চার দিনের টানা ভারী বৃষ্টি একসঙ্গে বহু সংকট ডেকে এনেছে পাহাড়ি জেলা বান্দরবানে। পাহাড়ধসের আশঙ্কা, পাহাড়ি ঢল, বন্যা, সড়ক ও নৌ যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎহীনতা, জলাবদ্ধতা- সব মিলিয়ে এ জেলার জনজীবন কার্যত স্থবির।
এদিকে, নাফাখুম জলপ্রপাতে ৭৮ জন পর্যটক ও ৯ জন গাইড আটকা পড়েছে বলে জানা গেছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় জননিরাপত্তার স্বার্থে আগামী ১০ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। একইসঙ্গে পর্যটক, ট্যুর অপারেটর ও সাধারণ মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়, ঝর্ণা, ট্রেইল, নদীপথ ও দুর্গম এলাকায় যাতায়াত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, টানা বৃষ্টিতে বান্দরবান জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও পাহাড়ের অংশ বসতবাড়ির ওপর ধসে পড়েছে, কোথাও প্রধান সড়কে ধসে পড়েছে পাহাড়ের মাটি।
সরেজমিন গিয়ে ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমা বরাবর প্রবাহিত হচ্ছে। তার ওপর রয়েছে টানা বৃষ্টি। এতে থানচি উপজেলায় নৌ-যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। ফলে রেমাক্রী খাল ও বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়ায় পানি দ্রুত অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় দুর্গম নাফাখুম জলপ্রপাতে ৭৮ জন পর্যটক ও ৯ জন গাইড আটকা পড়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমা বরাবর প্রবাহিত হওয়ায় রেমাক্রী ও নাফাখুম এলাকায় অবস্থানরত পর্যটকদের তখনি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। নদীর স্রোত কমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পর্যটকদের নিরাপদ স্থানে অবস্থান করতে বলা হয়েছে।
বান্দরবান-থানচি সড়কের নীলগিরি এলাকায় পাহাড়ধসের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হলেও পরে ফায়ার সার্ভিস দ্রুত মাটি অপসারণ করে সড়কটি সচল করে। অন্যদিকে লামার ফাইতং ইউনিয়নেও পাহাড়ধসে একটি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
টানা বৃষ্টিতে সোমবার (৬ জুলাই) বিকেলে বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কের গ্রিনপিক রিসোর্টসংলগ্ন এলাকায় ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের একটি খুঁটি হেলে পড়ে। এতে বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। টানা ১৪ ঘণ্টা পর মঙ্গলবার (৭ জুলাই) ভোর ৫টায় পুনরায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়।
দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি হাসপাতাল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবাও মারাত্মক ব্যাহত হয়। মোবাইল ফোনে চার্জ দিতে না পারায় অনেক এলাকায় জরুরি যোগাযোগও বিঘ্নিত হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘুমধুম ইউনিয়নের মধ্যমপাড়ায় পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ে একটি পরিবারের ঘরবাড়ির বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বৃষ্টির কারণে জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসের শঙ্কা থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে। যেহেতু অতিভারী বৃষ্টির ফলে ভূমিধসের শঙ্কা রয়েছে, তাই পাহাড়ের পাদদেশ ও চূড়ায় বসবাসরত সব জনসাধারণকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।
সূত্র জানায়, টানা বৃষ্টিতে বান্দরবান শহরের কালাঘাটা, বালাঘাটা, বনরূপা পাড়া, সিদ্দিক নগরসহ বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। নিচু এলাকার বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ। এছাড়া পাহাড়ি ঢলের কারণে বান্দরবান-রাঙ্গামাটি প্রধান সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
দুই উপজেলায় বন্যা
স্থানীয় সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ি ঢলে লামা ও আলীকদম উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আলীকদমের প্রধান সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
সূত্র জানায়, নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী, সোনাইছড়ি ও দোছড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন সড়কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক স্থানে যানবাহন চলছে চরম ঝুঁকি নিয়ে। দুর্যোগের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী ইউনিয়নে।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সৈয়দ আহমেদ জানান, সোমবার (৬ জুলাই) সকালে প্রবল স্রোতের একটি ছড়ায় ভেসে যায় পাঁচ বছরের শিশু আলিয়া সুলতানা। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। শিশুটির মৃত্যু পুরো এলাকায় শোকের ছায়া ফেলেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পাহাড়ি ছড়াগুলোর আকস্মিক স্রোত কতটা ভয়ংকর হতে পারে, এই ঘটনাই তার নির্মম উদাহরণ।
জেলা প্রশাসন জানায়, টানা বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই সাময়িকভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা প্রশাসন পাহাড়ধস-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে সতর্ক করছে। ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বলা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানিও বিতরণ করা শুরু হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর বর্ষা এলেই একই ধরনের দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয়। সময়মতো সড়ক সংস্কার, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো শক্তিশালী না হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের বান্দরবান কার্যালয়ের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টা) পর্যন্ত বান্দরবানে ১৩৫ মিলিমিটার অতিভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের শঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, গত দুই দিন ধরে বান্দরবানে অতি বৃষ্টি রয়েছে। বৃষ্টিতে যাতে বড় কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, সেজন্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক আরো বলেন, আমাদের সাত উপজেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। সেগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বিভিন্ন উপজেলায় সড়কের ওপর মাটি ও পাথর ধসে পড়ায় যান চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। তবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং স্থানীয়দের সহযোগিতায় সড়কের যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে।