• ই-পেপার

রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তন হোক

খেতাবের আড়ালে রাজনীতি

ড. মো: মিজানুর রহমান
খেতাবের আড়ালে রাজনীতি
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি নীরব কিন্তু গভীরভাবে প্রোথিত সমস্যা হলো নামের আগে-পরে বিভিন্ন খেতাব ব্যবহারের প্রবণতা। নির্বাচনী পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা কিংবা সভা-সমাবেশের পরিচিতিপর্বে আমরা প্রায়ই দেখি—ডক্টর, অধ্যাপক, অধ্যক্ষ, আইনজীবী, প্রকৌশলী, আলহাজ্ব, মাওলানা, শায়খ, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক কিংবা আরো নানা বিশেষণযুক্ত পরিচয়। এসব খেতাবের একটি অংশ নিঃসন্দেহে যথাযথ শিক্ষা, পেশাগত যোগ্যতা, গবেষণা, ধর্মীয় সাধনা কিংবা কর্মজীবনের অর্জনের মাধ্যমে প্রাপ্ত। সেসব ক্ষেত্রে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে সেই যোগ্যতার অধিকারী নন, অথচ জনসমক্ষে বা রাজনৈতিক পরিচয়ে সেই উপাধি ব্যবহার করেন, তখন বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি জনবিশ্বাস, নৈতিকতা এবং রাজনৈতিক সততার প্রশ্নে পরিণত হয়।

আরো গভীরে গেলে দেখা যায়, এই প্রবণতার পেছনে শুধু মর্যাদার আকাঙ্ক্ষাই নয়, অনেক সময় আত্মবিশ্বাসের সংকটও কাজ করে। যেসব মানুষ নিজেদের প্রকৃত কাজ, যোগ্যতা, জ্ঞান, নেতৃত্ব বা জনসেবার মাধ্যমে সমাজে পরিচিতি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হন, তাদের একটি অংশ খেতাবকে শর্টকাট হিসেবে ব্যবহার করতে চান। তারা মনে করেন, নামের আগে ডক্টর কিংবা অধ্যাপক লিখে দিলে মানুষ তাদের বেশি সম্মান করবে, বেশি শিক্ষিত ভাববে কিংবা অধিক যোগ্য মনে করবে। অর্থাৎ প্রকৃত যোগ্যতার পরিবর্তে একটি প্রতীকী পরিচয়কে সামনে এনে সামাজিক মর্যাদা অর্জনের চেষ্টা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি আত্মপ্রবঞ্চনা, আবার অনেক ক্ষেত্রে জনগণকে বিভ্রান্ত করার একটি সূক্ষ্ম কৌশল।

প্রকৃতপক্ষে একজন মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হওয়ার কথা তার কর্ম দ্বারা। একজন শিক্ষক শিক্ষকতার মাধ্যমে পরিচিত হবেন, একজন আইনজীবী তার পেশাগত সাফল্যের মাধ্যমে, একজন চিকিৎসক তার চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে এবং একজন রাজনীতিবিদ তার জনসেবার মাধ্যমে। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি নিজের কাজ ও অবদানের পরিবর্তে একটি খেতাবকে সামনে এনে সামাজিক অবস্থান তৈরি করতে চান, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—তিনি কি তার প্রকৃত পরিচয় নিয়ে সন্তুষ্ট নন? তিনি কি তার বাস্তব যোগ্যতার ওপর আস্থা হারিয়েছেন? তিনি কি জনগণকে এমন একটি ধারণা দিতে চাইছেন, যা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়?

উন্নত বিশ্বের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে তাকালে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মতো গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে রাজনৈতিক নেতারা সাধারণত তাদের উপাধির চেয়ে কর্মকে বেশি গুরুত্ব দেন। অ্যাঞ্জেলা মের্কেল একজন বিজ্ঞানী ছিলেন। বারাক ওবামা আইন বিষয়ে অধ্যাপনা করেছেন। মার্গারেট থ্যাচার রসায়নে শিক্ষিত ছিলেন। কিন্তু তারা জনগণের কাছে পরিচিত হয়েছেন তাদের নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতার মাধ্যমে। ভোটাররা তাঁদের সামনে ডক্টর বা প্রফেসর শব্দটি শুনে মুগ্ধ হননি; তারা মূল্যায়ন করেছেন তাদের কর্মফল।

অনেক উন্নত দেশে ভুয়া ডিগ্রি বা বিভ্রান্তিকর উপাধি ব্যবহার রাজনৈতিক জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ সেখানে জনগণ মনে করে, যে ব্যক্তি নিজের পরিচয় সম্পর্কে পুরো সত্য বলেন না, তিনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও পুরো সত্য বলবেন—এমন নিশ্চয়তা কোথায়? ফলে উপাধি নিয়ে মিথ্যাচারকে কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, নেতৃত্বের অযোগ্যতার লক্ষণ হিসেবেও দেখা হয়।

