• ই-পেপার

দুপুরের মধ্যে ৮ জেলায় ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের শঙ্কা

সরকারি চাকরিজীবীদের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নিয়ে বৈঠক আজ

অনলাইন ডেস্ক
সরকারি চাকরিজীবীদের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নিয়ে বৈঠক আজ

সুদমুক্ত ঋণে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য কেনা ব্যক্তিগত গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অর্ধেকে নামিয়ে আনার প্রস্তাব ঘিরে প্রশাসনে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অর্থ বিভাগের জারি করা একটি পত্রের এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বিষয়টি নিয়ে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বৈঠকে বসছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

জানা গেছে, গত ৯ জুলাই অর্থ বিভাগ থেকে জারি করা এক পত্রে সুদমুক্ত ঋণে কেনা গাড়ির মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৫০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়িসংক্রান্ত নীতিমালা, আদেশ বা নির্দেশনা জারির দায়িত্ব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের। সে বিবেচনায় অর্থ বিভাগের এমন পত্র জারির বৈধতা ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অর্থ বিভাগের পত্রে একাধিক স্থানে ‘প্রধানমন্ত্রী’ পদবি ব্যবহার করা হয়েছে, যা নিয়েও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে।

প্রাধিকারপ্রাপ্ত বিভিন্ন গ্রেডের কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ধরে তারা একই বেতন কাঠামোর আওতায় দায়িত্ব পালন করছেন। এ অবস্থায় বিদ্যমান সুবিধা কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের ভাষ্য, সরকারি কোনো আর্থিক সুবিধা একবার চালুর পর তা কমিয়ে আনার নজির অতীতে খুব একটা নেই।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়িসংক্রান্ত যাবতীয় আদেশ-নির্দেশ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকেই জারি করা হয়ে থাকে। অর্থ বিভাগ তাদের মতামত দিয়ে একটি পত্র জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। এ ধরনের নির্দেশনা জারির এখতিয়ার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের।’

তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আজ বৈঠক হবে। সেখানে অর্থ বিভাগের মতামতসহ সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পরে সেই সিদ্ধান্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও সিনিয়র সচিবকে অবহিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় মতামত অর্থ বিভাগে পাঠানো হবে।’

মব সহিংসতায় ছয় মাসে নিহত ১৩৩

অনলাইন ডেস্ক
মব সহিংসতায় ছয় মাসে নিহত ১৩৩

ছয় মাসে সারা দেশে মব সহিংসতায় ১৩৩ জন নিহত ও ২৫৬ জন আহত হয়েছেন। এসময় এ ধরনের ২৬১টি ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (১৫ জুলাই) হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

দেশের মূলধারার ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, এইচআরএসএসের সংগৃহীত তথ্য ও ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টের ভিত্তিতে ছয় মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এসব তথ্য সংকলন করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগ্‌বিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে এসব গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের একই সময়ে এ ধরনের ১৪১টি ঘটনায় অন্তত ৬৭ জন নিহত ও ১১৯ জন আহত হয়েছিলেন।

এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা, কারাগার ও হেফাজতে মৃত্যু, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাংবাদিক ও শ্রমিক নির্যাতন, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।’

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ছয় মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনায় দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দলে ৫৬ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৫ হাজার ২৪৬ জনের বেশি নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত এবং হামলার শিকার হয়েছেন।

রাজনৈতিক পরিচয় হিসাবে নিহত ৫৬ জনের মধ্যে বিএনপির ৩৭ জন, শতকরা হিসাবে যা প্রায় ৬৬ শতাংশ, জামায়াতে ইসলামীর ছয়জন, যা ১১ শতাংশ এবং আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) তিনজন।

এছাড়া ৮৩০টি সহিংসতার ঘটনার ৬৭৩টিই ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দল ও বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে; যা শতকরা হিসাবে ৮১ শতাংশ। প্রতিবেদনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার তথ্যে বলা হয়, গত ছয় মাসে নির্বাচনকেন্দ্রিক ৩৯৬টি সহিংসতার ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ২ হাজার ৫৭৮ জন আহত হয়েছেন।

এ ছাড়া নির্বাচনপূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ৬০০টির বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।

রাজনৈতিক মামলা ও আটকের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) এবং বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মধ্যকার সহিংসতায় এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ধারায় কমপক্ষে ১৪৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩ হাজার ২৬৮ জনের নাম উল্লেখ করে ও ২৪ হাজার ৫১৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে ১ হাজার ৬২১ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ১ হাজার ৪২ জন ছিল। অর্থাৎ, নির্যাতনের ঘটনা প্রায় ৫৬ শতাংশ বেড়েছে। এ বছর নির্যাতনের শিকার ১ হাজার ৬২১ জন নারী ও কন্যাশিশুর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪০৪ জন; যাদের মধ্যে ২৩৮ জন (৫৯ শতাংশ) ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। ৮৮ জন (২৭ শতাংশ) নারী ও কন্যাশিশু দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭ জনকে।

যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৯ জন ও আহত আটজন এবং তিনজন নারী আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৩২০ জন, আহত হয়েছেন ২১১ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ১৪৭ জন নারী।

মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে ৪০টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দেয়। এতে ৩১১ জন ব্যক্তি আহত ও ৩৮ জন আটক হন, যাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এই সময়ে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ৩০টি মামলায় ৮১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪৪ জনকে।

সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ছয় মাসে ২০০টি হামলার ঘটনায় ৩৮৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৩৪ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৬০ জন ও হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ৪৯ জন সাংবাদিক এবং ১১ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে।

সংখ্যালঘু নির্যাতন ও হামলার ঘটনার উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছয় মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫০টি হামলার ঘটনায় ৫৬ জন আহত হয়েছেন এবং ১৯টি মন্দির, ১৫টি প্রতিমা ও ৪৩টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

সীমান্তে হতাহত ও আটকের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৩২টি হামলার ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় ৯ জন নিহত ও ৩৫ জন আহত হয়েছেন, এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ ১৪ জন। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ২০টি সহিংসতার ঘটনায় একজন নিহত, পাঁচজন আহত ও পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হন।

এ বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ ও কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনায় ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রথম ছয় মাসে সারা দেশে কারাগারে কমপক্ষে ৫৮ জন আসামি মারা গেছেন। এর মধ্যে ১৫ জন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের এবং একজন বিএনপির ও ৪২ জন সাধারণ কয়েদি।

জুলাইয়ের প্রথম ১৪ দিনে রেমিট্যান্স এসেছে ১৫৪ কোটি ২০ লাখ ডলার

অনলাইন ডেস্ক
জুলাইয়ের প্রথম ১৪ দিনে রেমিট্যান্স এসেছে ১৫৪ কোটি ২০ লাখ ডলার

জুলাইয়ের প্রথম ১৪ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৫৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ দশমিক ৮০ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের একই সময় দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১২৬ কোটি ৬০ লাখ (১ দশমিক ২৬৬ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, শুধু ১৪ জুলাই একদিনেই প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১১ কোটি ৫০ লাখ (১১৫ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার।

