এক সারিতে বসা আর্সেন ওয়েঙ্গার, ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যান, পাবলো সাবালেতা, জিলবার্তো সিলভা। ফাইনালের আগের দিন মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে এদিনের আলোচনা ভিন্ন। খ্যাতিমান কোচ, খেলোয়াড়দের এই দলটি ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপের হয়ে কাজ করছে। ওয়েঙ্গার তাদের প্রধান। বিশ্বকাপে প্রতিটি খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ, দলগুলোর কৌশল, প্রবণতা নিয়ে টুর্নামেন্টজুড়ে বিস্তারিত কাজ করেছে এই গ্রুপ। তা নিয়েই সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করছিলেন ওয়েঙ্গার ও তাঁর সঙ্গীরা।
স্বাভাবিকভাবেই ফাইনালের দুই প্রতিপক্ষ নিয়ে বিশ্লেষণ শুনতে চেয়েছেন সাংবাদিকরা। ওয়েঙ্গার এককথায় বলেছেন, ‘এই দুটি দলই টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি দলীয় চরিত্র প্রকাশ করতে পেরেছে। আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে মানসিকতাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, স্পেনের জন্য আবার টেকনিক্যাল দিকটা।’
স্টাডি গ্রুপের অন্যতম বিশ্লেষক টম গার্টনার পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে তাঁর ব্যাখ্যাও তুলে ধরছিলেন। এই গ্রুপ খেলোয়াড়দের নিয়ে ফিফা পাওয়ার র্যাংকিংও করেছে টুর্নামেন্টের শুরু থেকে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ‘আক্রমণ’-এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি রেটিং নিয়ে ১ নম্বরে কিলিয়ান এমবাপ্পে, লিওনেল মেসিকে পেছনে ফেলেছেন তিনি। আর সুযোগ তৈরি বা সৃষ্টিশীলতা—সেখানে মেসিই ১ নম্বর, পরের অবস্থানে ফ্রেঞ্চ তারকা মাইকেল ওলিসে। তবে এ দুটি ক্যাটাগরি নয়, সংবাদ সম্মেলনে কৌতূহল তৈরি হলো রদ্রিকে নিয়ে। স্প্যানিশ মিডফিল্ডার রক্ষণের রেটিংয়ে সবার শীর্ষে। শুধু তা-ই নয়, রক্ষণে শীর্ষ তিনজনই স্পেনের। রদ্রির পর পেদ্রো পোরো ও পাউ কুবারসি। স্পেনের ফাইনালে উঠে আসার পেছনে রক্ষণের ভূমিকাটিও তাতে স্পষ্ট হয়। সাত ম্যাচে মাত্র ১ গোল হজম। আর মিডফিল্ডার হয়েও স্পেনের এই রক্ষণদৃঢ়তার নায়ক রদ্রি।
সাবেক ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার জিলবার্তো সিলভার কাছে এর ব্যাখ্যা শুনতে চাওয়া হয়। সিলভা ফুটবল মাঠের এক নীরব সেনাপতিকেই তুলে আনেন, ‘রদ্রি টেকনিক্যালি অসাধারণ খেলোয়াড়, কোনো সন্দেহ নেই। তাঁর ম্যাচ পড়তে পারার ক্ষমতাও অন্যদের চেয়ে তাঁকে এগিয়ে রাখে। প্রতিপক্ষের স্ট্রাকচারের বিপরীতে কোনো পজিশন নিলে সেটিকে অকার্যকর করে দেওয়া যাবে, রদ্রি সেটি খুব ভালোই বোঝেন। সতীর্থরাও তাঁকে সাহায্য করেন, রদ্রি যখন বল পান, তাঁরা দ্রুত জায়গা নিয়ে পাসগুলো সফল করেন। আবার বল হারালে রদ্রি দ্রুত অন্যদের সঙ্গে মিলে নতুন ব্যূহ তৈরি করেন।’ একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার অথবা ‘ডিপ লায়িং প্লেমেকার’ হিসেবে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের অন্যতম সেরা উদাহরণ এই রদ্রি। সেমিফাইনালে মাইকেল ওলিসের সঙ্গে এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলেদের যোগসূত্র কেটে দিয়ে খেলাটাকে যিনি স্পেনের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। আর্জেন্টিনার কার্যকারিতার সামনে গত রাতে ফাইনালে এই রদ্রিই তাই ছিলেন বড় চ্যালেঞ্জ। মেসির দল সেটি পেরিয়ে যেতে পেরেছে কি না বা কিভাবে পেরিয়েছে, এতক্ষণে নিশ্চয়ই তা জানাও হয়ে গেছে সবার। ফাইনালের আগ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সফল পাসও এই রদ্রির। স্প্যানিশদের কাছে প্রতিপক্ষের বল হারানোর ঘটনাও এই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ। আর আক্রমণের ক্ষেত্রে স্প্যানিশ দুই ফুলব্যাক মার্ক কুকুরেয়া ও পেদ্রো পোরোর বড় ভূমিকাও উঠে এসেছে বিশ্লেষণে। ফাইনালের আগ পর্যন্ত কুকুরেয়ার দুটি অ্যাসিস্ট ও দুটি গোল ছিল পোরোর।
আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ ছিল আর্জেন্টিনা মাঝখান দিয়ে আক্রমণে উঠেছে সবচেয়ে বেশি, মাঝখান দিয়ে সবচেয়ে বেশি অ্যাটাকিং থার্ডে ঢোকার রেকর্ডও তাদের। প্রতিপক্ষের লো ব্লক ভাঙতে আবার দুই প্রান্ত ব্যবহারের বিষয়টিও উঠে এসেছে, সে ক্ষেত্রে রদ্রিগো দি পলের মুভমেন্ট যেভাবে মেসির জন্য জায়গা করে দিয়েছে, মেসি তা থেকে যেভাবে গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন, সে বিষয়গুলোও ছিল। এই বিশ্বকাপে দলগুলোর ‘লো ব্লক’ প্রবণতা বাড়ার বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য, তবে সেটি শুধু নেতিবাচক নয়, ইতিবাচক অর্থেও। সেমিফাইনালের চার দলই প্রয়োজনে এই লো ব্লকে গেছে এবং সেখান থেকে আক্রমণে ওঠার কৌশল নিয়েছে। যেটিকে ওয়েঙ্গার ব্যাখ্যা করেছেন ‘রেস্ট অ্যাটাক’ হিসেবে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার এই ধরন ছিল স্পষ্ট। আবার এই লো ব্লক প্রবণতার কারণে এবারের আসরে বক্সের বাইরে থেকে শটের পরিমাণও বেড়েছে দ্বিগুণ। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে হুলিয়ান আলভারেসের বক্সের বাইরে থেকে করা গোলটি তো কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালের সেরা গোলের স্বীকৃতি পেয়েছে। গত বিশ্বকাপ থেকে এই বিশ্বকাপে আরো একটি প্রবণতা দেখানো হয়েছে। সেটি হলো হাইপ্রেসিংয়ে এক স্ট্রাইকারের বদলে দুই স্ট্রাইকারের ব্যবহার। ওয়েঙ্গার অবশ্য বলেছেন এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্ট্রাইকারকে মিডফিল্ডেও সাবলীল হতে হবে মার্টিন ওডেগার্ডের মতো, নইলে স্পেনের মতো দলের বিপক্ষে মাঝমাঠে খেলোয়াড় সংকটে ভুগতে হতে পারে।
ফাইনালেও সেই মাঝমাঠেই ভুগেছে আর্জেন্টিনা। শেষ পর্যন্ত মেসির সৃষ্টিশীলতা হার মেনেছে রদ্রির বিচক্ষণতার কাছে। আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতেছে স্পেন।







