গ্যাসসংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। শিল্প-কারখানায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে। কোনো কোনো শিল্প এলাকায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে বলে জানিয়েছেন শিল্প মালিকরা। গ্যাসের অভাবে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে গেছে। অনেক স্টেশন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। যেগুলোতে গ্যাস দেওয়া হয় সেগুলোতেও চাপ কম থাকায় গাড়িতে গ্যাস ঢুকে কম। কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অর্ধেকেরও কম গ্যাস পাওয়া যায়। ফলে বারবার গ্যাস নিতে হচ্ছে এবং ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের সারি শুধুই দীর্ঘ হচ্ছে। বাসাবাড়িতেও গ্যাসের প্রবাহ খুবই ক্ষীণ। অনেক গ্রাহকের অভিযোগ চুলা জ্বলেই না। বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। গ্যাসের এই সংকট সহসা কাটবে বলেও কেউ আশ্বস্ত করতে পারছেন না। কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, গ্যাসের এমন দুরবস্থার মধ্যেও প্রতিদিন সিস্টেম লসের নামে বিতরণ কম্পানিগুলোর হিসাবের বাইরে চলে যাচ্ছে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪ কোটি টাকা। বছরে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় পাঁচ হাজার ১১০ কোটি টাকা। বছরের পর বছর এ নিয়ে আলোচনা হলেও সিস্টেম লসের নামে এই চুরি কমছে না এবং সরকারকে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে যেতে হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত আট বছরে গ্যাস খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা। শুধু গত অর্থবছরেই এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আবাসিকে প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে। বৈধ সংযোগ না পেয়ে এক শ্রেণির গ্রাহক অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহার করছেন। শুধু আবাসিক নয়, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানার অনেক সংযোগও চলছে চুরি করা গ্যাসে। বছরজুড়ে বিপুলসংখ্যক অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও এই প্রবণতা কমছে না। অন্যান্য বিতরণ কম্পানির তুলনায় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির বিতরণ এলাকায় গ্যাস চুরির হার সবচেয়ে বেশি।
জানা যায়, সিস্টেম লস কমাতে সরকার ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করলেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায়নি। সরকারের লক্ষ্য ছিল সিস্টেম লস ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার। কিন্তু এখনো তা ৯ শতাংশেই রয়ে গেছে। সাময়িক অভিযান নয়, অবৈধ গ্রাহকদের স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করা না গেলে সিস্টেম লস কমানো সম্ভব নয় বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি আধুনিক মিটারিং ব্যবস্থা, ডিজিটাল নজরদারি, পুরনো পাইপলাইন প্রতিস্থাপন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থায় কারিগরি ক্ষতি সর্বোচ্চ ২ শতাংশ হতে পারে। এর বেশি যে ৬ থেকে ৭ শতাংশ ক্ষতি দেখানো হচ্ছে, তার পুরোটাই কার্যত গ্যাস চুরি।’ একই মত দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন। তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে উচ্চ চাপের সঞ্চালন লাইনে ২ শতাংশ সিস্টেম লসও উদ্বেগজনক। বিষয়টি নতুন করে গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।’
গ্যাসের চাহিদার তুলনায় নিজস্ব উৎপাদন কম থাকায় বৈদেশিক মুদ্রায় বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে ভর্তুকি মূল্যে বিতরণব্যবস্থায় দিতে হয়। তার পরও এভাবে গ্যাসের অপচয় বা চুরি কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই গ্যাস চুরি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি শিল্পসহ বিভিন্ন পর্যায়ের গ্রাহকদের গ্যাসের চাহিদা মেটাতে দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।

