বিচার পাওয়ার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকেরই রয়েছে। আর সেই বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে মামলাসংশ্লিষ্ট আলামত। জব্দ করা সেসব আলামত রাখা হয় থানা ও আদালতের মালখানায়। কিন্তু স্থানাভাবে এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনেক আলামতই নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। গতকাল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, চরম অব্যবস্থাপনায় দেশের থানা ও আদালতের মালখানায় জব্দ মালপত্রের পাহাড় জমেছে। এ পর্যন্ত ১৪ লাখের বেশি আলামত ও মালপত্র জব্দ রয়েছে থানা ও আদালতের মালখানায়। এর মধ্যে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে জব্দ আছে তিন লাখ ৬৭ হাজার ৪৯০টি সাধারণ আলামত।
এর আগে গঠিত পুলিশ সদর দপ্তরের অনুসন্ধান কমিটি যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতেও অপরাধের তদন্ত বা বিচারের স্বার্থে জব্দ করা আলামত বা জিনিসপত্র সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে চরম অব্যবস্থাপনার চিত্রই উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় পড়ে থাকায় এসব আলামত ও মালপত্র নষ্ট হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-প্রমাণও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই অব্যবস্থাপনা দূর করতে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরার পাশাপাশি উচ্চ আদালতকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে অনুরোধ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। একটি রিট মামলায় গত ৮ জুলাই বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। এই প্রতিবেদন দেখার পর হাইকোর্ট জব্দ আলামত সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ বা ব্যবস্থাপনাগত সমস্যার কার্যকর সমাধানের জন্য আইনসচিবকে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবকে প্রধান করে ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করতে বলা হয়েছে। এই কমিটিকে জব্দ আলামত, মালপত্র সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে আধুনিক রূপরেখা তুলে ধরে দুই মাসের মধ্যে একটি প্রতিবেদন দিতে বলেছেন হাইকোর্ট।
জানা যায়, এই রিটে প্রাথমিক শুনানির পর ২০২২ সালের ৩০ আগস্ট হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দেন। থানা বা আদালতের মালখানায় জব্দ আলামত, মালপত্র কিভাবে সংরক্ষণ বা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়, তা জানতে চান হাইকোর্ট। এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শককে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। সেই সঙ্গে থানা ও মালখানায় জব্দ আলামত যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, জানতে রুল জারি করেন। পরে ২০২৩ সালের ৭ জুন হাইকোর্টে এই প্রতিবেদন দেয় পুলিশ সদর দপ্তর, যা গত ৮ জুলাই উপস্থাপন করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, থানা ও আদালত মিলিয়ে দেশে মালখানা আছে ৯৬৭টি। এর মধ্যে থানায় মালখানা আছে ৭৪০টি, বাকি ২২৭টি আদালতে। থানার ৭৪০ মালখানার মধ্যে পর্যাপ্ত জায়গাসহ ব্যবহার উপযোগী মালখানা আছে মাত্র ৩০১টি। পর্যাপ্ত জায়গা আছে, কিন্তু ব্যবহার উপযোগী নয় এমন মালখানার সংখ্যা ৫২। আবার ব্যবহার উপযোগী কিন্তু পর্যাপ্ত জায়গা নেই এমন মালখানা রয়েছে ৩১৪টি। এ ছাড়া ব্যবহার অনুপযোগী এবং পর্যাপ্ত জায়গাও নেই এমন মালখানা আছে ৭৩টি। এসব মালখানায় ১৪ লাখ ২৪ হাজার ৭৭টি জব্দ আলামত, সম্পত্তি বা মালপত্র সংরক্ষিত আছে। এ ছাড়া রয়েছে আরো ৩৫ হাজার ৫৮৮টি জব্দ যানবাহন ও জলযান। থানার সামনে, পেছনে বা রাস্তায় বড় বড় আলামত, মালপত্র বা জব্দ সম্পত্তি রাখা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
মামলার স্বার্থে আলামত সঠিক অবস্থায় রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। আমরা আশা করি, হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী আলামত রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

