• ই-পেপার

ইয়ামালকে ‘ঘরে আটকে’ রাখতে চান আর্জেন্টিনার কোচ

আর্জেন্টিনাকে নিয়ে সতর্ক করলেন বিশ্বকাপজয়ী কোচ

ক্রীড়া ডেস্ক
আর্জেন্টিনাকে নিয়ে সতর্ক করলেন বিশ্বকাপজয়ী কোচ
স্পেনের ২০১০ বিশ্বকাপজয়ী কোচ ভিসেন্তে দেল বস্ক। ছবি : রয়টার্স

বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে দলকে সতর্ক করে স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী কোচ ভিসেন্তে দেল বস্ক বলেছেন, তারা যেন আর্জেন্টিনাকে কোনোভাবেই হালকাভাবে না নেয়। তাদের (আর্জেন্টিনা) খেলোয়াড়দের আগ্রাসী মনোভাবও মাথা ব্যথার কারণ হিসেবে বিবেচনা করেন তিনি।

শনিবার (১৮ জুলাই) স্প্যানিশ সংবাদপত্র ‘এল পাইস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। খবর রয়টার্স

 আর্জেন্টিনার লড়াকু মনোভাব এবং অভিজ্ঞতার ভূয়সী প্রশংসা করে ৭৫ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি কোচ বলেন, ‘আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে খেলা যেকোনো দলের জন্যই অত্যন্ত কঠিন। তারা মাঠের পরিস্থিতি অনুযায়ী খুব ভালো করে জানে ঠিক কখন কী করতে হবে।’

সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার দুর্দান্ত ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‌‘এটি স্পেনের জন্য বড় শিক্ষণীয় উদাহরণ।’

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি ফাইনালটি স্পেনের অনুকূলেই থাকবে, কিন্তু আর্জেন্টাইনদের ব্যাপারে তাদের সতর্ক থাকতে হবে, কারণ তাদের মোকাবেলা করা বেশ কঠিন এবং তাদের অভিজ্ঞতাও অনেক বেশি।’

শক্তির বিচারে ফাইনালে স্পেন কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতার কারণে ম্যাচটি অত্যন্ত কঠিন হবে বলে যোগ করেন তিনি।

বর্তমান স্প্যানিশ দল যেভাবে পুরো টুর্নামেন্টে আধিপত্য বিস্তার করে খেলছে, তাতে তিনি দলের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছেন এবং ট্রফি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।

আগামী রবিবার নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার বিশ্বকাপ ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে।

ফাইনালে ১২ রেকর্ড গড়ার সুযোগ মেসির, ম্যাজিক দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব

ক্রীড়া ডেস্ক
ফাইনালে ১২ রেকর্ড গড়ার সুযোগ মেসির, ম্যাজিক দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব
ছবি : রয়টার্স

বিশ্বজয়ের স্বপ্ন গতবার কাতারেই পূরণ করে ফেলেছেন লিওনেল মেসি। চার বছর পর আরো একবার বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা। ১৯ জুলাই, রবিবার নিউ জার্সির মেগাফাইনালে যখন আর্জেন্টিনা ইউরোপসেরা স্পেনের মুখোমুখি হবে।

নিউজ আঠেরোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আর সেই ফাইনালে লড়াই হবে মহাতারকা মেসি ও ইয়ামালের। মেসিদের লক্ষ্য পরপর দুবার বিশ্বজয়। তবে শুধু বিশ্বজয় নয়, মেসির সামনে সুযোগ ১২ রেকর্ড গড়ার।

আগামী রবিবার রাতে নিউইয়র্ক নিউ-জার্সি স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই ৩৯ বছর বয়সী মেসি এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করবেন। ৩৯ বছর ২৫ দিন বয়সে ফাইনালে নামার মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠবেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বয়সের ‘আউটফিল্ড’ খেলোয়াড়। যদিও সামগ্রিকভাবে সবচেয়ে বেশি বয়সে ফাইনাল খেলার বিশ্বরেকর্ডটি এখনো ইতালির কিংবদন্তি গোলরক্ষক দিনো জফের (৪০ বছর ১৩৩ দিন) দখলে, তবে গোলকিপিং গ্লাভস ছাড়া মাঠের মূল পজিশনে খেলা ফুটবলারদের মধ্যে মেসিই হতে যাচ্ছেন প্রবীণতম খেলোয়াড়।

