• ই-পেপার

ইচ্ছাকৃতভাবে ২ কোটি মোবাইলে ভাইরাস ঢুকিয়েছে জিওনি: চীনা আদালত

ইউক্রেনের খাদ্য কারখানায় রুশ হামলা, তিনজনের প্রাণহানি

অনলাইন ডেস্ক
ইউক্রেনের খাদ্য কারখানায় রুশ হামলা, তিনজনের প্রাণহানি
ছবি : রয়টার্স

ইউক্রেনের পাভলোহরাদ শহরে একটি খাদ্য শিল্প কারখানায় রাশিয়ার হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। এতে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন আঞ্চলিক গভর্নর ওলেক্সান্ডার হানজা।

ওলেক্সান্ডার হানজা জানিয়েছেন,হামলার পরপরই শিল্প কারখানাটিতে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। খবর রয়টার্স

ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, হামলাটিতে গাইডেড এরিয়াল বোম ব্যবহার করা হয়েছে।

আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পাভলোহরাদ শহরটি ফ্রন্টলাইনের কাছাকাছি চলে আসায় বাসিন্দাদের সতর্ক হওয়া ও নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় অনেকটাই কমে গেছে। উদ্ধারকারী দল ও স্থানীয় প্রশাসন বর্তমানে ক্ষয়ক্ষতির সম্পূর্ণ পরিমাণ নিরূপণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়

অনলাইন ডেস্ক
সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়
ছবি : রয়টার্স

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলছেন, প্রশ্ন ফাঁস মহাপাপ, এর জন্য দায়ীদের সাজা পেতেই হবে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বলছেন, প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে তারা শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং শিক্ষার্থীরা জবাবদিহি পাবেন।

দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এখন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসছেন, সোনম ওয়াংচুক এবং পুলিশি হামলায় আহতদের দেখতে ছুটে যাচ্ছেন হাসপাতালে। বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রীর বাসার সামনে গিয়ে ধরনায় বসে যাচ্ছেন। রাজনীতিবিদদের তৎপরতা দেখে মনে হচ্ছে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পরশু ফাঁস হয়েছে, আর আন্দোলন গতকাল শুরু হয়েছে। অথচ ঘটনা প্রায় আড়াই মাসের পুরনো। 

প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে গত ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছিল। পরে নজিরবিহীন নিরাপত্তায় গত ২১ জুন নতুন করে নিট পরীক্ষা নেওয়াও হয়েছিল। কঠিন প্রস্তুতির পর পরীক্ষা বাতিল হওয়ার চাপ নিতে পারেননি অনেকে। দীর্ঘদিন প্রস্তুতিতে ফোকাস ধরে রাখা, প্রস্তুতির খরচ, পরিবারের ওপর চাপ সামাল দেওয়া অল্পবয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ  ছিল না। ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট পরীক্ষা বাতিলের পর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অন্তত ১২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছিল। 

নবগঠিত ককরোচ জনতা পার্টি গত ৭ জুন প্রথম মাঠে নেমেছিল। সেদিন প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তর-মন্তরে প্রতিবাদ সমাবেশ করে তারা। তার পর থেকে ‍ঘুরেফিরে তারা যন্তর-মন্তরেই ছিল।

গত ২৮ জুন লাদাখের অ্যাক্টিভিস্ট সোনম ওয়াংচুক তাদের দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে আমরণ অনশন শুরু করলে আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। গত ২০ জুলাই বসেছে ভারতের সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন। সপ্তাহখানেক আগেই সিজেপি ২০ জুলাই ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। 

সোনম ওয়াংচুকও অনশন থেকেই ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিতে যোগ দিতে সবার প্রতি আহবান জানিয়ে ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন। ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচি ঠেকাতে দুই দিন আগে ভোরবেলায় পুলিশ এসে সোনম ওয়াংচুককে জোর করে তুলে নিয়ে সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়। হাসপাতাল থেকেও ২০ জুলাইয়ের কর্মসূচি সফল করার আহবান জানান সোনম ওয়াংচুক।