ঐক্যের জুলাই থেকে বিভক্তির জুলাই

অনলাইন ডেস্ক
ঐক্যের জুলাই থেকে বিভক্তির জুলাই

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে ১৬ জুলাই একটি ঐতিহাসিক দিন। কোটা সংস্কারের দাবিতে দেশের ছাত্রসমাজ ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে যে আন্দোলনের সূচনা করেছিল, ১৬ জুলাই তা পূর্ণতা পায়। রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ আন্দোলন রূপ নেয় গণ আন্দোলনে। এ দিনটি ছিল ৫ আগস্টের গণ অভ্যুত্থানের টার্নিং পয়েন্ট। রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের বুলেটে নিহত শিক্ষার্থী আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত সেই ছবিটি ছড়িয়ে পড়লে মানুষ দলে দলে রাস্তায় নেমে আসতে থাকে। আন্দোলন হয়ে ওঠে সর্বব্যাপী। সেই সঙ্গে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড হয়ে ওঠে জুলাই আন্দোলনের অন্যতম ‘রূপান্তরকারী’ ঘটনা। একটি বুলেট যখন বন্দুকের নল থেকে বের হয়, সেটার ওপর কারও নাম লেখা থাকে না। কিন্তু যখন সেটা একজন ন্যায্য দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রের বুক ভেদ করে, সেই বুলেটই লিখে ফেলে ইতিহাস। ১৬ জুলাই তাই বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় দিন। আবু সাঈদের রক্ত সারা দেশের ছাত্র-জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করে। এই ইস্পাত কঠিন ঐক্য বাংলাদেশকে নিয়ে যায় মুক্তির পথে। এক অভূতপূর্ব আন্দোলনের মাধ্যমে পতন হয় ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের। সরকার ১৬ জুলাইকে শহীদ দিবস হিসেবে পালন করছে। এ উপলক্ষে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচি। ১৬ কেবল শহীদ দিবস নয়, বাংলাদেশের জনগণের অভূতপূর্ব ঐক্য আর সংহতির প্রতীক। বাংলাদেশের জনগণ যে ঐক্যবদ্ধ হলে সব কিছু জয় করতে পারে, ২৪ গণ অভ্যুত্থান তার প্রমাণ। আর এই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দিনটি হলো ১৬ জুলাই। এই দিনটি আমাদের ঐক্যের।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৬ জুলাই বাংলাদেশের আপামর জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল জন্যই বিজয় এসেছিল। জনগণ কী কেবল কোটা সংস্কারের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল? অবশ্যই না। এদেশের আপামর জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের সব স্তরের মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল, মানবাধিকারের জন্য, ভোটের অধিকারের জন্য। শিক্ষার্থীরা চেয়েছিল, রাজনীতি মুক্ত শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ। নারীরা চেয়েছিলেন সমতা এবং অধিকার। ব্যবসায়ীরা চেয়েছিলেন ব্যবসার পরিবেশ। সবাই মিলে বৈষম্য মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যেই এ ১৬ জুলাই ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। তাই ১৬ জুলাই জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। ২৪-এর জুলাই বাংলাদেশের জনগণের ঐক্যের স্মারক। কিন্তু আজ দুই বছর পর আমরা কি সেই ঐক্য ধরে রাখতে পেরেছি? যে আকাক্সক্ষা নিয়ে ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল, বাংলাদেশ কি সেই প্রত্যাশার পথে হাঁটছে? জুলাই বিপ্লব কি বাংলাদেশের জনগণকে বৈষম্য থেকে মুক্তি দিয়েছে? যে স্বপ্ন দিয়ে শিক্ষার্থী এবং মা-বোনেরা রাজপথে নেমেছিলেন সেই স্বপ্ন পূরণের পথে কী বাংলাদেশ হাঁটছে? এই প্রশ্নের উত্তরে এদেশের বেশির ভাগ মানুষই হতাশার কথা বলবেন। তারা বলবেন, জুলাইয়ের স্বপ্ন পূরণ হয়নি। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, জুলাই আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারাও বলছেন, জুলাই গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক নতুন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, দুই বছর পরও সেই আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কেন? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর, ২৪-এর জুলাইয়ে যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, সেই ঐক্য আমরা ধরে রাখতে পারিনি। গণ অভ্যুত্থানের দুই বছর পর আবারও বিভাজন আর বিভক্তি সবখানে। রাজনৈতিক দলগুলো এখন বহুধা বিভক্ত। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দেয়নি বিরোধীদল। রাজনৈতিক এই বিভাজনের প্রভাব পড়েছে সবখানে। অর্থনীতির মেরুদণ্ড বেসরকারি খাতকে বিভক্ত করা হয়েছে। কে দোসর, কে অতীতে কী করেছে, সেই হিসাব-নিকাশ করতে করতেই বেসরকারি খাতকে আমার লোক, তোমার লোকে ভাগ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বিভক্ত। ২৪-এর গণ অভ্যুত্থানের পর অনেক শিক্ষার্থীর ভাগ্যের অলৌকিক পরিবর্তন ঘটেছে। অনেকেই এখন গাড়ি, বাড়ি এবং বিপুল সম্পদের মালিক। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মূল দাবি, কোটার সংস্কার হয়নি। সরকারি চাকরিতে এখনো রয়ে গেছে আগের মতোই বৈষম্য। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হয়নি। আইনের শাসনের বদলে শুরু হয়েছে মবের শাসন। নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। জুলাইয়ের ঐক্য আমরা ধরে রাখতে পারিনি বলেই সবখানে আশাভঙ্গের বেদনা।

প্রশ্ন হলো, কেন আমরা ঐক্য ধরে রাখতে পারলাম না? কেন সেই অভূতপূর্ব ঐক্যের বিপরীতে আজ আবারো বিভক্তি আর প্রতিহিংসার অসহিষ্ণুতা?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের দুই বছর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। ২৪-এর ৫ আগস্টের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেন শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে। প্যারিস থেকে ২৪-এর ৮ আগস্ট দেশে ফিরে তিনি প্রথমে ঐক্যের গান গেয়েছিলেন। বলেছিলেন, বাংলাদেশ এক পরিবার। সবাই মিলে দেশ গড়ার কথাও বলেছিলেন ড. ইউনূস। কিন্তু ১৮ মাসের শাসনকালে ইউনূস প্রমাণ করেছেন, তিনি যা বলেন, তা করেন না। তিনি যা বলেন, তা বিশ্বাস করেন না। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী ঐক্যের বাংলাদেশকে বিভক্ত করার জন্য একমাত্র দায়ী ইউনূস এবং তার উপদেষ্টারা। ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেড়টা বছর ছিল বাংলাদেশের জন্য এক বিভীষিকাময় কালো অধ্যায়। এই সময় দেশ অন্ধকার থেকে আরও গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদেন বলা হয়, ইউনূস সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের নামে অর্থনীতি ধ্বংসের আয়োজন করেন। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা হত্যা মামলা দায়ের করেন। মব বাহিনী শিল্পকারখানায় নির্বিচারে লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করে। সরকার দূর থেকে তামাশা দেখতে থাকে। শিল্পকারখানায় গ্যাস, বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয় ইউনূস শাসনামলে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা হতাশায় হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকাই নিরাপদ মনে করেন। বন্ধ হয়ে যায় বহু কারখানা, নতুন করে বেকার হন দেড় কোটি মানুষ। দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায় আরও ২ কোটি মানুষ। ১৮ মাসে ড. ইউনূস দেশের অর্থনীতি ফোকলা করে ফেলেছেন। দেড় কোটি বেকার আর ২ কোটি চরম দরিদ্র মানুষ সৃষ্টি করেছেন। বিনিয়োগ বন্ধ, উৎপাদন বন্ধ, অর্থনীতি অচল। ১৮ মাসে দেশের শিক্ষার পরিবেশকে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে গেছেন, দেশের শিক্ষাঙ্গনে স্বাভাবিক পরিবেশ নেই। কথায় কথায় মারামারি, ক্লাস বন্ধ, অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। শিক্ষার্থীরা ক্লাস না করে রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন করেছে।