এই মেগা ফাইনালের একাদশে মেসির অন্তর্ভুক্তি তাঁকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম এক অভিজাত ও এক্সক্লুসিভ ক্লাবের সদস্য করে তুলবে। ফুটবল ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপের ফাইনালে (২০১৪, ২০২২ এবং ২০২৬) মাঠে নামার বিরল নজির গড়বেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। এর আগে একমাত্র ব্রাজিলের কিংবদন্তি ডিফেন্ডার কাফু ১৯৯৪, ১৯৯৮ এবং ২০০২ সালে টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে মাঠে নেমে খেলার এই অনন্য কীর্তি গড়েছিলেন। রবিবার কাফুর সেই ২৪ বছরের পুরোনো রেকর্ডে ভাগ বসাবেন মেসি।

তবে কাফুকে ছুঁয়ে ফেলার দিনেও মেসি এমন একটি চূড়ায় আরোহণ করবেন, যেখানে ইতিহাসের আর কোনো ফুটবলার পা রাখতে পারেননি। স্পেনের বিরুদ্ধে টসের জন্য মাঠে নামার মুহূর্তে মেসি হবেন ফুটবল ইতিহাসের প্রথম এবং একমাত্র অধিনায়ক, যিনি তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপ ফাইনালে নিজের দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার গৌরব অর্জন করবেন। এর আগে দিয়েগো মারাডোনা, কার্ল-হেইঞ্জ, দুঙ্গা এবং হুগো লরিসের মতো কিংবদন্তিরা দুটি করে ফাইনালে অধিনায়কত্ব করলেও, অধিনায়ক হিসেবে ৩টি ফাইনাল খেলার রেকর্ড থাকবে শুধু মেসির নামে।

ইতিহাসে ইতালি ও ব্রাজিলের বহু ফুটবলার একাধিকবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছেন। কিন্তু অধিনায়ক হিসেবে দুবার ট্রফি জেতার ভাগ্য হয়নি কারো। ড্যানিয়েল পাসারেলা, জুসেপ্পে মেয়াজ্জা কিংবা খোদ কাফু—তাঁরা প্রত্যেকেই অধিনায়ক হিসেবে মাত্র একবারই বিশ্বজয়ের ট্রফি স্পর্শ করেছিলেন। রবিবার যদি আর্জেন্টিনা স্পেনের বাধা টপকাতে পারে। তবে ফুটবল ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে অধিনায়ক হিসেবে দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপ ট্রফি জেতার রাজকীয় কীর্তি গড়বেন লিওনেল মেসি। ফুটবল বিধাতা যেন তাঁর বিদায়ি মঞ্চের জন্য এই অনন্য শ্রেষ্ঠত্বের আসনটি ফাঁকা রেখেছিলেন।

বিশ্বকাপে মেসি ইতিমধ্যেই আটটি গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার শীর্ষে রয়েছেন। রবিবারের ফাইনালে স্পেনের জাল যদি একবারের জন্যও তিনি কাঁপাতে পারেন, তবে সুইডেনের নিলস লিডহোমের (৩৫ বছর ২৬৪ দিন) ৬৮ বছরের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে তিনি হবেন ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ গোলদাতা। একই সঙ্গে এই একটি গোল মেসিকে নিয়ে যাবে আর্জেন্টিনার নিজস্ব ইতিহাসের চূড়ায়। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে গুইলারমো স্তাবিলের করা ৮ গোলের রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলা মেসি এই গোলের মাধ্যমে এক আসরে কোনো আর্জেন্টাইনের সর্বাধিক গোলের দীর্ঘদিনের রেকর্ডটি নিজের করে নেবেন।

যদি ফাইনালের বড় মঞ্চে মেসির চেনা জাদু আরো একটু খোলস ছেড়ে বের হয়। তিনি জোড়া গোল করতে পারেন, তবে ভেঙে যাবে আরো বেশ কিছু মহাদেশীয় ও বৈশ্বিক রেকর্ড। প্রথম অ-ইউরোপীয় এবং ফুটবল ইতিহাসের সামগ্রিকভাবে মাত্র চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের একটি একক সংস্করণে ১০ বা তার বেশি গোল করার অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করবেন তিনি। এর আগে কেবল ফ্রান্সের ফন্টেইন (১৩ গোল), হাঙ্গেরির স্যান্ডর কোকসিস (১১ গোল) এবং পশ্চিম জার্মানির গার্ড মুলার (১০ গোল) এই ডাবল ডিজিটের গোলের চূড়ায় পৌঁছাতে পেরেছিলেন।

