• ই-পেপার

ঘুষের রেট তিন গুণ, তবু নড়ে না ফাইল

  • গোলাম মাওলা রনি

একাত্তর ও জুলাই বিজয় এক পাল্লায় নয়

মন্‌জুরুল ইসলাম
একাত্তর ও জুলাই বিজয় এক পাল্লায় নয়

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। অনেক রক্ত, অনেক মা- বোনের সম্ভ্রম, অনেক ত্যাগের বিনিময়ে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড, একটি পতাকা, একটি সংবিধান, একটি জাতীয় সংগীত এবং সর্বোপরি জনগণের অধিকার লাভ করেছে জাতি। আমাদের এই মহৎ অর্জনের পথে অনেক বাধা ছিল। আমাদেরই স্বজাতির একটা অংশ ছিল বিরুদ্ধে। তারা এখনো আমাদের বৃহত্তর স্বার্থের বিরোধী অংশ। কিন্তু ৫৬ বছরে আমরা স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ ভোগ করতে পারিনি। সে কারণেই এ দেশের মানুষ নব্বইয়ের গণ অভ্যুত্থান, চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান করেছে। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর দেশের অনেক কিছু বদলে গেছে। সবচেয়ে বেশি বদলেছে রাজনীতি। স্বাধীনতাবিরোধীদের ভয়ংকর উত্থান হয়েছে। স্বাধীনতার পক্ষের অন্যতম শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চায় দেশে গণতন্ত্র সুদৃঢ় করতে। দলটি এখন সংবিধানের যৌক্তিক সংস্কার, রাষ্ট্রব্যবস্থার উপযুক্ত সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায়। দলটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায়। সর্বোপরি ভবিষ্যতে দেশে যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে লক্ষ্যে এমন একটি সংবিধান চায়, যা জাতীয় সমঝোতার ভিত্তিতে গৃহীত হবে। কিন্তু জাতীয় সংসদে বিরোধী দল সে প্রত্যাশা পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কারণেই সংবিধান সংশোধন কমিটি তারা মানছে না। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনগণের ভোটে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে একাত্তর মনে রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ একাত্তরের পরাজিতরা এখন একাত্তরের গৌরবদীপ্ত অর্জনকে পরাজিত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে।

বিএনপি নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখ করেছিল, ‘এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা-এ নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে বিএনপি এমন একটি বাংলাদেশ গড়বে, যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান হবে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না এবং প্রতিটি নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবে-সবার আগে বাংলাদেশ।’ নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী বিএনপি এখন জনগণের ভোটের মর্যাদা রক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য সংবিধান সংশোধন জরুরি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে এসেছে। দেশের উচ্চ আদালতের রায় কার্যকরের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করেছে জাতীয় সংসদ। ১৩ জুলাই, ২০২৬ সোমবার রাতে সংসদে এ কমিটি গঠন করা হয়। তবে কমিটি গঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। সংসদ নেতা তারেক রহমানের পক্ষে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। এ কমিটি ১৭ সদস্যের হওয়ার কথা ছিল। এতে পাঁচজনের নাম দিতে বিরোধী দলকে অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু তারা নাম দেয়নি। তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে অনড় রয়েছে। চিফ হুইপ সংসদকে জানান, বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করা হলেও তাঁরা কোনো নাম দেননি। তাই আপাতত পাঁচটি পদ শূন্য রেখেই ১২ সদস্যের কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হচ্ছে। পরে বিরোধী দল নাম দিলে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে। ১৪ জুলাই জাতীয় সংসদে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে, কিন্তু বিরোধী দল তাদের দাবিতে অনড়। তারা সংবিধান সংস্কার চায়। তারা দুটি শপথ গ্রহণ করেছিল। একটি সংসদ সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ তারা কোন আইনের ভিত্তিতে নিয়েছিল? এই একটি প্রশ্নের সদুত্তরেই বর্তমান সমস্যার সমাধান হতে পারে।

এদিকে বিরোধী দলের অবস্থান সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘বিরোধী দলের অবস্থান তাদের রাজনৈতিক বিবেচনা হতে পারে। তবে বর্তমান সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হয়েছে, জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে, রাষ্ট্রপতির ভাষণ হয়েছে এবং সেই ভাষণের ওপর সরকার ও বিরোধী দল আলোচনা করেছে। তাই বর্তমান সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।’ বিরোধী দলের দুটি শপথের প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ। এটি কালারেবল লেজিসলেশন। আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানে যদি সংস্কার পরিষদের বিধান যুক্ত হয়, তখন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।’

২০২৫ সালের নভেম্বরে গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সেই অধ্যাদেশ অনুযায়ী গণভোটে চারটি প্রশ্ন উপস্থাপন করা হয়। ওই চার প্রশ্নে হ্যাঁ/না ভোট হয়েছে। প্রশ্নগুলো ছিল ‘(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে। (খ) আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষবিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে। (গ) সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হইতে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হইয়াছে-সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকিবে। (ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে।’ যদি চার প্রশ্নের ধারাবাহিক সমাধানের পথ নিয়ে আলোচনা করতে হয়, তা হলেও নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে সর্বপ্রথম আলোচনা করতে হবে। আদালতের রায় অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশন গঠনই সবার আগে হওয়া উচিত। সেজন্যই দরকার সংবিধান সংশোধন। সে পরিপ্রেক্ষিতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলেও সংবিধান সংশোধন করতে হবে। আর সেই আলোচনার উপযুক্ত স্থান সংসদের সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি। সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি বিচার বিভাগ, আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী, সংবাদপত্রের সম্পাদক, বিভিন্ন অংশীজন এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে। সংসদেও এ বিষয়ে আলোচনা হবে।