বাংলাদেশে অবশ্য সামাজিক বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে মানুষ এখনও নামের আগে-পরে যুক্ত বিশেষণ ও খেতাব দ্বারা সহজেই প্রভাবিত হয়। ফলে অনেকেই রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার আশায় এসব উপাধি ব্যবহার করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সুবিধা কতটা বাস্তব? একজন ব্যক্তি হয়তো কিছু মানুষের কাছে নিজেকে বেশি শিক্ষিত বা অভিজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হলেন। কিন্তু যখন তার পরিচয়ের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, তখন সেই সাময়িক লাভ বহু গুণ বেশি ক্ষতিতে পরিণত হবে। কারণ মানুষের বিশ্বাস একবার নষ্ট হলে তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে—ভুয়া বা প্রশ্নবিদ্ধ পিএইচডি ডিগ্রি ব্যবহার করে সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা অর্জনের চেষ্টা। বিভিন্ন ব্যক্তি দেশি-বিদেশি অস্বীকৃত, অননুমোদিত বা তথাকথিত ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পিএইচডি সনদ সংগ্রহ করে নিজেদের নামের আগে ‘ডক্টর’ উপাধি ব্যবহার করছেন বলে নানা সময়ে অভিযোগ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার, পেশাগত গ্রহণযোগ্যতা অর্জন এবং কখনো কখনো চাকরি বা পদোন্নতির ক্ষেত্রেও এসব উপাধি ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়। এর ফলে একদিকে প্রকৃত গবেষণা ও দীর্ঘ একাডেমিক সাধনার মাধ্যমে অর্জিত ডক্টরেট ডিগ্রির মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়, অন্যদিকে সমাজে যোগ্যতা ও অর্জন সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণার জন্ম দেয়। যে ডিগ্রি অর্জনের জন্য সাধারণত বছরের পর বছর গবেষণা, তত্ত্বাবধান, মূল্যায়ন ও কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়, সেটিকে যদি অর্থ, প্রভাব বা কৃত্রিম উপায়ে অর্জিত বলে উপস্থাপন করা হয়, তবে তা শুধু একাডেমিক অসততাই নয়; বরং সমাজে সত্য, মেধা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়।

সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, কোনো সমাজে যখন প্রতীক বাস্তবতার চেয়ে বেশি মূল্য পেতে শুরু করে, তখন সেই সমাজে মেধা, পরিশ্রম ও সততার গুরুত্ব কমতে থাকে। মানুষ তখন বাস্তব অর্জনের চেয়ে বাহ্যিক সাজসজ্জাকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। ভুয়া কিংবা অতিরঞ্জিত খেতাবের সংস্কৃতি ঠিক এই বিপজ্জনক প্রবণতাকেই উৎসাহিত করে।

ধরা যাক, একজন ব্যক্তি বহু বছর ফার্মেসিতে ওষুধ বিক্রি করেছেন। এলাকাবাসী স্নেহবশত তাকে ডাক্তার সাহেব বলে ডাকে। এটি একটি সামাজিক বাস্তবতা। কিন্তু তিনি যদি নিজের ভিজিটিং কার্ড, রাজনৈতিক পোস্টার বা আনুষ্ঠানিক পরিচয়ে ডাক্তার লিখতে শুরু করেন, তাহলে তিনি কেবল একটি জনপ্রিয় ডাকনাম ব্যবহার করছেন না; বরং এমন একটি যোগ্যতার দাবি করছেন, যা হয়তো তার নেই। একইভাবে কেউ স্বল্প সময় শিক্ষকতা করেছেন বলে সমাজ তাকে অধ্যাপক বলে সম্বোধন করতে পারে। কিন্তু সেই সামাজিক সম্বোধনকে আনুষ্ঠানিক পরিচয়ে রূপান্তর করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকেও এ বিষয়ে গভীর শিক্ষা রয়েছে। ইসলামে সততা শুধু অর্থনৈতিক লেনদেনে নয়, পরিচয়ের ক্ষেত্রেও অপরিহার্য। একজন মানুষ যা নন, নিজেকে তা হিসেবে উপস্থাপন করা ইসলামী নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মহানবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের সামনে নিজেকে বড় করে উপস্থাপন করা, অহংকার করা এবং মিথ্যা মর্যাদা দাবি করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা দিয়েছেন। ইসলামী ঐতিহ্যে প্রকৃত জ্ঞানীরা নিজেদের মর্যাদা প্রচার না করে বরং বিনয় প্রদর্শন করতেন। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী এবং ইমাম আহমদ ইবন হাম্বলের মতো মনীষীরা তাঁদের জ্ঞান ও চরিত্রের কারণে সম্মানিত হয়েছেন; নিজেদের জন্য জাঁকজমকপূর্ণ পরিচয় নির্মাণ করে নয়।

