• ই-পেপার

তোরেসের উদযাপন

ঘড়ির কাঁটায় ফাইনাল রোমাঞ্চ

রদ্রির সোনালি মুকুট

রদ্রির সোনালি মুকুট
স্পেনের মধ্যমাঠের চালিকাশক্তি রদ্রিই জিতেছেন টুর্নামেন্ট সেরা গোল্ডেন বলের পুরস্কার

এক সারিতে বসা আর্সেন ওয়েঙ্গার, ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যান, পাবলো সাবালেতা, জিলবার্তো সিলভা। ফাইনালের আগের দিন মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে এদিনের আলোচনা ভিন্ন। খ্যাতিমান কোচ, খেলোয়াড়দের এই দলটি ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপের হয়ে কাজ করছে। ওয়েঙ্গার তাদের প্রধান। বিশ্বকাপে প্রতিটি খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ, দলগুলোর কৌশল, প্রবণতা নিয়ে টুর্নামেন্টজুড়ে বিস্তারিত কাজ করেছে এই গ্রুপ। তা নিয়েই সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করছিলেন ওয়েঙ্গার ও তাঁর সঙ্গীরা।

স্বাভাবিকভাবেই ফাইনালের দুই প্রতিপক্ষ নিয়ে বিশ্লেষণ শুনতে চেয়েছেন সাংবাদিকরা। ওয়েঙ্গার এককথায় বলেছেন, ‘এই দুটি দলই টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি দলীয় চরিত্র প্রকাশ করতে পেরেছে। আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে মানসিকতাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, স্পেনের জন্য আবার টেকনিক্যাল দিকটা।’

স্টাডি গ্রুপের অন্যতম বিশ্লেষক টম গার্টনার পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে তাঁর ব্যাখ্যাও তুলে ধরছিলেন। এই গ্রুপ খেলোয়াড়দের নিয়ে ফিফা পাওয়ার র‌্যাংকিংও করেছে টুর্নামেন্টের শুরু থেকে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ‘আক্রমণ’-এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি রেটিং নিয়ে ১ নম্বরে কিলিয়ান এমবাপ্পে, লিওনেল মেসিকে পেছনে ফেলেছেন তিনি। আর সুযোগ তৈরি বা সৃষ্টিশীলতা—সেখানে মেসিই ১ নম্বর, পরের অবস্থানে ফ্রেঞ্চ তারকা মাইকেল ওলিসে। তবে এ দুটি ক্যাটাগরি নয়, সংবাদ সম্মেলনে কৌতূহল তৈরি হলো রদ্রিকে নিয়ে। স্প্যানিশ মিডফিল্ডার রক্ষণের রেটিংয়ে সবার শীর্ষে। শুধু তা-ই নয়, রক্ষণে শীর্ষ তিনজনই স্পেনের। রদ্রির পর পেদ্রো পোরো ও পাউ কুবারসি। স্পেনের ফাইনালে উঠে আসার পেছনে রক্ষণের ভূমিকাটিও তাতে স্পষ্ট হয়। সাত ম্যাচে মাত্র ১ গোল হজম। আর মিডফিল্ডার হয়েও স্পেনের এই রক্ষণদৃঢ়তার নায়ক রদ্রি।