সংবিধান সংশোধন নাকি সংস্কার-এ নিয়ে দলগুলোর মধ্যকার বিরোধ পুরোনো। জুলাই জাতীয় সনদ যখন হয় তখন ৩৩টি দল ও জোটের সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন আলোচনা করেছিল। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সভাপতি করে আট সদস্যের এ কমিটির সব কাজেরই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান সম্পর্কিত। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে। দলটি নিজেদের ভিন্নমতের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে। সে কারণে সে সময় ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো হুবহু বাস্তবায়নের পক্ষে। তারা এটিকে সাধারণ সংবিধান সংশোধন নয়, ‘সংবিধান সংস্কার’ হিসেবে দেখছে। এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার নির্ধারিত সময় গত ১৫ মার্চ শেষ হয়েছে।

অন্যদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও জুলাই অভ্যুত্থানকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ৫ আগস্ট জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর উদ্বোধন করবেন। জুলাই যোদ্ধাদের জন্য ভাতা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেওয়া হয়। প্রতি শহীদ পরিবারকে এককালীন ৩০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। আহত জুলাই যোদ্ধাদের তিন শ্রেণি আছে। যারা বেশি আহত তাদের ‘ক’, তার পরে ‘খ’, তার পরে ‘গ’ শ্রেণি। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় গুম, আয়নাঘরে বন্দি রাখা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ সব ঘটনার জন্য ইতোমধ্যে আদালতে মামলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা করেছিলেন। বর্তমানে মামলার সংখ্যা ৯৫টি। এর মধ্যে ১২টির তদন্ত শেষ হয়েছে এবং সেগুলো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে রয়েছে। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকেও বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম না দিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম করতে হয়তো আজকালের মধ্যেই কর্মসূচি দিতে পারে। তাদের অন্যতম দাবি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন। এর জবাবে সরকার ও সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের অত্যন্ত যৌক্তিক এবং রাজনৈতিক কৌশলে তাদের মোকাবিলা করতে হবে। প্রশ্ন রাখতে হবে, যে গণভোট ও গণরায়ের কথা তারা বলছে, সেই গণভোটের কোনো ভিত্তি আছে কি না? সেই গণভোটের আইনি ভিত্তি কী ছিল? যে ব্যবস্থার অধীনে সেটি করা হয়েছিল, তা আইন নয়, একটি নির্বাহী আদেশের ভিত্তিতে ছিল। সেই আদেশও কোনো জাতীয় রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে জারি করা হয়নি। অন্যদিকে জুলাই জাতীয় সনদ এবং জুলাই ঘোষণাপত্র রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার মাধ্যমে, ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত হয়েছে। সেখানে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর স্বাক্ষর রয়েছে। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সেটি হয়েছিল। কিন্তু পরে বাস্তবায়নসংক্রান্ত যে আদেশ জারি করা হয়, তা যে কোনো সর্বদলীয় আলোচনা বা রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে হয়নি, এটাও সবাইকে মনে করিয়ে দিতে হবে।

রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই-এমন একটি মতলববাজি মন্তব্য অনেক দিন ধরেই প্রচলিত আছে। কিন্তু এর বাস্তবতা এখন একটু ভিন্ন হওয়া উচিত। রাজনীতিতেও শেষ কথা বলে কিছু থাকতে হবে। শত্রুকে শত্রু, মিত্রকে মিত্র হিসেবেই চিহ্নিত করতে হবে। যারা দেশের স্বাধীনতার শত্রু ছিল, তাদের রাজনৈতিক কারণে মিত্র ভাবতে শুরু করলে বিএনপি আবারও ভুল করবে। একাত্তরের বিজয় আর জুলাইয়ের বিজয়কে ইতিহাসের এক পাল্লায় মাপার অপচেষ্টা চলছে। সেই ফাঁদে পা দিলে সর্বনাশ হবে দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী শক্তির। সুতরাং সংবিধান সংস্কারের নামে স্বাধীনতাবিরোধীদের নীলনকশার জালে জড়ানো যাবে না কিছুতেই।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

[email protected]​​​​​​​

রোহিঙ্গায় পাহাড়ধস কক্সবাজারের সর্বনাশ

অদিতি করিম
রোহিঙ্গায় পাহাড়ধস কক্সবাজারের সর্বনাশ

কক্সবাজারজুড়ে এখন পাহাড়ধসের আতঙ্ক। এই কদিনের ভারি বর্ষণে পাহাড়ধসে মারা গেছে অন্তত দুই ডজন মানুষ। এখনো মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে সহস্রাধিক মানুষ। বর্ষা কেবল শুরু হয়েছে, সামনে বাড়তে পারে মৃত্যুর মিছিল। গত ৯ বছরে এই পর্যটননগরীতে পাহাড়ধসের ঘটনা বেড়েই চলেছে। ২০১৭ সালে কক্সবাজারে মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় গ্রহণের পর থেকেই এ অঞ্চলে পাহাড়ধসসহ নানান প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৯ বছরে কক্সবাজারে পাহাড়ধসে শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। অথচ ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে পাহাড়ধসে মারা যায় মাত্র নয়জন।

২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গা ঢলের পর উঁচুনিচু পাহাড়ের ঢালুতে আশ্রয় নেয় লাখ লাখ রোহিঙ্গা; যা ছিল একসময়ের গভীর বন। ছিল বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য।

