ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলছেন, প্রশ্ন ফাঁস মহাপাপ, এর জন্য দায়ীদের সাজা পেতেই হবে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বলছেন, প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে তারা শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং শিক্ষার্থীরা জবাবদিহি পাবেন।
দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এখন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসছেন, সোনম ওয়াংচুক এবং পুলিশি হামলায় আহতদের দেখতে ছুটে যাচ্ছেন হাসপাতালে। বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রীর বাসার সামনে গিয়ে ধরনায় বসে যাচ্ছেন। রাজনীতিবিদদের তৎপরতা দেখে মনে হচ্ছে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পরশু ফাঁস হয়েছে, আর আন্দোলন গতকাল শুরু হয়েছে। অথচ ঘটনা প্রায় আড়াই মাসের পুরনো।
প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে গত ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছিল। পরে নজিরবিহীন নিরাপত্তায় গত ২১ জুন নতুন করে নিট পরীক্ষা নেওয়াও হয়েছিল। কঠিন প্রস্তুতির পর পরীক্ষা বাতিল হওয়ার চাপ নিতে পারেননি অনেকে। দীর্ঘদিন প্রস্তুতিতে ফোকাস ধরে রাখা, প্রস্তুতির খরচ, পরিবারের ওপর চাপ সামাল দেওয়া অল্পবয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ ছিল না। ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট পরীক্ষা বাতিলের পর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অন্তত ১২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছিল।
নবগঠিত ককরোচ জনতা পার্টি গত ৭ জুন প্রথম মাঠে নেমেছিল। সেদিন প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তর-মন্তরে প্রতিবাদ সমাবেশ করে তারা। তার পর থেকে ঘুরেফিরে তারা যন্তর-মন্তরেই ছিল।
গত ২৮ জুন লাদাখের অ্যাক্টিভিস্ট সোনম ওয়াংচুক তাদের দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে আমরণ অনশন শুরু করলে আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। গত ২০ জুলাই বসেছে ভারতের সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন। সপ্তাহখানেক আগেই সিজেপি ২০ জুলাই ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল।
সোনম ওয়াংচুকও অনশন থেকেই ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিতে যোগ দিতে সবার প্রতি আহবান জানিয়ে ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন। ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচি ঠেকাতে দুই দিন আগে ভোরবেলায় পুলিশ এসে সোনম ওয়াংচুককে জোর করে তুলে নিয়ে সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়। হাসপাতাল থেকেও ২০ জুলাইয়ের কর্মসূচি সফল করার আহবান জানান সোনম ওয়াংচুক।
পুলিশ অবশ্য আগের দিন জানিয়ে দেয়, সংসদ চলো কর্মসূচির অনুমতি নেই। অবশ্য ক্ষুব্ধ তারুণ্য এসব অনুমতির থোরাই কেয়ার করে। পুলিশের বাধা এবং কৌশলী ভুমিকা আরো ক্ষুব্ধ করে তাদের।