পুলিশ অবশ্য আগের দিন জানিয়ে দেয়, সংসদ চলো কর্মসূচির অনুমতি নেই। অবশ্য ক্ষুব্ধ তারুণ্য এসব অনুমতির থোরাই কেয়ার করে। পুলিশের বাধা এবং কৌশলী ভুমিকা আরো ক্ষুব্ধ করে তাদের।

সোমবার ভোর থেকে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী যখন যন্তর-মন্তরে সমবেত হয়ে সংসদ অভিমুখে রওনা দেওয়ার জন্য তৈরি, তখন টনক নড়ে সরকারের। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা দুই ছাত্রনেতাকে ডেকে পাঠান। তাদের স্মারকলিপি গ্রহণ করে আলোচনার আশ্বাস দেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা যন্তর-মন্তর থেকে বেরিয়ে পড়েন সংসদ ভবনের উদ্দেশে। পুলিশ লাঠিচার্জ করে আর টিয়ার গ্যাস ছুড়ে তাদের নিবৃত করার চেষ্টা করে। তাতে হঠাৎ রণক্ষেত্রে পরিণত হয় দিল্লির প্রাণকেন্দ্র।

অথচ ২০ জুলাই সরকার যেসব পদক্ষেপ নিলো বা আশ্বাস দিল, এক-দুদিন আগে এর চেয়ে অনেক কম পদক্ষেপেও শিক্ষার্থীদের শান্ত করা সম্ভব ছিল। মূল দাবি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ হলেও শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি নিয়ে সংসদে আলোচনা, জবাবদিহি নিশ্চিত করলেও ঘরে ফিরে যেতে তৈরি ছিল।

এমনকি ১৯ জুলাই রাতেও সোনম ওয়াংচুক বলেছিলেন, সরকার যদি হাসপাতালে তার সঙ্গে দেখা করে সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার আশ্বাস দেন, তাহলেও তিনি অনশন ভাঙতে রাজি আছেন। কিন্তু ১২ বছর ধরে টানা ক্ষমতায় থেকে মহাপরাক্রমশালী হয়ে ওঠা মোদি সরকারের ঘুম তখনও ভাঙেনি। 

২০ জুলাই যখন পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হলো, তখন টনক নড়ল সবার। অনলাইনে অফলাইনে এখন নিন্দা আর প্রতিবাদের ঝড়। এখন সেলিব্রেটিরা সোচ্চার, সুশীল সমাজ উচ্চকণ্ঠ, রাজনীতিবিদদের ঘুম হারাম। অথচ সিজেপি কিন্তু হুট করে সংসদের পথে হাঁটা শুরু করেনি।

৭ জুন থেকেই ছেলেগুলো ঘুরেফিরে যন্তর-মন্তরেই দিন-রাত একাকার করে শান্তিপূর্ণভাবে বসে ছিল। এতোদিন কারো মধ্যে কোনো হেলদোল ছিল না। অরবিন্দ কেজরিওয়ালসহ হাতে গোনা কয়েকজন রাজনীতিবিদ শুধু যন্তর-মন্তরে গিয়েছিলেন। ২০ জুলাই কর্মসূচির দিনে গিয়েছিলেন অভিনেত্রী শাবানা আজমী আর অভিনেতা প্রকাশ রাজ। 

পুলিশি হামলার পর প্রতিবাদের ঝড় দেখে বোঝা যাচ্ছে না, মূল সমস্যা কোনটা—প্রশ্নপত্র ফাঁস করে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জীবন তছনছ করে দেওয়া নাকি পিটিয়ে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া? টিয়ারগ্যাসের ধোঁয়ায় অন্ধকার চারপাশ, পুলিশ নির্বিচারে পেটাচ্ছে শিক্ষার্থীদের, এমন ছবিতেই যেন জেগে উঠেছে সবার বিবেক।