উখিয়ার ৩৩ রোহিঙ্গা শিবিরই পাহাড়ে গড়ে ওঠে। সব শিবিরে বর্ষা মানেই আতঙ্ক। ভারি বর্ষণ শুরু হলেই মৃত্যুভয়। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে ২ লাখ রোহিঙ্গা।

পাহাড় কেটে রোহিঙ্গা বসতি স্থাপন করায় পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। বন উজাড় হয়েছে। বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।

উল্লেখ্য, গত বছরে নতুন করে এসেছে আরো ২ লাখ রোহিঙ্গা। তাদের সবার বসতি উঁচু পাহাড়ে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে তারাই। কক্সবাজারের বনাঞ্চল উজাড়, পাহাড় কাটা এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় রোহিঙ্গাসংকটের অন্যতম বড় পরিবেশগত প্রভাব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আশ্রয়শিবির নির্মাণের জন্য বিপুল বনভূমি ব্যবহার করা হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসের ঘটনা হলেই কেবল কক্সবাজারের পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে আলোচনা হয়, কিছু মৃত্যু নিয়ে হইচই হয়। কিন্তু বর্ষা মৌসুম চলে গেলেই আমরা সব ভুলে যাই!

কক্সবাজার। বাংলাদেশের পর্যটননগরী। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকত। অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি। বাংলাদেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। কক্সবাজার ঘিরে বাংলাদেশ পর্যটন খাতে বছরে অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারত। কিন্তু ২০১৭ সাল থেকে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার চাপে এ পর্যটননগরী আজ মৃতপ্রায়। বিদেশি পর্যটক দূরের কথা, দেশি পর্যটকরাও এখন কক্সবাজার ভ্রমণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। রোহিঙ্গাদের চাপে এখানে শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটেনি। এ জনপদ হয়ে উঠছে মাদক, অস্ত্র চোরাচালানের আন্তর্জাতিক রুট। মানব পাচারসহ নানান অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের পর্যটননগরী।

রোহিঙ্গাসংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশকে বিপুলপরিমাণ অবকাঠামো, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। যদিও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো উল্লেখযোগ্য সহায়তা প্রদান করছে, তবু স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং অন্যান্য সরকারি সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কক্সবাজার অঞ্চলের স্থানীয় জনগোষ্ঠী কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবও অনুভব করছে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, আশ্রয়শিবিরসংলগ্ন এলাকায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব জটিল ও বহুমাত্রিক।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে আশ্রয়শিবিরে মাদক পাচার, মানব পাচার, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলো ঘিরে গড়ে উঠেছে অপরাধ জগতের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এলাকাবাসী। গত ৯ বছরে এখানে সহিংসতায় সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। কক্সবাজারে অবাধে আসছে অবৈধ অস্ত্র, মাদক; যা বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সাগরপথে অবৈধভাবে বিদেশযাত্রায় শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাগরপথে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার সূচনা হয়েছে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের পর থেকে। রোহিঙ্গারাই এসব মানব পাচার নেটওয়ার্কের মূল হোতা। সহজেই এরা বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেয়ে যাচ্ছে, যা ব্যবহার করে এভাবে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। যখন তাদের দুর্ঘটনার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় তখন বদনাম হচ্ছে বাংলাদেশের। এদের জালিয়াতি ও প্রতারণার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা কার্যক্রম বন্ধ অথবা কঠিন করে দিয়েছে।

এর ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম বড় উৎস জনশক্তি রপ্তানি খাত আজ হুমকির মুখে।

স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সীমিত সম্পদ ভাগাভাগি, শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা এবং অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সামাজিক টানাপোড়েনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাসহ বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রমও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। জাতিসংঘের সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে অর্থায়ন কমে গেলে সংকট আরো জটিল হতে পারে। এমনিতেই বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক সংকটে, তার ওপর এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার চাপ সামাল দেওয়া বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এখন বড় বাধা।

রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের নিরাপত্তা হুমকি ও দোদুল্যমান অবস্থায় থাকবে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা নানান ধরনের সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। এ সংকট ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি করেছে। আর বাংলাদেশ এর কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এটি ভবিষ্যতে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আঞ্চলিক সংঘাত সৃষ্টি করবে। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এবং আরাকান আর্মি কর্তৃক বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ফলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন বলে মনে করেন সামরিক বিশ্লেষকরা। চলতি মাসে আবারও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু ও বুথিডং টাউনশিপে আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে যুদ্ধবিমান থেকে ধারাবাহিক বিমান হামলা চালায় দেশটির সামরিক জান্তা। সীমান্তের ওপারে বিস্ফোরণের বিকট শব্দে টেকনাফের জাদিমোড়া থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা বার বার প্রকম্পিত হয়। এ অবস্থায় যেকোনো সময় বাংলাদেশ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আর এ কারণেই রোহিঙ্গাসংকট মোকাবেলায় সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের ‘জাতীয় কর্মপরিকল্পনা কমিটি’ গঠন করেছে। বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি এ সংকট মোকাবেলায় আরো বেশি নিরাপত্তামূলক দৃষ্টিভঙ্গির দিকে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে এ পদক্ষেপ। গত রবিবার প্রকাশিত সরকারি গেজেট অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গঠিত এ কমিটিতে সামরিক বাহিনী, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী এ কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন আর সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) থাকবেন প্রধান সমন্বয়কারী। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালককে সদস্যসচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পরপরই এ কমিটি গঠন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সরকার যে রোহিঙ্গা ইস্যুকে গুরুত্ব দিচ্ছে এ কমিটি তার একটা ইঙ্গিত। আশা করি সরকার রোহিঙ্গাসংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেবে। রোহিঙ্গারা এখন শুধু কক্সবাজারের জন্য নয়, গোটা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তাই যত তাড়াতাড়ি তাদের প্রত্যাবাসন হয়, ততই দেশের জন্য নিরাপদ।

