দ্বিনের ওপর দৃঢ় থাকো, কারামাত চেয়ো না। কেননা প্রবৃত্তি কারামাত চায় আর আল্লাহ চান দ্বিনের ওপর দৃঢ়তা।
ইবনু আতা (রহ.)

দ্বিনের ওপর দৃঢ় থাকো, কারামাত চেয়ো না। কেননা প্রবৃত্তি কারামাত চায় আর আল্লাহ চান দ্বিনের ওপর দৃঢ়তা।
ইবনু আতা (রহ.)

আয়াতের অর্থ
‘আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সর্বময় কর্তৃত্ব আল্লাহরই, তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তোমরা যখন যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সংগ্রহের জন্য যাবে তখন যারা পশ্চাতে রয়ে গিয়েছিল, তারা বলবে, আমাদেরকে তোমাদের সঙ্গে যেতে দাও। তারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি পরিবর্তন করতে চায়। বোলো, তোমরা কখনো আমাদের সঙ্গী হতে পারবে না। আল্লাহ পূর্বেই এরূপ ঘোষণা করেছেন।...’
(সুরা : ফাতহ, আয়াত : ১৪-১৫)
আয়াতদ্বয়ে মোনাফিকদের লোভ-লালসা ও মুমিনদের প্রতি আল্লাহর অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে।
শিক্ষা ও বিধান
১. আয়াত থেকে জানা যায়, পার্থিব দায়মুক্তি ও ক্ষমা পরকালীন দায়মুক্তি ও ক্ষমার নিশ্চয়তা দেয় না।
২. আয়াতে আল্লাহ খায়বার যুদ্ধের বিজয় ও গনিমতের সুসংবাদ দিয়েছেন। এই যুদ্ধে মুমিনরা বিপুল পরিমাণ গনিমত লাভ করেছিল।
৩. হুদাইবিয়ার কিছুদিন পর সপ্তম হিজরির মহররম মাসে খায়বার যুদ্ধ হয়েছিল। হুদাইবিয়ায় অংশগ্রহণকারী সাহাবিরাই প্রধানত এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।
৪. ইসলামের বিধান হলো, যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধারাই শুধু গনিমত লাভ করবে। মোনাফিকরা এর বিপরীতে যুদ্ধ না করেই গনিমতের অংশ চেয়েছিল।
৫. ‘তোমরা আমাদের সঙ্গী হতে পারবে না’ বাক্যে তাবুক যুদ্ধে মোনাফিকরা যে অংশগ্রহণ করবে না সেদিকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। (তাফসিরে আবু সাউদ : ৮/১০৮)

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বান্দার তাওবার কারণে সেই লোকটির চেয়েও অধিক খুশি হন, যে লোকটি মরুভূমিতে তাঁর উট হারানোর পর তা খুঁজে পায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৩০৯)
শিক্ষা
হাদিসের ব্যাখ্যায় আলেমরা বলেন—
১. আল্লাহ বান্দার পাপ মার্জনা করেন, এটা মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। তবে তিনি শাস্তিদানেও কঠোর।
২. বুজুর্গ আলেমরা বলেন, আল্লাহর ক্ষমার গুণ দেখে কেউ যেন পাপ পরিহারে শৈথিল্য না দেখায়। কেননা পাপের প্রতি উদাসীনতা তাওবার দুয়ার বন্ধ করে দেয়।
৩. কোনো গুনাহই ছোট না। কেননা সগিরা গুনাহ মানুষকে কবিরা গুনাহের দিকে নিয়ে যায়। যেমন— আগুনের ছোট স্ফুলিঙ্গও ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে
৪. মানুষ তাওবা করলে আল্লাহর কোনো লাভ নেই। তবু তিনি খুশি হন। কেননা তিনি মানুষের স্রষ্টা ও প্রতিপালক।
(মাউসুয়াতুল হাদিসিয়্যা)

মুহাম্মদ ইবনু কায়স ইবনু মাখরামা ইবনুল মুত্তালিব (রহ.) একদিন বললেন, ‘আমি কি তোমাদের আমার মা সম্পর্কে একটি ঘটনা শোনাব?’ উপস্থিত লোকেরা মনে করলেন, তিনি তাঁর জন্মদাত্রী মায়ের কথা বলবেন। কিন্তু তিনি বললেন, ‘আমার মা বলতে আমি উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)-কে বুঝিয়েছি।’ অতঃপর তিনি আয়েশা (রা.)-এর বর্ণিত একটি ঘটনা তুলে ধরলেন। আয়েশা (রা.) বললেন, ‘আমি কি তোমাদের আমার এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি ঘটনার কথা বলব?’
