ক্রিকেট শুদ্ধতায় বিশ্বাসী অনেকে আইপিএল ফলো করেন না, টি-টোয়েন্টির নাম শুনলেও নাক সিটকান অনেকেই। আইপিএল ফলো করুন আর না-ই করুন, এমনকি ক্রিকেট নিয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ না থাকলেও আপনি নিশ্চয়ই বৈভব সূর্যবংশীর নাম শুনেছেন ইতিমধ্যেই। এমনকি ক্রিকেটের ক না জানলেও হয়তো সূর্যবংশীর নাম আপনার কানের পোকা নাড়িয়ে দিয়েছে। বছর দুয়েক ধরে ফিসফাস হলেও মাস দুয়েক ধরে আইপিএলে সূর্যবংশী যা করেছেন, কানে তুলো দিয়ে রাখলেও আপনি তাকে এড়াতে পারবেন না। তারপরও যদি কোনোভাবে বৈভব সূর্যবংশী নামটি আপনি না শুনে থাকেন, তবে নিজের কান এবং মনকে তৈরি করে রাখুন। আগামী অনেক বছর অনলাইনে, অফলাইনে, গুগলে, চ্যাট জিপিটিতে, মাঠে-ময়দানে আপনাকে এই নামটি বারবার শুনতে হবে।
অথচ বৈভবের দল এবার আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হয়নি, আসলে ফাইনালেই ওঠেনি। ফাইনালে না ওঠা দলের সদস্য সূর্যবংশী এবারের আইপিএলে ৫টি পুরস্কার জিতেছেন। মানুষটা ছোট, জিতেছেন বড় বড় সব পুরস্কার। সবচেয়ে বেশি রান (৭৭৬), সুপার স্ট্রাইকার অব দ্য সিজন (স্ট্রাইক রেট ২৩৭.৩০ ), সবচেয়ে বেশি ছক্কা (৭২)।
মজাটা হলো, সবচেয়ে বেশি ছক্কার রেকর্ডটা শুধু এবারের নয়। আইপিএলে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ছক্কা মারতে গিয়ে তিনি ভেঙেছেন কিংবদন্তি ক্রিস গেইলের ৫৯ ছক্কার রেকর্ড। আইপিএল শুরুর পরে জন্ম নেওয়া বৈভব ছক্কার রেকর্ডকে আকাশে তুলে নিয়েছেন গেইলের চেয়ে অনেক কম বল খেলে। এরপরের দুটি পুরস্কার আরো ইন্টারেস্টিং। একই সঙ্গে বৈভব এবারের আইপিএলের সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড় এবং সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ও। গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পেতে আরো তিন বছর লাগবে। কিন্তু এখনই তার গ্যারেজে তিনটি বিলাসবহুল গাড়ি জায়গা করে নিয়েছে।
বয়স মাত্র ১৫। এখনো ভারতের মূল দলে খেলার সুযোগ পাননি। কিন্তু আইপিএল, বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, ঘরোয়া ক্রিকেটে বৈভব যা করেছেন, তাতেই লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে রেকর্ডের খাতার অনেক পাতা। বৈভব যেন ‘বুলডোজার’ নিয়ে মাঠে নামেন একের পর এক রেকর্ড ভেঙে চুরমার করার জন্য।
এই ছেলে কোথায় গিয়ে থামবে, তা নিয়েই সবাই হিসাব কষছেন। ব্র্যাডম্যানের রেকর্ড আর শচিনের মোট রানের রেকর্ড ছাড়া আর কোনো রেকর্ডকেই নিরাপদ মনে হচ্ছে না। সব রেকর্ডের কথা লিখলে এই লেখা পড়ার ধৈর্য থাকবে না আপনাদের। এবারের আইপিএলে বৈভবের সবগুলো ইনিংসই ছিল দুর্দান্ত, তাক লাগানো। আইপিএলকে যারা গোনায় ধরেন না, তারা যুব বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৮০ বলে ১৭৫ রানের ইনিংসটা দেখতে পারেন।
