চট্টগ্রাম মহানগরে গত মঙ্গলবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া বিভাগের মতে, চট্টগ্রামে গত ৪২ বছরের মধ্যে এটিই ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাতের সর্বোচ্চ রেকর্ড। ভারি বৃষ্টি হচ্ছে বৃহত্তর চট্টগ্রামজুড়েই। টানা বৃষ্টিতে বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে। শুধু কক্সবাজার জেলায়ই পাহাড়ধসে গত রবিবার থেকে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়। চট্টগ্রাম মহানগর ও তিন পার্বত্য জেলায়ও কিছু পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে এবং বেশ কয়েকজন হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আবহাওয়া বিভাগ জানায়, লঘুচাপ থাকায় আগামী কয়েক দিন ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে আরো পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে। আর শুধু বৃহত্তর চট্টগ্রাম নয়, বৃহত্তর সিলেটেও পাহাড়ধসের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
টানা বর্ষণে বন্দরনগর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার শহরের অনেক এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। শহর ছাড়াও রামু, চৌফলদণ্ডী, ঈদগাঁওসহ কক্সবাজার জেলার নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বৈরী আবহাওয়ায় চট্টগ্রামের সঙ্গে বিমান যোগাযোগও ব্যাহত হয়। এমন পরিস্থিতিতে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। সড়ক ডুবে যাওয়ায় সাজেকে পাঁচ শতাধিক পর্যটক আটকা পড়েছে।
প্রতিবছরই পাহাড়ধসের অনেক দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। এ বছর এরই মধ্যে কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলায় পাহাড়ধসের বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রাম মহানগরে পাহাড়ধসের সবচেয়ে বড় দুটি ঘটনা ঘটে ২০০৭ ও ২০১৭ সালে। ২০০৭ সালে পাহাড়ধসে মারা যায় ১২৭ জন। আর ২০১৭ সালের ঘটনায় চার সেনা কর্মকর্তাসহ ১৬৮ জনের অকালমৃত্যু হয়। তখন ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার পর সরকার পাহাড়ধসের কারণ খুঁজতে উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করেছিল। ৯ মাস ধরে অনুসন্ধানের পর সেই কমিটি তাদের প্রতিবেদন দিয়েছে। এতে সম্ভাব্য কারণগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি বেশ কিছু সুপারিশও করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, তাতে বাস্তব অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। এখনো দেশের বিভিন্ন স্থানে বহু মানুষ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে এবং প্রতিবছরই অনেকে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।
গতকাল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত খবর থেকেও জানা যায়, পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস রয়েছে। চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরের চিহ্নিত ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে এখনো অন্তত ছয় হাজার ৫৫৮টি পরিবার বসবাস করছে। তবে বাস্তবে এই সংখ্যা আরো বেশি। এমন বসবাস রয়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও বৃহত্তর সিলেটের আরো অনেক স্থানে। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাহাড়ধসের অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে নির্বিচারে পাহাড় কাটা, পাহাড়ের ওপরে থাকা গাছপালা কেটে ন্যাড়া করে ফেলা এবং প্রতিবেদনে সুপারিশকৃত পাহাড় ঘিরে আরসিসি রক্ষাবেষ্টনী ও নালা না থাকা। ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (২০১০ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী, দেশে পাহাড় বা টিলা কাটা নিষিদ্ধ। কিন্তু পাহাড় কাটা কি বন্ধ আছে? পাশাপাশি যারা ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করে, তাদের শুধু সতর্ক করলেই হবে না, তাদের বিকল্প আশ্রয়ের ব্যবস্থা করাও জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়া ক্রমেই চরমভাবাপন্ন হচ্ছে। সমুদ্র উত্তাল থাকা ও টানা প্রবল বর্ষণের ঘটনা প্রায়ই ঘটতে পারে। তাই পাহাড়ধস রোধে পাহাড় কাটা, বৃক্ষ নিধন বন্ধ করাসহ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড়সংলগ্ন বসবাস ঝুঁকিমুক্ত করতে হবে।

