মাঠের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে অনেক ‘হুমকিই’ পেয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। তবে এবার মাঠের বাইরে ভিন্ন এক হুমকি পেলেন ফরাসি ফরোয়ার্ড। ক্ষমা না চাইলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছেন প্যারাগুয়ের সিনেটর চেলেস্টে আমারিলা।
অনেকটা চোরের মায়ের বড় গলার মতো। কেননা এই সিনেটরই এমবাপ্পেকে উদ্দেশ্যে করে বর্ণবাদী মন্তব্যে করেন। ফরোয়ার্ডকে ‘উপনিবেশিত ক্যামেরুনীয় ফরাসি’ ও ‘কুৎসিত’ বলে সংবোধন করেন আমারিলা। তার জবাব দিয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের তারকা। শুধু এমবাপ্পে নন, তীব্র প্রতিবাদ জানান ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁসহ প্যারাগুয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট পেড্রো আলিয়ানাও। এমবাপ্পে তার জবাবে আমারিলাকে বলেন, ‘আপনি একজন ঘৃণ্য নারী এবং এই পদের অযোগ্য।’
সেটারই প্রতি উত্তরে এমাবাপ্পেকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন আমারিলা। সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া তার পোস্টটি হুবহু নিচে তুলে ধরা হলো—
‘সমস্যাটা তোমার সঙ্গে আমার। আমি কখনোই ফ্রান্সের বিরুদ্ধে কিছু বলিনি। আমি তোমাদের (ফ্রান্স) পাশেই আছি। দুই থেকে সতেরো বছর বয়স পর্যন্ত একটি ফরাসি স্কুলে পড়াশোনা করেছি এবং সেখানেই আমার স্কুলজীবন শেষ করেছি। আমি আজ যা হতে পেরেছি তা ‘কলেজ দে ল’ইনমাকুলে কনসেপসিওন’-এর কল্যাণে। আমি আজ যেখানে পৌঁছেছি তা এই প্রতিষ্ঠানের দেওয়া শিক্ষার কারণেই। আমরা লা মার্সেই (ফ্রান্সের জাতীয় সংগীত) গাইতাম এবং আমাদের নিজেদের পতাকার পাশাপাশি ফরাসি পতাকাকে সম্মান জানাতাম। আমি ফরাসি ভাষায় কথা বলি এবং ফ্রান্সে বেড়াতে যেতে পছন্দ করি। গত ক্রিসমাস আমি আমার পরিবারের সাথে কুরশেভেলে কাটিয়েছি এবং সেন্ট-ট্রোপেজে নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়েছি। এর সাথে ফ্রান্সের কোনো সম্পর্ক নেই; সমস্যাটা তোমার সাথে।
ম্যাচের আগে থেকেই তোমার অহংকার এবং অবজ্ঞা আমার বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যখন তুমি বলেছিলে—আমাদের যদি হাত নোংরা করতে হয়, তবে হাত নোংরাই করব। আমরা বোকা নই; আমরা খুব ভালো করেই বুঝি তুমি প্যারাগুয়ে দলকেই নোংরা বা সস্তা বোঝাতে চেয়েছ, আর আমরা সবাই মিলেই তো প্যারাগুয়ে দল। এরপর তুমি বলেছিলে তারা মেকআপ তুলে ফেলবে। আমরা সেটাও বুঝি, মেকআপে আপনাকে কত মার্জিত দেখায়, আর আমরা এতটাই দরিদ্র ও রুক্ষ যে মেকআপ কী জিনিস তা-ই জানি না। আমারসহ পুরো প্যারাগুয়েবাসী তখন চুপ ছিল। আমরা তা মুখ বুজে সহ্য করেছি।
আরো পড়ুন
এমবাপ্পের হয়ে প্যারাগুয়ের সিনেটরের বর্ণবাদী মন্তব্যের জবাব ফরাসি প্রেসিডেন্টের
ম্যাচ চলাকালীন তোমার অহংকারী আচরণ স্পষ্ট ছিল, প্রতিটি খেলোয়াড়ের প্রতি তোমার অবজ্ঞা এমন ছিল যেন তারা অত্যন্ত ঘৃণ্য। এমনকি মুখ না ঢেকেই যখন লাতিন আমেরিকার অত্যন্ত আক্রমণাত্মক একটি গালি দিলে, তুমি নিজেও জানো সেটি কতটা আপত্তিকর।
পরিশেষে, তুমি আমাদের গোলরক্ষকের প্রতি অবহেলা দেখিয়েছ। এটি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। ম্যাচের পর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান অনেকটা পবিত্র বিষয়—যুদ্ধে যেমন, শান্তিতেও তেমন; পরাজয়ে যেমন, জয়েও তেমন। অথচ তুমি তার সাথে করমর্দন করনি এবং তার মুখের ওপর আপনার বিজয়ের উল্লাস প্রকাশ করেছ—এটি স্রেফ অগ্রহণযোগ্য। মাত্র এক সেকেন্ডের মধ্যে তোমার অবজ্ঞা, অহংকার এবং খারাপ আচরণ দেখিয়েছো। এটি আমাকে এবং আমার দেশকে গভীরভাবে আঘাত করেছে। ফ্রান্সের উচিত তোমার কাছ থেকে এর জবাবদিহিতা চাওয়া। কারণ ফ্রান্স বীর ও ভদ্রলোকদের দেশ, যার রয়েছে শত বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এই আচরণের জন্য ফ্রান্সের অবশ্যই তোমাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত।
