সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি পথচারীর মৃত্যু হয় ঢাকা শহরে। ঢাকায় যাঁরা নিম্ন আয়ের মানুষ আছেন তাঁরা একেবারে বাসা থেকে কর্মস্থল পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া-আসা করেন। অনেক সময় তাঁদের বাসা থেকে কর্মস্থলের দূরত্ব দুই থেকে তিন কিলোমিটারের মধ্যে হয়ে থাকে। সেই সঙ্গে নিম্ন মধ্যবিত্ত যদি যুক্ত করি, তাহলে ওই শ্রেণির বেশির ভাগ পেশাজীবীও গণপরিবহনের পাশাপাশি পায়ে হেঁটে কর্মস্থলে যাতায়াত করেন। আমাদের সড়কে গণপরিবহনে ওঠা-নামার ক্ষেত্রে যে নিরাপদ ব্যবস্থা থাকার কথা সেটা একেবারেই অনুপস্থিত। অনেক ক্ষেত্রে বাসের যাত্রীরা পথচারী হিসেবে মারা যাচ্ছেন। মেট্রোর মতো আমরা বড় প্রকল্প করে ফেললাম। কিন্তু বাসগুলোর রেষারেষি আমরা থামাতে পারিনি। এই সত্য কারোরই অস্বীকার করার সুযোগ নেই। গণপরিবহনকে শৃঙ্খলায় আনতে না পারার কারণে ঢাকার সড়কে পথচারীর মৃত্যু কমছে না। আমরা ঢাকা শহরে পায়ে হাঁটার পথকে নিরাপদ করতে পারিনি। আমরা একটি গবেষণায় দেখেছি, ঢাকা শহরে যাঁরা কর্মস্থলে যান তাঁদের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষই পায়ে হেঁটে কর্মস্থলে নিয়মিত যাতায়াত করেন। ফুটপাতগুলো হকারদের দখলে আছে। ফলে বাধ্য হয়ে পথচারীরা ফুটপাত রেখে সড়কে চলে আসছেন। সড়কের বেশির ভাগ পথচারী গণপরিবহনের রেষারেষিতে বাসচাপায় মারা যাচ্ছেন। যেকোনো একটা মেগাসিটিতে গণপরিবহনকে আমরা মেরুদণ্ড বলে থাকি। কিন্তু আমাদের শহরে গণপরিবহন একটা বড় প্রতিবন্ধকতা। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর ক্ষেত্রেও এটা বড় প্রতিবন্ধকতা। দুর্ঘটনা কমানোর ক্ষেত্রেও এটা বড় প্রতিবন্ধকতা। আরেকটা বিষয়ের দিকে আমাদের নজর দেওয়া উচিত। আমরা তো অনেক বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করলাম। এসব অবকাঠামো নির্মাণ করতে গিয়ে আমরা ফুটপাত নষ্ট করেছি। এটা খুবই দুঃখজনক, একটা শহরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় ফুটপাতের ওপর। কারণ সেখানে মানুষ হাঁটবে। আমরা সে হাঁটার পথ কমিয়ে বড় প্রকল্প নির্মাণ করেছি। আমরা ফ্লাইওভার করার সময়, এক্সপ্রেসওয়ে ও মেট্রো রেল করতে গিয়ে ফুটপাত নষ্ট করেছি। যেখানে আমাদের পায়ে হাঁটার জন্য ফুটপাতের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে ফুটপাত আরো কমানো হয়েছে। অথচ আমরা ১২ বছর ধরে বলে আসছি, ফুটপাতের নেটওয়ার্ক তৈরি করার জন্য, সড়কে হাঁটার পথ বানানোর জন্য। ফলে পথচারীদের আগেই অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। এখন নতুন নতুন আরো প্রতিবন্ধকতা হাঁটার পথে যুক্ত হয়েছে। আমরা যদি খেয়াল করি তাহলে দেখব, স্কুলে যাওয়ার সময় এবং স্কুল থেকে ফেরার সময় সকালে ও বিকেলে সড়কে পথচারী হিসেবে শিশুর মৃত্যু বেশি। শিক্ষার মতো অধিকার পেতে গিয়েও সড়কে শিশুদের প্রাণ দিতে হচ্ছে। আবার অনেক শিশু বাড়ির আশপাশে খেলার সময় সড়কে দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে। কারণ সড়কটা বাড়ির খুব কাছে এবং সেই সড়কটি ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের আঞ্চলিক সড়কগুলোতে সব ধরনের অবৈধ যানবাহন চলাচল করছে। আঞ্চলিক সড়কগুলোতে শিশুর মৃত্যুর হারও বেশি। আবার আবাসিক সড়কগুলোতে যানবাহনের যেসব ধরনের নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা; ওজনের নিয়ন্ত্রণ, গতি নিয়ন্ত্রণ; যেসব ধরনের ব্যবস্থাপনা থাকার কথা সেগুলোতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো মনোযোগ নেই। আমরা শুধু সড়ক নির্মাণ করছি। অথচ সড়ক ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিচ্ছি না। সড়ক তৈরি করতে গিয়ে আমাদের সমস্ত ধ্যান-জ্ঞান হচ্ছে যানবাহনের গতি বাড়ানো। কিন্তু এই গতি অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হওয়ার কারণে মানুষের প্রাণ চলে যাচ্ছে। সেটা আমরা খেয়াল করছি না। সব মিলিয়ে এখন অবস্থাটা অনেকটা এমন দাঁড়িয়েছে, যেন পথিকের পথ নেই। এখন প্রশ্ন, পথিক তোমার পথ কই? একটা সড়ক ধরে হাঁটতে হাঁটতে কিছুটা সময় পর দেখা যায় আর হাঁটার জায়গা নেই। পথিক পথ হারিয়ে ফেলেছে। এতে করে পথচারী দুর্ঘটনা আরো বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। এই যে পথিক যে পথ হারিয়ে ফেলল, এই দায় এখন কে নেবে? এই দায় আমাদের পুরো ইকো সিস্টেমের ওপর বর্তায়। জবাবদিহিতা অর্থাৎ যিনি এটা নকশা করছেন এ ধরনের ফুটপাত নষ্ট করে, তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আর জবাবদিহিতামূলক পরিবেশ তৈরি না করতে পারলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দায় নিতে হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়েরও দায় রয়েছে। নিরাপদ হাঁটার জায়গা তৈরি না করে শুধু গতি বাড়ানোর প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে সড়কে পথচারী মৃত্যুর সংখ্যা কখনোই কমবে না। লেখক : সাবেক পরিচালক, এআরআই, অধ্যাপক, বুয়েট