গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলের একাধিক হামলায় অন্তত ১৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো অনেক মানুষ। নিহতদের মধ্যে আটজন একটি জানাজা শেষে দাফনের উদ্দেশ্যে বের হওয়া শোকযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন। তাদের ওপর ড্রোন হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য ও উদ্ধার কর্তৃপক্ষ।
শুক্রবার মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের আল-বালাতা বাজার এলাকায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। গাজার সিভিল ডিফেন্স সংস্থা এবং আল-আওদা হাসপাতাল জানিয়েছে, হামলায় আটজন নিহত এবং অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একই এলাকায় এর আগে আরেকটি হামলায় নিহত এক ফিলিস্তিনির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে দাফনের জন্য শোকযাত্রা বের হওয়ার অপেক্ষায় আহমদ ইয়াসিন মসজিদের বাইরে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। ঠিক সেই সময় একটি ইসরায়েলি ড্রোন সেখানে হামলা চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই কয়েকজন নিহত হন।
গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক হানি মাহমুদ বলেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে প্রতিদিনই হামলা চলছে। তার ভাষায়, মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় শোকযাত্রায় অংশ নেওয়া মানুষের ওপর ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এই হামলার কথা স্বীকার করেছে। তবে সেনাবাহিনীর দাবি, তারা মধ্য গাজায় একটি 'সন্ত্রাসী' দলের সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে তারা বলেছে, হামলায় সাধারণ মানুষ হতাহত হওয়ার অভিযোগ তাদের নজরে এসেছে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে হামাস অভিযোগ করেছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও ইসরায়েল ধারাবাহিকভাবে সেই চুক্তি লঙ্ঘন করছে। তাদের দাবি, নিরীহ মানুষকে হত্যা এবং আতঙ্ক সৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মধ্যস্থতাকারীরা সবকিছু দেখলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।
শুধু নুসেইরাত নয়, শুক্রবার গাজার আরো কয়েকটি এলাকায় হামলার খবর পাওয়া গেছে। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া শহরে আবু তাম্মাম স্কুলের কাছে একটি ইসরায়েলি ড্রোন থেকে বোমা ফেলা হয়। এতে ৫২ বছর বয়সী এক নারী নিহত হন। মধ্য গাজার আজ-জাওয়াইদা এলাকায় সাধারণ মানুষের একটি জড়ো হওয়া স্থানে আরেকটি হামলায় একজন নিহত এবং কয়েকজন আহত হন। নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের পশ্চিমে আল-সাওয়ারহা এলাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত একটি স্থাপনায় হামলায় আরো একজন নিহত হন। এ ছাড়া গাজা সিটির একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় একজন ফিলিস্তিনি নিহত হন। এতে শিশুদেরসহ আরো কয়েকজন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের দক্ষিণ-পশ্চিমে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে আহত এক নারী পরে মারা যান।
গত বছরের অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় নিয়মিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা, ড্রোন হামলা ও গোলাবর্ষণের ঘটনা ঘটছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (এসিএলইডি)' বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মে মাসের পর থেকে গাজায় ইসরায়েলের হামলার সংখ্যা আরো বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে গাজায় ৪০টির বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এক মাসে এটিই সর্বোচ্চ হামলার সংখ্যা। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে কি না এবং গাজায় সহিংসতা আদৌ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদক হানি মাহমুদ বলেন, এখন গাজার আকাশজুড়ে প্রায় সব সময়ই ড্রোন উড়তে দেখা যায়। তার ভাষায়, চারদিকে ড্রোনের যান্ত্রিক শব্দ শোনা যায়। একই সঙ্গে ইসরায়েল গাজায় টিকে থাকা অবকাঠামোগুলোও ধ্বংস করে চলেছে। এদিকে শুক্রবার ইসরায়েলি সংবাদপত্র 'হারেৎজ' জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ২৭৪ জন শিশু নিহত হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, এই সময়ে গড়ে প্রতিদিন একজন করে শিশু প্রাণ হারিয়েছে।