সাবেক ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার জিলবার্তো সিলভার কাছে এর ব্যাখ্যা শুনতে চাওয়া হয়। সিলভা ফুটবল মাঠের এক নীরব সেনাপতিকেই তুলে আনেন, ‘রদ্রি টেকনিক্যালি অসাধারণ খেলোয়াড়, কোনো সন্দেহ নেই। তাঁর ম্যাচ পড়তে পারার ক্ষমতাও অন্যদের চেয়ে তাঁকে এগিয়ে রাখে। প্রতিপক্ষের স্ট্রাকচারের বিপরীতে কোনো পজিশন নিলে সেটিকে অকার্যকর করে দেওয়া যাবে, রদ্রি সেটি খুব ভালোই বোঝেন। সতীর্থরাও তাঁকে সাহায্য করেন, রদ্রি যখন বল পান, তাঁরা দ্রুত জায়গা নিয়ে পাসগুলো সফল করেন। আবার বল হারালে রদ্রি দ্রুত অন্যদের সঙ্গে মিলে নতুন ব্যূহ তৈরি করেন।’ একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার অথবা ‘ডিপ লায়িং প্লেমেকার’ হিসেবে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের অন্যতম সেরা উদাহরণ এই রদ্রি। সেমিফাইনালে মাইকেল ওলিসের সঙ্গে এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলেদের যোগসূত্র কেটে দিয়ে খেলাটাকে যিনি স্পেনের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। আর্জেন্টিনার কার্যকারিতার সামনে গত রাতে ফাইনালে এই রদ্রিই তাই ছিলেন বড় চ্যালেঞ্জ। মেসির দল সেটি পেরিয়ে যেতে পেরেছে কি না বা কিভাবে পেরিয়েছে, এতক্ষণে নিশ্চয়ই তা জানাও হয়ে গেছে সবার। ফাইনালের আগ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সফল পাসও এই রদ্রির। স্প্যানিশদের কাছে প্রতিপক্ষের বল হারানোর ঘটনাও এই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ। আর আক্রমণের ক্ষেত্রে স্প্যানিশ দুই ফুলব্যাক মার্ক কুকুরেয়া ও পেদ্রো পোরোর বড় ভূমিকাও উঠে এসেছে বিশ্লেষণে। ফাইনালের আগ পর্যন্ত কুকুরেয়ার দুটি অ্যাসিস্ট ও দুটি গোল ছিল পোরোর।

আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ ছিল আর্জেন্টিনা মাঝখান দিয়ে আক্রমণে উঠেছে সবচেয়ে বেশি, মাঝখান দিয়ে সবচেয়ে বেশি অ্যাটাকিং থার্ডে ঢোকার রেকর্ডও তাদের। প্রতিপক্ষের লো ব্লক ভাঙতে আবার দুই প্রান্ত ব্যবহারের বিষয়টিও উঠে এসেছে, সে ক্ষেত্রে রদ্রিগো দি পলের মুভমেন্ট যেভাবে মেসির জন্য জায়গা করে দিয়েছে, মেসি তা থেকে যেভাবে গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন, সে বিষয়গুলোও ছিল। এই বিশ্বকাপে দলগুলোর ‘লো ব্লক’ প্রবণতা বাড়ার বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য, তবে সেটি শুধু নেতিবাচক নয়, ইতিবাচক অর্থেও। সেমিফাইনালের চার দলই প্রয়োজনে এই লো ব্লকে গেছে এবং সেখান থেকে আক্রমণে ওঠার কৌশল নিয়েছে। যেটিকে ওয়েঙ্গার ব্যাখ্যা করেছেন ‘রেস্ট অ্যাটাক’ হিসেবে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার এই ধরন ছিল স্পষ্ট। আবার এই লো ব্লক প্রবণতার কারণে এবারের আসরে বক্সের বাইরে থেকে শটের পরিমাণও বেড়েছে দ্বিগুণ। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে হুলিয়ান আলভারেসের বক্সের বাইরে থেকে করা গোলটি তো কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালের সেরা গোলের স্বীকৃতি পেয়েছে। গত বিশ্বকাপ থেকে এই বিশ্বকাপে আরো একটি প্রবণতা দেখানো হয়েছে। সেটি হলো হাইপ্রেসিংয়ে এক স্ট্রাইকারের বদলে দুই স্ট্রাইকারের ব্যবহার। ওয়েঙ্গার অবশ্য বলেছেন এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্ট্রাইকারকে মিডফিল্ডেও সাবলীল হতে হবে মার্টিন ওডেগার্ডের মতো, নইলে স্পেনের মতো দলের বিপক্ষে মাঝমাঠে খেলোয়াড় সংকটে ভুগতে হতে পারে।

ফাইনালেও সেই মাঝমাঠেই ভুগেছে আর্জেন্টিনা। শেষ পর্যন্ত মেসির সৃষ্টিশীলতা হার মেনেছে রদ্রির বিচক্ষণতার কাছে। আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতেছে স্পেন।

 