ফাইনালে মেসির পা থেকে আসা যেকোনো গোল তাঁকে আরেকটি এলিট তালিকায় যুক্ত করবে। তিনি হবেন ইতিহাসের মাত্র ষষ্ঠ খেলোয়াড়, যিনি দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল করার বিরল নজির স্থাপন করবেন। ২০২২ সালের ফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে জোড়া গোল করেছিলেন মেসি। স্পেনের বিরুদ্ধে আরেকটি গোল পেলে তিনি ব্রাজিলের ভাভা ও পেলে, জার্মানির পল ব্রেইটনার এবং ফ্রান্সের জিনেদিন জিদান ও কিলিয়ান এমবাপের পাশে নিজের নাম খোদাই করবেন, যাঁরা দুটি ভিন্ন ফাইনালে গোল করেছিলেন।

আর্জেন্টিনা যদি রবিবারের এই মহারণে জয়ী হয় এবং মেসি যদি অন্তত একটি গোল পান, তবে তিনি আধুনিক ফুটবলের অন্যতম বড় এক রেকর্ড নিজের করে নেবেন। টুর্নামেন্টে নিজের গোলসংখ্যা ৯-এ নিয়ে গিয়ে তিনি হবেন বিশ্বকাপজয়ী কোনো দলের খেলোয়াড় হিসেবে এক আসরে সর্বাধিক গোল করার একক রেকর্ডের মালিক। ২০০২ সালে ব্রাজিলের রোনাল্ডো আটটি গোল করে দলকে চ্যাম্পিয়ন বানিয়েছিলেন। ২৪ বছর পর রোনাল্ডোর সেই রাজকীয় রেকর্ড ভাঙার সুযোগ মেসির।

ইতিমধ্যেই বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচগুলোতে দুটি গোল করা মেসির সামনে সুযোগ থাকছে কিলিয়ান এমবাপ্পের সর্বকালীন রেকর্ড ভাঙার। ফাইনালে যদি মেসি দুটি গোল করতে পারেন, তবে বিশ্বকাপের ফাইনালে মোট ৪টি গোল করা এমবাপ্পের রেকর্ড স্পর্শ করবেন। আর ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশা পূরণ করে মেসি যদি রবিবারের ফাইনালে একটি হ্যাটট্রিক উপহার দিতে পারেন, তবে এমবাপ্পেকে ছাড়িয়ে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের ফাইনালে ৫টি গোল করার অবিস্মরণীয় ইতিহাস গড়বেন তিনি। একইসঙ্গে ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের হার্স্ট ও ২০২২ সালে এমবাপ্পের পর তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিক করবেন মেসি।

মেসির ব্যক্তিগত এই ডজন রেকর্ডের ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনা দলগতভাবেও এক বিশাল ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে। ১৯৩৪-১৯৩৮ সালে ইতালি এবং ১৯৫৮-১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর ফুটবল ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় দেশ হিসেবে ফিফা বিশ্বকাপের শিরোপা সফলভাবে ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা। আর দল যদি এই ঐতিহাসিক মিশন সফল করতে পারে, তবে লিওনেল মেসি হবেন বিশ্বমঞ্চে ট্রফি ধরে রাখা ইতিহাসের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ খেলোয়াড়। ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের নিলতন স্যান্তোস ৩৭ বছর বয়সে এই রেকর্ড গড়েছিলেন, যাকে ৩৯ বছর বয়সে ছাড়িয়ে যাবেন মেসি।

সব মিলিয়ে, ১৯ জুলাইয়ের ফাইনাল ম্যাচটি কেবল একটি ট্রফি নির্ধারণের ৯০ মিনিটের খেলা নয়। এটি মূলত লিওনেল মেসির ফুটবল জীবনের এমন এক মহাকাব্যিক শেষ অধ্যায়, যা ফুটবল খেলাটির ইতিহাসকে চিরকালের জন্য বদলে দিতে পারে। ডজন খানেক রেকর্ডের এই হাতছানিকে সামনে রেখে মেসি যখন মাঠে নামবেন, তখন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের চোখ থাকবে তাঁর পায়ের জাদুতে। এক নক্ষত্রের বিদায়ের লগ্নে ফুটবল বিশ্ব হয়তো প্রত্যক্ষ করতে চলেছে ইতিহাসের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ ও অলৌকিক এক রেকর্ডের মেলা।

চাপ নয়, আনন্দ নিয়ে খেলি : মেসি

ক্রীড়া ডেস্ক
চাপ নয়, আনন্দ নিয়ে খেলি : মেসি

ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালের বাকি আর এক দিন। ফাইনালের আগে হয়ে গেল বিশ্বকাপ ট্রফির প্রদর্শনী। এই উপলক্ষে ফিফা ফ্যানাটিকস ফেস্ট নামে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে দুই ফাইনালিস্ট দলের তিনজন করে সদস্য উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটিতে আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি এবং এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেজের সঙ্গে নিয়ে ম্যাচের আগে কথা বলেন লিওনেল মেসি। 