ভারতের সবচেয়ে কম বয়সী লিস্টে এ খেলোয়াড়, সবচেয়ে কম বয়সে আইপিএল খেলা, সবচেয়ে কম বয়সে আইপিএল সেঞ্চুরি- রেকর্ডের আসলে কোনো শেষ নেই। কনিষ্ঠতা নিয়েই তো অনেক রেকর্ড।
এবার গড়তে যাচ্ছে, আরো একটি বিশ্বরেকর্ড। ১৫ বছর বয়সী বৈভব ডাক পেয়েছেন ভারতের জাতীয় দলে। আগামী ২৬ জুন থেকে ১১ জুলাই আয়ারল্যান্ড ও ইংল্যান্ড সফর করবে ভারত। সেই সফরে ভারত দলের সঙ্গী হবেন বৈভব সূর্যবংশী। ১৫ বছর বয়সী এই বালককে দেখেশুনে রাখার জন্য সফরে যাবেন বৈভবের বাবা-মাও, তা-ও বোর্ডের খরচে। এমন প্রতিভার পেছনে টাকা খরচ করেও শান্তি। বৈভবের জাতীয় দলে ডাক পাওয়াটা সময়ের ব্যাপার ছিল মাত্র। ভারতের নির্বাচকরা তো আর ভিনগ্রহের বাসিন্দা নন। বৈভব যে ‘বুলডোজার’ নিয়ে সব লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে, তা তো তারা নিজের চোখেই দেখেছেন।
সমস্যা হলো, বৈভবের রেকর্ডের খাতার দিকে তাকালে বয়সের দিকে তাকানোর ফুরসত মেলে না। আবার চেহারায় সারল্য আর বয়সজনিত চপলতা দেখলে রেকর্ড বিশ্বাস হতে চায় না। ভারতের মানুষ ক্রিকেটে খায়, ক্রিকেটে ঘুমায়, ক্রিকেটে স্বপ্ন দেখে। প্রায় দেড়শ কোটি মানুষের প্রত্যাশা তো আছেই, গোটা ক্রিকেটবিশ্বই এখন বৈভবে বুঁদ। কিংবদন্তি ক্রিকেটারদের মুখে বৈভব বন্দনার প্রতিযোগিতা। ভাববেন না, সবাই বৈভবের রান করা দেখে বুঝি মুগ্ধ। আসল কারণ যেভাবে রান করেন, সেই ধরনটা। ব্যাপারটা মোটেই এমন নয় যে, অল্পবয়সী একটা ছেলে, গায়ে জোর বেশি, সেই জোরে বল পিটিয়ে সীমানা পার করে। বরং বিশ্বের সেরা সব বোলারদের পাড়ার বোলার বানিয়ে ফেলা বৈভবের প্রতিটি শটই নিখুঁত ক্রিকেটিং শট। কখনো কখনো বৈভবের সৃষ্টিশীলতায় যেন ক্রিকেটের চেয়েও বেশি কিছু। বৈভবের ব্যাটিং দেখা তাই একইসঙ্গে উত্তেজনা এবং আনন্দের। বৈভবের বয়সটা কম্পিউটার গেমস খেলার। এই খেয়ালী কিশোর যেন ক্রিকেট মাঠকেই বানিয়ে ফেলেছে ভার্চুয়াল গেমসের স্ক্রিন।
বয়সভিত্তিক ক্রিকেট খেলার বয়স ফুরোবার আগেই জাতীয় দলে ডাক পেয়েছেন। আয়ারল্যান্ড বা ইংল্যান্ডে কোনো ম্যাচে খেলার সুযোগ পেলেই ১৬ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা প্রথম ভারতীয় ক্রিকেটার হিসেবে ইতিহাস গড়বেন সূর্যবংশী। ভারতের ক্রিকেট ‘দেবতা’ শচিন টেন্ডুলকারের টেস্ট ও ওয়ানডে অভিষেক হয়েছিল যথাক্রমে ১৬ বছর ২০৫ দিন ও ১৬ বছর ২৩৮ দিন বয়সে। আয়ারল্যান্ড-ইংল্যান্ড সফরে বৈভবের অভিষেক নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তাই ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন তিনি এটা বলাই যায়। চাইলে আপনি সেই ইতিহাসের সাক্ষী হতে পারেন।
