• ই-পেপার

ঐতিহাসিক মসজিদে আদদাস

তায়েফের বুকে যে মসজিদ মুসলিমদের জন্য এক টুকরো সান্ত্বনা

হাদিসের বাণী

ইসলামে আর্থিক স্বচ্ছতা রক্ষায় জবাবদিহিতার নির্দেশ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ইসলামে আর্থিক স্বচ্ছতা রক্ষায় জবাবদিহিতার নির্দেশ
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আদি ইবনে উমাইরাহ (রা.)-থেকে বর্ণিত, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমরা কাউকে আমাদের বিভিন্ন কাজে নিয়োগ করি, আর সে যদি সেখান থেকে সুঁই বা তার চেয়ে ছোট জিনিস গোপন করে, তাহলে সেটা খিয়ানত ও চুরি হিসেবে ধর্তব্য হবে। কিয়ামতের দিন সে এই খিয়ানত নিয়ে উপস্থিত হবে। এ কথা শুনে আনসারিদের থেকে একজন কালো ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, (বর্ণনাকারী সাহাবি বলেন) আমি তাকে (এখন) দেখতে পাচ্ছি।

ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি আমার দায়িত্ব ফিরিয়ে নিন। তিনি বললেন, কেন? কী হয়েছে? সে বলল, আমি আপনাকে এমন-এমন কথা বলতে শুনলাম। তিনি বললেন, আমি এখনো বলছি, যাকে আমরা কোনো কাজে নিয়োগ দিই, সে কম-বেশি যে সম্পদই হোক, তা আমার কাছে উপস্থিত করবে। এরপর সেখান থেকে যা দেওয়া হবে, সে তা-ই গ্রহণ করবে এবং যা দেওয়া হয় না, সেটা থেকে সে বিরত থাকবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস, ৪৭৪৩, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৭৭২৩)

শিক্ষ ও বিধান
১. আমানত রক্ষা করা ঈমানের দাবি। আর যে ব্যক্তি কোনো দায়িত্ব বা চাকরিতে নিয়োজিত হয়, তার কাছে অর্পিত ছোট-বড় সব সম্পদই আমানত। এতে সামান্য পরিমাণও আত্মসাৎ করা হারাম।

২. সরকারি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ আত্মসাৎ করা বড় গুনাহ। এমনকি সুঁইয়ের মতো তুচ্ছ জিনিসও গোপন করে নেওয়া খিয়ানত ও চুরির অন্তর্ভুক্ত।

৩. কিয়ামতের দিন আত্মসাৎ করা সম্পদসহ হাজির হতে হবে। অন্যায়ভাবে নেওয়া সম্পদ মানুষের জন্য পরকালে লাঞ্ছনা ও শাস্তির কারণ হবে।

৪. দায়িত্বশীল ব্যক্তির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকা আবশ্যক। তাই কর্মচারী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির জন্য কাজ শেষে কর্তৃপক্ষের কাছে অবশিষ্ট অর্থ-সম্পদ ফেরত দেয়া আবশ্যক।

৫. অনুমতি ছাড়া কোনো উপহার বা অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহণ বৈধ নয়। দায়িত্ব পালনের সময় প্রাপ্ত সব সম্পদের পূর্ণ হিসাব দিতে হবে। কর্তৃপক্ষ যা বৈধভাবে প্রদান করবে, শুধু তাই গ্রহণ করা যাবে।

৬. এক্ষেত্রে সাহাবিদের তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অনুকরণীয়। হাদিস শুনে ওই সাহাবি সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। এটি তাদের জবাবদিহিতার ভয় ও সততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

৭. নেতৃত্ব ও প্রশাসনে সততা অপরিহার্য। রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সকল পর্যায়ে আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা ইসলামের নির্দেশ।

সর্বপরি এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, সরকারি, প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত—যেকোনো আমানতের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সততা বজায় রাখতে হবে। সামান্য পরিমাণ সম্পদ আত্মসাৎ করাও বড় গুনাহ। একজন মুমিনের পরিচয় হলো আমানত রক্ষা করা, দুর্নীতি ও খিয়ানত থেকে বেঁচে থাকা এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতি নিয়ে দায়িত্ব পালন করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের হাদিসের উপর পূর্ণ আমল করার তাওফিক দান করুক। আমিন। 