আজকের বাস্তবতায় খেতাবের অপব্যবহার কেবল একটি ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি সামাজিক আস্থার সংকট তৈরি করে। কারণ সমাজে যখন মানুষ দেখতে পায় যে প্রকৃত যোগ্যতা ছাড়াও নানা উপাধি ব্যবহার করে মর্যাদা অর্জন সম্ভব, তখন তারা কঠোর পরিশ্রম, গবেষণা, শিক্ষা ও আত্মোন্নয়নের পরিবর্তে শর্টকাট খোঁজার দিকে ঝুঁকে পড়ে। একজন তরুণ ছাত্র তখন ভাবতে পারে—ডিগ্রি অর্জনের চেয়ে ডিগ্রির ভাবমূর্তি অর্জনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন উদীয়মান রাজনীতিক ভাবতে পারে—জনসেবার চেয়ে পরিচয়ের অলংকারই বেশি কার্যকর। এটি একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর মানসিকতা।

আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংস্কৃতি ধীরে ধীরে সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার সামাজিক পার্থক্যকে ক্ষয় করে। মানুষ যখন প্রতিদিন অসত্য, অতিরঞ্জন ও কৃত্রিম পরিচয় দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন সততা আর বিশেষ কোনো গুণ হিসেবে বিবেচিত হয় না। মিথ্যাও তখন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। একটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয় সাধারণত এভাবেই শুরু হয়—বড় অপরাধ দিয়ে নয়, ছোট ছোট অসততাকে স্বাভাবিক করে তোলার মাধ্যমে।

অথচ একজন রাজনৈতিক নেতার সবচেয়ে বড় শক্তি তার খেতাব নয়, তার বিশ্বাসযোগ্যতা। জনগণ শেষ পর্যন্ত তার নামের আগে কী লেখা আছে তা মনে রাখে না; তারা মনে রাখে তিনি মানুষের জন্য কী করেছেন। দুর্যোগে তিনি কোথায় ছিলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কতটা সোচ্চার ছিলেন, জনগণের সমস্যা সমাধানে কতটা আন্তরিক ছিলেন—এসবই একজন নেতার প্রকৃত পরিচয়।

যদি কোনো ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত হন, তবে তার জ্ঞানই তাকে পরিচিত করবে। যদি তিনি সত্যিকারের আইনজীবী হন, তবে তার পেশাগত সাফল্যই তাকে প্রতিষ্ঠিত করবে। যদি তিনি প্রকৃত শিক্ষক হন, তবে তার ছাত্ররাই তার সম্মানের সাক্ষ্য দেবে। আর যদি তিনি সত্যিকারের জননেতা হন, তবে জনগণের ভালোবাসাই হবে তার সবচেয়ে বড় খেতাব। সেখানে কৃত্রিম উপাধির কোনো প্রয়োজন পড়ে না।

বরং ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যারা নিজেদের অর্জনের চেয়ে বেশি বড় পরিচয় প্রদর্শনের চেষ্টা করেছেন, তারা শেষ পর্যন্ত সম্মানের চেয়ে সমালোচনাই বেশি অর্জন করেছেন। কারণ মানুষ ভুলে যেতে পারে একজন ব্যক্তি কত বড় ডিগ্রিধারী ছিলেন, কিন্তু মানুষ কখনো ভুলে যায় না কে সৎ ছিল আর কে ছিল অসৎ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আরো পরিণত করতে হলে এই খেতাবনির্ভর মর্যাদাবোধ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত প্রার্থীদের পরিচয় ও যোগ্যতার বিষয়ে কঠোর যাচাই-বাছাই করা। গণমাধ্যমের উচিত তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে জনগণকে সত্য জানানো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত তরুণদের শেখানো যে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার চরিত্র। আর নাগরিক সমাজের উচিত খেতাব নয়, কাজকে মূল্যায়ন করা।

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে নামের আগে ডক্টর, অধ্যাপক, অধ্যক্ষ বা আইনজীবী লেখা যতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই ব্যক্তি সত্যবাদী কি না। কারণ খেতাব সম্মান দাবি করতে পারে, কিন্তু সততা সম্মান অর্জন করে। খেতাব মানুষকে সাময়িকভাবে বড় দেখাতে পারে, কিন্তু চরিত্র মানুষকে প্রকৃত অর্থে বড় করে তোলে।