লেখক : নাট্যকার ও কলাম লেখক

ইমেইল : [email protected]

চলতি দুর্যোগ মোকাবেলায়ও কাণ্ডারির স্টিয়ারিংয়ে সশস্ত্র বাহিনীর সুসমন্বয়

মোস্তফা কামাল
চলতি দুর্যোগ মোকাবেলায়ও কাণ্ডারির স্টিয়ারিংয়ে সশস্ত্র বাহিনীর সুসমন্বয়

বন্যা, জলাবদ্ধতা, ঢলসহ চলমান দুর্যোগ-দুর্বিপাক কতটা প্রাকৃতিক আর কতটা মানবসৃষ্ট, এ নিয়ে গণমাধ্যমের নানা বিশ্লেষণের দিকে তাকানোর অবকাশ নেই সশস্ত্র বাহিনীর। সেই চর্চা বা অভ্যস্ততাই নেই তাদের। জীবন ও সম্পদ রক্ষাসহ দুর্যোগ মোকাবেলায় যথারীতিসমন্বিতভাবে নেমে পড়া তাদের বৈশিষ্ট্য। যথারীতি স্থলে, জলে, সীমান্তেও এ কাজে নেমেও পড়েছে। এ জন্য তাদের তাগিদ দিতে হয় না। বড় রকমের হুকুমনামা জারি করতে হয় না। নতুন করে প্রস্তুতিও নিতে হয় না। এভাবেই তারা রপ্ত ও অভ্যস্ত। বৈশিষ্ট্যের এ ধারাবাহিকতার কারণেই বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর দক্ষতা, সাহস, দুর্যোগ মোকাবেলা ও ব্যবস্থাপনার বিশ্ব স্বীকৃতি। অনুকরণীয় মডেল হিসেবে পরিচিতি। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের মানবিক সহায়তা মিশন এবং ত্রাণ ব্যবস্থাপনার  প্রশংসা নিয়মিত করে চলছে। এ ধরনের স্বীকৃতি, কদর, প্রশংসা প্রকারান্তরে যোগ হচ্ছে বাংলাদেশ নামক দেশটির ঝুড়িতে।

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, তিন পার্বত্য জেলাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবেলায় তাদের সমন্বিত কাজ মানুষকে ভরসা জাগাচ্ছে। দেশের চলমান বন্যা ও পাহাড়ধস পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন সরাসরি তদারকি করছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের নেওয়া তাৎক্ষণিক ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে : দুর্গতদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা, পানিবাহিত রোগ ও সাপের দংশন মোকাবেলায় পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন এবং ওষুধসহ মেডিক্যাল টিম মোতায়েন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, মৎস্যজীবী, গবাদি পশুর খামারি ও সাধারণ গৃহস্থদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া, পানি নেমে যাওয়ার পর দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা মেরামত ইত্যাদি।

অতি বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং সমুদ্রের অস্বাভাবিক জোয়ারের প্রভাবে চট্টগ্রামে নগরে জলাবদ্ধতার পর এবার উপজেলাগুলোতেও জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত। চরম দুর্ভোগে পড়া সেই চট্টগ্রামবাসীর পাশে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর পাশে দাঁড়ানোর কার্যক্রম নিজ চোখে না দেখলে কারো কারো বোধগম্য নাও হতে পারে। সেনাবাহিনী কত দ্রুতগতিতে উত্তর চট্টগ্রামে বোয়ালখালী, হাটহাজারী এবং ফটিকছড়ির দুর্গম এলাকার দুর্গততের কাছে জরুরি ত্রাণ এবং চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দিয়েছে, তা উপকারভোগীদের কাছেও তাজ্জবের। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ এলাকায়ও সেনাবাহিনী ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছে। এর বাইরে হাজারেরও বেশি মানুষকে জরুরি চিকিৎসাসেবার আওতায় এনেছে সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল টিম। নৌবাহিনী পতেঙ্গার বিজয় নগর, আকমল আলী রোড, নিউ মুরিং মাদরাসা, নারিকেলতলা ও নেভি হাসপাতাল গেট এলাকায় পানিবন্দি পরিবারগুলোর মাঝে প্যাকেট রান্না করা খাবার পৌঁছে দিয়েছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে না আসা পর্যন্ত চলবে নৌবাহিনীর এ কার্যক্রম।

সীমান্তে শত কাজের ব্যস্ততার মাঝে বান্দরবান, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, ফেনী, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুরসহ মোট বন্যাকবলিত ১১ জেলায় বিজিবি মোতায়েন রয়েছে। এ ১১ জেলার শখানেক পয়েন্টে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও মনিটর করছে বিজিবি। সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক উদ্ধার ও মানবিক সহায়তাও দিচ্ছে। রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে ক্ষতিগ্রস্ত ও পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে ছুটে গেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি। আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া শত শত মানুষের মাঝে রান্না করা উন্নতমানের খাবার দিয়েছে। করেছে সুপেয় পানির ব্যবস্থাও। নাইক্ষ্যংছড়িতে ভূমিক্ষয়ের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়া স্টিলের সেতু রক্ষায় জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।

সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিয়ে বিজিবি সদস্যদের ওই কর্মতৎপরতায় মুগ্ধ দুর্গতরা। পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বিজিবি কর্মকর্তাদের দুর্গতদের খোঁজখবর নেয়ার ধরন, পানিবাহিত রোগ সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ চরম দিনে পরম পাওয়া। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে এ মানবিক ও  জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে বিজিবির হাই কমান্ডের নেতৃত্বেরও। দুর্যোগ মোকাবেলায় সশস্ত্র বাহিনীর এ বিশ্ব স্বীকৃতি একদিনে আসেনি। তা প্রশংসায় ভরিয়ে দেওয়ার ‍স্তুতির কূটনীতিও নয়। পদে পদে, সময়ে সময়ে কাজের স্বীকৃতির স্মারক। বিশ্বশান্তি রক্ষা ও মানবাধিকার রক্ষায় অনবদ্য অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর কাজের ধরনকে ‘রোল মডেল’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে অনেক আগেই। জাতিসংঘ মিশনে বিশ্বশান্তি রক্ষার পাশাপাশি যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দুর্যোগকবলিত বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জরুরি উদ্ধার, চিকিৎসাসেবা ও ত্রাণ তৎপরতাসহ মানবিক সেবার ধরন বিশ্বকে তাক লাগিয়েছে। এ জন্য অসংখ্যবার জাতিসংঘ পদক ও সম্মাননায় ভূষিত করা হয়েছে বাংলাদেশকে এবং বাংলাদেশের এ সন্তানদের। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক সমন্বয় বৃদ্ধির জন্য এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বৃহত্তম মহড়া ‘ডিজাস্টার রেসপন্স এক্সারসাইজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ’ নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে আয়োজিত হয়, যেখানে সশস্ত্র বাহিনী বিশ্বমঞ্চে তাদের সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার ও নেপালে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী সফলভাবে জরুরি উদ্ধার ও মানবিক সহায়তা মিশন পরিচালনা করে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসিত।

নিজ দেশে সিডর, আইলা, করোনা মহামারিসহ নানা দুর্যোগে জীবন বাজি রেখে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনায় তাদের ভূমিকা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত। সাম্প্রতিক বিপর্যয়ে যার আরেক ঝলক দুর্যোগ মোকাবেলা ও ব্যবস্থাপনার এ কাণ্ডারিদের।  ‘সমরে আমরা, শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা দেশের তরে’ দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে সেনাবাহিনী দেশের যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় থাকে আগোয়ান থাকে বলেই তাদের কাছে ভরসা বেশি। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রায় সবার মাঝে যখন এক চিন্তা—কিভাবে বানভাসিদের দুর্যোগ থেকে রক্ষা করা সম্ভব, তখন ঠিকই জেগে ওঠে বাংলাদেশ। মানবিকতার অনন্য নজির, অভূতপূর্ব ঐক্য ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে। দেশপ্রেম আর সর্বজনীন কল্যাণবোধের মানবিক গুণে উদ্ভাসিত হয়ে সৌহার্দ্য, সহানুভূতি, চিন্তাশীলতা আর ন্যায়বোধে সমহিমায় বলিয়ান হয়ে নেমে পড়েছে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। তা শুধু বস্তুগত নয়, এক অনন্য আন্তরিক-মানবিক সংযোগও। দুর্দশাগ্রস্ত মানুষকে নিরাপদে উদ্ধারের পাশাপাশি অভুক্তদের আহারের বন্দোবস্ত কিংবা বেঁচে থাকাদের সান্ত্বনা সবই রয়েছে তাদের কাজের ভলিউমে।

বাংলাদেশ বিশ্বে দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর অন্যতম। উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতি বছর বাংলাদেশকে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগের মোকাবিলা করতে হয়। ভৌগোলিক অবস্থান, উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে দেশটিতে দুর্যোগ অনেকটা নিয়তির মতো। তা কখনো প্রাকৃতিক, কখনো  মনুষ্যসৃষ্ট। সশস্ত্র বাহিনী সেই তফাত দেখতে যায় না। হোক প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগ দুর্যোগই তাদের কাছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্য হলো ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা, ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের পাশে দাঁড়ানো এবং দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ সুগম করা। এ কঠিন বাস্তবতায় কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিন ধরেই এক অনন্য ও নির্ভরযোগ্য ভূমিকা। ভরসার জায়গাও। দেশে কোনো বড় দুর্যোগ দেখা দিলে দল-মত-নির্বিশেষে মানুষের প্রথম প্রত্যাশাই থাকে সেনাবাহিনী মোতায়েনের, যা এই বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থার প্রতিফলন। ঘূর্ণিঝড় সিডর, বুলবুল কিংবা আইলার মতো দুর্যোগের সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ব্যাপক ত্রাণ এবং উদ্ধার তৎপরতা দেশে দেশে পাঠ-পঠনের বিষয়। সাভার রানা প্লাজা ধসের মানবসৃষ্ট দুর্যোগ সামলানোর সেই চেষ্টা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এখনো আসছে উদাহরণ হয়ে। রানা প্লাজা ধস চলতি শতাব্দীতে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ বিপর্যয়। ২০১৩ সালের ১৪ এপ্রিল ৯ তলা ভবনটি হঠাৎ ধসে পড়ে। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় ১ হাজার ১১৫ জন মানুষ নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়। রানা প্লাজা ধসের পর সপ্তাহব্যাপী উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব প্রদান করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের জীবন রক্ষা করতে সক্ষম হয়।

