ফুটবল বিশ্বকাপকে বলা হয় গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। বিশ্বকাপের সময় বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ কাজকর্ম ফেলে বুঁদ হয়ে থাকে ফুটবলে। সরাসরি স্টেডিয়ামে গিয়ে বা টিভির পর্দায় বিশ্বের প্রতিটি কোনায় মানুষ ফুটবল উন্মাদনায় মেতে থাকে। গত প্রায় দেড়মাস ধরে কাজে মানুষের মনোযোগ ছিল না। সবাই ব্যস্ত মেসি, এমবাপ্পে, লামিন, রোনালদো, নেইমারদের নিয়ে।
ফিফার হিসেবে তাদের সবচেয়ে লাভজনক ইভেন্ট বিশ্বকাপ। টিভি পর্দাও ভরপুর থাকে বিজ্ঞাপনে। কিন্তু ফুটবল দেখতে ব্যস্ত মানুষের কাজের ফাঁকির কারণে উৎপাদনশীলতায় বড় ঘাটতি দেখা দেয়।
প্রায় দেড়মাসের ফুটবল উৎসব এখন শেষ প্রান্তে। আগামীকাল নিউজাসির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা আর স্পেনের ফাইনালে পর্দা নামবে এবারের আয়োজনের। যৌথ আয়োজক হিসেবে মেক্সিকো আর কানাডার নাম থাকলেও এবারের বিশ্বকাপের মূল আয়োজক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। হিউম্যান রিসোর্স সফটওয়্যার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান 'ইউকেজি'-র একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের বিশ্বকাপের কারণে উৎপাদনশীলতার বিবেচনায় মার্কিন অর্থনীতির প্রায় ১১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হতে পারে। বিশ্বব্যাপী উৎপাদনশীলতায় এই ক্ষতির পরিমাণ ১৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিশ্বকাপে প্রিয় দলের খেলার দিন বিপুলসংখ্যক কর্মী খেলা দেখার জন্য কাজ ফাঁকি দিয়ে আগেভাগে চলে যাওয়া, খেলার পর দিন দেরি করে আসা বা পুরোপুরি কাজ ফাঁকি দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। যার প্রভাব পড়েছে উৎপাদনশীলতায়। কর্মক্ষেত্র ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা প্ল্যাটফর্ম 'এনভয়'-এর তথ্য অনুযায়ী, বেলজিয়ামের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ের পর দিন ৭ জুলাই মঙ্গলবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অফিসে কর্মীদের উপস্থিতি ২৬ ভাগ কমে গিয়েছিল। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রে আমেরিকান ফুটবলের ফাইনাল সুপার বোলের পরদিন (সাধারণত সোমবার) অনুপস্থিতির হার বেশি থাকে। তবে ৭ জুলাইয়ের অনুপস্থিতির হার সুপার বোলের পরের দিনের তুলনায় ১০ গুণ বেশি ছিল।
৭ জুলাই শুধু অনুপস্থিতিই নয়; ক্লায়েন্ট মিটিং, ইন্টারভিউ এবং ভেন্ডর অ্যাপয়েন্টমেন্টের মতো ভিজিটর এন্ট্রিও ৩২ ভাগ কমে গিয়েছিল, যা সুপার বোলের পরের দিনের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। এনভয় এই ঘটনাকে 'নকআউট মঙ্গলবার' নাম দিয়েছে। যেসব ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নিয়েছিল, সেদিন এবং তার পরদিন অনুপস্থিতির হার ছিল সবচেয়ে বেশি। আয়োজক দেশ টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার পর, বিশ্বকাপ আরও রোমাঞ্চকর পর্যায়ে পৌঁছালেও যুক্তরাষ্ট্রে উত্তেজনা কমে গেছে। সেখানে কর্মক্ষেত্রে উপস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বড় কোনো ইভেন্টের কারণে কর্মীদের মনোযোগ নষ্ট হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। অলিম্পিক গেমস বা ২০২৩ সালে 'বার্বি' ও 'ওপেনহাইমার' সিনেমা মুক্তির সময়েও অফিসে উপস্থিতি কমে গিয়েছিল। কিছু কোম্পানি উৎপাদনশীলতার ওপর বিশ্বকাপের এই নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের খেলা চলার দিনগুলোতে যানজট ও যাতায়াতের বিলম্ব এড়াতে এসঅ্যান্ডপি, জেপিমরগান চেজ অ্যান্ড কোং, গোল্ডম্যান স্যাক্স-এর মত প্রতিষ্ঠানের আয়োজক শহরগুলোর নিয়োগকর্তারা কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করতে উৎসাহিত করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র টুর্নামেন্টে নেই বলে ফুটবল নিয়ে আমেরিকানদের আগ্রহও কমে গেছে। এমনকি আগামীকালের হাইভোল্টেজ ফাইনাল নিয়েও নেই তেমন উত্তেজনা। এনভয় পূর্বাভাস দিয়েছে, ফাইনাল ম্যাচের পরদিন কর্মক্ষেত্রে উপস্থিতি সামান্য কমতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি অনুমান করেছে যে, এই অনুপস্থিতির হার 'নকআউট মঙ্গলবার'-এর চেয়ে অনেক কম হবে; 'সুপার বোল'-এর পরের দিনের কাছাকাছি হতে পারে। তাদের ধারণা ফাইনালের পরদিন অন্যান্য সোমবারের তুলনায় কর্মক্ষেত্রে উপস্থিতি ১ দশমিক ৮৭ ভাগ কম হতে পারে।