স্টাডি গ্রুপের অন্যতম বিশ্লেষক টম গার্টনার পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে তাঁর ব্যাখ্যাও তুলে ধরছিলেন। এই গ্রুপ খেলোয়াড়দের নিয়ে ফিফা পাওয়ার র‌্যাংকিংও করেছে টুর্নামেন্টের শুরু থেকে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ‘আক্রমণ’-এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি রেটিং নিয়ে ১ নম্বরে কিলিয়ান এমবাপ্পে, লিওনেল মেসিকে পেছনে ফেলেছেন তিনি। আর সুযোগ তৈরি বা সৃষ্টিশীলতা—সেখানে মেসিই ১ নম্বর।’

 

এটা গোল উৎসবেরও বিশ্বকাপ

এটা গোল উৎসবেরও বিশ্বকাপ

দেড় মাসব্যাপী ভরপুর রোমাঞ্চ আর নাটকীয়তার পর পর্দা নামল ফুটবল মহাযজ্ঞের। অনেক নতুনকে সঙ্গী করে গত ১১ জুন শুরু হয়েছিল ৪৮ দলের বর্ধিত কলেবরের ২০২৬ বিশ্বকাপ। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা-স্পেনের ফাইনাল দিয়ে সমাপ্তি ঘটল প্রথমবার তিন দেশের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ফুটবলের সর্ববৃহৎ এই বৈশ্বিক আসরের। বেশি দল নিয়ে টুর্নামেন্ট আয়োজন, স্বাভাবিকভাবে ম্যাচের সংখ্যাও ছিল অনেক বেশি। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের চেয়ে এবার ম্যাচ বেশি ছিল ৪০টি। ম্যাচের সংখ্যা বৃদ্ধির অনুপাতে বেড়েছে গোলের সংখ্যাও! তুলনাচিত্রে আগের আসরগুলোর চেয়ে গোলের সংখ্যাতে বড় উল্লম্ফনই দিয়েছে এবারের আসর! ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী এক ম্যাচেই তো গোল হয়েছে ১০টি। তাতেই সব মিলিয়ে ফাইনালের আগে ২০২৬ বিশ্বকাপের গোলসংখ্যা উন্নীত হয় ৩০৭-এ, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক আসরের সর্বোচ্চ। ফাইনালের একটিসহ এবার গোল হয়েছে মোট ৩০৮টি।

এবারের আসরেই বিশ্বকাপের মোট গোলসংখ্যা ছুঁয়েছে তিন হাজার গোলের অনন্য মাইলফলকও! মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার রূপকথার প্রত্যাবর্তন গল্পে হেডারে বিশ্বকাপের ৩০০০তম গোলটি করেছিলেন এনসো ফের্নান্দেস। ১৯৭৮ সালে বিশ্বকাপের হাজারতম গোলটি করেছিলেন ডাচ ফরোয়ার্ড রব রেনসেনব্রিংক। এর ২৮ বছর পর ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে ২০০০তম গোলটি করেছিলেন সুইডিশ ফরোয়ার্ড মার্কাস অ্যালব্যাক। এর দুই দশক পর ৩০০০তম গোল পেল বিশ্বকাপ।

গোলের সংখ্যায় তো নতুন ইতিহাসই গড়েছে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার এই আসর। আর্জেন্টিনা-স্পেন ফাইনাল মাঠে গড়ানোর আগেই মোট গোল ছুঁয়ে ফেলে ট্রিপল সেঞ্চুরির ম্যাজিক ফিগার! ৩০০ গোলের মাইলফলক ছোঁয়া প্রথম বিশ্বকাপ এটি। এর আগের সর্বোচ্চ ১৭২ গোলের রেকর্ড হয়েছিল চার বছর আগে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে। ২০১৮ রাশিয়ার আসরে সংখ্যাটা ছিল ১৬৯টি আর ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে মোট গোল হয়েছিল ১৭১টি। নক আউটে পদার্পণের আগেই অর্থাৎ গ্রুপ পর্বেই আগের আসরগুলোর গোলসংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ২০২৬।  অবশ্য এর আগে অংশ নেওয়া দলের সংখ্যা ছিল ৩২টি আর ম্যাচ ছিল ৬৪টি। দল ও ম্যাচসংখ্যা বাড়লে তো গোলও বাড়বে—যাঁদের মনে এমন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, তাঁদের জন্য তথ্য হচ্ছে শুধু সংখ্যায় নয়, অনুপাতেও (ম্যাচপ্রতি গড় গোল) এবারের আসরের স্থান থাকবে ওপরের সারিতে। ফাইনালের আগে এবারের বিশ্বকাপে ম্যাচপ্রতি গড় গোল ছিল ২.৯৮ (১০৩ ম্যাচে ৩০৭টি), যা ছিল ১৯৫৮ সালের পর সর্বোচ্চ। ফাইনালে এক গোল হওয়ায় গড়টা একটু কমে দাঁড়ায় ২.৯৬। এটাও ৫৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তালিকায় ১৯৭০ বিশ্বকাপে ২.৯৭ গড়ের পরই ২০২৬ বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপে গড় গোলে সবার ওপরে আছে ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড আসর। সেবার ২৬ ম্যাচেই হয়েছিল ১৪০ গোল। ম্যাচপ্রতি গড় গোল হয়েছিল ৫.৩৮টি। এর আগের তিনটি আসরেও গড়ে গোল হয়েছিল চার বা ততোধিক!

