প্রতি বছর সংসদে বাজেট পেশের দিনটি আসে বিশাল প্রতিশ্রুতি আর উচ্চাভিলাষী সংখ্যার ভার নিয়ে। কিন্তু অর্থবছর শেষে যখন হিসাব মেলানো হয়, তখন দেখা যায়, বরাদ্দের বিশাল অংশ কাগজেই রয়ে গেছে, মাঠে পৌঁছায়নি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটও এই পুরনো রোগ থেকে মুক্ত নয়। একজন উদ্যোক্তা, শিল্পনেতা ও নারী উন্নয়নকর্মী হিসেবে আমি মনে করি, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না—বাস্তবায়নের সংস্কৃতি বদলাতে হবে।
বাজেটের চ্যালেঞ্জ : যে বাধা পেরোনো যাচ্ছে না এবারের বাজেটে সরকারি ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বিপুল অংকে, কিন্তু রাজস্ব আহরণের বাস্তবতা সেই লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) ধারাবাহিক ব্যর্থতা, কর ফাঁকি রোধে কার্যকর পদক্ষেপের অনুপস্থিতি এবং সরকারি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এক দুষ্টচক্র।
• রাজস্ব ঘাটতি : প্রতি বছর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২০-৩০% কম রাজস্ব আদায় হচ্ছে, যা বাজেটের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করছে।
• ব্যাংকিং খাতের সংকট : খেলাপি ঋণের পাহাড় বাড়তেই থাকছে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না, আর বৃহৎ ঋণখেলাপিরা পার পেয়ে যাচ্ছেন।
• মুদ্রাস্ফীতির চাপ : সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, নিত্যপণ্যের মূল্য আকাশছোঁয়া, অথচ বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর কাঠামো নেই।
• বৈদেশিক মুদ্রার সংকট : রিজার্ভ সংকট এখনও কাটেনি, আমদানি নির্ভরতা কমানোর কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়।
বাজেটের ফাঁকফোকর : যেখানে হারিয়ে যায় টাকা বাজেট বক্তৃতায় সুন্দর কথা, আর বাস্তব মাঠে পরিস্থিতি — এই দুয়ের মধ্যে যে গভীর খাদ তৈরি হয়েছে, তা এখন আর কোনো গোপন তথ্য নয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (ADP) মাত্র ৫০-৬০% বাস্তবায়িত হয় প্রতি বছর। খাত বরাদ্দ (প্রতিশ্রুতি) বাস্তবতা (সমস্যা) স্বাস্থ্য খাত GDP-র ১% এরও কম বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় লাগামহীন ব্যয়। শিক্ষা খাত GDP-র ২% এর কাছাকাছি মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। নারী উন্নয়ন নামমাত্র বরাদ্দ। তৃণমূল নারী উদ্যোক্তারা বঞ্চিতই থাকছেন। চিকিৎসা যন্ত্রপাতি আমদানি নির্ভরতা অব্যাহত। দেশীয় উৎপাদনে কোনো প্রণোদনা নেই। এসএমই খাত ঋণ সহজলভ্যতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে জামানত সংকটে আটকে থাকছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা।
প্রভাব : কে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি?বাজেটের দুর্বল বাস্তবায়নের মাশুল দিতে হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষদের — বিশেষত তৃণমূল নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে। নারী উদ্যোক্তাদের উপর প্রভাব AGWEB-এর মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি — তৃণমূল নারী উদ্যোক্তারা এখনও ব্যাংক ঋণ, প্রশিক্ষণ সুবিধা ও বাজার সংযোগ থেকে বঞ্চিত। বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক তহবিল ও নীতি সহায়তার ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে সেই সুবিধা তাদের কাছে পৌঁছায় না। মধ্যবর্তী স্তরের দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতায় এই সুযোগগুলো হারিয়ে যায়।
চিকিৎসা যন্ত্রপাতি শিল্পে প্রভাব MEDMEB-এর একজন নেতৃত্ব হিসেবে আমি দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি যে, বাংলাদেশে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি উৎপাদন ও রপ্তানি খাতে দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বাজেটে কার্যকর প্রণোদনা নেই। আমদানি শুল্ক কাঠামো এমনভাবে সাজানো যে দেশীয় উৎপাদনকারীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না।
