• ই-পেপার

স্রষ্টার অন্যতম মহা নিদর্শন হলো মানবদেহের হাড়

কোরআনে যেভাবে ভ্রাতৃত্বের কথা বারবার বলা হয়েছে

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ
কোরআনে যেভাবে ভ্রাতৃত্বের কথা বারবার বলা হয়েছে
সংগৃহীত ছবি

পবিত্র কোরআন শুধু আত্মীয়তার সম্পর্ক (রক্তের সম্পর্ক) নিয়েই আলোচনা করেনি; বরং ‘ভাই’ এবং এর বিভিন্ন রূপক শব্দকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছে। কোরআনে ‘ভাই’ এবং এর বিভিন্ন শব্দরূপ মোট ৯৬ বার এসেছে। তবে সব ক্ষেত্রেই এর অর্থ রক্তের ভাই নয়; বরং প্রসঙ্গভেদে এর বিভিন্ন অর্থ আছে। আরবি ভাষার মূল অর্থ এবং কোরআনের বিভিন্ন আয়াত পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ‘ভ্রাতৃত্ব’ শব্দটি নিম্নোক্ত অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে—

১. রক্তের সম্পর্কের ভাই (ভ্রাতৃত্বের মূল অর্থ),
এটি শব্দটির প্রকৃত ও মূল অর্থ। এর উদাহরণ আল্লাহ তাআলার বাণী—‘আর যখন মুসা (আ.) তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে ক্রুদ্ধ ও দুঃখিত অবস্থায় ফিরে এলেন, তখন বলেন, আমার অনুপস্থিতিতে তোমরা কতই না মন্দ কাজ করলে! তোমরা কি তোমাদের প্রতিপালকের নির্দেশের অপেক্ষা না করেই তাড়াহুড়া করলে?’ অতঃপর তিনি ফলকগুলো নিক্ষেপ করলেন এবং তাঁর ভাই হারুনের মাথার চুল ধরে নিজের দিকে টেনে আনলেন। হারুন বলেন, ‘হে আমার মাতৃগর্ভের ভাই! এ জাতি আমাকে দুর্বল মনে করেছিল এবং প্রায় আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল। অতএব, আপনি শত্রুদের আমার ওপর হাসার সুযোগ দেবেন না এবং আমাকে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত করবেন না।’ (সুরা : আল-আরাফ, আয়াত : ১৫০)
এখানে ‘ভাই’ বলতে প্রকৃত রক্তের ভাইকে বোঝানো হয়েছে।

২. রক্তের সম্পর্ক ছাড়া অন্যান্য অর্থে ভ্রাতৃত্ব
অনেক স্থানে ‘ভাই’ শব্দটি মূল অর্থ থেকে বের হয়ে অংশীদারিত্ব, সাদৃশ্য বা মিল বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধরন নিচে তুলে ধরা হলো—

ক. ঈমান ও আকিদার ভ্রাতৃত্ব : এটি দুই ধরনের হতে পারে—ঈমানের ভ্রাতৃত্ব ও কুফর বা শিরকের ভ্রাতৃত্ব।

(১) ঈমানের ভ্রাতৃত্ব : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও।’ (সুরা : আল-হুজুরাত, আয়াত : ১০)

ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘এখানে ভ্রাতৃত্ব বলতে বংশগত সম্পর্ক নয়; বরং দ্বিনের সম্পর্ক বোঝানো হয়েছে। এ কারণেই বলা হয়, দ্বিনের ভ্রাতৃত্ব রক্তের ভ্রাতৃত্বের চেয়েও দৃঢ়। কারণ রক্তের সম্পর্ক ধর্ম ভিন্ন হলে ছিন্ন হয়ে যায়; কিন্তু ঈমানের সম্পর্ক বংশ ভিন্ন হলেও ছিন্ন হয় না।’

(২) কুফর ও মুনাফিকির ভ্রাতৃত্ব : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা কুফরি করেছে এবং তাদের ভাইদের সম্পর্কে বলেছে, যখন তারা পৃথিবীতে সফরে ছিল অথবা যুদ্ধে গিয়েছিল, যদি তারা আমাদের কাছে থাকত, তবে মরত না এবং নিহতও হতো না।’ আল্লাহ এ কথাকে তাদের অন্তরে অনুতাপের কারণ বানিয়ে দিয়েছেন। ‘আল্লাহই জীবন দান করেন এবং মৃত্যু দেন। আর তোমরা যা করো, আল্লাহ তা দেখেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৬)

এখানে ‘তাদের ভাই’ বলতে রক্তের ভাই বোঝানো হয়নি; বরং কুফর ও মুনাফিকিতে তাদের সহচরদের বোঝানো হয়েছে।