দেশের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা তাদের প্রধান দায়িত্ব হলেও প্রয়োজনের সময় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করা সেনাবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, মানবিক সহায়তা এবং জাতি গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ সর্বজনস্বীকৃত। দুর্যোগ মোকাবিলার এ কাজটি করতে গিয়ে প্রায় সব ক্ষেত্রেই অগ্রভাগে থাকে। ভবন ধস, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা অগ্নিকাণ্ডে আটকে পড়াদের উদ্ধারে নিজ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেনাবাহিনীর কর্মতৎপরতা বরাবরই সাহসের গৌরব গাঁথা। দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে নৌযান, বিশেষায়িত অনুসন্ধান দল এবং আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহারের মাধ্যমে ছুটে যায় তারা। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল টিম আহতদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা, নিরাপদে হাসপাতালে স্থানান্তর এবং প্রয়োজন হলে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যবস্থাও করে। যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় তারা সর্বদা নিজেদের প্রস্তুত রাখতে অভ্যস্ত হয়ে এখন ভরসার সমান্তরালে কাণ্ডারির ভূমিকায়। যার সর্বশেষ ছাপ এখন দেশের দুর্যোগপীড়িত এলাকায়।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

সাঙ্গু নদী : পার্বত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনীর উন্নয়ননির্ভরতা ও পাহাড়কেন্দ্রিক অর্থনীতির রূপকার

লেফটেন্যান্ট কর্নেল নূর মো. সিদ্দিক সেলিম
সাঙ্গু নদী : পার্বত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনীর উন্নয়ননির্ভরতা ও পাহাড়কেন্দ্রিক অর্থনীতির রূপকার
লেফটেন্যান্ট কর্নেল নূর মো. সিদ্দিক সেলিম। ছবি : সংগৃহীত

দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলা নিয়ে গঠিত দেশের বৃহত্তম পাহাড়ি অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রাম। দেশের মোট আয়তনের প্রায় এক-দশমাংশ জুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চল ভৌগোলিক, কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পাহাড়, বনভূমি, বহমান নদী ও ঝরনার সমন্বয়ে এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক রূপ যেন এক অনন্য সৃষ্টি। পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করে, যাদের মধ্যে চাকমা, মারমা, ম্রো, বম, ত্রিপুরা, লুসাই, খুমি, খিয়াং, পাংখোয়া, তঞ্চঙ্গ্যা ও কুকি উল্লেখযোগ্য। সবাই তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রেখে একসঙ্গে বসবাস করে এলেও জীবনমান উন্নয়নের সীমাবদ্ধতা নিয়ে তারা সর্বদাই সোচ্চার।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সাল থেকে এই অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। পাশাপাশি এই এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ১৯৭৬ সাল থেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স নিয়োজিত রয়েছে। বর্তমানে কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স এর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা) প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে।

নদী

সাঙ্গু নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত বান্দরবান জেলায় সীমান্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের ৩৪৯ কিলোমিটারের মধ্যে ১০৫ কিলোমিটারের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং অবশিষ্ট ২৪৪ কিলোমিটারের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়াও সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী থানচি-আলীকদম, থানচি-চিম্বুক, থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি ও বান্দরবান-রুমা সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড নিয়োজিত রয়েছে।

উল্লেখিত প্রকল্পসমূহের কাজ অনেকাংশে সাঙ্গু নদীর পানি ও বালি সরবরাহের উপর নির্ভরশীল। বর্ষা মৌসুমে নির্মাণ সামগ্রী পরিবহন ও নির্মাণ কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার জন্য সাঙ্গু নদী এবং এর সঙ্গে যুক্ত ঝিরিসমূহ প্রধান ভরসা। এছাড়াও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় এই নদীর কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম।

সাঙ্গু নদীর তীর ঘেঁষে দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে রয়েছে বিজিবির গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত চৌকি। এই নদী ও আশেপাশের ঝিরি ব্যবহার করে বিজিবি গহীন জঙ্গলে দ্রুত টহল ও নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলশ্রুতিতে সীমান্তে চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশসহ অন্যান্য সকল কার্যক্রম রোধ এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখাসহ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা রাখছে।

সাঙ্গু নদীর উৎপত্তিস্থল বান্দরবান জেলার বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চল মদকসংলগ্ন আরাকান পাহাড় থেকে। নদীটি বান্দরবানের থানচি, রুমা, রোয়াংছড়ি, বান্দরবান সদর হয়ে চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া ও আনোয়ারা উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। সাঙ্গু নদীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর প্রবাহপথ, যা পূর্ব দিক হতে পশ্চিম দিকে প্রবাহমান। সাধারণত দেশের অধিকাংশ নদীর প্রবাহ উত্তর থেকে দক্ষিণ বা উত্তর-পূর্ব দিক হতে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে হলেও সাঙ্গু নদী এর ব্যতিক্রম। এই কারণে নদীটির প্রবাহপথ এবং ভৌগোলিক চরিত্র বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

সাঙ্গু নদী বান্দরবান ও এর আশেপাশের মানুষের জন্য প্রকৃতির এক আশীর্বাদ, পাহাড় কেন্দ্রিক অর্থনীতির প্রাণভোমরা। নদীর তীরবর্তী জনগোষ্ঠীর ৯০ শতাংশই মারমা এবং জীবন-জীবিকাসহ দৈনন্দিন কাজে এরা এই নদীর ওপর নির্ভরশীল।

