দেড় মাসব্যাপী ভরপুর রোমাঞ্চ আর নাটকীয়তার পর পর্দা নামল ফুটবল মহাযজ্ঞের। অনেক নতুনকে সঙ্গী করে গত ১১ জুন শুরু হয়েছিল ৪৮ দলের বর্ধিত কলেবরের ২০২৬ বিশ্বকাপ। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা-স্পেনের ফাইনাল দিয়ে সমাপ্তি ঘটল প্রথমবার তিন দেশের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ফুটবলের সর্ববৃহৎ এই বৈশ্বিক আসরের। বেশি দল নিয়ে টুর্নামেন্ট আয়োজন, স্বাভাবিকভাবে ম্যাচের সংখ্যাও ছিল অনেক বেশি। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের চেয়ে এবার ম্যাচ বেশি ছিল ৪০টি। ম্যাচের সংখ্যা বৃদ্ধির অনুপাতে বেড়েছে গোলের সংখ্যাও! তুলনাচিত্রে আগের আসরগুলোর চেয়ে গোলের সংখ্যাতে বড় উল্লম্ফনই দিয়েছে এবারের আসর! ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী এক ম্যাচেই তো গোল হয়েছে ১০টি। তাতেই সব মিলিয়ে ফাইনালের আগে ২০২৬ বিশ্বকাপের গোলসংখ্যা উন্নীত হয় ৩০৭-এ, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক আসরের সর্বোচ্চ। ফাইনালের একটিসহ এবার গোল হয়েছে মোট ৩০৮টি।
এবারের আসরেই বিশ্বকাপের মোট গোলসংখ্যা ছুঁয়েছে তিন হাজার গোলের অনন্য মাইলফলকও! মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার রূপকথার প্রত্যাবর্তন গল্পে হেডারে বিশ্বকাপের ৩০০০তম গোলটি করেছিলেন এনসো ফের্নান্দেস। ১৯৭৮ সালে বিশ্বকাপের হাজারতম গোলটি করেছিলেন ডাচ ফরোয়ার্ড রব রেনসেনব্রিংক। এর ২৮ বছর পর ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে ২০০০তম গোলটি করেছিলেন সুইডিশ ফরোয়ার্ড মার্কাস অ্যালব্যাক। এর দুই দশক পর ৩০০০তম গোল পেল বিশ্বকাপ।
গোলের সংখ্যায় তো নতুন ইতিহাসই গড়েছে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার এই আসর। আর্জেন্টিনা-স্পেন ফাইনাল মাঠে গড়ানোর আগেই মোট গোল ছুঁয়ে ফেলে ট্রিপল সেঞ্চুরির ম্যাজিক ফিগার! ৩০০ গোলের মাইলফলক ছোঁয়া প্রথম বিশ্বকাপ এটি। এর আগের সর্বোচ্চ ১৭২ গোলের রেকর্ড হয়েছিল চার বছর আগে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে। ২০১৮ রাশিয়ার আসরে সংখ্যাটা ছিল ১৬৯টি আর ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে মোট গোল হয়েছিল ১৭১টি। নক আউটে পদার্পণের আগেই অর্থাৎ গ্রুপ পর্বেই আগের আসরগুলোর গোলসংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ২০২৬। অবশ্য এর আগে অংশ নেওয়া দলের সংখ্যা ছিল ৩২টি আর ম্যাচ ছিল ৬৪টি। দল ও ম্যাচসংখ্যা বাড়লে তো গোলও বাড়বে—যাঁদের মনে এমন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, তাঁদের জন্য তথ্য হচ্ছে শুধু সংখ্যায় নয়, অনুপাতেও (ম্যাচপ্রতি গড় গোল) এবারের আসরের স্থান থাকবে ওপরের সারিতে। ফাইনালের আগে এবারের বিশ্বকাপে ম্যাচপ্রতি গড় গোল ছিল ২.৯৮ (১০৩ ম্যাচে ৩০৭টি), যা ছিল ১৯৫৮ সালের পর সর্বোচ্চ। ফাইনালে এক গোল হওয়ায় গড়টা একটু কমে দাঁড়ায় ২.৯৬। এটাও ৫৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তালিকায় ১৯৭০ বিশ্বকাপে ২.৯৭ গড়ের পরই ২০২৬ বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপে গড় গোলে সবার ওপরে আছে ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড আসর। সেবার ২৬ ম্যাচেই হয়েছিল ১৪০ গোল। ম্যাচপ্রতি গড় গোল হয়েছিল ৫.৩৮টি। এর আগের তিনটি আসরেও গড়ে গোল হয়েছিল চার বা ততোধিক!
দল ও ম্যাচের সংখ্যা বেশি থাকায় আগের বিশ্বকাপগুলোর সঙ্গে তুলনা করাটা একটু মুশকিল, তবু রেকর্ডের পাতায় আলাদা একটা জায়গা পাবে এবারের বিশ্বকাপ। ব্যক্তিগত আলোর ঝলকানিতেও তো এবারের আসর পেয়েছে ভিন্নমাত্রা! কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসির সোনার জুতার (গোল্ডেন বুট) লড়াইটা ছিল দারুণ জমজমাট ও উপভোগ্য। শিরোপা নির্ধারণী লড়াই শেষ হওয়ার আগেও বলা যায়নি কার পায়ে উঠবে এবারের সোনার জুতা! সেমিফাইনাল পর্যন্ত মেসি-এমবাপ্পে দুজনেরই নামের পাশে ছিল আটটি করে গোল। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের জালে দুবার বল পাঠিয়ে মেসিকে পেছনে ফেলে সংখ্যাটা ডাবল ডিজিটে নিয়ে যান এমবাপ্পে। শেষ পর্যন্ত মেসি তাঁকে আর ছুঁতে না পারায় টানা দ্বিতীয়বার গোল্ডেন বুট জিতেছেন এমবাপ্পে। কাতারে আট গোল করে সোনার জুতা জিতেছিলেন ফ্রেঞ্চ এই ফরোয়ার্ড। এবার জিতলেন গোলসংখ্যা আরো দুটি বাড়িয়ে নিয়ে। এমবাপ্পে-মেসির পেছনে যাঁরা ছিলেন তাঁরাও কম যাননি। নরওয়ের রূপকথার ভ্রমণে পাঁচ ম্যাচে সাতটি গোল করেছেন গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড। তৃতীয় হয়ে আসর শেষ করা ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগের তারকা জুড বেলিংহামের নামের পাশেও জ্বলজ্বল করছে সাতটি গোল। এক আসরে চারজন খেলোয়াড়ের অন্তত সাত গোল করার প্রথম নজিরও গড়েছে এবারের বিশ্বকাপ। ফিফা







