দেশে পাসপোর্ট, ভূমি অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে দালাল শ্রেণির দৌরাত্ম্যের কথা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে, এই দালালচক্র দেশের সীমানা পেরিয়ে সুদূর সৌদি আরবেও থাবা বসিয়েছে। এমনটি উঠে এসেছে কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। দেখা গেছে, প্রবাসীদের পাসপোর্ট নবায়নের মতো জরুরি কাজেও লেগে যাচ্ছে আট থেকে ১০ মাস। অথচ দালালের মাধ্যমে সেটি অল্পদিনেই হয়ে যাচ্ছে। এর জন্য গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানী টিমের তরফ থেকে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস ও জেদ্দার কনসুলেট জেনারেল অফিসে দুজন প্রবাসীকে পাঠানো হয়। দেখা গেছে, পাসপোর্ট নবায়নের জন্য শত শত লোকের দীর্ঘ লাইন। অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন না। এগিয়ে আসে দালালচক্র। প্রস্তাব দেয়, কয়েক শ রিয়াল দিলে কিছুদিনেই মিলবে পাসপোর্ট। অভিযোগ রয়েছে, দালালচক্রের সঙ্গে দূতাবাস কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও যোগসাজশ রয়েছে। এসব কারণে সৌদি আরবে বৈধ প্রক্রিয়ায় পাসপোর্ট নবায়ন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো সময় সেটি আট থেকে ১০ মাসও লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময়ে জটিলতায় পড়তে হয় রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের। সৌদি আরবে বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করার জন্য আকামা (রেসিডেন্স পারমিট) অপরিহার্য। আর আকামা নিতে হলে প্রয়োজন বৈধ পাসপোর্ট। যদি পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, তখন আকামা নবায়নও সম্ভব হয় না। এ কারণে পাসপোর্ট নবায়নে বিলম্ব সরাসরি আকামা নবায়নের ওপর প্রভাব ফেলে।
সৌদি আরব আমাদের প্রবাস আয়ের অন্যতম উৎস। সেখানকার দূতাবাসগুলো প্রবাসীদের নানা সমস্যা-সংকটে এগিয়ে আসবে; প্রবাসীরা কোনো জটিলতায় পড়লে সেগুলো দ্রুত সমাধান করবে—এটিই স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড হওয়ার কথা। কিন্তু হয়েছে উল্টো। প্রবাসীরা সেবার জন্য এসব দপ্তরে গেলে তাঁদের সঙ্গে সঠিক আচরণ পর্যন্ত করা হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটি প্রবাসী কর্মী তথা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের প্রতি এক ধরনের জুলুম, জবরদস্তি এবং তাঁদের কষ্টের উপার্জনকে অবমূল্যায়ন করার শামিল।’ তিনি বলেন, ‘এই সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়বে, যা দীর্ঘ মেয়াদে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’
এদিকে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে দূতাবাসের নানা সমস্যা-সংকটের কথা বলা হয়েছে। ই-পাসপোর্ট সেবার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই, বায়োমেট্রিক কিটসহ প্রশিক্ষিত জনবলেরও ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসবের দোহাই দিয়ে প্রবাসীদের সংকট থেকে চোখ ফেরানোর উপায় নেই।
আমরাও মনে করি, সৌদি আরবে অবস্থানরত প্রবাসীরা যেন স্বল্প সময়ে পাসপোর্ট নবায়ন করতে পারেন, তার জন্য দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দালালচক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থাও নিতে হবে।

