথা। তবে যে অন্যকে অশ্রদ্ধা করে, ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের চিন্তা ও জীবনবোধকে ধ্বংস করে দেয়—সেই মানুষকে আমি অবশ্যই শ্রদ্ধা করতে চাই না। আপনার কাছে নারীবাদ কী? নারীবাদ আসলে পুরুষবিদ্বেষ নয়। আমার অনেক পুরুষ বন্ধু আছেন, যাঁরা নারীবাদী। অন্যদিকে অনেক নারী কিন্তু সাংঘাতিকভাবে পুরুষতান্ত্রিক। তবে নারীবাদের মধ্যেও অনেক ধরন আছে। ভ্রান্ত ধারণা বলব না; আমি বলব চিন্তার সীমাবদ্ধতা আছে। আমাকে দেখতে হবে, নারীবাদকে আমি কিভাবে দেখছি। সমাজকাঠামোয় পিতৃতন্ত্র একটি বড় যন্ত্র। এটি মানুষের জীবনকে আরো সত্যিকারে মুক্ত করার পথে একটা বাধা। তাই আমার কাছে নারীবাদ হলো পুরো কাঠামোর ভেতর পুরুষতন্ত্রকে বাতিল করার, ওটাকে উচ্ছেদ করার আন্দোলন। আপনার ব্যক্তিগত জীবনের কথা জানতে চাই। আমি বিয়ে করেছি ৩৪ বছর বয়সে। মানুষকে ভালোবাসা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা—এ দুটি মৌলিক জায়গায় আমাদের দুজনের মিল। আমাদের একমাত্র কন্যা এখন বিদেশে পিএইচডি করছে। পাঠ শেষে দেশে ফিরে নিজের মতো কাজ করবে। আপনার শিল্পজীবন? মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে আর পেইন্টিং করি না। আমি যে কাজ করছি, সেটি আর পেইন্টিং—এই দুই কাজ একসঙ্গে করা যায় না। নিজেকে পুরোপুরি নিযুক্ত করতে না পারলে আসলে পেইন্টিং হয় না। আমি মনে করি দুটিই প্যাশনের জায়গা। দুটি প্যাশনকে একসঙ্গে চালিয়ে নেওয়া কঠিন। তাই একটি কাজেই মনোনিবেশ করেছি। তবে আর্টিস্ট বন্ধুদের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ আছে। সময় পেলে এক্সিবিশন দেখতে যাই। তরুণ আর্টিস্টদের সঙ্গেও ওঠাবসা করি। শ্রতলিখন : মাসুদ রানা আশিক (লালমাটিয়া, ঢাকা; ৩১ অক্টোবর ২০১৮)