বৈভব সূর্যবংশীর নামের আগে ‘প্রডিজি’ বা ‘বিস্ময়বালক’ বিশেষণ ব্যবহার করা হয়। তার আগে এই বিশেষণের সার্থক ব্যবহার হয়েছিল, যার রেকর্ড তিনি ভাঙতে যাচ্ছেন সেই শচিন টেন্ডুলকারের নামের আগে। ১৯৮৯ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে পাকিস্তান সফরে গিয়ে ক্রিকেটবিশ্বকে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন শচিন। তারপর টানা ২৪ বছর বিশ্ব ত্রিকেটকে শাসন করেছেন, গড়েছেন একের পর এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা দেওয়ার আগে শচিনও বৈভবের মতো হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন। তখন তো আইপিএল ছিল না। স্কুল ক্রিকেটে বন্ধু বিনোদ কাম্বলিকে নিয়ে ৬৬৪ রানের অবিচ্ছিন্ন পার্টনারশিপের বিশ্বরেকর্ড গড়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন সবাইকে।
এইখানে একটু শঙ্কার কথা বলে লেখাটা শেষ করি। স্কুল ক্রিকেটে বিশ্বরেকর্ড গড়া দুই বন্ধু শচিন আর বিনোদ। বলা হতো, দুজনেই প্রতিভাবান। তবে বিনোদের মধ্যে সহজাত প্রতিভা বেশি ছিল। সেই প্রতিভার ঝলক ক্রিকেট বিশ্ব দেখেছেও কিছুটা। কিন্তু অল্পবয়সে পাওয়া নাম, যশ আর খ্যাতির আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়ে ক্রিকেটের আফসোস হয়ে আছেন বিনোদ। আর তার বন্ধু শচিন সেই আগুনে পুড়ে আরো খাঁটি হয়েছেন। নিজের প্রতিভার সাথে নিরলস পরিশ্রম, কঠোর অনুশীলন, আর ডিসিপ্লিনে শচিন নিজেকে পরিণত করেছেন আস্ত এক বিশ্ববিদ্যালয়ে। শচিনের ক্যারিয়ার থেকে শুধু ক্রিকেটার নয়, যেকোনো ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়ামোদী, এমনকি সাধারণ মানুষেরও অনেক কিছু শেখার আছে।
শঙ্কাটা হলো বৈভব সূর্যবংশী বিনোদ হবেন না শচিন হবেন? বিনোদের মতো ধূমকেতু হয়ে ফুরিয়ে যাবেন নাকি নিজের নামের মত সূর্যের আলোয় আলোকিত করবেন গোটা বিশ্বকে? আমার বাজি শচিনের পক্ষে; সূর্যই হবেন সূর্যবংশী, ধূমকেতু নয়।
শচিনের অভিষেক, তার বেড়ে ওঠা যারা দেখেছেন; তারা সৌভাগ্যবান। তেমনি আরেক সৌভাগ্যের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ আপনার সামনে। ৪ দিন পরেই শুরু হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া ইভেন্ট বিশ্বকাপ ফুটবল। ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত গোটা বিশ্বই মেতে থাকবে ফুটবল নিয়ে। এই সময়ে বৈভবের অভিষেক হলেও হয়তো তা একটু আড়ালেই থাকবে। তবে অনুরোধ, ফুটবলের ফাঁকে ফাঁকে বৈভবের দিকে একটু নজর রাখবেন। কারণ আপনি ইতিহাসের সাক্ষী হতে যাচ্ছেন।