খ. মানবজাতির ভ্রাতৃত্ব : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আদ জাতির কাছে আমরা তাদের ভাই হুদকে প্রেরণ করেছিলাম।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৫০)

কিছু মুফাসসির বলেন, এখানে ‘ভাই’ বলতে বোঝানো হয়েছে—‘তিনি তাদের মতোই একজন মানুষ ছিলেন; সবাই আদম (আ.)-এর সন্তান।’ আবার কেউ বলেছেন, আল্লাহ তাঁকে ‘ভাই’ বলে উল্লেখ করেছেন, যাতে বোঝা যায়, তিনি নিজের জাতির প্রতি ঠিক আপন ভাইয়ের মতোই আন্তরিক, দয়ালু ও কল্যাণকামী ছিলেন।

গ. গোত্রীয় ভ্রাতৃত্ব : ওপরের একই আয়াতের আরেকটি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে—‘তাদের ভাই’ অর্থাৎ তাদেরই গোত্রের একজন ব্যক্তি। অর্থাৎ হুদ (আ.) আদ জাতিরই একজন সদস্য ছিলেন।

ঘ. শয়তানের ভ্রাতৃত্ব : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি চরম অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা : আল-ইসরা, আয়াত : ২৭)

এখানে শয়তানের ভাই বলতে প্রকৃত ভাই বোঝানো হয়নি। অর্থ হলো অপচয়কারীরা তাদের এ নিকৃষ্ট কাজে শয়তানের অনুসারী এবং তার অনুরূপ হয়ে যায়। আরবরা এমন ব্যক্তিকে ‘অমুকের ভাই’ বলে, যেকোনো কাজে সর্বদা লিপ্ত থাকে। যেমন—তিনি দানশীলতার ভাই। তিনি সফরের ভাই। অর্থাৎ তিনি ওই গুণের সঙ্গে সর্বদা যুক্ত।

ঙ. বিভিন্ন জাতির পারস্পরিক সম্পর্ক : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখনই কোনো জাতি জাহান্নামে প্রবেশ করবে, তখনই তারা তাদের পূর্ববর্তী সঙ্গী জাতিকে অভিশাপ দেবে। অবশেষে যখন সবাই সেখানে একত্র হবে, তখন পরবর্তীরা পূর্ববর্তীদের সম্পর্কে বলবে, হে আমাদের রব! এরাই আমাদের পথভ্রষ্ট করেছে। অতএব, তাদের দ্বিগুণ শাস্তি দিন।’ (সুরা : আল-আরাফ, আয়াত : ৩৮)

এখানে ‘তাদের বোন’ বলতে বোঝানো হয়েছে তাদের সমজাতীয়, অনুরূপ ও একই পথের অনুসারী জাতিকে।

চ. আল্লাহর নিদর্শনগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি তাদের যে নিদর্শনই দেখিয়েছি, তা পূর্ববর্তী নিদর্শনের চেয়েও বড় ছিল। আর আমি তাদের শাস্তির মাধ্যমে পাকড়াও করেছি, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সুরা : আজ-জুখরুফ, আয়াত : ৪৮)

এখানে ‘তার বোন’ বলতে বোঝানো হয়েছে, মুসা (আ.)-এর প্রতিটি মুজিজা আগেরটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিল এবং প্রত্যেকটি আগেরটির চেয়ে আরো অধিক শক্তিশালী ও স্পষ্ট ছিল। কিছু মুফাসসির বলেন, প্রথম নিদর্শন একটি সত্য প্রমাণ করেছিল, দ্বিতীয়টি সেটিকে আরো স্পষ্ট করেছিল। এভাবে প্রতিটি নিদর্শন পূর্ববর্তীটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিল। এখানে ‘ভ্রাতৃত্ব’ বলতে বোঝানো হয়েছে—সাদৃশ্য, মিল ও পারস্পরিক সম্পর্ক। যেমন বলা হয়—এটি ওটির সাথি বা এটি ওটির অনুরূপ।

এই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—ওপরের আয়াতগুলোর আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়, ঐক্যবদ্ধ ভাইয়েরা শক্তিশালী হয় আর বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে।

এটাই প্রকৃত ভ্রাতৃত্বের অন্যতম ফল। যখন ঈমান, নৈতিকতা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক ভালোবাসার ভিত্তিতে ভ্রাতৃত্ব গড়ে ওঠে, তখন ব্যক্তি, সমাজ ও জাতি শক্তিশালী হয়। আর যখন এই ভ্রাতৃত্ব ভেঙে যায়, তখন দুর্বলতা, বিভক্তি ও পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলা আমাদের ঈমানের ভ্রাতৃত্বকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করার এবং পারস্পরিক ভালোবাসা, সহযোগিতা ও ঐক্যের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী মুসলিম সমাজ গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আজকের নামাজের সময়সূচি, ১৬ ‍জুলাই, ২০২৬