স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার আগে আশ্বস্ত করে লিওনেল মেসি বলেন, ‘আমরা কখনোই চাপ নিয়ে ভাবি না। এটা আমাদের কাছে স্বাভাবিক বিষয়। আমরা খেলতে, উপভোগ করতে এবং জিততে চাই। তবে এটা দলগত খেলা, প্রতিপক্ষও খেলে, তাই সব সময় জেতা সম্ভব নয়।’ খবর টিওয়াইসি স্পোর্টস

ফিফার ফ্যানাটিকস ফেস্ট অনুষ্ঠানে এই মন্তব্য করেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। সঙ্গে ছিলেন কোচ লিওনেল স্কালোনি, গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ।

তিনি বলেন, ‘আমরা একটি প্রতিযোগিতাপূর্ণ দল, আমরা জিততে পছন্দ করি। কিন্তু এটা একটা দলীয় খেলা, প্রতিপক্ষও খেলে এবং আপনি সব সময় জিততে পারবেন, তা এমন নয়। ছোটবেলায় আমি শিখেছি জেতার চেয়ে হারতেই বেশি হয় এবং এটাই একজন ব্যক্তি ও খেলোয়াড় হিসেবে বিকশিত করেছে।’

এই দলের সদস্যরা পাড়া বা রাস্তায় আবেগ ও আনন্দের সঙ্গে ফুটবল খেলে বড় হয়েছে। তাই তারা কেবল নিজেদের উপভোগের কথা ভেবেই প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয় বলে জানান এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা।

আগামী রবিবার বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে মাঠে নামবে। আর স্পেন চাইবে ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে।

তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ যে কারণে ফেলনা নয়

সাহিদ রহমান অরিন
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ যে কারণে ফেলনা নয়
আজ রাতে ফিফা বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি হবে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড। ছবি : সংগৃহীত

ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল কিংবা ফ্রান্সের ডিফেন্ডার ইব্রাহিমা কোনাতে; দুজনের কথার সারসংক্ষেপ একটাই—তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে তাদের আগ্রহ নেই। কোনাতে তো এর গুরুত্বহীনতা বোঝাতে মজা করে ‘চকোলেট মেডেল ম্যাচ’ও বলেছেন। 

ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড অনেক বড় স্বপ্ন নিয়েই এবারের বিশ্বকাপ শুরু করেছিল। কিন্তু সেমিফাইনালে এসে সেই স্বপ্ন ফুড়ুৎ করে উড়ে গেল। স্পেনের কাছে ফ্রান্স হারল ২-০ গোলে। আর্জেন্টিনা লিখল ঘুরে দাঁড়ানোর আরেকটি গল্প। পিছিয়ে পড়েও ২-১ ব্যবধানে জিতে ইংল্যান্ডকে হতভম্ব করে দিল। ভাঙা মনের সেই ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডই মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে আজ রাতে তৃতীয় হওয়ার লড়াইয়ে নামছে।

তবে এই ম্যাচ খেলতে না চাওয়ার কারণ খুব সম্ভবত সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন নেদারল্যান্ডসের সাবেক কোচ লুই ফন গাল। ২০১৪ বিশ্বকাপে স্বাগতিক ব্রাজিলকে হারিয়ে তৃতীয় হওয়া ফন গালের যুক্তি ছিল এমন—বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের স্বপ্ন নিয়ে সেমিফাইনালের লড়াইয়ে নামে চারটি দল। সেমিফাইনালে হেরে স্বপ্ন ভেঙে চৌচির হয়ে যাওয়া দুটি দল মুখোমুখি হয় তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে। ভাঙা হৃদয় নিয়ে কি নিজেদের সেরা ফুটবল কেউ উপহার দিতে পারে?

কিন্তু তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচকে অর্থহীন মনে করা হলেও এর পেছনে অর্থযোগ মোটেও কম নয়। মায়ামিতে আজকের জয়ী দল পাবে প্রায় ৩৫৫ কোটি টাকা; হারলে পাবে প্রায় ৩৩০ কোটি।

শুধু কি তাই? সেমিফাইনালে হেরে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিতে হলেও এই ম্যাচ কি প্রিয় তারকাকে দেখার আরেকটি সুযোগ করে দেয় না? কখনো কখনো এটিই হয়ে যায় শেষ সুযোগ। 

kahn
বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ জার্মানির জার্সিতে অলিভার কানের শেষ ম্যাচ হয়ে আছে। ছবি: সংগৃহীত

