১৯৭১ সালের ৩১ জানুয়ারি চাঁদের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে নাসার 'অ্যাপোলো ১৪' মহাকাশযান। এতে ছিলেন তিন মহাকাশচারী- অ্যালান শেপার্ড, এডগার মিচেল ও স্টুয়ার্ট রুসা।
চাঁদে পৌঁছানোর পর শেপার্ড ও মিচেল চাঁদের পৃষ্ঠের 'ফ্রা মাউরো' এলাকায় নেমে হাঁটেন। অন্যদিকে কমান্ড মডিউলের পাইলট স্টুয়ার্ট রুসা চাঁদের কক্ষপথে থাকা মহাকাশযানের ভেতর থেকে পুরো অভিযান পরিচালনা করেন। তবে রুসার এই যাত্রায় আরেকটি বিশেষ দায়িত্ব ছিল, যা শুরুতে খুব বেশি আলোচনায় আসেনি। নিজের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র রাখার ব্যাগে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন কয়েকশ গাছের বীজ। এটি ছিল নাসা ও যুক্তরাষ্ট্রের বন বিভাগের যৌথ একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পের অংশ। চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসার পর ওই বীজ থেকে জন্ম নেওয়া গাছগুলো পরে পরিচিত হয় ‘মুন ট্রি’ বা ‘চাঁদের গাছ’ নামে। পরবর্তী সময়ে এসব গাছ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সরকারি ভবন, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, নাসার কেন্দ্র ও পার্কে লাগানো হয়। কিন্তু গাছগুলোর পাশে থাকা ছোট ফলক না পড়লে সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝার উপায় ছিল না যে, এগুলোর বীজ একসময় চাঁদের চারদিকে ঘুরে এসেছিল।
স্টুয়ার্ট রুসাকে এই প্রকল্পের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল বিশেষ কারণে। মহাকাশচারী হওয়ার আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বন বিভাগে 'স্মোকজাম্পার' হিসেবে কাজ করতেন। পঞ্চাশের দশকে তিনি প্যারাশুটের মাধ্যমে দাবানল এলাকায় নেমে আগুন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতেন। এই অভিজ্ঞতার কারণেই মহাকাশ গবেষণা ও বন গবেষণার মধ্যে রুসা হয়ে ওঠেন একটি স্বাভাবিক সংযোগ। নাসার তথ্য অনুযায়ী, অ্যাপোলো ১৪ অভিযানে রুসার দায়িত্ব পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের বন বিভাগের প্রধান এডওয়ার্ড পি. ক্লিফ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি জানতে চান, মহাকাশে গাছের বীজ নিয়ে যাওয়া সম্ভব কি না। বন বিভাগের উদ্ভিদ জিনতত্ত্ববিদ স্ট্যানলি এল. ক্রুগম্যান এই বীজ প্রকল্পের দায়িত্ব নেন।
তবে এটি কোনো বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ছিল না। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, চাঁদের চারপাশে নয় দিনের ভ্রমণ বীজের অঙ্কুরোদগম বা বেড়ে ওঠায় কোনো প্রভাব ফেলে কি না, তা দেখা। তুলনার জন্য পৃথিবীতেই একই ধরনের কিছু বীজ রাখা হয়েছিল, যাতে মহাকাশ থেকে ফিরে আসা বীজগুলোর সঙ্গে পার্থক্য যাচাই করা যায়। এই পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের পরিচিত কয়েকটি গাছের বীজ। এর মধ্যে ছিল লবললি পাইন, সিকামোর, সুইটগাম, রেডউড ও ডগলাস ফার। নাসার তথ্য অনুযায়ী, একটি ছোট নলাকার পাত্রে এসব বীজ রাখা হয়েছিল। তবে কতটি বীজ নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন নথিতে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। কোথাও ৪০০ থেকে ৫০০ বীজের কথা বলা হয়েছে, আবার কোথাও বলা হয়েছে সংখ্যাটি ২ হাজারের বেশি হতে পারে।
অ্যাপোলো ১৪ অভিযানের সময় শেপার্ড ও মিচেল যখন চাঁদের মাটিতে হাঁটছিলেন, তখন রুসা চাঁদের কক্ষপথে ঘুরছিলেন। সেই সময় তার সঙ্গে থাকা বীজগুলোও চাঁদকে প্রদক্ষিণ করে। নাসার তথ্য অনুযায়ী, রুসা কমান্ড মডিউল থেকে চাঁদের চারদিকে ৩৪ বার ঘুরেছিলেন। পৃথিবীতে ফেরার পর বীজগুলো নেওয়া হয় তখনকার লুনার রিসিভিং ল্যাবরেটরিতে, যা বর্তমানে নাসার জনসন স্পেস সেন্টারের অংশ। কিন্তু সেখানেই তৈরি হয় বড় সমস্যা। জীবাণুমুক্ত করার সময় বীজ রাখার পাত্রটি ভেঙে যায়। এতে সব বীজ একসঙ্গে মিশে যায় এবং কিছু সময়ের জন্য সেগুলো বিশেষ পরিবেশের বাইরে চলে যায়। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানী স্ট্যানলি ক্রুগম্যান আশঙ্কা করেছিলেন, হয়তো এসব বীজ আর অঙ্কুরিত হবে না। তবে শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কা সত্য হয়নি। বন বিভাগ বীজগুলো মিসিসিপি ও ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষণা কেন্দ্রে পাঠায়। পরীক্ষায় দেখা যায়, মহাকাশ ঘুরে আসা বীজগুলো পৃথিবীতে থাকা একই ধরনের বীজের মতোই অঙ্কুরিত হয়েছে। এসব বীজ থেকে তৈরি হয় ৪০০টির বেশি চারা। গবেষকরা পরে দেখতে পান, চাঁদ ঘুরে আসার কারণে গাছগুলোর মধ্যে আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়নি।
৪০ বছরের বেশি সময় পরও মুন ট্রি ও পৃথিবীতে থাকা একই ধরনের গাছের মধ্যে চোখে পড়ার মতো কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি। তবে গাছগুলোর বিশেষত্ব ছিল তাদের বেড়ে ওঠায় নয়, বরং তাদের যাত্রার ইতিহাসে। ১৯৭৫ ও ১৯৭৬ সালে এসব চারা গাছ রোপণের জন্য প্রস্তুত হয়। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বাধীনতার ২০০ বছর উদ্যাপন করছিল। এ উপলক্ষে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের মাধ্যমে এসব গাছ বিতরণ করা হয়। গাছগুলোকে অ্যাপোলো কর্মসূচির জীবন্ত স্মারক হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় লাগানো হয়। নাসার তালিকায় মুন ট্রি হিসেবে চিহ্নিত গাছের অবস্থানের মধ্যে রয়েছে নাসার বিভিন্ন কেন্দ্র, বিশ্ববিদ্যালয়, পার্ক ও সরকারি স্থাপনা। এর মধ্যে রয়েছে মেরিল্যান্ডের গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে লাগানো একটি সিকামোর গাছ এবং ফিলাডেলফিয়ার ওয়াশিংটন স্কয়ার পার্কে লাগানো একটি গাছ। তবে সব গাছের তথ্য সংরক্ষণ করা হয়নি। অনেক গাছ সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে, আবার কিছু গাছ এখনো নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। সমস্যা হলো, মুন ট্রি দেখতে সাধারণ গাছের মতোই। পাশে কোনো ফলক না থাকলে বোঝার উপায় নেই যে সেটি একসময় চাঁদের চারদিকে ঘুরে এসেছে।
১৯৯৬ সালে ইন্ডিয়ানার এক শিক্ষিকা জোয়ান গোবল তার শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি মুন ট্রির ফলক দেখতে পান। এরপর তিনি নাসার কর্মকর্তা ডেভিড আর. উইলিয়ামসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। শুরুতে উইলিয়ামসও এই প্রকল্পের বিষয়ে জানতেন না। পরে তিনি নাসা, বন বিভাগ ও বিভিন্ন নথি ঘেঁটে মুন ট্রির হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস আবার সামনে নিয়ে আসেন। এর ফলে মুন ট্রি আবারও মানুষের আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে। মুন ট্রির সবচেয়ে বড় গুরুত্ব ছিল পাশে থাকা ছোট ফলকগুলোতে। কারণ গাছ নিজে তার ইতিহাস জানান দিতে পারে না। অন্য মহাকাশ নিদর্শনের মতো মুন ট্রিকে জাদুঘরে রেখে সংরক্ষণ করা যায় না। এসব গাছকে প্রকৃতির মধ্যেই বেড়ে উঠতে হয়েছে। তাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে ঝড়, রোগ, নির্মাণকাজ ও অবহেলার মতো নানা চ্যালেঞ্জ। তাই মুন ট্রির মূল্য শুধু বিজ্ঞানে নয়, মানুষের স্মৃতিতেও।
অ্যাপোলো অভিযানের কয়েক দশক পর আবারও একই ধরনের উদ্যোগ নেয় নাসা। ২০২২ সালে 'আর্টেমিস-১' অভিযানে গাছের বীজ চাঁদের চারদিকে পাঠানো হয়। নাসা ও যুক্তরাষ্ট্রের বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই অভিযানে প্রায় দুই হাজার বীজ মহাকাশ ভ্রমণ করে। অ্যাপোলোর মুন ট্রি যেখানে পরে ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে, আর্টেমিসের গাছগুলো শুরু থেকেই শিক্ষা, সংরক্ষণ ও জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে পুরোনো মুন ট্রিগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়- একটি সাধারণ দেখতে গাছও অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে, যদি তার সঙ্গে একটি বড় গল্প জড়িয়ে থাকে।