তাফসির চর্চায় সাহাবিদের নীতি ও পদ্ধতি

আতাউর রহমান খসরু
তাফসির চর্চায় সাহাবিদের নীতি ও পদ্ধতি
সংগৃহীত ছবি

মহান আল্লাহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর কোরআন নাজিল করেন এবং তাঁকে কোরআনের মর্ম প্রচার ও ব্যাখ্যার দায়িত্ব দেন। ফলে নবীজি (সা.)-এর যুগেই শুরু হয়েছিল তাফসিরশাস্ত্রের চর্চা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমার প্রতি কোরআন অবতীর্ণ করেছি, মানুষকে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছিল, যাতে তারা চিন্তা করে।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৪৪)

উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরবিদরা বলেন, এই আয়াত দ্বারা প্রমাণ হয়, মানুষকে কোরআনের ব্যাখ্যা শেখানো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নববী দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-ও তাঁর শিক্ষা ও সান্নিধ্যে কোরআনের শ্রেষ্ঠতম ধারক, বাহক ও ব্যাখ্যাকারে পরিণত হন। প্রকৃতপক্ষে তাঁরাই কোরআন সবচেয়ে উত্তমরূপে অনুধাবন করেছিলেন এবং তার ওপর যথাযথভাবে আমল করেছিলেন।

তাফসির চর্চায় সাহাবিদের পদ্ধতি
পবিত্র কোরআন ও তাফসির শাস্ত্রের পঠন-পাঠনে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর পদ্ধতি ছিল নিম্নরূপ :

১. শেখা ও আমল করা : সাহাবিদের তাফসির চর্চার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁরা যখন কোনো আয়াত পাঠ করতেন, তখন তার মর্ম ও ব্যাখ্যা জানতেন এবং তাঁর ওপর আমল করতেন। অর্থাৎ উপলব্ধ অর্থ ও বিধান আমলের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘আমাদের ভেতর যখন কেউ কোরআনের ১০টি আয়াত শিখত, তখন সে তাঁর অর্থ জানা এবং তার ওপর আমল করার আগে সামনে অগ্রসর হতো না।’ (শুআবুল ঈমান, হাদিস : ১৮০১)

২. পড়ে পড়ে ব্যাখ্যা করা : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা কোরআন পড়ে পড়ে তার ব্যাখ্যা করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, যখন তাঁর কাছে তাঁর ভাইয়েরা একত্র হতেন। তাঁরা কোরআন খুলে তা পাঠ করতেন এবং তিনি তার ব্যাখ্যা করতেন। (ফাদায়িলুল কোরআন, পৃষ্ঠা-১০২)

৩. প্রশ্ন করে শিক্ষা দেওয়া : সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর ভেতর যাঁরা তাফসির শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন, তাঁরা অন্যদের প্রশ্ন করতেন। যদি তারা সঠিক উত্তর দিতেন, তবে তিনি তাদের সমর্থন করতেন এবং জ্ঞানের প্রশংসা করতেন। আর ভুল করলে তিনি তাদের সংশোধন করে দিতেন। যেমন আবু বকর (রা.) জিজ্ঞাসা করেন, তোমরা আল্লাহর বাণী ‘নিশ্চয়ই যারা বলে, আল্লাহ আমাদের প্রভু, অতঃপর তাতে অবিচল থাকে’-এর ব্যাপারে কী বলো? তারা বলেন, এর ব্যাখ্যা হলো ‘আল্লাহ আমাদের প্রভু, অতঃপর তারা পাপ থেকে বেঁচে থাকে।’ আবু বকর (রা.) বললেন, তোমরা আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছ। এর ব্যাখ্যা হলো, ‘তারা বলে, আল্লাহ আমাদের প্রভু। অতঃপর তারা অবিচল থাকে। ফলে তারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না।’
(তাফসির ইবনে কাসির : ৬/১৭৩)