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আজকের নামাজের সময়সূচি, ১৬ ‍জুলাই, ২০২৬
সংগৃহীত ছবি

আজ বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ, ১৪৩৩, ১ সফর, ১৪৪৮।
ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—

জোহরের সময় শুরু ১২টা ৮ মিনিটে।
আসরের সময় শুরু ৪টা ৪৩ মিনিটে।
মাগরিব ৬টা ৫২ মিনিটে।
এশার সময় শুরু ৮টা ১৬ মিনিটে।
আগামীকাল ফজর শুরু ৩টা ৫৮ মিনিটে 
আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত ৬টা ৪৯ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় ৫টা ১৯ মিনিটে।
সূত্র : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা।

সফর মাসের চাঁদ দেখা গেছে, ১২ আগস্ট আখেরি চাহার শোম্বা

অনলাইন ডেস্ক
সফর মাসের চাঁদ দেখা গেছে, ১২ আগস্ট আখেরি চাহার শোম্বা
সংগৃহীত ছবি

দেশের আকাশে ১৪৪৮ হিজরি সনের পবিত্র সফর মাসের চাঁদ দেখা গেছে। ফলে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) থেকে পবিত্র সফর মাস গণনা শুরু হবে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ১২ আগস্ট (বুধবার) পবিত্র আখেরি চাহার শোম্বা পালিত হবে।

বুধবার (১৫ জুলাই) সন্ধ্যায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন বায়তুল মোকাররম সভাকক্ষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সি আলাউদ্দিন আল আজাদ।

সভায় ১৪৪৮ হিজরি সনের পবিত্র সফর মাসের চাঁদ দেখা সম্পর্কে সব জেলা প্রশাসন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয়, বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়সহ বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো) থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি।

এদিন সভায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক (গ্রেড-১) মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী ছাড়াও প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, বাংলাদেশ টেলিভিশনের পরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ছাদেক আহমদ, বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠানের (স্পারসো) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. সাহেদুল ইসলাম, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম, ঢাকা জেলার অতিরিক্ত প্রশাসক মো. মাহাবুব উল্লাহ মজুমদার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়াও সভায় অন্যদের মধ্যে সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া ঢাকার অধ্যক্ষ অধ্যাপক ওবায়দুল হক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন দ্বীনি দাওয়াত ও সংস্কৃতি বিভাগের পরিচালক ড. মোহাম্মদ হারুনূর রশীদ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা ডক্টর গোলাম মহিউদ্দিন ইকরাম, ঢাকা রেসিন্ডেন্সিয়াল মডেল কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমাম ও খতিব মুফতি মাওলানা মো. মহিউদ্দিন, চকবাজার শাহী জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব মুফতি শেখ নাঈম রেজওয়ান, লালবাগ শাহী জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব মুফতি মাওলানা মোহাম্মদ নিয়ামতুল্লাহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ঐতিহাসিক মসজিদে আদদাস

তায়েফের বুকে যে মসজিদ মুসলিমদের জন্য এক টুকরো সান্ত্বনা

ইসলামী জীবন ডেস্ক
তায়েফের বুকে যে মসজিদ মুসলিমদের জন্য এক টুকরো সান্ত্বনা
সংগৃহীত ছবি

ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু স্থান রয়েছে, যেগুলো শুধুমাত্র স্থাপত্যের কারণে নয়, বরং ঈমান, ধৈর্য ও আল্লাহর রহমতের অবিস্মরণীয় স্মৃতির কারণে যুগে যুগে মুসলমানদের হৃদয়ে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। সৌদি আরবের তাইফ শহরে অবস্থিত মসজিদ আদ্দাস তেমনই একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, এখানেই নবী মুহাম্মদ (সা.) তাইফবাসীর নির্মম নির্যাতন ও প্রত্যাখ্যানের পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েছিলেন। আর এখানেই ঘটে যায় এক হৃদয়স্পর্শী ঘটনা—যা একজন খ্রিস্টান ক্রীতদাসের হৃদয়ে ইসলামের আলো জ্বালিয়ে দেয়।