এখন যেমন প্রধানমন্ত্রী বলছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস মহাপাপ, এটা যদি তিনি ৩ মের পরে বুঝতেন ও ব্যবস্থা নিতেন তাহলে তো সিজেপি’কে মাঠেই নামতে হতো না। যদি ৭ জুনের পরও বুঝতেন, তাহলেও জল এতদূর গড়াতো না।

সরকার, বিরোধী দল, সুশীল সমাজ, সেলিব্রেটিরা যদি অন্যায়ের মূল কারণটা বুঝতেন তাহলে হয়তো আজ রাজপথে মার খেতে হতো না নিরীহ শিক্ষার্থীদের। সভা-সমাবেশ করা সবার গণতান্ত্রিক অধিকার। দাবির ন্যায্যতা বুঝে সবাই সময়মতো এক হয়ে প্রতিবাদ করলে সমস্যা অনেক আগেই মিটে যেতে পারত। একেই বলে সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়।

এখন যেমন সবার প্রাণান্ত চেষ্টা, হয়তো প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে সংসদে তুমুল আলোচনা হবে, সরকারও হয়তো বুঝ দিয়ে শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরাতে পারবেন। কিন্তু পরীক্ষা বাতিলের চাপ সামলাতে না পেরে যে ১২ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করল, তাদের পরিবারগুলো কিসে সান্ত্বনা পাবে?

দলে দলে আল-আকসায় প্রবেশ করছে ইহুদি বসতিরা

অনলাইন ডেস্ক
দলে দলে আল-আকসায় প্রবেশ করছে ইহুদি বসতিরা
ছবি : রয়টার্স

মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান, ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে অবস্থিত ঐতিহাসিক আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে দলে দলে প্রবেশ করেছে কয়েক হাজার ইহুদি বসতি স্থাপনকারী। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জর্ডান ও ফিলিস্তিনের প্রধান ইসলামপন্থী রাজনৈতিক ও সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগঠন হামাস।

স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় ইহুদি ধর্মীয় উৎসব তিশা ব’আভ উপলক্ষে এই অনুপ্রবেশে তাদের নিরাপত্তায় মোতায়েন রয়েছে বিপুল সংখ্যক ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী। আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, প্রবেশকারীর সংখ্যা ২ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে। এ সময় ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও আল-আকসা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন।

ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এ সময় ইসরায়েলি বাহিনী আল-আকসা মসজিদের প্রবেশপথে কঠোর নিরাপত্তা ও বিধিনিষেধ আরোপ করে। বহু ফিলিস্তিনি মুসল্লিকে মসজিদে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়, শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং কয়েকজন মুসল্লির ওপর হামলাও চালানো হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এদিকে জেরুজালেম গভর্নরেটের ফিলিস্তিনি প্রশাসন বেন-গভিরের আল-আকসা সফরকে ‘বিপজ্জনক উসকানি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তাদের দাবি, এই পদক্ষেপ ইসরায়েলি সরকারের আনুষ্ঠানিক সমর্থনকে প্রতিফলিত করে, যা আগে কেবল কট্টর ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখা হতো।

জর্দানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাষ্ট্রদূত ফুয়াদ মাজালি এক বিবৃতিতে বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ আল-আকসা মসজিদের ঐতিহাসিক ও আইনগত স্থিতাবস্থার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জেরুজালেমে ইসলামী ও খ্রিস্টান ধর্মীয় পবিত্র স্থানগুলোর বিরুদ্ধে চলমান লঙ্ঘন বন্ধে ইসরায়েলের ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগ করতে হবে।

অন্যদিকে এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে ‘প্রকাশ্য আগ্রাসন’ হিসেবে উল্লেখ করে সতর্ক করেছে হামাস। সেখানে বলা হয়েছে, এর পরিণতি ইসরায়েলি দখলদার কর্তৃপক্ষ ও বসতি স্থাপনকারীদেরই ভোগ করতে হবে।

বিবৃতিতে হামাস আরো বলছে, ‘আমাদের জনগণ এবং প্রতিরোধ আন্দোলন আমাদের পবিত্র স্থানগুলোর অবমাননার বিরুদ্ধে কখনো নীরব থাকবে না।’