অতএব, খেতাবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মর্যাদার এই সংস্কৃতিকে পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মানুষ পরিচয়ের সাজসজ্জা দিয়ে বড় হয়; নাকি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মানুষ সত্য, যোগ্যতা, শ্রম ও সততার মাধ্যমে সম্মান অর্জন করে? বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতির মান অনেকাংশে নির্ভর করছে এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টা, প্রতিরোধ নয়, প্রতিবাদও করতে হবে

আহসান হাবিব বরুন
সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টা, প্রতিরোধ নয়, প্রতিবাদও করতে হবে
সংগৃহীত ছবি

রাষ্ট্রের সীমান্ত একটি দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক, কিন্তু মানুষের মর্যাদা তারও ঊর্ধ্বে। আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো এই বিশ্বাস যে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি সেই অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং কূটনৈতিক রীতিনীতি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কথিত ‘পুশ ইন’ নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতি, মানবাধিকার এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

বাংলাদেশের মানুষের কাছে সীমান্ত সংকট নতুন নয়। ভারতের তরফে সীমান্ত হত্যা, গুলি, আটক, নির্যাতন এবং বিভিন্ন সময়ে জোরপূর্বক প্রত্যাবাসনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের সম্পর্কের একটি অস্বস্তিকর অধ্যায় হয়ে আছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পুশ ইন বিতর্ক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ এখানে শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা নয়, সরাসরি মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রের মর্যাদার প্রশ্ন জড়িত।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠ। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (UDHR)-এর ১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব মানুষ মর্যাদা ও অধিকারে সমান। ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে খামখেয়ালি গ্রেপ্তার, আটক বা নির্বাসনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক চুক্তি (ICCPR)-এর ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিককে বহিষ্কার করতে হলে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে এবং তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।

আবার আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের অন্যতম মৌলিক নীতি নন-রিফাউলমেন্ট (Non-Refoulement) অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে এমন পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া যায় না, যেখানে তার নিরাপত্তা, অধিকার বা আইনগত অবস্থান মারাত্মকভাবে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তার সমাধান হতে হবে যৌথ যাচাই, কনস্যুলার যোগাযোগ এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে; সীমান্তে একতরফাভাবে ঠেলে দেওয়ার মাধ্যমে নয়।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের বর্তমান অবস্থানকে আরো বিব্রতকর করে তুলেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। সমালোচনা শুধু বাংলাদেশ থেকে আসছে না; ভারতের ভেতর থেকেও আসছে। পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন Association for Protection of Democratic Rights (APDR) প্রকাশ্যে বিএসএফের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছে এবং একে মানবাধিকারবিরোধী ও অসাংবিধানিক বলে আখ্যায়িত করেছে। সংগঠনটি ভারতের সংবিধানের ১৪ ও ২১ অনুচ্ছেদের আলোকে প্রশ্ন তুলেছে—যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কীভাবে কাউকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়?

এই সমালোচনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে আমি মনে করি। কারণ অভিযোগগুলো কোনো বিদেশি সরকার বা ভারতের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছ থেকে আসেনি; এসেছে ভারতের নিজস্ব নাগরিক সমাজ, মানবাধিকারকর্মী এবং গণতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলোর কাছ থেকে। ফলে এটি আর কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; বরং এটি ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গীকারের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।

এদিকে ভারত নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে পরিচয় দেয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। কিন্তু সীমান্তে যদি এমন আচরণের অভিযোগ ওঠে, যা সেই মূল্যবোধের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—ভারত কি তার ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে বাস্তব আচরণের সামঞ্জস্য বজায় রাখতে পারছে?

এখানে ভারতের নীতিনির্ধারকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা উপলব্ধি করা জরুরি। বাংলাদেশ এখন আর নব্বই দশক কিংবা একবিংশ শতাব্দীর শুরুর সেই বাংলাদেশ নয়, যাকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে দুর্বল অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হতো। গত দুই দশকে অর্থনীতি, অবকাঠামো, মানবসম্পদ, কৌশলগত অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে বঙ্গোপসাগর শুধু একটি জলরাশি নয়; এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন শক্তির ভারসাম্য গড়ে উঠছে। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্বিন্যাস, সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ এবং নৌ-বাণিজ্যের নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশকে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, তুরস্ক এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে। ফলে ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে পুরোনো মানসিকতা বা একতরফা প্রভাব বিস্তারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিচালনার চেষ্টা করে তবে তা কৌশলগতভাবে কখনোই ফলপ্রসূ হবে না।