সাঙ্গু নদীর পানি স্বচ্ছ এবং শীতল, যা পাহাড়ি পরিবেশে অপরূপ সৌন্দর্য এনে দিয়েছে। এই নদীর তীরবর্তী এলাকা বনজ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এবং জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। নদীর তীরবর্তী এলাকায় পাহাড় ও সবুজ বন ঘেরা ছোট গ্রাম এবং বাঁশের তৈরি ঘরগুলো মিলে একটি স্বতন্ত্র ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশ তৈরি করে। এই নদীর সঙ্গে বান্দরবান জেলা এবং এর আশেপাশের এলাকার বহু মানুষের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস জড়িত।

সাঙ্গু নদী সংলগ্ন অধিকাংশ পাহাড়ি মানুষের জীবিকা জুম চাষের উপর নির্ভরশীল। পাহাড়ের ঢালে তারা জঙ্গল পরিষ্কার করে ধান, ভুট্টা, আদা, হলুদ ও মরিচ ইত্যাদি চাষাবাদ করে থাকে। বর্ষা মৌসুমে জুম চাষের জন্য এই নদী সংলগ্ন পাহাড়ি ঝিরি ও নদীর পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আবার শীতকালেও সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে ব্যাপক হারে শাকসবজি ফলন হতে দেখা যায়। লাউ, কুমড়া, শসা, বেগুন, বরবটি ও টমেটোসহ নানা ধরনের মৌসুমি সবজি সাঙ্গু নদীর পানি ব্যবহার করে চাষ করা হয়। এই কৃষিপণ্য শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ফলে সাঙ্গু নদী এক কথায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অর্থনীতির চালিকা শক্তি। এ ছাড়া এই নদীর পানি তীরবর্তী মানুষের জন্য রান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া এবং পানীয় জল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

পাহাড়ের অনেক পাড়ায় ও গ্রামে এখনো বিশুদ্ধ পানির আলাদা কোনো উৎস না থাকায় সাঙ্গু নদীই তাদের নির্ভরতার একমাত্র উৎস। নদী থেকে সহজেই পানি সংগ্রহ করা যায় বলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী নদীর কাছাকাছি বসতি গড়ে তুলেছে। পাশাপাশি নদীটি পাহাড়িদের সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

ত্রিপুরা, ম্রো, বম, মারমা ও চাকমা জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে নদীকে কেন্দ্র করে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, যা তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থায় যুগ যুগ ধরেই বান্দরবান ও এর আশেপাশের মানুষের জন্য সাঙ্গু নদী একটি সহজ ও কার্যকর বিকল্প পরিবহন পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

থানচি থেকে মদক পর্যন্ত নৌকা চলাচল এই অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। নদীপথে মালামাল পরিবহন সহজ, সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব বিধায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহন মাধ্যম। একই সঙ্গে নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দেশের অনেক জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা।

থানচি, রিমাকরি, নাফাখুম ও আমিয়াখুম জলপ্রপাত, তিন্দু সংলগ্ন বড় পাথরের মতো দর্শনীয় স্থানগুলো এই নদীর তীরবর্তী সৌন্দর্যের বিস্ময়ে আঁকা। নদী পথে নৌকা ভ্রমণ, ক্যাম্পিং এবং স্থানীয় আদিবাসী সংস্কৃতি পর্যটকদের জন্য রোমাঞ্চকর এবং আনন্দময় অভিজ্ঞতা।

পানির উপর দিয়ে চলা বাঁশের ভেলা, দুই পাশের সবুজ পাহাড়, ঝিরিপথ ও ঝরনার কলকল ধ্বনি তৈরি করে এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

সাঙ্গু নদীকে ঘেরা অপরূপ বৈচিত্র্য উপভোগ করতে আসা পর্যটকদের মাধ্যমে স্থানীয় হোটেল, রিসোর্ট, গাইড (নির্দেশিকা), নৌকা চালক ও দোকানিরা সরাসরি আর্থিকভাবে উপকৃত হন এবং এর মাধ্যমে পাহাড় কেন্দ্রিক অর্থনীতি আরো গতিশীল হয়ে ওঠে।

সাঙ্গু নদী বর্ষাকালে শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত থাকলেও শীতকালে এই নদীর পানি প্রবাহ অনেকটাই কমে যায়। অনেক স্থানে নদীর তলদেশ প্রায় শুকিয়ে যায়, যা প্রাকৃতিক কারণের চেয়ে মূলত মানবসৃষ্ট কারণেই হয়ে থাকে। এই পানি সংকটের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে, যার মধ্যে অপরিকল্পিত জুম চাষ, বনভূমি ধ্বংস এবং পানি সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকাই উল্লেখযোগ্য।

অপরিকল্পিত জুম চাষের কারণে নদী সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকার মাটি ক্ষয় হয়ে বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে, যার ফলে নদীর স্বাভাবিক পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বর্ষা মৌসুমে সাঙ্গু নদীর পাহাড়ি মাটিযুক্ত পানির প্রবাহ বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিলিত হওয়ার ফলে সমুদ্রের তলদেশও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ পাহাড়ি ঝিরি শুকনা মৌসুমে পানির প্রবাহের জন্য আশেপাশের বনভূমির উপর নির্ভরশীল। পরিলক্ষিত হয় যে, যেসব ঝিরির পাশে বনভূমির পরিমাণ বেশি থাকে, সেইসব ঝিরির পানি প্রবাহ শুকনা মৌসুমেও চলমান থাকে। এ ক্ষেত্রে আশেপাশের বনভূমি প্রত্যেকটি ঝিরির জন্য প্রাকৃতিক পানির সংরক্ষণাগার হিসেবে কাজ করে এবং বছর জুড়ে পানি নির্গমনের মাধ্যমে ঝিরিতে পানির প্রবাহ সচল রাখে। ঝিরির পানি প্রবাহের সঙ্গে সাঙ্গু নদীর পানি প্রবাহ জড়িত।