নবুওয়তের দশম বছরে, মহানবী (সা.) প্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রা.) এবং চাচা আবু তালিবের ইন্তেকালের পর ইসলামের দাওয়াত নিয়ে তাইফে যান। কিন্তু সেখানে তিনি প্রত্যাশিত সাড়া তো পানইনি, বরং শহরের প্রভাবশালীরা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে। উসকানি দিয়ে শিশু ও দুর্বৃত্তদের তাঁর পেছনে লেলিয়ে দেওয়া হয়। তারা পাথর নিক্ষেপ করতে করতে তাঁকে শহরের বাইরে বের করে দেয়। এতে তাঁর পবিত্র শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায় এবং জুতা পর্যন্ত রক্তে ভিজে যায়।

মহানবী (সা.) রক্তাক্ত আর ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীর নিয়ে শহরের অদূরে অবস্থিহ একটি আঙুর বাগানে আশ্রয় নেন । দূর থেকে তাঁর অবস্থা দেখে বাগানের মালিকরা তাদের খ্রিস্টান ক্রীতদাস আদ্দাস-কে এক থোকা আঙুর দিয়ে তাঁর কাছে পাঠান। আদদাস যখন আঙুরের পাত্র নবীজির সামনে রাখল, তিনি খাওয়ার আগে বললেন, ‘বিসমিল্লাহ্’ (আল্লাহর নামে শুরু করছি)। শুনে আদদাসকে থমকে গেল। তায়েফ বা মক্কার পৌত্তলিকরা এভাবে কথা বলে না। সে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এই উপত্যকার মানুষ তো এমন কথা বলে না। আপনি কে? মহানবী (সা.) পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার আদি বাড়ি কোথায়, তোমার ধর্ম কী?’ আদদাস জবাব দিল, ‘আমি ইরাকের নিনেভা শহরের এক খ্রিষ্টান।’ নিনেভার নাম শুনে নবীজির রক্তাক্ত মুখেও এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন, ‘তুমি তবে সেই পুণ্যবান নবী ইউনুস ইবনে মাত্তার শহরের লোক!’ আদদাস আরও অবাক, এই মরুভূমির মানুষ ইউনুসের নাম জানার কথা নয়। মহানবী (সা.) বললেন, ‘ইউনুস ছিলেন আমার ভাই। তিনি ছিলেন আল্লাহর নবী, আমিও আল্লাহর নবী।’

এই একটি বাক্য জাগিয়ে তুলল আদদাসের ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা বিশ্বাস। সে বুঝে গেল, সামনে বসা মানুষটি মক্কার কোনো সাধারণ নেতা নন। তিনি সেই শেষ নবী, যাঁর কথা তার নিজের কিতাবেও লেখা আছে। সে নবীজির হাতে, পায়ে, কপালে চুমু খেতে লাগল। দূর থেকে সেই দৃশ্য দেখে উতবা-শাইবা আফসোস করে বলল, ‘সর্বনাশ, লোকটা আমাদের দাসকেও নষ্ট করে দিল!’ ফিরে আসার পর তারা আদদাসকে জিজ্ঞেস করল, কেন সে ওভাবে চুমু খাচ্ছিল। আদদাস দৃঢ়ভাবে জবাব দিল, ‘এই পৃথিবীতে এই মানুষটির চেয়ে উত্তম আর কেউ নেই। তিনি আমাকে এমন এক সত্য বলেছেন, যা একজন নবী ছাড়া কেউ জানতে পারে না।’

এই তাৎক্ষণিক ইসলাম গ্রহণ ছিল তায়েফের সেই অন্ধকার দিনে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক টুকরো সান্ত্বনা। সেই আঙুর বাগানের জায়গাতেই পরে গড়ে ওঠে একটি মসজিদ—মসজিদে আদদাস। বাহ্যিক ব্যর্থতার আড়ালে আসলে সফলতা লুকিয়ে থাকে। পুরো তায়েফ শহর নবীজিকে তাড়িয়ে দেয়, অথচ আল্লাহ ঠিক তখনই একজন সাধারণ দাসের অন্তর খুলে দেন। তাই আজও তায়েফে যারা বেড়াতে যান, তারা মসজিদ আদদাসের শান্ত পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হন, অস্থির হৃদয়ে সান্ত্বনা লাভ করেন। বুঝতে পারেন, যখন দুনিয়ার সব মানুষ বিপক্ষে চলে যায়, চারপাশ তাড়িয়ে দেয়, তখনও আল্লাহর রহমতের একটা আঙুরের থোকা আর একজন বিশ্বস্ত আদদাস কোথাও না কোথাও অপেক্ষা করে থাকে।

তথ্যসূত্র :  (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খণ্ড ৩, পৃ. ১৩২, সীরাতে ইবনে হিশাম, সিরাতুন নবাবিয়্যাহ, ২/৭১, ইবনুল আসির, আল-কামিল ফিত-তারিখ, খণ্ড ১, পৃ. ৬৬০)