৪. পারস্পরিক আলোচনা : সাহাবায়ে কেরাম (রা.) যখন একত্র হতেন পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে কোরআন ও তার ব্যাখ্যা শিখতেন। ঠিক যেমনটি রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো সম্প্রদায় আল্লাহর ঘরগুলোর কোনো একটি ঘরে একত্র হয়ে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে এবং একে অপরের সঙ্গে মিলে (কোরআন) অধ্যয়নে লিপ্ত থাকে, তখন তাদের ওপর শান্তিধারা অবতীর্ণ হয়। রহমত তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং ফেরেশতারা তাদের পরিবেষ্টন করে রাখেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)

আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা যখন একত্রে বসে ফিকহ নিয়ে আলোচনা করতেন, তখন তাঁরা একজন কোরআনের সুরা পাঠ করার আদেশ করতেন। (তাবাকাতে ইবনে সাআদ : ২/২৮৫)

৫. প্রচলিত ভুল ব্যাখ্যা সংশোধন করে : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা প্রচলিত ভুল ব্যাখ্যা সংশোধন করেও মানুষকে কোরআনের ব্যাখ্যা শেখাতেন। আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ভাষণ দেন। তিনি বলেন, হে মানুষ তোমরা এই (সুরা মায়িদার ১০৫ নম্বর)  আয়াত পাঠ করো এবং এর ভুল অর্থ গ্রহণ করে থাকো। আয়াতটি হলো : ‘হে মুমিনরা! তোমাদের দায়িত্ব তোমাদেরই ওপর। তোমরা যদি সৎপথে পরিচালিত হও তবে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।’ আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, নিশ্চয়ই মানুষ যখন নিজেদের ভেতর মন্দ কাজ হতে দেখে অথচ সে তা প্রতিহত করে না। আশঙ্কা আছে, আল্লাহ তাদের সবাইকে এই পাপের শাস্তি দেবেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৩৩৮)

৬. জনসমাগমের আলোচনার মাধ্যমে : সাহাবিদের অনেকে জনসমাগমের স্থানে উপস্থিত হয়ে কোরআনের তাফসির করতেন। আবু ওয়ায়েল (রহ.) বলেন, ‘আমি ও আমার এক সঙ্গী হজ করি। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-ও হজে ছিলেন। তিনি সুরা নুর পাঠ করে তা ব্যাখ্যা করেন। আমার সঙ্গী বলেন, সুবহানাল্লাহ! এই ব্যক্তির মাথা থেকে কি বের হচ্ছে? যদি তুর্কিরা এটা শুনত তবে তারা ইসলাম গ্রহণ করত।’ (ফাদায়িলুস সাহাবা, ইমাম আহমদ, হাদিস : ১৯৩৪)

৭. প্রশ্নের উত্তরে ব্যাখ্যা : সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর কাছে সাধারণ মানুষ কোরআনের আয়াত বা অর্থ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি তার উত্তর দিতেন। যেমন আতা ইবনে রাবাহ (রহ.) বলেন, ‘আমি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মজলিসের চেয়ে উত্তম কোনো মজলিস দেখিনি। তাঁর কাছে কোরআনের শিক্ষার্থীরা এসে প্রশ্ন করতেন, ইলমের অধিকারীরা এসে প্রশ্ন করতেন, কবিতার শিক্ষার্থীরা এসে প্রশ্ন করতেন।’ (ফাদায়িলুস সাহাবা, ইমাম আহমদ, হাদিস : ১৯২৯)

সাহাবিদের তাফসিরের বৈশিষ্ট্য
ড. মুহসিন আবদুল হামিদ সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর তাফসিরের পাঁচটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। তা হলো—
১. বিরোধশূন্য : সাহাবিদের তাফসিরে বৈপরীত্য ও মৌলিক বিষয়ে বিরোধ পাওয়া যায় না, তবে আনুষঙ্গিক বিষয়ে তাদের অনেক মতভিন্নতা পাওয়া যায়।

২. স্বল্প বাক্য, বিস্তৃত মর্ম : সাহাবায়ে কেরাম (রা.) কোরআনের ব্যাখ্যায় দীর্ঘ আলোচনা পরিহার করতেন। এ বিষয়ে তাঁদের শব্দ-বাক্য হতো সীমিত এবং মর্ম হতো অত্যন্ত বিস্তৃত।

