ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ হতে তখন কয়েক সেকেন্ড বাকি। ডি বক্সের ঠিক বাইরে আন্দ্রেস শেলডেরাপের বাড়ানো বল ডান পায়ে রিসিভ করেন এক নরওয়েজিয়ান।
বাঁ পায়ে টোকা দিয়ে এগিয়ে নিয়েই জোরালো শট; ফিনিশিংয়ে বল খুঁজে পায় আপন ঠিকানা। ব্রাজিলের বিশ্বকাপ অভিযানের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে সোনালি চুলের বাঁধন খুলে দুই হাত ছড়িয়ে দেন আর্লিং হালান্ড। নেই পাগলাটে উদযাপন, যেন শুধু নিজের কাজটুকু শেষ করে জানিয়ে দেওয়া—আজকের দিনটা শুধুই আমার। গ্যালারির হলুদ সমুদ্রের পাথর নীরবতা ভেদ করে ‘ভাইকিং’ হালান্ড যেন তখন বিজয়ের নরওয়েজিয়ান পতাকাই গেঁথে ফেলেন মেটলাইফ স্টেডিয়ামে।
হালান্ড প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের সঙ্গে লড়াই করেন, দৌড়ান আবার হারিয়েও যান। অনেক সময় মনে হয়, তিনি নেই। কিন্তু হালান্ড কখনো ম্যাচ থেকে হারিয়ে যান না, শুধু সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। ব্রাজিলের বিপক্ষেও প্রথমার্ধে মাত্র ১০ বার বলের ছোঁয়া পেয়েছেন তিনি; শুরুর একাদশে থাকা দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে যা সবচেয়ে কম।
ফলে প্রথম ৪৫ মিনিটে সাফল্যেরও মুখ দেখেনি নরওয়ে। ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা হয়তো ভেবেছিলেন, হালান্ড বল না পেলেই কোনো বিপদ আর ডানা মেলবে না। অথচ বল নয়, হালান্ডের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তো অপেক্ষা। যখনই সুযোগ পেয়েছেন, তখনই আঘাত হেনেছেন। হালান্ডের জোড়া আঘাতেই ভেঙে চুরমার ফুটবলের লাতিন দুর্গ।
সেটি ভাঙল কখন? ম্যাচের অন্তিমে। এমনিতেই নরওয়েকে বলা হয় নিশীথ সূর্যের দেশ। হালান্ড যেন সেই দেশের সার্থক প্রতিনিধি হয়ে ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে গোলের ঝলকে স্তব্ধ করে দেন গোটা বিশ্বকে।
এমন একটি কথা প্রচলিত আছে যে স্ট্রাইকাররা ৮০ মিনিট নিজেকে হারিয়ে খুঁজলেও শেষ ১০ মিনিটের জাদুতে পুরো ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে জানেন। ব্রাজিল ম্যাচের হালান্ড এর জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। মাঠের ঘড়িতে তখন ৭৮ মিনিট। গ্যালারিতে তখনো ঢাক বাজাচ্ছে ব্রাজিল সমর্থকরা। হলুদ জার্সির ঢেউয়ে মনে হচ্ছে, ম্যাচটা যেন ধীরে ধীরে তাদের দিকেই হেলে পড়ছে। নরওয়ে শুধু লড়াই করে যাচ্ছে, বলের দখলে ঢের এগিয়ে থাকলেও আক্রমণ হাতে গোনা। অথচ হালান্ড তখনো নিশ্চুপ। অবশেষে সুযোগ আসে, মাত্র ১১ মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল করে কেড়ে নেন সব আলো, যার প্রথমটি ছিল সময়জ্ঞান, শক্তি আর হেডিং দক্ষতার এক অসাধারণ প্রদর্শনী। আর দ্বিতীয়টি ছিল নিখাদ নিষ্ঠুরতা, ডি বক্সের বাইরে থেকে তাঁর বজ্রগতির শট ভেঙে দিয়েছে সাম্বা সাম্রাজ্যের মূল ফটক। তাতেই অস্তমিত হয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ‘হেক্সা’ জয়ের স্বপ্ন।
ব্রাজিলকে ২-১ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছেন নিশীথ সূর্যের দেশের প্রতিনিধিরা। তাই তো ম্যাচ শেষে নরওয়ের কোচ স্টালে সোলবাকেন এটিকে দেশের ফুটবল ইতিহাসের ‘সর্বশ্রেষ্ঠ দিন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। আর হালান্ড বলেছেন, ‘এটি নরওয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য দিনগুলোর একটি।’ ব্রাজিলকে হারানো শুধু একটি স্কোরলাইন নয়, এটি একটি নতুন ফুটবল শক্তির জন্মের রাতও, যে রাতে অসলোর রাস্তায় নেমে এসেছিল হাজারো মানুষ, রাজপ্রাসাদের চত্বরে লেগেছিল উৎসবের রং। যে রং ছুঁয়ে গেছে স্বয়ং ক্রাউন প্রিন্সকেও। তাই তো গলায় লাল স্কার্ফ জড়িয়ে মধ্যরাতে হাত নেড়েছেন রাজপ্রাসাদের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে, যেন দুটি গোল, স্বপ্নের জয় এবং একটি জাতির উল্লাস মিলেমিশে তৈরি হয়েছে নতুন এক ফুটবল উপাখ্যান। আর সেই উপাখ্যানের প্রথম পাতায় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে একটি নাম—আর্লিং হালান্ড।
সামনে আরো বড় চ্যালেঞ্জ, কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের অপেক্ষায় শক্তিশালী ইংল্যান্ড। তবে ব্রাজিলকে হারানোর পর প্রিয় শিষ্যের কাঁধে চড়ে নিশ্চয়ই ইংলিশ বাধাও পেরোতে চাইবেন স্টালে সোলবাকেন।




