টানা ভারি বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। বেশ কিছু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিশেষ করে বৃহত্তর চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। সেখানে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ কয়েক দিন ধরে অসহায় পানিবন্দি হয়ে আছে। চট্টগ্রামের দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০ পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। এরই মধ্যে ত্রাণ ও উদ্ধার কাজে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
কালের কণ্ঠের খবরে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালী—এই চারটি উপজেলা ব্যাপকভাবে প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার প্রায় চার লাখ মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এ ছাড়া বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলার বন্যা পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বৃহত্তর চট্টগ্রামে বন্যার মধ্যে বড় শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পাহাড়ধস। গত সাত দিনে শুধু কক্সবাজারেই পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলমান বিপর্যয়ে সব মিলিয়ে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বান্দরবানের সাত উপজেলার সব নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ায় অনেকে পাহাড়ের ওপর আশ্রয় নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে সার্বক্ষণিক চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, এখন পর্যন্ত দুর্যোগকবলিত এলাকায় এক হাজার ৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। দুই কোটি ১৫ লাখ টাকা অনুদান এবং তিন হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন চাল দুর্গতদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দুর্গত এলাকায় নিরাপদ খাওয়ার পানি, স্যানিটেশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, শিশুখাদ্য এবং তিন বেলা খাবার সরবরাহ করা হয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে এসব নির্দেশনার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
অন্যদিকে সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করেছে। সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, আগামী কয়েক দিন চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সিলেটে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। উত্তরাঞ্চলে রংপুর ও লালমনিরহাটেও বন্যা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও শেরপুরের কিছু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বন্যার্ত মানুষের ক্ষয়ক্ষতি অপূরণীয়। ঘরবাড়ি, ফসলের ক্ষেত—সবকিছু ডুবে একাকার হয়। গবাদি পশু, সঞ্চিত সম্পদ হারিয়ে অনেকে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। সঙ্গে রয়েছে রোগ-বালাই। বন্যার পানি নেমে গেলেও বন্যার ক্ষত থেকেই যায়। কাজেই দুর্গতরা যেন ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারে তার জন্য বন্যা-পরবর্তী সহায়তার পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে নিয়মিত বন্যা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলের নদীগুলো—মাতামুহুরী, সাঙ্গু, হালদা ও কর্ণফুলী আগের মতো বৃষ্টির পানি স্বল্প সময়ে সাগরে প্রবাহিত করতে পারছে না। দূষণে-দখলে দেশের বেশির ভাগ নদীর মতো এগুলোরও করুণ দশা। এ ছাড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। এ কারণে একই বিপর্যয় বারবার ফিরে আসে।
আমরা মনে করি, বন্যার্ত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণ, সেবা কার্যক্রম যেমন নিশ্চিত করা প্রয়োজন, তেমনি বন্যা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এ ছাড়া সতর্কবার্তা অনুযায়ী, আগাম প্রস্তুতি নিলেও ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়।