দল ও ম্যাচের সংখ্যা বেশি থাকায় আগের বিশ্বকাপগুলোর সঙ্গে তুলনা করাটা একটু মুশকিল, তবু রেকর্ডের পাতায় আলাদা একটা জায়গা পাবে এবারের বিশ্বকাপ। ব্যক্তিগত আলোর ঝলকানিতেও তো এবারের আসর পেয়েছে ভিন্নমাত্রা! কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসির সোনার জুতার (গোল্ডেন বুট) লড়াইটা ছিল দারুণ জমজমাট ও উপভোগ্য। শিরোপা নির্ধারণী লড়াই শেষ হওয়ার আগেও বলা যায়নি কার পায়ে উঠবে এবারের সোনার জুতা! সেমিফাইনাল পর্যন্ত মেসি-এমবাপ্পে দুজনেরই নামের পাশে ছিল আটটি করে গোল। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের জালে দুবার বল পাঠিয়ে মেসিকে পেছনে ফেলে সংখ্যাটা ডাবল ডিজিটে নিয়ে যান এমবাপ্পে। শেষ পর্যন্ত মেসি তাঁকে আর ছুঁতে না পারায় টানা দ্বিতীয়বার গোল্ডেন বুট জিতেছেন এমবাপ্পে। কাতারে আট গোল করে সোনার জুতা জিতেছিলেন ফ্রেঞ্চ এই ফরোয়ার্ড। এবার জিতলেন গোলসংখ্যা আরো দুটি বাড়িয়ে নিয়ে। এমবাপ্পে-মেসির পেছনে যাঁরা ছিলেন তাঁরাও কম যাননি। নরওয়ের রূপকথার ভ্রমণে পাঁচ ম্যাচে সাতটি গোল করেছেন গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড। তৃতীয় হয়ে আসর শেষ করা ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগের তারকা জুড বেলিংহামের নামের পাশেও জ্বলজ্বল করছে সাতটি গোল। এক আসরে চারজন খেলোয়াড়ের অন্তত সাত গোল করার প্রথম নজিরও গড়েছে এবারের বিশ্বকাপ। ফিফা

 

শিক্ষাগুরুর হাতেই উঠল মর্যাদার ট্রফি

মামুন উর রশীদ
শিক্ষাগুরুর হাতেই উঠল মর্যাদার ট্রফি
লুইস দে লা ফুয়েন্তে

নিজের হাতে গড়ে তোলা শিষ্যদের নিয়ে অনেক কিছুই জিতেছিলেন তিনি। এবার সবচেয়ে বড় মর্যাদার অর্জনটাও যোগ হলো ক্যারিয়ারে। লুইস দে লা ফুয়েন্তে নিজের মতো করে রদ্রি, উনাই সিমন, মিকেল ওয়াইরসাবাল ও মিকেল মেরিনোদের গড়ে তুলেছিলেন যুব ফুটবল থেকেই। তাঁরা এবার গুরুকে উপহার দিলেন বিশ্বকাপ ট্রফি। অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২১ ইউরো এবং ২০২৪ সালে সিনিয়রদের ইউরো জেতার পর এবার বিশ্বকাপ জেতার মর্যাদা অর্জন করেছেন ফুয়েন্তে। ৯ বছর আগে কোচিং শিষ্য হিসেবে থাকা আর্জেন্টিনার বর্তমান কোচ লিওনেল স্কালোনিকে হারিয়ে তিনিই এগিয়ে থাকলেন শিক্ষাগুরু হিসেবে।