৩. নসনির্ভর : সাহাবিরা নস তথা কোরআন ও সুন্নাহ নির্ভর তাফসির করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগের সঙ্গে তাঁদের যুগের বৈশিষ্ট্যগত মিল থাকায় তাঁদের ইজতিহাদের খুব বেশি প্রয়োজন হতো না। কোনো বিষয়ে কোরআন ও সুন্নাহের বক্তব্য পাওয়া না গেলে তাঁরা ইজতিহাদ করতেন।

৪. অপূর্ণাঙ্গ তাফসির : সাহাবায়ে কেরাম (রা.) প্রয়োজন ও মানুষের প্রশ্নের আলোকেই বেশি তাফসির করতেন। তাই তাঁদের যুগে পূর্ণাঙ্গ ও ধারাবাহিক তাফসির পাওয়া যায় না।

৫. ত্রুটিমুক্ত : সাহাবিরা স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে কোরআন শিখেছেন, তাঁরা ছিলেন নবীজি (সা.)-এর হাতে গড়া সোনার মানুষ। তাই তাঁদের তাফসির ছিল ভুলত্রুটি, বিকৃতি ও বিদআতমুক্ত। (তাতাওউরুল তাফসিরিল কোরআনিল কারিম কিরাআতান জাদিদাতান, পৃষ্ঠা-৩৮)

সাহাবিদের তাফসিরের বিধান
সাহাবায়ে কেরাম (রা.) কর্তৃক বর্ণিত তাফসিরের ব্যাপারে ফকিহ আলেমদের বক্তব্য নিম্নরূপ :

১. ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিমসহ বেশির ভাগ আলেমের মত হলো, সাহাবিদের বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত ও তাদের থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত তাফসিরের বিধান হলো তা মুসনাদ ও মারফু হাদিসের অনুরূপ। অর্থাৎ তা গ্রহণযোগ্য ও আমলকে আবশ্যক করে।

২. যে তাফসির সাহাবিরা মুসনাদ পদ্ধতি তথা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সূত্রে অথবা তাঁর থেকে মারফু পদ্ধতিতে বর্ণনা করেছেন সর্বসম্মতিক্রমে তার ওপর আমল করা ওয়াজিব এবং তা প্রত্যাখ্যান করা নাজায়েজ।

৩. তাদের থেকে যে তাফসির মাওকুফ পদ্ধতিতে বর্ণিত হয়েছে, তাতে যদি কিয়াসের (বুদ্ধিবৃত্তির) অবকাশ না থাকে তবে তা মারফু হাদিসের বিধানভুক্ত, অর্থাৎ তার ওপর আমল আবশ্যক। আর যদি তাতে কিয়াসের অবকাশ থাকে তবে তা মাওকুফ হাদিসের অন্তর্ভুক্ত, তা অনুসন্ধানের দাবি রাখে, এমন তাফসিরের ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের চিন্তা-ভাবনার অবকাশ আছে।

৪. সাহাবায়ে কেরাম (রা.) যে তাফসিরের ব্যাপারে একমত হয়েছেন তা অকাট্য এবং তার ওপর আমল করা আবশ্যক।

৫. কোনো আয়াতের ব্যাপারে সাহাবিদের থেকে একাধিক ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলে, মুজতাহিদ আলেমরা যেকোনো একটির ওপর আমল করতে পারবেন। কিন্তু তারা নতুন কোনো মত উদ্ভাবন করতে পারবেন না। (আল মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন : ২/২৮৩; মাবাহিসুন ফি উলুমিল কোরআন, পৃষ্ঠা-৩৪৫; আল বোরহান ফি উলুমিল কোরআন : ২/১৮৩)

শ্রেষ্ঠত্বের কারণ
সাহাবায়ে কেরাম পবিত্র কোরআনের যে তাফসির করেছেন, তা পৃথিবীর যেকোনো তাফসিরের ওপর শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখে। কেননা—

১. তাঁরা ওহি নাজিল হতে দেখেছেন এবং ওহি নাজিলের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অবগত।