ইউনূস আমলে গণমাধ্যমে এক আতঙ্ক পরিবেশ বিরাজ করছে। মবের শিকার হয়েছেন গণমাধ্যম কর্মীরা। হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে বহু সাংবাদিককে।

ক্রীড়া ক্ষেত্রেও ছিল হতাশার চিত্র। রাজনীতির বিষবাষ্প থেকে খেলাধুলা মুক্ত রাখতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত, বাংলাদেশের ক্রিকেটে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। বিশ্বের দরজা বাংলাদেশের পাসপোর্টধারীদের জন্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ইউনূসের আমলে দেশজুড়ে শুরু হয়েছিল মব সন্ত্রাস। মবের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছিল গোটা দেশ। ইউনূসের আমলে দুর্নীতি বন্ধ হয়নি বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুর্নীতি বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে বলেছেন ঘুষের রেট বেড়েছে। হাতেগোনা দু-একজন উপদেষ্টা ছাড়া সবার বিরুদ্ধেই উঠেছে দুর্নীতির অভিযোগ। এভাবেই ড. ইউনূস বাংলাদেশকে করেছেন ক্ষতবিক্ষত এবং বিভক্ত।

তবে, ইউনূস সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছেন জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পরিকল্পিত বিভাজন এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস সৃষ্টি করে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান এবং একমাত্র কাজ ছিল, একটি অবাধ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। কিন্তু তা না করে ক্ষমতা দখল করে রাখার জন্য, সংস্কার নাটক তৈরি করেন। রাষ্ট্র সংস্কারের নামে বিদেশ থেকে ভাড়াটে লোক এনে একদিকে যেমন কালক্ষেপণ করেন অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোকে মুখোমুখি দাঁড় করান। সংবিধান সংস্কারের নামে উদ্ভট এবং অযৌক্তিক কিছু বিষয় এনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টির চেষ্টা করেন। সংবিধান কতটা, কীভাবে সংশোধন হবে তা সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র প্ল্যাটফর্ম হলো জাতীয় সংসদ। কিন্তু সংবিধান সংস্কারের নামে মাসের পর মাস অপ্রাসঙ্গিক বিষয় এনে গোটা জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন ড. ইউনূস।

সেই পুরোনো ডিভাইড অ্যান্ড রুল পদ্ধতির মাধ্যমে ইউনূস দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে শেষ পর্যন্ত ইউনূসের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলেও জুলাই আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের মধ্যে তিনি ঠিক ঢুকিয়ে দিয়েছেন অবিশ্বাসের বীজ। যে কারণে, আজ জুলাই সনদ এবং সংবিধান সংশোধন নিয়ে রাজনীতির আকাশে আবারও কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। তবে, আশার কথা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সত্যিকার অর্থেই জুলাই চেতনাকে ধারণ করেছেন। এজন্যই তিনি বারবার ঐক্যের বার্তা দিচ্ছেন। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কারণ, তিনি জানেন, এই ঐক্যই আসলে বাংলাদেশের মূল শক্তি। জুলাই এই ঐক্যের প্রতীক। ১৬ জুলাই, বাংলাদেশের জনগণের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দিন। দুই বছরে রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে এ ঐক্য আজ বিপন্ন। এ ঐক্য নষ্ট হলে জুলাই আন্দোলনের চেতনা নষ্ট হবে। বাংলাদেশে আবার সেই বিভক্তির চোরাস্রোত আটকে যাবে। তাই এ জুলাইয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে সহনশীল হতে হবে। সমঝোতা আর ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণ করতে হবে।