শিষ্যদের যেভাবে তৈরি করেছেন সেটাই যেন এবার বিশ্বকাপে কার্যকরভাবে মাঠে করতে দেখেছেন ফুয়েন্তে। তাই ফাইনাল ম্যাচের আগে বেশ ভারমুক্তই ছিলেন তিনি। কারণ এই শিষ্যরা ‘অপরাজেয়’; সেই বিশ্বাসটা দৃঢ় হয়েছে তাঁর মনে। তাঁর অধীনে বর্তমান লা রোজার বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়ই ছিলেন বয়সভিত্তিক ইউরোপিয়ান আসরগুলোয়। অনূর্ধ্ব-১৯, ২১

ও ২৩ দলে বর্তমান অধিনায়ক রদ্রি, মেরিনো, সিমনরা খেলে এনেছেন সাফল্যও। সেই ধাপগুলো পেরিয়ে ফুয়েন্তে হয়েছেন জাতীয় দলের কোচ। সব মিলিয়ে শিষ্যদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা ১৩ বছরেরও বেশি।

নিজের মতো তৈরি করে এবং নিজের চোখে লাগা খেলোয়াড়দের নিয়ে দল গোছানোর কারণেই বড় টুর্নামেন্টেও আসছে সাফল্য। ২০২২ সালে লা রোজার কোচ হিসেবে যোগ দেওয়ার পরের বছরই ফুয়েন্তে স্পেনকে জিতিয়েছেন উয়েফা নেশনস লিগ। ২০২৪ সালে তাঁর শিষ্যরা জিতেছেন ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ। এবার সবচেয়ে বড় গৌরবটাও ছিনিয়ে আনলেন রদ্রি-ইয়ামালরা। ২০১০ সালের পর আবার বিশ্বকাপ জিতেছে স্পেন।

বর্তমান দলটির সাফল্য পাওয়ার পেছনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকার বিষয়ে ফুয়েন্তে আগেই জানিয়েছিলেন, ‘আমরা প্রায় চার বছর আগে একটি ধারণা বা পরিকল্পনা নিয়ে পথচলা শুরু করেছিলাম এবং আমরা সেই পরিকল্পনার প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছি। এ সবই আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে আজ।’

দিনের পর দিন ফুয়েন্তের শিষ্যরা প্রতিশ্রুতি, পারস্পরিক সংহতি, উদারতা এবং প্রতিভা প্রদর্শন করেছেন। কঠিন সময়েও ম্যাচ জেতার পরিস্থিতি তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছেন তাঁরা। সুশৃঙ্খল খেলা উপহার দিয়ে ফাইনালের মতো বড় উত্তেজনা ও স্নায়ুচাপের ম্যাচও তাই জিতে নিয়েছেন লা রোজারা। পুরো আসরেই রক্ষণভাগ ও মাঝমাঠ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছেন ফুয়েন্তের শিষ্যরা।

৬৫ বছর বয়সী এই কোচ প্রতিপক্ষ হিসেবে আলবিসেলেস্তেদেরই চেয়েছিলেন ফাইনালে। তিনি আসলে পুরনো বন্ধুত্ব এবং ৯ বছর আগে লা রোজাদের কোচিং একাডেমিতে শিষ্য হয়ে আসা আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনির সম্পর্কে তাঁর জানা। আর চেনা শত্রুকে হারিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিকল্পনা তৈরি সহজতর। শিক্ষাগুরু হিসেবে তিনিই যে এগিয়ে, সেটাই যেন আরেকবার স্কালোনিকে হারিয়ে বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দিলেন ফুয়েন্তে।

 

অমলিন মেসি

রানা শেখ
অমলিন মেসি
এবার আর সোনালি ট্রফিটা ছোঁয়া হলো না মহাতারকা লিওনেল মেসির। ছবি : রয়টার্স