২. তাঁরা সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে কোরআনের অর্থ ও মর্ম শিখেছেন।

৩. তাকওয়া, দ্বিনদারি ও বিশ্বস্ততার বিচারে তাঁরাই সবচেয়ে অগ্রগামী ছিলেন।

৪. কোরআনের একাধিক আয়াতে তাঁদের প্রশংসা করা হয়েছে এবং তাঁদেরকে আল্লাহ ক্ষমা ও সন্তুষ্টি দানের ঘোষণা দিয়েছেন।

৫. রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের খাইরিয়্যাত (উত্তম হওয়ার) সাক্ষ্য দিয়েছেন। (প্রবন্ধ : আত-তাফসির ফি আসরিস সাহাবাতি)

আল্লাহ সবাইকে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দ্বারা উপকৃত হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।

যেকোনো বিপদ থেকে নিশ্চিত মুক্তি লাভের দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যেকোনো বিপদ থেকে নিশ্চিত মুক্তি লাভের দোয়া
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবন কখনোই বিপদ-আপদমুক্ত নয়। কখনো রোগ-ব্যাধি, কখনো দুর্ঘটনা, কখনো শত্রুর অনিষ্ট, আবার কখনো অজানা কোনো দুর্যোগ—প্রতিনিয়ত নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্য দিয়েই আমাদের চলতে হয়। মানুষ যতই শক্তিশালী বা সতর্ক হোক না কেন, আল্লাহ তাআলার হেফাজত ছাড়া প্রকৃত নিরাপত্তা লাভ করা সম্ভব নয়। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে এমন এক বরকতময় দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন, যা সকাল ও সন্ধ্যায় তিনবার পাঠ করলে আল্লাহর ইচ্ছায় সারাদিন বা সারারাত কোনো আকস্মিক বিপদ-আপদ ক্ষতি করতে পারে না। দোয়াটি হলো-

بِسْمِ اللّٰهِ الَّذِيْ لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ

উচ্চারণ : বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়া দুররু মাআস মিহি শাইয়ুন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস সামায়ি ওয়াহুয়াস সামিউল আলিম। 

অর্থ : ‘আল্লাহর নামে, যাঁর নামে পৃথিবীতে বা আকাশে কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারে না এবং তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’

হাদিস : ওসমান ইবনে আফফান (রা.)-থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সকালে তিনবার এই দোয়া পাঠ করবে,  সন্ধ্যা পর্যন্ত তার উপর কোনো আকস্মিক বিপদ আসবে না। আর যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় এটি বলবে সকাল পর্যন্ত তার উপর কোনো আকস্মিক বিপদ আসবে না। ইনশাআল্লাহ। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০৮৮, তিরমিজি, হাদিস : ৩৩৮৮)

খেলার উন্মাদনায় প্রাণহানি অত্যন্ত দুঃখজনক

মুফতি ওমর বিন নাছির
খেলার উন্মাদনায় প্রাণহানি অত্যন্ত দুঃখজনক
সংগৃহীত ছবি

খেলাধুলা মানুষের জীবনের একটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। এটি শরীরকে সুস্থ রাখে, মনকে প্রফুল্ল করে এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য গড়ে তুলতে সহায়তা করে। ইসলামও বৈধ ও কল্যাণকর খেলাধুলা এবং শারীরিক সক্ষমতা অর্জনকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু যখন খেলাধুলা সুস্থ বিনোদনের সীমা অতিক্রম করে অন্ধ সমর্থন, বিদ্বেষ, গালি-গালাজ, মারামারি, আত্মহত্যা কিংবা হত্যাকাণ্ডের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা আর বিনোদন থাকে না; বরং তা একটি সামাজিক ও নৈতিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়।

দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে ফুটবল বিশ্বকাপ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক খেলাকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সংঘর্ষ, আহত হওয়া, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। কোথাও বন্ধুর হাতে বন্ধু নিহত হচ্ছে, কোথাও তুচ্ছ ট্রোলিং বা বিদ্রূপ সহ্য করতে না পেরে কেউ আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ পথ বেছে নিচ্ছে। একজন মুসলমানের জীবন, সময় ও আবেগ এতটা মূল্যহীন হতে পারে না যে, একটি খেলার জয়-পরাজয় তার জীবন ধ্বংস করে দেবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা সীমালঙ্ঘন কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯০)
তাই খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ বৈধ; কিন্তু সেই আগ্রহ যদি উন্মাদনায় রূপ নেয়, তাহলে তা ইসলামের শিক্ষা থেকে বিচ্যুতি।