আমার পোস্টগুলো ছিল টগবগে রক্তে ভরা, সেই মিশ্র রক্ত—যা আমার শিরায় প্রবাহিত হওয়া স্প্যানিশ রক্তের সাথে আদিবাসী রক্তের এক সুন্দর মিশ্রণ। আজ তুমি যখন সেই মহান প্যারাগুয়েন খেলোয়াড়দের উপহাস করছিলে, যারা ম্যাচের শেষ পর্যন্ত সমানে সমানে লড়াই করেছে, তখন আমি সেই আবেগ থেকেই লিখেছিলাম। তবে, আমি যে ধরনের গালাগাল বা অপমানের শিকার হই, ঠিক একই রকম ভাষায় তোমাকে আক্রমণ করার জন্য আমার সাথে সাথেই অনুশোচনা হয়। কারণ মিশ্র জাতি এবং লাতিনা হওয়ার কারণে আমাকেও অবজ্ঞা করা হয়, ‘নোংরা’ বলে ডাকা হয়। আমি পরে অনুতপ্ত হয়ে পোস্টটি মুছে দিই। আমি বুঝতে পারি যে আমি নিজেই সেই আচরণগুলোর পুনরাবৃত্তি করছিলাম যা ঘৃণা করি, তাই আমি এটি সরিয়ে ফেলি। আমি বুঝি এটি তোমাকেও হয়তো বিব্রত করেছে, কারণ বিষয়টি সত্যিই অপমানজনক।
এখন, আমি দাবি করছি তুমি তোমার বক্তব্য প্রত্যাহার কর এবং আমার কাছে ক্ষমা চাও। তোমার এই মানসিক বা বাচনিক সহিংসতা আমিও সহ্য করব না। তুমি আমাকে চেনো না, আমি কে সে সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণাই নেই। আর যে পদের দায়িত্বে আছি তার জন্য আমি একজন অযোগ্য বা ঘৃণ্য নারী—এ কথা বলার কোনো অধিকার তোমার নেই। আমি প্যারাগুয়ে প্রজাতন্ত্রের একজন নির্বাচিত সিনেটর, যাকে জনগণ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। এর আগে আমি জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন জাতীয় ডেপুটি ছিলাম। হাজার হাজার প্যারাগুয়েন আমাকে ভোট দিয়েছেন এবং আমাকে তাদের কণ্ঠস্বর মনে করেন। প্যারাগুয়ের জনগণের পক্ষে কথা বলা, তাদের নীরবতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা এবং নিজের জীবন দিয়ে দেশকে রক্ষা করাই আমার প্রধান দায়িত্ব। আমার কাছ থেকে এটাই প্রত্যাশিত।
আমি মুক্ত ও স্বাধীন নির্বাচনে জয়ী হয়ে আমার দেশের প্রতিনিধিত্ব করছি। আইন প্রণয়ন এবং দেশের কণ্ঠস্বর হওয়ার জন্য আমি নির্বাচিত হয়েছি। দেশকে রক্ষা করার জন্য বা জনগণের কণ্ঠস্বর হওয়ার জন্য নির্বাচিত হওয়ার গুরুত্ব কী, সে সম্পর্কে তোমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। আমি একজন ন্যাশনাল সিনেটর নির্বাচিত হয়েছি; আমি জানি না আমার এই পদের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারছো কি না।
আমাকে না চিনেও অযোগ্য বা ঘৃণ্য বলার তুমি কে? এটি পুরোপুরি একটি লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা! জনগণের ভোটে এই অবস্থানে আসা একজন নারীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সহিংসতা। তুমি মূলত আমার লিঙ্গের কারণেই আমাকে অবজ্ঞা করছো; আমি একজন নারী বলেই অপমান করেছ। তুমি শুধু আমার গায়ের রঙ, পছন্দ, নারী হিসেবে আমার মর্যাদা বা রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর আঘাত করছ না। তোমার বক্তব্য প্রত্যাহার করে ফরাসি নাগরিকত্বের মর্যাদা রক্ষা কর এবং ক্ষমা চাও। অন্যথায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার জন্য আমি তোমার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারি।’