শিল্প ও বাণিজ্যে প্রভাব PROMIXCO Group-এর মতো বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো আজ যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে, তা হলো — গ্যাস ও বিদ্যুতের অস্থির মূল্য, দক্ষ জনশক্তির অভাব এবং নীতি অনিশ্চয়তা। বাজেটে এই সমস্যাগুলোর সমাধানে কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ নেই।
দুর্বল বাস্তবায়ন: সংখ্যায় যখন বলা হয় গল্প বাজেট বাস্তবায়নের হার নিয়ে তথ্য-উপাত্ত বলছে এক বেদনাদায়ক সত্য। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অর্থ বছরের শেষ তিন মাসে ব্যয় হওয়া 'জুন মাসের উন্মাদনা' এখন যেন একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে — শুধু বাস্তবায়নের তাড়নায় টাকা ঢালা হয়, প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত না করেই।
• ADP বাস্তবায়ন হার গড়ে মাত্র ৫৫-৬৫% — প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা অব্যবহৃত ফেরত যায়।
• সরকারি প্রকল্পে মেয়াদ বৃদ্ধি ও ব্যয় বৃদ্ধি এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে — জবাবদিহির কোনো কাঠামো নেই।
• সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর টাকা প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছানোর হার উদ্বেগজনকভাবে কম — তালিকায় ভুয়া নাম ও দুর্নীতি এখনও বড় সমস্যা।
• ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ হয়, কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ডিজিটাল সেবার বাইরেই থাকে।
আমাদের দাবি ও সুপারিশ :
শুধু সমালোচনায় দায়িত্ব শেষ হয় না। একজন উদ্যোক্তা ও সমাজসেবক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, সুনির্দিষ্ট সংস্কার পদক্ষেপের মাধ্যমেই এই পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব:
• নারী উদ্যোক্তা তহবিল : তৃণমূল নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতমুক্ত ঋণ ও ডিজিটাল বাজার সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
• দেশীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি উৎপাদন : আমদানি শুল্ক পুনর্বিন্যাস করে দেশীয় উৎপাদনকারীদের প্রণোদনা দিতে হবে।
• ADP বাস্তবায়নে জবাবদিহি : প্রকল্প পরিচালকদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে বাস্তবায়ন হারকে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
• এসএমই সংস্কার: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য একক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো (Single Window) তৈরি করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে।
• সামাজিক নিরাপত্তা সংস্কার : ডিজিটাল পদ্ধতিতে সুবিধাভোগী যাচাই ও সরাসরি নগদ হস্তান্তর ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
বাজেট নয়, বাস্তবায়নই হোক প্রতিশ্রুতি :
বাজেট একটি দলিল, বাস্তবায়ন একটি সংস্কৃতি। যতদিন না আমরা এই সংস্কৃতি বদলাতে পারব — যতদিন না প্রতিটি টাকার হিসাব প্রকৃত সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত হবে — ততদিন লক্ষ কোটি টাকার বাজেটও শুধু কাগজের স্বপ্নই থাকবে। আমাদের দেশের নারী উদ্যোক্তারা, প্রান্তিক মানুষেরা, তরুণ উদ্যোক্তারা — তারা ভালো বক্তৃতা চান না, তারা চান কর্মসংস্থান, ঋণ, বাজার আর মর্যাদা। সরকারের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ — বাজেট ঘোষণা নয়, বাজেট বাস্তবায়নকেই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে নিন।
লেখক : সভাপতি, AGWEB ও MEDMEB এবং চেয়ারপারসন PROMIXCO Group।