ধ্বংসস্তূপে এখনো নিখোঁজদের দেহাবশেষ খুঁজছেন স্বজনরা

অনলাইন ডেস্ক
ধ্বংসস্তূপে এখনো নিখোঁজদের দেহাবশেষ খুঁজছেন স্বজনরা
ছবি : রয়টার্স।

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের ছোট শহর মিনাবে নিজের পুরনো স্কুলের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিয়ে সাবধানে হাঁটছিলেন ৩৩ বছর বয়সী শিক্ষিকা আমাইনেহ নাদেমি। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ওপরের তলা থেকে ভাঙা কংক্রিটের বড় বড় অংশ ঝুলে থাকায় পুরো এলাকাই ঝুঁকিপূর্ণ।

তবু তিনি সহজেই চিনে নিতে পারছিলেন স্কুলের প্রতিটি অংশ। কোথায় ছিল মেয়েদের শ্রেণিকক্ষ, কোথায় ছেলেদের ক্লাসরুম, প্রধান শিক্ষকের কক্ষ আর প্রার্থনার স্থান, সবই তার মনে আছে। মিনাবের শাহারেহ তাইয়েবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যে শ্রেণিকক্ষে তিনি প্রথম শ্রেণির ছাত্রীদের পড়াতেন, সেটি এখন পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। শুধু ভাঙা ইট-পাথর আর ধ্বংসাবশেষই সেখানে পড়ে আছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে একটি স্কুলে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে একটি সাধারণ শনিবারের সকাল মুহূর্তেই ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়। এটি ছিল ওই যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের ওপর সবচেয়ে প্রাণঘাতী একক হামলাগুলোর একটি।

মিনাব প্রসিকিউটরের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় ১৫৬ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ১২০ জন শিশু, একজন গর্ভবতী নারী এবং তার অনাগত সন্তানও ছিলেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন প্রমাণে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে হামলাটি মার্কিন বাহিনী চালিয়ে থাকতে পারে। স্কুলটির পাশে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর একটি স্থাপনা ছিল, যেখানে স্যাটেলাইট ছবিতে একাধিকবার হামলার চিহ্ন দেখা গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ হামলার দায় স্বীকার করেনি। যদিও মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সামরিক তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা হলো, মার্কিন বাহিনী সম্ভবত অনিচ্ছাকৃতভাবে স্কুলটিতে হামলা চালিয়েছিল।

স্কুলে হামলার পরও সেখানে শোকের আবহ কাটেনি। শিক্ষকরা জানান, তারা প্রতিদিন ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহতদের স্মরণে প্রার্থনা করেন। উদ্ধারকারীরা এখনও ধ্বংসস্তূপে নিখোঁজদের দেহাবশেষ খুঁজে চলেছেন। হামলায় ভবনের ওপরের তলার বেশিরভাগ অংশ নিচের তলার ওপর ধসে পড়েছে।

শিক্ষিকা আমাইনেহ নাদেমি বলেন, ‘এটিকে আর স্কুল বলা যায় না। এটি এখন শুধু মৃত্যু, শোক আর রক্তের স্মৃতি বহন করা কয়েকটি দেয়াল।’

ইরানি কর্তৃপক্ষ চায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এই স্কুলটি পরিদর্শন করুক। তাদের দাবি, ঘটনাটি দেখায় যে ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা স্থাপনাকে লক্ষ্য করে চালানো বলে যে অভিযান যুক্তরাষ্ট্র তুলে ধরেছিল, তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ বেসামরিক মানুষকে।

শিক্ষিকা আমাইনেহ নাদেমি জানান, সেদিনও অন্য দিনের মতোই ক্লাস শুরু হয়েছিল। রমজান মাস হওয়ায় শিশুরা প্রথমে প্রার্থনা কক্ষে কোরআন তেলাওয়াত করছিল। এরপর তাদের ফারসি বর্ণমালার নতুন একটি অক্ষর শেখানোর কথা ছিল। কিন্তু ঠিক তখনই ইরানের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধের প্রথম হামলার খবর আসে। এরপর প্রধান শিক্ষক স্কুল বন্ধের ঘোষণা দেন এবং শিক্ষকরা অভিভাবকদের ফোন করে সন্তানদের নিয়ে যেতে বলেন।

