সাহিত্য মানুষের মননকে সমৃদ্ধ করে, কল্পনাশক্তিকে বিকশিত করে এবং মানবিক মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ত জীবনে তরুণদের বইমুখী করে তোলা এবং মাদকসহ নানা সামাজিক অবক্ষয় থেকে দূরে রাখতে সাহিত্যচর্চার বিকল্প নেই। এই প্রত্যয়কে সামনে রেখে গোপালগঞ্জে বসুন্ধরা শুভসংঘের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রাণবন্ত ‘সাহিত্য আড্ডা’।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৪টায় গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার রঘুনাথপুর ইউনিয়নের জলসাঘর সংগীত একাডেমিতে বসুন্ধরা শুভসংঘ গোপালগঞ্জ জেলা শাখার আয়োজনে এ সাহিত্য আড্ডা অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের গুরুত্ব, সাহিত্যচর্চার প্রয়োজনীয়তা এবং সমাজ গঠনে সাহিত্যের ভূমিকা নিয়ে শিক্ষক, সাহিত্যপ্রেমী, সংস্কৃতিকর্মী ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত আলোচনা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যকর্ম ও বাংলা সাহিত্যে তার অসামান্য অবদানের কথা স্মরণ করা হয়। বক্তারা বলেন, সাহিত্য কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের চিন্তা, চেতনা, অনুভূতি ও মূল্যবোধকে সমৃদ্ধ করে একটি সুন্দর সমাজ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার কাজী মন্টু কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক বিষ্ণুপদ বালা। তিনি বলেন, সাহিত্য মানুষের মনের ভাব, কল্পনা ও অনুভূতি যখন সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও শিল্পসম্মত ভাষার মাধ্যমে লিখিত আকারে প্রকাশ পায়, তখন তাকে সাহিত্য বলা হয়। সাহিত্য মানবজীবনের দর্পণ। এর মাধ্যমে মানুষের আনন্দ, বেদনা, প্রেম, সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার প্রকাশ ঘটে। সাহিত্য মানুষে মানুষে হৃদয়ের বন্ধন তৈরি করে।
তিনি আরো বলেন, কবিতা আবেগের শিল্পিত প্রকাশ, গল্প ও উপন্যাস বাস্তব কিংবা কাল্পনিক জীবনের বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরে, নাটক সংলাপনির্ভর শিল্পরূপ এবং প্রবন্ধ নির্দিষ্ট বিষয়ে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ। এসব সাহিত্যধারা মানুষের চিন্তার পরিধি বিস্তৃত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সাহিত্য আড্ডায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রঘুনাথপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, রঘুনাথপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক ও জলসাঘর সংগীত একাডেমির উপদেষ্টা সরোজ কান্তি বিশ্বাস (খোকন)। তিনি বলেন, ‘সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য মানবজীবনকে সুন্দর ও অর্থপূর্ণ করে তোলা। সাহিত্য আমাদের আনন্দ দেয়, কল্পনাশক্তি বাড়ায় এবং অন্যের সুখ-দুঃখ উপলব্ধি করতে শেখায়। সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরে মানুষকে সচেতন করাও সাহিত্যের অন্যতম দায়িত্ব।’
অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন গোপালগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহানামব্রত সরকার। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, সাহিত্যের কাজ হলো মানবাত্মার সঙ্গে মানবাত্মার মিলন ঘটানো। সাহিত্য মানুষের ভেতরের মানবিক সত্তাকে জাগ্রত করে এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি করে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে অহিদ সরদার বলেন, সাহিত্য কোনো নির্দিষ্ট দেশ, ভাষা বা জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই বিশ্বমানবের সত্তা রয়েছে। সাহিত্য সেই বিশ্বমানবিক চেতনাকে জাগিয়ে তোলে।
অনুষ্ঠানে বসুন্ধরা শুভসংঘ গোপালগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি সুজন দাস বলেন, সাহিত্য মানুষকে আনন্দ দেয়, সাহিত্য মানুষের মনের কথা বলে। সাহিত্যের মধ্যেই মানুষ খুঁজে পায় তার নতুন জীবন। মনুষ্য জীবনের আনন্দ বেদনার এক মিলন স্থল সাহিত্য। যে বইকে ভালোবাসে না সে পশুর সমান।
তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমান প্রজন্মকে মাদক ও নানা সামাজিক অবক্ষয় থেকে দূরে রাখতে সাহিত্যচর্চা অত্যন্ত প্রয়োজন। বসুন্ধরা শুভসংঘের এই উদ্যোগ তরুণদের বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তুলছে। আমরা নিয়মিত পাঠচক্র ও সাহিত্য আড্ডার আয়োজন করব, যাতে যুবসমাজ সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে নিজেদের গড়ে তুলতে পারে।’
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন বসুন্ধরা শুভসংঘ গোপালগঞ্জ জেলা শাখার সহসভাপতি মো. আল ইমরান সুমন, সাধারণ সম্পাদক তূর্য রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু বিশ্বাস ও সামিউল আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক অয়ন সাহা, দপ্তর সম্পাদক সীমান্ত পাল, ক্রীড়া সম্পাদক তমাল বোস, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সাব্বিরসহ জেলা শাখার নেতৃবৃন্দ।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন জলসাঘর সংগীত একাডেমির আহ্বায়ক কমলেশ বিশ্বাস, সদস্যসচিব বিপ্লব বিশ্বাস, কার্যকরী সদস্য শংকর মালাকার, কৃষ্ণানন্দ মনু, অমিতোষ বিশ্বাস, সৌরভ বালা, মৌসুমি বিশ্বাস, পার্থ বিশ্বাস, পূর্ণেন্দু বালা, মুক্তা বিশ্বাস, বিপ্রদেব বিশ্বাস, শংকর বালা, নিলীমা বিশ্বাস, নৃত্য প্রশিক্ষক শেখ সাদি, অভিভাবক দিপীকা মন্ডল, সমীর মালাকার, ফটিক মালাকারসহ সংস্কৃতিকর্মী, শিল্পী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা।
উপস্থিত শিক্ষার্থীরা সাহিত্য, বইপড়া ও সৃজনশীল চর্চার গুরুত্ব নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন এবং ভবিষ্যতেও এমন আয়োজন নিয়মিত করার আহ্বান জানান।
আয়োজকরা জানান, তরুণদের বইপড়ায় আগ্রহী করে তোলা, সাহিত্যচর্চার পরিবেশ সৃষ্টি, মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা এবং মাদকমুক্ত, সংস্কৃতিমনস্ক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে বসুন্ধরা শুভসংঘ ভবিষ্যতেও নিয়মিত সাহিত্য আড্ডা, পাঠচক্র ও বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মসূচির আয়োজন করবে। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে অংশগ্রহণকারীরা সাহিত্যচর্চাকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।