ইসলামে মানুষের জীবন অত্যন্ত মূল্যবান
মানুষের প্রাণ আল্লাহর দেওয়া অমূল্য আমানত। কোনো তুচ্ছ কারণে মানুষের প্রাণ নষ্ট করা ইসলামে সবচেয়ে বড় অপরাধগুলোর একটি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে একজন মানুষকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল। আর যে একজন মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩২)
ফুটবল কিংবা অন্য কোনো খেলাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, প্রতিহিংসা কিংবা হত্যাকাণ্ড তাই ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ।

আত্মহত্যা মহাপাপ
খেলায় হার-জিতের কারণে আত্মহত্যা করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। একজন মুমিন বিপদে ধৈর্য ধারণ করবে, আল্লাহর দিকে ফিরে আসবে; নিজের জীবন ধ্বংস করবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নিজেদেরকে হত্যা কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।’(সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো বস্তু দিয়ে আত্মহত্যা করবে, কিয়ামতের দিন তাকে সেই বস্তু দিয়েই শাস্তি দেওয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৭৭৮)
তাই কোনো দলের হার কিংবা মানুষের কটূক্তির কারণে নিজের জীবন শেষ করে দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে ভয়াবহ অপরাধ এবং অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা।

আর মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—সে অনর্থক ও ক্ষতিকর বিষয় থেকে নিজেকে দূরে রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তারা অনর্থক কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৩)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের ইসলামের সৌন্দর্যের অন্যতম নিদর্শন হলো, সে অনর্থক বিষয় পরিত্যাগ করে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩১৭)
অতএব, এমন উন্মাদনা যা মানুষের সময়, সম্পদ, সম্পর্ক ও জীবনকে ধ্বংস করে দেয়, তা একজন মুসলমানের জন্য শোভন নয়।

সুস্থ শরীর গঠনও ইসলামের শিক্ষা
ইসলাম দুর্বলতা নয়; বরং শক্তি ও কর্মক্ষমতার শিক্ষা দেয়। শরীর সুস্থ রাখা ইবাদত পালনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের তুলনায় আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় ও অধিক উত্তম, যদিও উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৬৪)
তাই ব্যায়াম, দৌড়, সাঁতার, তীরন্দাজি, ঘোড়সওয়ারি কিংবা অন্যান্য বৈধ খেলাধুলা শরীর ও মনের সুস্থতার জন্য প্রশংসনীয়। কিন্তু এগুলো কখনোই বিবাদ, বিদ্বেষ বা প্রাণহানির কারণ হতে পারে না।

সামাজিক দায়িত্ব ও সচেতনতার প্রয়োজন
খেলাকে কেন্দ্র করে বিদ্বেষ ছড়ানো, ট্রোলিং, অপমান, উসকানি কিংবা সংঘর্ষ সৃষ্টি করা সামাজিক অপরাধ। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষের আবেগকে উসকে দেন বা সীমাহীন উন্মাদনা সৃষ্টি করেন, তাদেরও নৈতিক দায় রয়েছে। একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ ছড়িয়ে দেওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০)

সুতরাং খেলাধুলা মানুষের সুস্থ জীবন, শারীরিক সক্ষমতা ও বৈধ বিনোদনের একটি সুন্দর মাধ্যম। কিন্তু সেই খেলাকে কেন্দ্র করে যদি সৃষ্টি হয় অন্ধ সমর্থন, বিদ্বেষ, মারামারি, আত্মহত্যা কিংবা প্রাণহানি, তবে তা ইসলামের সংযম, ভারসাম্য ও মানবিকতার শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সংযম, প্রজ্ঞা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন এবং খেলাধুলাকে কল্যাণ, সৌহার্দ্য ও সুস্থ বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।