গত রাতে বিশ্বকাপের ফাইনালে সেপনের কাছে হেরে ইতিহাস গড়ার সুযোগ হাতছাড়া করেছে আর্জেন্টিনা। টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের যে কীর্তি ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালের ইতালি এবং ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর আর কোনো দল ছুঁতে পারেনি, সেই অভিজাত ক্লাবে নাম লেখানোর স্বপ্নও অপূর্ণ থেকে গেল। কিন্তু ট্রফি হারানোর রাতেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একজনই—লিওনেল মেসি।

এমন মঞ্চে মেসির নাম নতুন কিছু নয়। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ফুটবলকে এমনভাবে শাসন করেছেন যে সর্বকালের সেরা কে—এই বিতর্কে তাঁর নামই উচ্চারিত হয় সবার আগে। মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু একটি বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ নেই, ফুটবল ইতিহাসে তাঁর মতো পূর্ণাঙ্গ ও ধারাবাহিক ফুটবলার খুব কমই এসেছে। নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালটি ছিল ইতিহাস লেখার আরেকটি সুযোগ। দুইবার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হওয়ার সম্ভাবনা, বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড ছোঁয়ার হাতছানি—সবই ছিল সামনে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ট্রফিটা আর হাতে ওঠেনি। বরং এমন এক রাতে দেখা গেল অন্য এক মেসিকে। যে মেসি টুর্নামেন্টজুড়ে ছিলেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসা, ফাইনালের ১২০ মিনিটে তাঁকে যেন খুঁজে পাওয়া গেল না।

১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের শট যখন আর্জেন্টিনার জাল কাঁপাল, তখন ভেঙে পড়ে পুরো দল। আর সেই মুহূর্তে হতাশায় মুখ লুকাতে দেখা যায় মেসিকে। তাঁর চোখে-মুখে ছিল অবিশ্বাস আর অপূর্ণতার যন্ত্রণা। পুরো টুর্নামেন্টে যিনি একের পর এক জাদুকরী মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন, প্রয়োজনের সময় দলকে টেনে তুলেছেন, সেই মেসি ফাইনালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাতে নিজের সেরা ছন্দের ধারে-কাছেও ছিলেন না। ফুটবল কখনো

কখনো এমনই নিষ্ঠুর—যে খেলোয়াড় পুরো যাত্রার আলো হয়ে থাকেন, শেষ মঞ্চে তাঁর কাছ থেকেই আলোটা হারিয়ে যেতে পারে।

তবু ৩৯ বছর বয়সেও তিনি যেন সময়কে হার মানিয়েছেন। আট ম্যাচে আট গোল, অসংখ্য জাদুকরী মুহূর্ত, প্রয়োজনের সময় গোল, আবার কখনো নিখুঁত অ্যাসিস্ট—পুরো টুর্নামেন্টেই আর্জেন্টিনার হৃদস্পন্দন ছিলেন একজনই। ফাইনালের একটি রাত তাঁর সেই অসাধারণ যাত্রাকে মুছে দিতে পারেনি। কারণ ১০ বছর আগে দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। ২০১৬ সালের সেই অন্ধকার রাত। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শতবর্ষী কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হারের পর কান্নাভেজা চোখে জাতীয় দলকে বিদায় জানিয়েছিলেন মেসি। মনে হয়েছিল, অপূর্ণতার ভার নিয়েই শেষ হয়ে গেল আর্জেন্টাইন অধ্যায়। কিন্তু কিংবদন্তিরা হয়তো এভাবেই ফিরে আসেন। কয়েক মাসের মধ্যেই সিদ্ধান্ত বদলালেন। এরপর একে একে জিতলেন কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ, ফিনালিসিমা। অসম্পূর্ণ গল্পটিকে পরিণত করলেন পূর্ণতার মহাকাব্যে। আর এবার মেটলাইফে আরেকটি ফাইনাল হার যেন আবারও সেই পুরনো প্রশ্ন সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে—এটাই কি তাঁর শেষ বিশ্বকাপ?