আমাইনেহ জানান, প্রথম বিস্ফোরণের শব্দ শোনার সময় তার প্রথম শ্রেণির ১৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র পাঁচজন শ্রেণিকক্ষে ছিল। তিনি করিডোরে ছিলেন এবং শিশুদের নিতে দ্রুত শ্রেণিকক্ষে ফিরে যান। তিনি বলেন, ‘আমি বের হওয়ার ঠিক মুহূর্তে একটি ক্ষেপণাস্ত্র স্কুলে আঘাত হানে। কিছু একটা আমার ও শিশুদের মাথায় আঘাত করে। আমরা সবাই ছিটকে পড়ি।’

তার ভাষ্য, এরপর পুরো শ্রেণিকক্ষ ঘন কালো ধোঁয়ায় ভরে যায়। তিনি বলেন, ‘আমি কোলে থাকা শিশুদেরও দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমরা শ্বাস নিতে পারছিলাম না।’

তিনি আরো বলেন, এরপর আরেকটি বিস্ফোরণের শব্দ, মানুষের চিৎকার, শিশুদের কান্না এবং ভবন ধসে পড়ার বিকট শব্দ একসঙ্গে শুনতে পান। আমাইনেহ বলেন, ‘মুহূর্তের মধ্যেই সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়। আমার শরীর ও ছাত্রছাত্রীদের শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল।’

‘তারা অস্ত্র নয়, বই-খাতা নিয়ে স্কুলে গিয়েছিল’

মিনাবের স্কুলে হামলার ঘটনাকে ইরান সরকার বারবার আন্তর্জাতিক মঞ্চ, সরকারি বক্তব্য ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে তুলে ধরছে। কর্মকর্তাদের মতে, এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের ব্যাখ্যার বিপরীতে একটি শক্তিশালী উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

এই যুদ্ধ ইরানের ভেতরেও মতভেদ তৈরি করেছে। কেউ কেউ আশা করেছিলেন, বিদেশি সামরিক চাপ সরকারকে দুর্বল করবে। তবে সরকারের সমালোচকরাও বিবিসিকে বলেছেন, মিনাবের স্কুলে হামলা তাদের জন্য বড় ধাক্কা ছিল। তাদের মতে, এ ঘটনা দেখিয়েছে যে যুদ্ধে বেসামরিক মানুষও ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এতে সরকার বিদেশি হামলার বিরুদ্ধে জনগণের রক্ষক হিসেবে নিজেদের তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে।

এদিকে শিক্ষিকা আমাইনেহ নাদেমি প্রতিনিয়ত তার নিহত শিক্ষার্থীদের কবর জিয়ারত করেন। কবরস্থানের পাশে থাকা একটি স্মৃতিফলকে সেই শিশু, শিক্ষক, কর্মচারী ও অভিভাবকদের ছবি রয়েছে, যারা সেদিন সকালে স্কুলে গিয়েছিলেন কিন্তু আর বাড়ি ফেরেননি।

নয় বছর বয়সী সেতায়েশের মা এখনও প্রতিদিন মেয়ের কবরের পাশে বসে থাকেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এই শিশুদের অপরাধ কী ছিল? তাদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। তাদের কাছে ছিল শুধু একটি পেন্সিল, একটি বই, একটি খাতা আর একটি স্কুলব্যাগ। তারা যুদ্ধ করতে নয়, শিখতে স্কুলে গিয়েছিল।’

ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে দেখলেন স্বজনদের আর্তনাদ

আমাইনেহ নাদেমি জানান, কিছুক্ষণ পর ধোঁয়া একটু সরে গেলে তিনি আহত শিশুদের নিচে অপেক্ষা করা লোকজনের কাছে পৌঁছে দেন। এরপর আগুন ও ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে স্কুলের গেটের দিকে যান। সেখানে তিনি অসংখ্য উদ্বিগ্ন অভিভাবককে জড়ো হতে দেখেন। অনেকেই এতো তাড়াহুড়ো করে ছুটে এসেছিলেন যে, তাদের পায়ে জুতাও ছিল না।