লোকেরা বলল, ‘অবশ্যই বলুন।’ তিনি বললেন, ‘যে রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আমার ঘরে থাকার পালা ছিল, তিনি এশার সালাতের পর আমার কাছে ফিরে এলেন। তিনি তাঁর চাদর খুলে রাখলেন, জুতা খুলে পায়ের কাছে রাখলেন এবং নিজের লুঙ্গির এক প্রান্ত বিছানার ওপর বিছিয়ে শুয়ে পড়লেন।
অল্পক্ষণ পর যখন তিনি ধারণা করলেন যে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি, তখন তিনি অত্যন্ত আস্তে করে তাঁর চাদর তুলে নিলেন, নিঃশব্দে জুতা পরলেন, খুব ধীরে দরজা খুলে বাইরে বের হলেন এবং আবার আস্তে করে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমি তখন ঈর্ষাবোধ করলাম।
আমি দ্রুত আমার ওড়না মাথায় দিলাম, নিজেকে ভালোভাবে ঢেকে নিলাম এবং তাঁর পেছন পেছন বের হলাম। তিনি জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে পৌঁছে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর তিনবার হাত উঠিয়ে দোয়া করলেন। এরপর তিনি ফিরে চললেন। আমিও তাঁর পিছু নিলাম। তিনি দ্রুত হাঁটতে লাগলেন, আমিও দ্রুত হাঁটলাম। তিনি আরো দ্রুত চললেন, আমিও আরো দ্রুত চললাম। শেষ পর্যন্ত আমি তাঁর আগে বাড়িতে পৌঁছে শুয়ে পড়লাম। তিনি ঘরে প্রবেশ করে বলেন, ‘হে আয়িশ! কী হয়েছে? তোমার শ্বাস এত দ্রুত কেন?’
আমি বললাম, ‘কিছুই হয়নি।’ তিনি বললেন, ‘তুমি অবশ্যই আমাকে বলবে, নতুবা সর্বজ্ঞ ও সর্বসূক্ষ্ম জ্ঞানের অধিকারী আল্লাহ আমাকে জানিয়ে দেবেন।’ তখন আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক।’
অতঃপর আমি পুরো ঘটনাটি তাঁকে খুলে বললাম। তিনি বলেন, ‘তাহলে সামনে যে কালো ছায়াটিকে আমি দেখেছিলাম, সেটি কি তুমি ছিলে?’ আমি বললাম, ‘জি, হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, ‘হে আয়িশ! তুমি কি ঈর্ষান্বিত হয়েছিলে?’ আমি বললাম, ‘আপনার মতো একজন স্বামীর ব্যাপারে আমার মতো একজন স্ত্রীর ঈর্ষান্বিত না হওয়ারই বা কী কারণ থাকতে পারে?’
তখন তিনি বলেন, ‘তুমি কি মনে করেছিলে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল তোমার প্রতি অবিচার করবেন?’
আমি বললাম, ‘মানুষ যা-ই গোপন করুক, আল্লাহ তো সবই জানেন। হ্যাঁ, আমার এমন ধারণা হয়েছিল।’
এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) আমার বুকে হালকা একটি ধাক্কা দিলেন, যাতে আমি কিছুটা ব্যথা অনুভব করলাম।
তারপর তিনি বললেন, ‘তোমার কাছে কি তোমার শয়তান এসেছিল?’
আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার সঙ্গেও কি শয়তান থাকে?’
তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ আমি বললাম, ‘প্রত্যেক মানুষের সঙ্গেই?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ আমি বললাম, ‘আপনার সঙ্গেও, হে আল্লাহর রাসুল?’ তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ। তবে আমার রব আমাকে তার বিরুদ্ধে সাহায্য করেছেন। ফলে সে আমার অনুগত হয়েছে (অর্থাৎ সে আমাকে কুমন্ত্রণা দিয়ে প্রভাবিত করতে পারে না)।’
এরপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আজ রাতে আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?’
তিনি বললেন, ‘তুমি যখন দেখেছিলে, তখন জিবরিল (আ.) আমার কাছে এসেছিলেন। তিনি আমাকে ডাকলেন, আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিলাম। কিন্তু তুমি তখন পোশাক খুলে বিশ্রামে ছিলে, তাই তিনি ঘরে প্রবেশ করেননি। আমি ভেবেছিলাম তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ। তোমাকে জাগিয়ে দিতে চাইনি এবং ঘটনাটি তোমার কাছ থেকে গোপন রেখেছিলাম। কারণ আমি আশঙ্কা করেছিলাম, তুমি একা হয়ে ভয় পাবে।
জিবরিল আমাকে বললেন, ‘আপনার প্রতিপালক আপনাকে জান্নাতুল বাকির অধিবাসীদের কাছে যেতে এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে নির্দেশ দিয়েছেন।’ আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি তাদের জন্য কিভাবে দোয়া করব?’
তিনি বললেন, ‘এভাবে বলবে—হে এই কবরস্থানের মুমিন ও মুসলিম অধিবাসীরা! আপনাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ আমাদের মধ্য থেকে যারা আগে চলে গেছেন এবং যারা পরে যাবেন—সবার প্রতি রহম করুন। আর ইনশাআল্লাহ আমরাও অচিরেই আপনাদের সঙ্গে মিলিত হব।’ (মুসলিম, হাদিস : ৯৭৪; নাসাঈ, হাদিস : ৩৯৬০)
এই হাদিস থেকে শিক্ষা, বিধান ও উপদেশ
এই হাদিসের মধ্যে অসংখ্য শিক্ষা, বিধান ও উপদেশ নিহিত আছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—
১. একাধিক স্ত্রীর মধ্যে ন্যায়বিচার করা ফরজ।
২. নারীর স্বাভাবিক ঈর্ষা : নারীর স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ঈর্ষা একটি বিষয়। ঈর্ষা দুই ধরনের—
প্রশংসনীয় ঈর্ষা : স্বামীকে ভালোবাসার কারণে অন্য কারো সঙ্গে তাকে ভাগাভাগি করতে না চাওয়া।
নিন্দনীয় ঈর্ষা : অমূলক সন্দেহ, কুধারণা ও অকারণ ঝগড়া-বিবাদে রূপ নেওয়া।
ইসলাম প্রথমটিকে স্বাভাবিক বলে স্বীকার করেছে, কিন্তু দ্বিতীয়টি নিষিদ্ধ।
৩. রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো পরিবারের ওপর কর্তৃত্বপরায়ণ বা কঠোর ছিলেন না।
৪. এই হাদিস থেকে জানা যায় যে রহমতের ফেরেশতারা এমন স্থানে প্রবেশ করেন না, যেখানে একজন নারী পোশাকমুক্ত অবস্থায় থাকেন।
৫. কবরবাসীর জন্য দোয়া করা সুন্নত
৬. স্নেহবশত নাম সংক্ষিপ্ত করে ডাকা বৈধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) আয়েশাকে ‘ইয়া আয়িশ’ বলে সম্বোধন করেছিলেন।
৭. রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো কারো প্রতি অবিচার করেননি। তিনি স্ত্রীদের প্রতিও ন্যায়পরায়ণ ছিলেন এবং সব সৃষ্টির প্রতি সুবিচার করতেন।