কয়েক বছর ধরেই দেশের অর্থনীতি নানামুখী চাপের মধ্যে রয়েছে। করোনা মহামারির ভয়ংকর প্রভাব কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ও জ্বালানি তেলের সংকট আরো বেশি ক্ষতিকর হয়েছে। তা ছাড়া দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, ডলার সংকট, মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হারসহ আরো অনেক প্রতিকূলতাই মোকাবেলা করতে হচ্ছে দেশের শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে। ফলে দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সেই চাপ থেকে মুক্ত হতে পারছে না।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) জুন ২০২৬ অর্থনৈতিক হালনাগাদ ও পূর্বাভাস প্রতিবেদনে বলা হয়, রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক রপ্তানির ইতিবাচক প্রবাহ অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও সামষ্টিক অর্থনীতির চিত্র এখনো স্বস্তিদায়ক নয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, উন্নয়ন ব্যয়ের ধীরগতি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা—সব মিলিয়ে অর্থনীতি এখন বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে তারল্য বাড়লেও সেই অর্থ উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে
রূপান্তরিত হচ্ছে না। ফলে কর্মসংস্থান, আয় ও প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ আরো বাড়ছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৪২ শতাংশ, যা এপ্রিলে ছিল ৯.০৪ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.৩৯ থেকে বেড়ে ৯.০৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৫৭ থেকে ৯.৭১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে প্রায় সব খাতেই মূল্যচাপ অব্যাহত রয়েছে। এর বিপরীতে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ফলে তাঁদের প্রকৃত আয় কমছে।
রাজস্ব পরিস্থিতিও সন্তোষজনক নয়। মে মাসে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আদায় হয়েছে মাত্র ৭৩ শতাংশ। ফলে এক মাসেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা। এই ঘাটতি সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ও বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ব্যাংকিং খাতে আমানত কিছুটা বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪.৭৫ শতাংশে। অর্থাৎ উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন না কিংবা ঋণ গ্রহণে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন।
এমন পরিস্থিতিতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান আকিরা মাটসুনাগা বলেন, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, আর্থিক খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করার মতো সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
আমরা মনে করি, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে গৃহীত কর্মসূচি বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান অসংগতি ও প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সরকারকে আরো বেশি জোর দিতে হবে। সর্বোপরি কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