ভারতের উপলব্ধি করে জরুরি যে,প্রতিবেশী সম্পর্ক কখনো আধিপত্যের ভিত্তিতে টিকে থাকে না। ইতিহাস বলে, দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি এবং সমতা। সুতরাং ভারত যদি সত্যিই দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীল নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতে চায়, তাহলে তাকে প্রথমে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেই দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক নীতিগুলোর প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতির আরেকটি দিক দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সীমান্তে ভারতের অস্বাভাবিক তৎপরতা এমন এক সময়ে দৃশ্যমান হয়েছে, যখন বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে মালয়েশিয়া ও চীন সফরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত হয়েছে।

সময়গত এই মিলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে নানা বিশ্লেষণ ও আলোচনা দেখা যাচ্ছে। যদিও কোনো কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের পেছনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত মন্তব্য করা কঠিন, তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের অধিকার সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যাপার।

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং কৌশলগত প্রয়োজন বিবেচনা করেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনা করবে। কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা অন্য কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সমার্থক নয়। আধুনিক কূটনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হলো বহুমাত্রিক অংশীদারত্ব।

যদি ভারতে সত্যিই বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার নিয়ে কোনো অসন্তোষ থেকে থাকে, তাহলে তা বাস্তবতার সঙ্গে মোটেও  সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ বাংলাদেশ কোনো রাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ের অংশ নয়। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, আত্মমর্যাদাশীল এবং ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন রাষ্ট্র। তার পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হবে ঢাকার জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে; অন্য কোনো রাজধানীর প্রত্যাশার ভিত্তিতে নয়।

এখানে আরেকটি রাজনৈতিক বাস্তবতার কথাও উপেক্ষা করা যায় না। বিগত সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঢাকার নীতিগত অবস্থান নিয়ে দেশের ভেতরে বিস্তর বিতর্ক ছিল। সমালোচকদের একটি অংশের মতে, তৎকালীন সরকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন এক নীতি অনুসরণ করেছিল, যেখানে পারস্পরিকতার তুলনায় একতরফা ছাড় ও সুবিধা প্রদানের প্রবণতা বেশি দৃশ্যমান ছিল। ফলে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সেই বাস্তবতার পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অধিক ভারসাম্য ও বহুমাত্রিকতার প্রত্যাশা ভারতের কিছু নীতিনির্ধারক মহলে অস্বস্তির কারণ হয়ে থাকতে পারে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করেই পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবে—এটাই একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের স্বাভাবিক পথ।

এখানে আমি মনে করি, বাংলাদেশের জন্যও সীমান্ত পরিস্থিতি একটি নির্মম শিক্ষা। তাই শুধু প্রতিরোধ করলেই হবে না; আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে আরও শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। জাতিসংঘ, মানবাধিকার কাউন্সিল, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক ফোরামে তথ্য-প্রমাণসহ বিষয়টি তুলে ধরতে হবে। সীমান্তে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ নথিভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আবেগ নয়, তথ্যই শক্তি। অভিযোগ নয়, প্রমাণই গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে। আর নীরবতা কখনো মর্যাদা রক্ষা করে না; বরং অনেক সময় অন্যায়কে উৎসাহিত করে।

বাংলাদেশ সংঘাত চায় না, উত্তেজনাও চায় না। বাংলাদেশ চায় একটি মর্যাদাপূর্ণ, ভারসাম্যপূর্ণ এবং পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক সম্পর্ক। কিন্তু বন্ধুত্বের অর্থ কখনো নীরব আনুগত্য নয়। বন্ধুত্বের ভিত্তি হলো সমতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা।

আজকের বাস্তবতায় ভারতের জন্যও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে অনুধাবন করা। কারণ ইতিহাসের অন্যতম বড় শিক্ষা হলো—যে রাষ্ট্র সময়মতো পরিবর্তনকে বুঝতে ব্যর্থ হয়, শেষ পর্যন্ত সেই রাষ্ট্রই কৌশলগত ক্ষতির মুখোমুখি হয়।


পরিশেষে বলা যায়, পুশ ইন নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো কেবল সীমান্তের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে শক্তির প্রদর্শন নয়, প্রয়োজন আইনের শাসন, মানবিক মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক সম্মানের প্রতি আন্তরিক অঙ্গীকার।
বাংলাদেশের করণীয়ও স্পষ্ট। সীমান্তে সতর্কতা ও প্রতিরোধ যেমন অব্যাহত রাখতে হবে, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও সক্রিয়, সুসংগঠিত এবং তথ্যভিত্তিক প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। কারণ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা শুধু তার ভূখণ্ড রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে দৃঢ় ও সাহসী অবস্থান গ্রহণের মধ্যেও নিহিত। সুতরাং পুশ ইনের বিরুদ্ধে শুধু প্রতিরোধ নয়, প্রতিবাদও করতে হবে; এবং সেই প্রতিবাদ হতে হবে যুক্তি, প্রমাণ, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও জাতীয় আত্মমর্যাদার দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। অতএব যেকোনো মূল্যে সীমান্ত সংকটের সুষ্ঠু সমাধান করতেই হবে। 