অপরিকল্পিত জুম চাষের ফলে সাঙ্গু সংলগ্ন ঝিরিসমূহ শুকিয়ে যাওয়ার কারণে এর প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে। এছাড়াও বর্জ্য ফেলা, পাথর ও বালি উত্তোলন এবং বসতবাড়ির সম্প্রসারণ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বিঘ্নিত করছে। বলা যায়, সাঙ্গু নদীতে শীতকালে পানি সংকট মূলত মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের ফলাফল।

বন ধ্বংস, অপরিকল্পিত কৃষি ও অব্যবস্থাপনার কারণে নদীর উৎস ও পরিবেশের উপর চাপ পড়ছে। এই সমস্যা সমাধানে জরুরি ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ এবং স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যতে সাঙ্গু নদীর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

শীতকালে সাঙ্গু নদীর পানি স্বল্পতা পার্বত্য অঞ্চলের সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থায় ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। পানির অভাবে জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হয় না, ফলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং কৃষকের আয়ের পথ সংকুচিত হয়। গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ অনেকটা সীমিত হয়ে পড়ে, যার কারণে পানি সংগ্রহের জন্য নারী ও শিশুদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়।

পাহাড়ি এলাকার সরু ও কঠিন সড়ক পথে সব সময় যাতায়াত সম্ভব হয় না বিধায় নদীপথ অচল হলে বাণিজ্য ও পরিবহন থমকে যায়। অন্যদিকে, নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে পর্যটন খাত ক্ষতির সম্মুখীন হয়। পরিশেষে, নদীর পানি কমে যাওয়ায় সামাজিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলে; যেমন বিজিবির সীমান্ত নজরদারি ও দ্রুত টহল কার্যক্রমের সক্ষমতা হ্রাস পায় এবং সীমান্তে চোরাচালান বা অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সাঙ্গু নদীকে টিকিয়ে রাখা এবং শীতকালে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ।

পার্বত্য অঞ্চলের পরিবেশ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা সবই সাঙ্গু নদীর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই সাঙ্গু নদীকে বাঁচানো মানে পাহাড়কে বাঁচানো। নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার জন্য কয়েকটি বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন করে রাবার ড্যাম নির্মাণের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা, নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস করে অপরিকল্পিত জুমচাষ হতে বিরত থাকার ব্যাপারে স্থানীয় জনগণকে উৎসাহিত করা ও বিকল্প জীবিকা সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া, নদী সংলগ্ন ঝিরির দুই পার্শ্বের বনভূমি সংরক্ষণের ব্যাপারে নদীর তীরবর্তী ও এর আশেপাশের মানুষকে প্রয়োজনীয় প্রেষণা প্রদান করা এবং নদী হতে অবৈধভাবে পাথর ও বালি উত্তোলন বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

সাঙ্গু নদী শুধু একটি প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ নয়, বরং এটি পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের প্রাণ। এই নদী পাহাড়কেন্দ্রিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড, সেনাবাহিনী কর্তৃক পাহাড়ে উন্নয়ন কার্যক্রমের নির্ভরতা এবং বান্দরবান জেলার দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত নিরাপত্তার অবলম্বন। 
নদীর প্রবাহে বহমান শুধু পানি নয়, বহমান পাহাড়ি মানুষের ইতিহাস, জীবন, সংস্কৃতি ও উন্নয়নের ধারা। কিন্তু আজ বিভিন্ন কারণে সাঙ্গু নদী বেঁচে থাকার লড়াইয়ে শ্রান্ত।

নদীর ক্ষুরধারা ক্রমেই নিম্নগামী হওয়ার কারণে এর স্বাভাবিক ছন্দে ভাটা পড়েছে। যে নদীর প্রবাহ একসময় বছর জুড়ে ছিল প্রাণবন্ত, আজ সে নিজেই প্রকৃতির কাছে বাঁচার আর্তনাদ করছে।

সাঙ্গু নদীকে বাঁচানোর দায়িত্ব শুধু পাহাড়িদের নয়, বরং এ দায়িত্ব আমাদের সকলের। এ নদী বাঁচলে নদীর তীরবর্তী মানুষ বাঁচবে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হবে, পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে এবং দেশের অর্থনীতিতে সমৃদ্ধি ঘটবে।

সাঙ্গু নদীর স্রোত প্রবাহিত থাকলে পাহাড়ে বয়ে যাবে উন্নয়নের জোয়ার, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী বাঁচবে, বাংলাদেশ অগ্রসর হবে তার স্বপ্নের গন্তব্যে। এখন এ সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে, আমরা সাঙ্গুর পাশে দাঁড়িয়ে তাকে আবার প্রাণবন্ত করে তুলতে চাই কিনা?

লেখক : অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক, সীমান্ত সড়ক (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য এলাকা) নির্মাণ প্রকল্প ও প্রকল্প পরিচালক, থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্প এবং অধিনায়ক, ১৭ ইসিবি।

ঘুষের রেট তিন গুণ, তবু নড়ে না ফাইল | কালের কণ্ঠ