স্প্যানিশ সাংবাদিক গিয়েম বালাগে তা মনে করেন না। তাঁর বিশ্বাস, ‘মেসির মধ্যে এখনো জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানোর আনন্দ অটুট। তাঁর মধ্যে এখনো সেই আবেগ আছে। তিনি এখনো খেলাটা উপভোগ করেন। তাই আমি মনে করি না, এটাই তাঁর শেষ’,— বলেছেন বালাগে। কথাটি অমূলকও নয়। ১২০ মিনিটের ম্যাচ শেষ করেও মেসিকে ক্লান্ত মনে হয় না। তিনি আগের মতো হয়তো আর দৌড়ান না, কিন্তু ফুটবল কখনোই শুধু দৌড়ের খেলা ছিল না। কখন হাঁটতে হবে, কখন গতি বাড়াতে হবে, কখন একটি পাসেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে হবে—এসবের শিল্পে এখনো তিনি অতুলনীয়। তাই চার বছর পরের ২০৩০ বিশ্বকাপের কথাও উঠে আসছে। পরের বিশ্বকাপের মূল আয়োজন হবে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোয়। তবে শতবর্ষ উপলক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচগুলোর একটি হবে আর্জেন্টিনার মাটিতে। যদি মেসি তখনো খেলেন, বয়স হবে ৪৩। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বয়স্ক আউটফিল্ড ফুটবলার হওয়ার রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি নিজের দেশের দর্শকদের সামনে আরেকবার বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ—এমন প্রলোভন কি সহজে এড়িয়ে যাওয়া যায়? মজার ব্যাপার হলো, ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালের আগেও মেসি বলেছিলেন, সেটিই হবে তাঁর শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। চার বছর পর তিনি নিজেই সেই ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণ করেছেন। তাই এবার যদি আবার বিদায়ের কথা বলেন, তবু হয়তো কেউ আর নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করবে না।

আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনিও যেন সেই অনুভূতিই প্রকাশ করেছিলেন ফাইনালের আগে সংবাদ সম্মেলনে। মেসির অবসর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘তিনি ইতিহাস। তিনি কিংবদন্তি। ৩৯ বছর বয়সে তাঁকে বিশ্বকাপের আরেকটি ফাইনালে খেলতে দেখা অবিশ্বাস্য। ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে আমরা শুধু স্মরণ করতে পারি। কিন্তু মেসি এখনো আমাদের সঙ্গে আছেন। তাই তাঁকে যত দিন সম্ভব উপভোগ করা উচিত।’ এই বিশ্বকাপেও মেসি রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়েছেন। ফাইনাল দিয়ে তাঁর বিশ্বকাপে ম্যাচসংখ্যা দাঁড়াল ৩৪। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১২টি অ্যাসিস্ট, টানা ১১ ম্যাচে গোল বা অ্যাসিস্ট, টানা ৯ ম্যাচে গোল—এমন অসংখ্য কীর্তি তাঁর ঝুলিতে। কাফুর পর দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে খেললেন তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালেও। কিন্তু হয়তো পরিসংখ্যানই মেসির সবচেয়ে বড় পরিচয় নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি বারবার অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। ২০১৬ সালে যাঁকে সবাই হারিয়ে গেছেন ভেবেছিল, তিনিই পরে ফুটবলকে উপহার দিয়েছেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রত্যাবর্তনের গল্প।

তাই মেটলাইফের এই ফাইনাল হয়তো আরেকটি অপূর্ণতার স্মৃতি হয়ে থাকবে। ১০৬ মিনিটের সেই গোল, মেসির হতাশ মুখ, চোখের সামনে হাতছাড়া হওয়া ট্রফি—সবই থেকে যাবে বেদনাদায়ক ছবির মতো। কিন্তু ইতিহাস বলছে, লিওনেল মেসির গল্পে কোনো পরাজয়ই শেষ অধ্যায় হয়ে থাকেনি। প্রতিবারই তিনি ফিরে এসেছেন নতুন এক বিস্ময় নিয়ে। তাই এবারও যদি বিদায়ের কথা বলেন, তবু ফুটবল বিশ্ব নিশ্চিত বিশ্বাস করবে না। কারণ লিওনেল মেসির গল্পে ফুলস্টপ নেই। প্রতিটি সমাপ্তির পরও থেকে যায় নতুন একটি বাক্য শুরু হওয়ার সম্ভাবনা।