টানা বৃষ্টিতে বিস্তীর্ণ এলাকা ডুবে যাওয়ায় বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের লাখো মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে ঢল ও পাহাড়ধসে হতাহতের সংখ্যাও। হাসপাতালের মতো অপরিহার্য অবকাঠামো তলিয়ে গেছে। চট্টগ্রাম শহর, আশপাশের থানা ও জেলাগুলো পানিতে টইটম্বুর। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাজার, স্কুল-কলেজ, বসতবাড়ি ডুবে যাওয়ায় এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, ভারি বৃষ্টিপাত আরো কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এতে পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে।
কালের কণ্ঠ গতকাল জানিয়েছে, পাঁচ দিনে চট্টগ্রামে ১০২০.৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার এক দিনেই ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়, যা বিগত ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সাধারণ বৃষ্টিতেই চট্টগ্রাম শহর ডুবে যায়। রেকর্ড বৃষ্টিতে পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে। পাহাড় ও দেয়াল ধসে এবং পানিতে ডুবে গত পাঁচ দিনে বৃহত্তর চট্টগ্রামে ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সাতকানিয়া উপজেলার ৮০ শতাংশ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে, সেখানকার তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। সব মিলিয়ে পানিবন্দির মানুষের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হাঁটু পানির নিচে। রেলপথ ডুবে যাওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। বান্দরবানে সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বহু পর্যটক আটকা পড়েছে। সবখানে পানিবন্দি অসহায় মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।
বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি হবে—এটাই স্বাভাবিক। অতিবৃষ্টিতে বন্যাও হবে। তবে এর সঙ্গে মানবসৃষ্ট কিছু কারণে মানুষের দুর্ভোগ, ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রতিবছরই দেখা যায়, এক দিনের বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম শহর তলিয়ে যায়। এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য বিশেষজ্ঞমহল নানা সময় সুনির্দিষ্ট পরামর্শও দিয়েছে। কিন্তু হতাশার ব্যাপার হলো, সেগুলো বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি নেই। এখন আগে থেকেই জানা যায় কবে কখন, কোথায় কেমন বৃষ্টিপাত হবে। সেই অনুযায়ী পূর্বপ্রস্তুতি নিলেও ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমিয়ে আনা যায়। সে ক্ষেত্রেও আশানুরূপ পদক্ষেপ নেই। আমাদের পাহাড়গুলো পাথুরে নয়, মাটির। সাধারণত বর্ষা মৌসুমে ধসের আশঙ্কা থাকে। কিন্তু যথেচ্ছ পাহাড় কাটার ফলে ধসের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। আবার সেই পাহাড়ের কোলে গড়ে উঠেছে বসতি। সংগত কারণেই পাহাড়ধসে মৃত্যুর মিছিলে তারাই যোগ হয়। খবরে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে বিগত ১৯ বছরে পাহাড়ধসে ২১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাহাড়া কাটা রোধে আইন রয়েছে, কিন্তু তার বাস্তবায়ন কোথায়? এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তাদের সহায়তায় আটকে পড়া কয়েক শ পর্যটককে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে।
আমরা মনে করি, উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতার পরিসর আরো বাড়ানো দরকার। এখনো যারা ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাহাড়ের কাছে বসবাস করছে, তাদের অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হবে। তাদের স্থায়ী পুনর্বাসন প্রয়োজন। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য স্থানেও বন্যার সতর্কবার্তা রয়েছে, সেসব স্থানে সরকার এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে—এটাই কাম্য।