তিনি বলেন, তখনও তিনি বুঝতে পারেননি কী ঘটেছে। তার ধারণা ছিল, সবাই ইতোমধ্যে ভবন থেকে বেরিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম না, তারা সবাই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।’

আমাইনেহ ছয় বছর ধরে ওই স্কুলে প্রথম শ্রেণির শিক্ষকতা করেছেন। তিনি জানান, হামলায় তার প্রথম শ্রেণির ছাত্রী আদ্রিনা ও তার মা সিঁড়িতে নিহত হন। এ ছাড়া দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ফাতেমাসহ আরো অনেক শিক্ষার্থী প্রাণ হারায়। নিহতদের মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও ছিল, যাদের তিনি একসময় বর্ণমালা শিখিয়েছিলেন।

হামলায় স্কুলের প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক এবং কোরআনের শিক্ষকও নিহত হন বলে জানান আমাইনেহ।

‘আমার ছেলেকে খুঁজে দিন’—স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ

হামলার কয়েক মিনিটের মধ্যেই উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কর্মী রেজা বেশারাতি জানান, তিনি প্রথম দিকের উদ্ধারকারীদের একজন ছিলেন। তখন স্কুলের আশপাশের রাস্তাগুলো সন্তানদের খুঁজতে ছুটে আসা স্বজনদের ভিড়ে আটকে গিয়েছিল।

মিনাব ছোট শহর হওয়ায় ধ্বংসস্তূপের দিকে যেতে গিয়ে তিনি অনেক পরিচিত মানুষকে দেখেন, যাদের মধ্যে তার নিজের আত্মীয়ও ছিলেন। রেজা বলেন, ‘আমরা জীবিত কাউকে পাওয়ার আশায় খোঁজ শুরু করি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কাউকে জীবিত পাইনি।’

তিনি জানান, অনেক মরদেহ এতোটাই ক্ষতবিক্ষত ছিল যে সেগুলো শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। কোথাও শুধু একটি হাত, কোথাও শুধু একটি পা পাওয়া গেছে। কোনো দেহই সম্পূর্ণ ছিল না। অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের জুতা বা পোশাক দেখে পরিচয় নিশ্চিত করেন।

রেজা বলেন, তার এক আত্মীয় বারবার কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘আমার সন্তানকে খুঁজে দিন, আমার ছেলেকে খুঁজে দিন।’ কিন্তু তিনি জানতেন, শিশুটি আর বেঁচে নেই। তিনি বলেন, ‘আমি তাকে সত্যিটা বলতে পারিনি। আমরা সবাই শুধু কাঁদছিলাম।’

রেজা জানান, ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজের সময় দেখা ভয়াবহ দৃশ্য এখনো তাকে তাড়া করে বেড়ায়। তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন আমি ঘুমাতে পারিনি। চোখ বন্ধ করলেই সেই দৃশ্যগুলো মনে পড়ে।’

স্কুলে হামলার পর শুরুতে কোনো প্রমাণ ছাড়াই ইরানকে দায়ী করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে এবং মার্কিন বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে কখনো বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালায় না। পরে তিনি ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) বাইরের একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের ঘোষণা দেন। তবে এখনো সেই তদন্তের ফল প্রকাশ করা হয়নি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে ধারণা করা হচ্ছে, পুরোনো গোয়েন্দা তথ্যের কারণে স্কুলটিকে ভুল করে একটি সামরিক স্থাপনার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্কুলের পাশের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর একটি কমপ্লেক্স নির্ভুলভাবে পরিচালিত টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্যাটেলাইট ছবি ও যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা যায়, স্কুল এবং পাশের কয়েকটি ভবনেও হামলা হয়েছে। মার্কিন সামরিক মানচিত্রেও ওই সময় মিনাব এলাকায় মার্কিন অভিযান চালানোর তথ্য রয়েছে।

