কয়েক দিনের ভারি বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষয়ক্ষতির যে চিত্র সামনে এসেছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। লাখো মানুষ পানিবন্দি, বহু ঘরবাড়ি ভেসে গেছে, রাস্তাঘাট ডুবে গেছে, বিপুল পরিমাণ জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। অগণিত কৃষকের মাথায় হাত। এদিকে বৃহত্তর চট্টগ্রামে পানি কিছুটা নেমে গেলেও সিলেট অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে শুরু করেছে। এই অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা নিয়ে সরকার বন্যার্ত মানুষের পাশে আছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যের বরাত দিয়ে কালের কণ্ঠ জানিয়েছে, বন্যাকবলিত আট জেলায় ১৯ হাজার ৮৬৯ হেক্টর জমির ফসল মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৯ হাজার ৬১৭ হেক্টর জমির আউশ আবাদ একেবারে তলিয়ে গেছে। ৪৩ হাজার ৯৭৯ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন সবজি নষ্ট হয়েছে। জেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, এটি প্রাথমিক ক্ষতি, পানি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি হবে।
চট্টগ্রামে গত সপ্তাহে এক দিনে ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর পরও বৃষ্টি চলছেই। এতে পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে গোটা চট্টগ্রাম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সেখানে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ কয়েক দিন যাবৎ পানিবন্দি হয়ে আছে। এর মধ্যে চার লাখ মানুষের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। ভূমিধসে, পানিতে ডুবে প্রাণহানি হয়েছে অন্তত ৪৩ জনের। এদিকে সারা দেশেই অতিবৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। গতকাল রবিবার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টা ঢাকাসহ ছয় বিভাগে ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। খবরে বলা হয়েছে, সিলেট অঞ্চলে উজান থেকে নেমে আসা ঢলে বিস্তৃীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে আশ্রয়শিবিরে বন্যার্তদের সংখ্যা বাড়ছে। তবে ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নেওয়া অনেকের অভিযোগ, এখন পর্যন্ত কেউ তাদের খোঁজখবর নেয়নি। কোনো সহায়তাও পৌঁছেনি। আবার বন্যার্তরা শুধু খাবার সংকটে থাকে এমনও নয়, সুপেয় পানির অভাবসহ অন্যান্য সেবা অত্যন্ত অপরিহার্য হয়ে দেখা দেয়। রয়েছে ডায়রিয়া, কলেরাসহ নানা রোগ ছড়িয়ে পড়ার বড় ঝুঁকি।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও গভীর মমত্ববোধ নিয়ে বন্যার্ত মানুষের সুরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তরা দ্রুতই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরে পাবে। এ ছাড়া কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রস্তুত করা হচ্ছে। তালিকার কাজ শেষ হলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে সরকার।
এখন দেখা যাচ্ছে, প্রতিবছরই দেশের কোথাও না কোথাও বন্যা ভয়াবহ রূপ নেয়। স্বল্প সময়ের বন্যায়ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়ে থাকে। এক দিনের বৃষ্টিতেই শহরাঞ্চল পানিতে টইটম্বুর হয়ে পড়ে। সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, বন্যা নিয়ন্ত্রণে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ব্যবস্থা নেই। নানা সময় বিশেষজ্ঞমহল পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিলেও বরাবরই তা উপেক্ষিত রয়েছে।
আমরা মনে করি, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকার কাজ যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, মাঠ পর্যায়ে যেন কোনো অনিয়ম না হয়, তার জন্য নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে বন্যা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়দি ও টেকসই ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি। সতর্ক ব্যবস্থা আরো সময়োপযোগী করে সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নিলেও ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা যেতে পারে।