কিলিয়ান এমবাপ্পে ও হ্যারি কেইনের জায়গায় লিওনেল মেসিকে কল্পনা করুন। আর্জেন্টিনা যদি সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে যেত, তাহলে হয়তো তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটাই হয়ে থাকত দেশের জার্সিতে মেসির ‘লাস্ট ড্যান্স’! যেমনটা জার্মানির অলিভার কান, পতুর্গালের লুইস ফিগোর মতো কিংবদন্তিদের ক্ষেত্রে হয়েছে। 

দিদিয়ের দেশমকে আপনি কিংবদন্তির কাতার থেকে সরিয়ে রাখবেন কীভাবে? অধিনায়ক-কোচ উভয় ভূমিকায় বিশ্বকাপ জিতেছেন। ফ্রান্সের কোচ হিসেবে দেশমের দীর্ঘ অধ্যায়টা শেষ হয়ে যাচ্ছে আজ রাতের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ দিয়েই।

তা ছাড়া এটি যেহেতু একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচ, তাই বিশ্বকাপের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সেরা হওয়ার ক্ষেত্রে এই ম্যাচের পারফরম্যান্সও বিবেচনায় নেওয়া হয়। 

এসব বাদ দিন। তৃতীয় হওয়ার লড়াইটা যদি না-ই থাকত, তাহলে বিশ্বকাপ ফুটবলের যে ইতিহাস আমাদের জানা, তা অনেকটাই বদলে যেত। 

হয়তো জাস্ট ফন্টেইনের নাম জানাই হতো না! ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ১৩ গোল করেছিলেন ফ্রান্সের প্রয়াত এই ফরোয়ার্ড। ৬৮ বছর পরও এক বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড হিসেবে টিকে আছে তা। হয়তো টিকে থাকবে আরো কয়েক যুগ। 

ধরুন, তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ বলে বিশ্বকাপে কিছু নেই, কখনো ছিল না। কী হতো, বলুন তো? ফন্টেইনের বদলে এক বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোল করার রেকর্ডে থাকত সান্দোর ককসিসের নাম। হাঙ্গেরিয়ান কিংবদন্তি ১৯৫৪ বিশ্বকাপে করেছিলেন ১১ গোল। ১৯৫৮ বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ৪ গোল করেই যে ককসিসকে পেছনে ফেলেন ফন্টেইন।

just
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন একাই ৪ গোল করেন। ছবি: ফিফা

৯৬ বছরের ইতিহাসে মাত্র দুটি বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী নামে কোনো ম্যাচ ছিল না—১৯৩০ ও ১৯৫০ আসরে। ১৯৫০ সালে তো নকআউট পর্ব বলে কোনো শব্দই ছিল না। 

বাকি বিশ্বকাপগুলোতে কম গল্প উপহার দেয়নি তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। ১৯৩৮ আসরে তৃতীয় হওয়ার লড়াইয়ে সুইডেনের বিপক্ষে জোড়া গোল করেই সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন ব্রাজিলের লিওনিদাস। 

শুধুই কি ফন্টেইন আর লিওনিদাস? ইতালির সালভাতর শিলাচি (১৯৯০), ক্রোয়েশিয়ার ডেভর সুকার (১৯৯৮), জার্মানির টমাস মুলার (২০১০) তো সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের গোলেই। এবারো এমবাপ্পে-কেইনদের সামনে থাকছে সেই সুযোগ।

বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্রুততম গোলটিও কিন্তু তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেরই উপহার। ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ শুরুর ১১ সেকেন্ডের মাথায় গোল করেছিলেন তুরস্কের হাকান সুকুর।

sukur
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্রুততম গোল করেন তুরস্কের হাকান সুকুর। ছবি: এএফপি

ব্যর্থতার ইতিহাসও আছে। ১৯৭০ বিশ্বকাপে ‘অর্থহীন’ এই ম্যাচে হ্যাটট্রিক পেলেই ফন্টেইনের রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলতেন জার্মানির জার্ড মুলার। ১৯৯৪ সালে একটি গোল পেলেই এককভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যেতেন রিস্টো স্টইচকভ। তা করতে না পেরে শুধু নিজের চুল ছিঁড়তেই বাকি রেখেছিলেন বুলগেরিয়ার এই স্ট্রাইকার।

অনেক দেশের তো বিশ্বকাপে সেরা সাফল্য হয়ে আছে এই ম্যাচ জিতে তৃতীয় হওয়াটাই। তাই কারো কারো চোখে অর্থহীন ম্যাচেও আমাদের চোখ রাখতে হয়। আর যাই হোক, এই ম্যাচ কোনোভাবেই ফেলনা নয়।