বিদেশি শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির অংশগ্রহণকারী এবং বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন আনছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এসব ভিসার মেয়াদ কমিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তন এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান নিয়েও নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করছে দেশটি।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ (ডিএইচএস) এ-সংক্রান্ত একটি চূড়ান্ত নিয়ম প্রকাশ করেছে। ফেডারেল নিবন্ধনে প্রকাশের ৬০ দিন পর এটি কার্যকর হবে। তবে তার আগে কংগ্রেসের পর্যালোচনার সুযোগ থাকবে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের এফ (এফ-১) ভিসা, সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির জে ভিসা এবং বিদেশি সাংবাদিকদের আই ভিসা সাধারণত সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি বা চাকরির পুরো সময় পর্যন্ত বৈধ থাকে। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে এই ব্যবস্থা বদলে যাবে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির অংশগ্রহণকারীদের ভিসার সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে চার বছর।
অন্যদিকে বিদেশি সাংবাদিকদের আই ভিসার মেয়াদ সর্বোচ্চ ২৪০ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে চীনের নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই ভিসার মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ ৯০ দিন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অভিবাসন নীতিতে কঠোর অবস্থান নেন। অবৈধ অভিবাসনের পাশাপাশি বৈধ অভিবাসনের ক্ষেত্রেও নজরদারি বাড়ানো হয়। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভিসা ও গ্রিন কার্ড বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েক লাখ অভিবাসীর বৈধ অবস্থানও বাতিল করেছে প্রশাসন। সর্বশেষ এই সিদ্ধান্তের ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির অংশগ্রহণকারী এবং বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ও অবস্থান আরো কঠিন হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ভিসাধারীরা চাইলে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগে ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন করতে পারবেন বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ।
নতুন নিয়মে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যোগ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা আর তাদের শিক্ষার লক্ষ্য বা কোর্স পরিবর্তন করতে পারবেন না। অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ভর্তি হওয়া যাবে না। এ ছাড়া পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর বর্তমানে শিক্ষার্থীরা যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার জন্য ৬০ দিন সময় পান। নতুন নিয়মে সেই সময় কমিয়ে ৩০ দিন করা হচ্ছে। অর্থাৎ পড়াশোনা শেষ হওয়ার এক মাসের মধ্যে হয় যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হবে, নয়তো বৈধভাবে থাকার জন্য অন্য কোনো অনুমতি বা ভিসার ব্যবস্থা করতে হবে। নতুন এই নিয়মের সমালোচনা করেছেন অভিবাসন ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা ডাগ র্যান্ড বলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানানো এবং অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নতুন এই নিয়ম ঠিক উল্টো প্রভাব ফেলবে। অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাটো ইনস্টিটিউটের অভিবাসন গবেষণা বিভাগের পরিচালক ডেভিড জে. বিয়ার বলেন, পড়াশোনার বিষয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আনা হয়েছে, তার কোনো স্পষ্ট আইনি ভিত্তি নেই। তিনি বলেন, অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর চাকরিদাতার মাধ্যমে নতুন ভিসার ব্যবস্থা করার জন্য তাদের হাতে মাত্র ৩০ দিন থাকবে। এই সময়ের মধ্যে তা সম্ভব না হলে তারা অবৈধ অভিবাসীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে চীন। শুক্রবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নতুন ভিসা নীতিকে 'বৈষম্যমূলক' বলে আখ্যা দেয়। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনকে চীনা সাংবাদিকদের জন্য নতুন নিয়ম অবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। বেইজিংয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, এই সিদ্ধান্ত ২০২১ সালে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গণমাধ্যমবিষয়ক তিন দফা সমঝোতা লঙ্ঘন করেছে। পাশাপাশি এটি যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত চীনা সংবাদমাধ্যমের স্বাভাবিক কাজকেও বাধাগ্রস্ত করবে। তিনি আরো বলেন, প্রয়োজন হলে চীনও একই ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে।
স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির অংশগ্রহণকারী এবং বিদেশি সাংবাদিকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করা আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে। বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শিক্ষার্থী ভিসায় ১৮ লাখের বেশি মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছেন। যা আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশের বেশি। এ ছাড়া ২০২৪ অর্থবছরে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির ভিসা পেয়েছেন। একই সময়ে ৩৭ হাজার ৩০০ জন বিদেশি সাংবাদিককে আই ভিসা দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৪ অর্থবছর শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের ১ অক্টোবর।
স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ আরো জানিয়েছে, তাদের কাছে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে যেখানে শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির ভিসাধারীরা নির্ধারিত সময়ের অনেক বেশি, এমনকি কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেছেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে চাইলে ভিসাধারীদের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের কাছে মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করতে হবে। অন্যথায় তাদের যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে নিজ দেশে বা অন্য কোনো দেশে গিয়ে নতুন করে ভিসা নিয়ে আবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে হবে।