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected] 
 

স্বপ্নের বাজেট, বাস্তবের দুঃস্বপ্ন : বাস্তবায়নের ব্যর্থতায় ডুবছে জাতির প্রত্যাশা

মৌসুমী ইসলাম
স্বপ্নের বাজেট, বাস্তবের দুঃস্বপ্ন : বাস্তবায়নের ব্যর্থতায় ডুবছে জাতির প্রত্যাশা
সংগৃহীত ছবি

প্রতি বছর সংসদে বাজেট পেশের দিনটি আসে বিশাল প্রতিশ্রুতি আর উচ্চাভিলাষী সংখ্যার ভার নিয়ে। কিন্তু অর্থবছর শেষে যখন হিসাব মেলানো হয়, তখন দেখা যায়, বরাদ্দের বিশাল অংশ কাগজেই রয়ে গেছে, মাঠে পৌঁছায়নি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটও এই পুরনো রোগ থেকে মুক্ত নয়। একজন উদ্যোক্তা, শিল্পনেতা ও নারী উন্নয়নকর্মী হিসেবে আমি মনে করি, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না—বাস্তবায়নের সংস্কৃতি বদলাতে হবে।

বাজেটের চ্যালেঞ্জ : যে বাধা পেরোনো যাচ্ছে না এবারের বাজেটে সরকারি ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বিপুল অংকে, কিন্তু রাজস্ব আহরণের বাস্তবতা সেই লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) ধারাবাহিক ব্যর্থতা, কর ফাঁকি রোধে কার্যকর পদক্ষেপের অনুপস্থিতি এবং সরকারি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এক দুষ্টচক্র।

•    রাজস্ব ঘাটতি : প্রতি বছর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২০-৩০% কম রাজস্ব আদায় হচ্ছে, যা বাজেটের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করছে।
•    ব্যাংকিং খাতের সংকট : খেলাপি ঋণের পাহাড় বাড়তেই থাকছে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না, আর বৃহৎ ঋণখেলাপিরা পার পেয়ে যাচ্ছেন।
•    মুদ্রাস্ফীতির চাপ : সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, নিত্যপণ্যের মূল্য আকাশছোঁয়া, অথচ বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর কাঠামো নেই।
•    বৈদেশিক মুদ্রার সংকট : রিজার্ভ সংকট এখনও কাটেনি, আমদানি নির্ভরতা কমানোর কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়।

বাজেটের ফাঁকফোকর : যেখানে হারিয়ে যায় টাকা বাজেট বক্তৃতায় সুন্দর কথা, আর বাস্তব মাঠে পরিস্থিতি — এই দুয়ের মধ্যে যে গভীর খাদ তৈরি হয়েছে, তা এখন আর কোনো গোপন তথ্য নয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (ADP) মাত্র ৫০-৬০% বাস্তবায়িত হয় প্রতি বছর। খাত    বরাদ্দ  (প্রতিশ্রুতি)   বাস্তবতা (সমস্যা) স্বাস্থ্য খাত   GDP-র ১% এরও কম  বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় লাগামহীন ব্যয়।  শিক্ষা খাত    GDP-র ২% এর কাছাকাছি   মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। নারী উন্নয়ন  নামমাত্র বরাদ্দ। তৃণমূল নারী উদ্যোক্তারা বঞ্চিতই থাকছেন।  চিকিৎসা যন্ত্রপাতি  আমদানি নির্ভরতা অব্যাহত। দেশীয় উৎপাদনে কোনো প্রণোদনা নেই।  এসএমই খাত ঋণ সহজলভ্যতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে জামানত সংকটে আটকে থাকছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। 

প্রভাব : কে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি?বাজেটের দুর্বল বাস্তবায়নের মাশুল দিতে হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষদের — বিশেষত তৃণমূল নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে। নারী উদ্যোক্তাদের উপর প্রভাব AGWEB-এর মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি — তৃণমূল নারী উদ্যোক্তারা এখনও ব্যাংক ঋণ, প্রশিক্ষণ সুবিধা ও বাজার সংযোগ থেকে বঞ্চিত। বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক তহবিল ও নীতি সহায়তার ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে সেই সুবিধা তাদের কাছে পৌঁছায় না। মধ্যবর্তী স্তরের দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতায় এই সুযোগগুলো হারিয়ে যায়।

চিকিৎসা যন্ত্রপাতি শিল্পে প্রভাব MEDMEB-এর একজন নেতৃত্ব হিসেবে আমি দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি যে, বাংলাদেশে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি উৎপাদন ও রপ্তানি খাতে দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বাজেটে কার্যকর প্রণোদনা নেই। আমদানি শুল্ক কাঠামো এমনভাবে সাজানো যে দেশীয় উৎপাদনকারীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না।