সোমবার ভোর থেকে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী যখন যন্তর-মন্তরে সমবেত হয়ে সংসদ অভিমুখে রওনা দেওয়ার জন্য তৈরি, তখন টনক নড়ে সরকারের। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা দুই ছাত্রনেতাকে ডেকে পাঠান। তাদের স্মারকলিপি গ্রহণ করে আলোচনার আশ্বাস দেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা যন্তর-মন্তর থেকে বেরিয়ে পড়েন সংসদ ভবনের উদ্দেশে। পুলিশ লাঠিচার্জ করে আর টিয়ার গ্যাস ছুড়ে তাদের নিবৃত করার চেষ্টা করে। তাতে হঠাৎ রণক্ষেত্রে পরিণত হয় দিল্লির প্রাণকেন্দ্র।
অথচ ২০ জুলাই সরকার যেসব পদক্ষেপ নিলো বা আশ্বাস দিল, এক-দুদিন আগে এর চেয়ে অনেক কম পদক্ষেপেও শিক্ষার্থীদের শান্ত করা সম্ভব ছিল। মূল দাবি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ হলেও শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি নিয়ে সংসদে আলোচনা, জবাবদিহি নিশ্চিত করলেও ঘরে ফিরে যেতে তৈরি ছিল।
এমনকি ১৯ জুলাই রাতেও সোনম ওয়াংচুক বলেছিলেন, সরকার যদি হাসপাতালে তার সঙ্গে দেখা করে সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার আশ্বাস দেন, তাহলেও তিনি অনশন ভাঙতে রাজি আছেন। কিন্তু ১২ বছর ধরে টানা ক্ষমতায় থেকে মহাপরাক্রমশালী হয়ে ওঠা মোদি সরকারের ঘুম তখনও ভাঙেনি।
২০ জুলাই যখন পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হলো, তখন টনক নড়ল সবার। অনলাইনে অফলাইনে এখন নিন্দা আর প্রতিবাদের ঝড়। এখন সেলিব্রেটিরা সোচ্চার, সুশীল সমাজ উচ্চকণ্ঠ, রাজনীতিবিদদের ঘুম হারাম। অথচ সিজেপি কিন্তু হুট করে সংসদের পথে হাঁটা শুরু করেনি।
৭ জুন থেকেই ছেলেগুলো ঘুরেফিরে যন্তর-মন্তরেই দিন-রাত একাকার করে শান্তিপূর্ণভাবে বসে ছিল। এতোদিন কারো মধ্যে কোনো হেলদোল ছিল না। অরবিন্দ কেজরিওয়ালসহ হাতে গোনা কয়েকজন রাজনীতিবিদ শুধু যন্তর-মন্তরে গিয়েছিলেন। ২০ জুলাই কর্মসূচির দিনে গিয়েছিলেন অভিনেত্রী শাবানা আজমী আর অভিনেতা প্রকাশ রাজ।
পুলিশি হামলার পর প্রতিবাদের ঝড় দেখে বোঝা যাচ্ছে না, মূল সমস্যা কোনটা—প্রশ্নপত্র ফাঁস করে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জীবন তছনছ করে দেওয়া নাকি পিটিয়ে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া? টিয়ারগ্যাসের ধোঁয়ায় অন্ধকার চারপাশ, পুলিশ নির্বিচারে পেটাচ্ছে শিক্ষার্থীদের, এমন ছবিতেই যেন জেগে উঠেছে সবার বিবেক।
এখন যেমন প্রধানমন্ত্রী বলছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস মহাপাপ, এটা যদি তিনি ৩ মের পরে বুঝতেন ও ব্যবস্থা নিতেন তাহলে তো সিজেপি’কে মাঠেই নামতে হতো না। যদি ৭ জুনের পরও বুঝতেন, তাহলেও জল এতদূর গড়াতো না।
সরকার, বিরোধী দল, সুশীল সমাজ, সেলিব্রেটিরা যদি অন্যায়ের মূল কারণটা বুঝতেন তাহলে হয়তো আজ রাজপথে মার খেতে হতো না নিরীহ শিক্ষার্থীদের। সভা-সমাবেশ করা সবার গণতান্ত্রিক অধিকার। দাবির ন্যায্যতা বুঝে সবাই সময়মতো এক হয়ে প্রতিবাদ করলে সমস্যা অনেক আগেই মিটে যেতে পারত। একেই বলে সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়।
এখন যেমন সবার প্রাণান্ত চেষ্টা, হয়তো প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে সংসদে তুমুল আলোচনা হবে, সরকারও হয়তো বুঝ দিয়ে শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরাতে পারবেন। কিন্তু পরীক্ষা বাতিলের চাপ সামলাতে না পেরে যে ১২ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করল, তাদের পরিবারগুলো কিসে সান্ত্বনা পাবে?