ঐতিহাসিক স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, স্কুলের জায়গাটি একসময় আইআরজিসি কমপ্লেক্সের অংশ ছিল। তবে ২০১৬ সালের পর এটি আলাদা প্রাচীর, নিজস্ব প্রবেশপথ ও প্রাঙ্গণসহ একটি স্বতন্ত্র স্কুলে পরিণত হয়। এ ছাড়া স্কুলটির ঠিকানাসহ তথ্য অনলাইনেও প্রকাশ্যে ছিল। হামলার কয়েক মাস আগেও স্কুলটির ওয়েবসাইটে এসব তথ্য দেখা গেছে।

মে মাসে সেন্টকমের প্রধান কংগ্রেসে বলেন, তদন্তটি জটিল, কারণ স্কুলটি আইআরজিসির একটি সক্রিয় ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির মধ্যে ছিল বলে তাদের দাবি। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকাটি আগে আইআরজিসির একটি নৌ ঘাঁটি ছিল, কিন্তু কয়েক বছর আগে সেখানে সামরিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ওই কমপ্লেক্সে একটি ক্লিনিক ও গাড়ি ধোয়ার কেন্দ্রসহ বেসামরিক স্থাপনা রয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে বিবিসি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, তদন্ত এখনও চলছে এবং এ মুহূর্তে নতুন কোনো তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

মোজা দেখে শনাক্ত হয় ৯ বছরের সেতায়েশ

ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্কুলের কাছেই একটি কবরস্থানে নিহত অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে দাফন করা হয়েছে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় স্বজনরা সেখানে জড়ো হন। মায়েরা সন্তানদের ছবির ধুলো মুছে দেন, আর বাবা-মায়েরা গভীর রাত পর্যন্ত কবরের পাশে বসে প্রার্থনা করেন। কবরগুলোর পাশে ছোট ভাইবোনদের খেলতেও দেখা যায়।

নয় বছর বয়সী মেয়ে সেতায়েশকে হারানো মা মাসুমেহ মেহরান শেখাবাদী প্রতিদিন তার মেয়ের কবর জিয়ারত করতে আসেন। হামলার দিন তিনিও অন্য অভিভাবকদের মতো স্কুলে ছুটে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘স্কুল বলে কিছু ছিল না। চারদিকে শুধু ধোঁয়া, শিশুদের চুল, কোথাও একটি হাত, কোথাও একটি পা পড়ে ছিল। সবকিছু ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি শুধু সেতায়েশকে নয়, সব শিশুদেরই ডাকছিলাম—বাচ্চারা, তোমরা কোথায়?’ মাসুমেহ জানান, পরদিন ভোরের আগে পরিবার নিশ্চিত হতে পারেনি যে সেতায়েশ মারা গেছে। উদ্ধারকর্মীরা বারবার জানতে চেয়েছিলেন, সে কী রঙের মোজা পরেছিল। তিনি বলেন, তার মেয়ে ক্রিম রঙের মোজা পরেছিল। শেষ পর্যন্ত সেই মোজা দেখেই সেতায়েশের মরদেহ শনাক্ত করা হয়।

মায়ের ভাষায়, সেতায়েশ বড় হয়ে একজন শিক্ষিকা হতে চেয়েছিল। সে বাড়িতে পুতুলগুলোকে সারি করে বসিয়ে বলত, ‘আমি তোমাদের শিক্ষিকা। আমি এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ি, তাই আমিও শিক্ষক।’ মাসুমেহ বলেন, সন্তান হারানোর শোকের সঙ্গে তাদের ক্ষোভও মিশে আছে। তার ভাষায়, ‘ট্রাম্প ধ্বংস হোক, যেন এই শিশুদের রক্ত বৃথা না যায়।’

ইচ্ছাকৃতভাবে ২ কোটি মোবাইলে ভাইরাস ঢুকিয়েছে জিওনি: চীনা আদালত | কালের কণ্ঠ