শিল্প ও বাণিজ্যে প্রভাব PROMIXCO Group-এর মতো বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো আজ যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে, তা হলো — গ্যাস ও বিদ্যুতের অস্থির মূল্য, দক্ষ জনশক্তির অভাব এবং নীতি অনিশ্চয়তা। বাজেটে এই সমস্যাগুলোর সমাধানে কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ নেই।

দুর্বল বাস্তবায়ন: সংখ্যায় যখন বলা হয় গল্প বাজেট বাস্তবায়নের হার নিয়ে তথ্য-উপাত্ত বলছে এক বেদনাদায়ক সত্য। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অর্থ বছরের শেষ তিন মাসে ব্যয় হওয়া 'জুন মাসের উন্মাদনা' এখন যেন একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে — শুধু বাস্তবায়নের তাড়নায় টাকা ঢালা হয়, প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত না করেই।

•    ADP বাস্তবায়ন হার গড়ে মাত্র ৫৫-৬৫% — প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা অব্যবহৃত ফেরত যায়।
•    সরকারি প্রকল্পে মেয়াদ বৃদ্ধি ও ব্যয় বৃদ্ধি এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে — জবাবদিহির কোনো কাঠামো নেই।
•    সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর টাকা প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছানোর হার উদ্বেগজনকভাবে কম — তালিকায় ভুয়া নাম ও দুর্নীতি এখনও বড় সমস্যা।
•    ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ হয়, কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ডিজিটাল সেবার বাইরেই থাকে।

আমাদের দাবি ও সুপারিশ :

শুধু সমালোচনায় দায়িত্ব শেষ হয় না। একজন উদ্যোক্তা ও সমাজসেবক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, সুনির্দিষ্ট সংস্কার পদক্ষেপের মাধ্যমেই এই পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব:

•    নারী উদ্যোক্তা তহবিল : তৃণমূল নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতমুক্ত ঋণ ও ডিজিটাল বাজার সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
•    দেশীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি উৎপাদন : আমদানি শুল্ক পুনর্বিন্যাস করে দেশীয় উৎপাদনকারীদের প্রণোদনা দিতে হবে।
•    ADP বাস্তবায়নে জবাবদিহি : প্রকল্প পরিচালকদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে বাস্তবায়ন হারকে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
•    এসএমই সংস্কার: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য একক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো (Single Window) তৈরি করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে।
•    সামাজিক নিরাপত্তা সংস্কার : ডিজিটাল পদ্ধতিতে সুবিধাভোগী যাচাই ও সরাসরি নগদ হস্তান্তর ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

বাজেট নয়, বাস্তবায়নই হোক প্রতিশ্রুতি :

বাজেট একটি দলিল, বাস্তবায়ন একটি সংস্কৃতি। যতদিন না আমরা এই সংস্কৃতি বদলাতে পারব — যতদিন না প্রতিটি টাকার হিসাব প্রকৃত সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত হবে — ততদিন লক্ষ কোটি টাকার বাজেটও শুধু কাগজের স্বপ্নই থাকবে। আমাদের দেশের নারী উদ্যোক্তারা, প্রান্তিক মানুষেরা, তরুণ উদ্যোক্তারা — তারা ভালো বক্তৃতা চান না, তারা চান কর্মসংস্থান, ঋণ, বাজার আর মর্যাদা। সরকারের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ — বাজেট ঘোষণা নয়, বাজেট বাস্তবায়নকেই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে নিন।

লেখক : সভাপতি, AGWEB ও MEDMEB এবং চেয়ারপারসন PROMIXCO Group। 

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে আমরা ৪ বছর ধরে লাল তালিকাভুক্ত : ড. জাহাঙ্গীর আলম

অনলাইন ডেস্ক
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে আমরা ৪ বছর ধরে লাল তালিকাভুক্ত : ড. জাহাঙ্গীর আলম
ছবি: কালের কণ্ঠ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে। এ নিয়ে কালের কণ্ঠ মাল্টিমিডিয়ার নিয়মিত আয়োজন দ্য বিজনেস রিভিউ শোতে কথা বলেছেন একুশে প্রদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম।

ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘কন্ট্রাকশন পলিসির সঙ্গে ফিসকাল পলিসির একটা সম্পর্ক আছে। ফিসকাল পলিসি যদি সঠিকভাবে পরিচালিত না হয় তাহলে শুধু কন্ট্রাক্ট শ্রেণি মনিটরি পলিসি দিয়ে দ্রব্যমূল্যকে স্বাভাবিক করা সম্ভব না। ইনফ্লেশনটা কমিয়ে আনা ডিফিকাল্ট। কারণ একদিকে আপনি সুদের হার বাড়িয়েছেন, বাড়িয়ে টাকা নিয়ে যাচ্ছেন ব্যাংকের খাতে। আরেক দিকে প্রায় এক লাখ কোটি টাকারও বেশি আপনি ব্যাংকের সিস্টেম থেকে নিয়ে গেছেন এবং বাজারে ছেড়েছেন। তো এই যখন হয় তখন উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে নির্বাপিত করা এটা খুব ডিফিকাল্ট হয়ে পড়ে। সবচাইতে বড় জিনিস হলো খাদ্য মূল্যস্ফীতি।’

এবারও কিন্তু খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৯.০৬ শতাংশ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গত মাসেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এখন খাদ্যমূল্যস্ফীতি গত চার বছর ধরে আমরা খুব উচ্চ পর্যায়ে দেখছি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে আমরা লাল তালিকাভুক্ত গত চার বছর ধরে। তো এমন একটা পরিস্থিতিতে উৎপাদন না বাড়িয়ে আপনি খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে নামিয়ে আনা এটা ডিফিকাল্ট। এখন গত বছর ২০২৪-২৫ সময়ে আমাদের যেই প্রবৃদ্ধি কৃষি খাতে সেটা ছিল ২.৪২ শতাংশ।

এই বছর যে প্রবৃদ্ধি ধারণা করা হচ্ছে এটা প্রাথমিকভাবে যেটা প্রকাশ করা হয়েছে আজকে আমি দেখলাম এটা ২.৭২ শতাংশ। এর মানে গত ৫৪ বছর ধরে আমরা যে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছি ৩ শতাংশ বা তার চাইতে ওপরে গড়ে লং টার্ম ট্রেন যেটা সেটা খুব কম এবং উৎপাদন যখন স্বাভাবিকভাবে প্রবৃত্তি অর্জন করা না হয় তখন বাজারে স্বাভাবিকভাবেই সরবরাহ কমে এবং সরবরাহ যখন কমে তখন মূল্যস্ফীতি বাড়ে। খাদ্যের ক্ষেত্রে এটা অত্যন্ত খুব জটিল। কারণ এটা শুধু আপনার যে উৎপাদন প্রবৃদ্ধি কম সেটা না।’

একুশে প্রদকপ্রাপ্ত এই কৃষি অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বাজার ব্যবস্থাকে কিন্তু আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। সরকারের নিয়ন্ত্রণে বাজার ব্যবস্থাটা নাই। বাজার ব্যবস্থাটা সম্পূর্ণভাবে আমাদের ব্যবসায়ী যারা আছেন তাদের হাতে। কারণটা বুঝতে হবে, সেটা হলো সরকার যে ইন্টারভিন করে, কি দিয়ে ইন্টারভিন করে? আমার মাত্র ২০ থেকে ২২ লাখ টন চাল থাকে গম থাকে এর বেশি না, সরকারের এর বেশি ক্যাপাসিটিও নাই। কিন্তু প্রাইভেট সেক্টরে সেটা এক কোটি টনেরও বেশি খাদ্যশস্য মজুদ থাকে, সুযোগ তাদের বেশি। কাজেই প্রাইভেট সেক্টরে যখন যেভাবে বাজারটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় তারা সেটা করতে পারে। সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারত যদি তাদের হাতে আরো বেশি আপনার ইন্টারভিন করার ক্ষমতা থাকত কিন্তু সরকারের হাতে এই ইন্টারভিন করার ক্ষমতা নাই।’

তিনি বলেন, ‘আরেকটি বিষয় হলো যে আন্তর্জাতিক মূল্য। আন্তর্জাতিক মূল্য মাঝখানে কিছুটা কমে গিয়েছিল। কিন্তু এখন এই আপনি যেটা বললেন, যে ইরান এবং ইউএস যেই যুদ্ধ শুরু হয়েছে এটার কারণে আবার পণ্যমূল্য বেড়ে গেছে। সবচাইতে বড় জিনিস হলো—যে উপকরণ যেমন সার, রাসায়নিক সার, তেল এগুলোর দাম বেড়ে গেছে এবং এগুলোর দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে সারা বিশ্বের উৎপাদন ২ শতাংশ হ্রাস পাবে এটাই আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই সব পণ্যের দাম কিন্তু বেড়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাচ্ছে। তো বাংলাদেশেও এটার প্রভাব পড়েছে। এখন হলো গরুর মৌসুম। এই সময়ে চালের দাম তিন থেকে চার টাকা প্রতিকেজি বেড়ে গেছে।’

রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তন হোক | কালের কণ্ঠ