২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সংসদে উপস্থাপিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসে বৃহত্তম বাজেট হলেও এই বাজেটে জনগণের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে দাবি করে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এর আগে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বাজেট উপস্থাপনের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে সমাবেশে করে দলটি।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘সরকার জনগণের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে দলীয়কর্মী পালনের বাজেট উপস্থাপন করেছে।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের অর্থমন্ত্রী যেই বাজেট উপস্থাপন করেছে সেই বাজেট গণবিরোধী ও লুটপাটের বাজেট। এই বাজেটে জুলাই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয়নি। পুরনো ব্যবস্থার বাজেটের চিত্র অঙ্কন করা হয়েছে। এই বাজেট বিশাল ঋণনির্ভর বাজেট। এই বাজেটে ঋণ ও করের বোঝা জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়ে সরকার গণবিরোধী বাজেট উপস্থাপন করেছে।’
দলীয় কর্মীদের লুটপাটের জন্য বাজেটের আকার বৃদ্ধি করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন বরাদ্দের তহবিল যাবে সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের পকেটে। যারা বাজেট প্রণয়ন করেছে তারা ধনী শ্রেণির বলে তারা ধনীবান্ধব বাজেট প্রণয়ন করেছে। তারা গরিবের দুঃখ-কষ্ট বুঝে না। এ জন্য তারা গরিববান্ধব বাজেট প্রণয়ন করতে পারেনি। বাজেট প্রণয়নে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হলে জনবান্ধব বাজেট উপস্থাপন করা সম্ভব। বাজেটের ৭০ শতাংশ চলে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয় হিসাবে! তাহলে জনগণ বাজেট দিয়ে কী উপকৃত হবে সেটি সরকার বিবেচনা করেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘সরকারের উপস্থাপিত বাজেট থেকে ১ লাখ কোটি টাকার কম বাজেট প্রস্তাব করেছে জামায়াতে ইসলামী। কারণ জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত বাজেটে দলীয় কর্মীদের পালন করা হবে না, লুটপাটের সুযোগ থাকবে না, দুর্নীতি হবে না। জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত বাজেট সরাসরি জনগণের কল্যাণে ব্যবহার হবে। তাই উপস্থাপিত বাজেট সংশোধন করে জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত বাজেট অনুসরণ করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি আরো বলেন, ‘৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার উপস্থাপিত বাজেটের মধ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে! যার মধ্যে এনবিআরকে একাই তুলতে হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল রাজস্ব আদায়ের চাপ সামলাতে গিয়ে খুচরা বিক্রেতাদের ওপর আগাম কর (Advance Tax), কাস্টমস ডিউটি এবং বিভিন্ন সেবার ওপর পরোক্ষ কর বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা ৩.৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৩.৭৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে, তবু পরোক্ষ করের খড়গ সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রার খরচ বাড়িয়ে দেবে। এই বিশাল রাজস্ব আদায়ের ফলে জনগণের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়বে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী আরো বেশি দারিদ্র্যতার মুখোমুখি হবে। তিনি বলেন, উপস্থাপিত বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। (যা জিপিডির প্রায় ৩.৬%)। এই ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজারকোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার যদি ব্যাংক থেকে এত বিপুল পরিমাণ টাকা ধার করে, তবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যেতে পারে (Crowding-outeffect)। ফলে নতুন ব্যবসা শুরু করা বা শিল্প প্রসারে উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় ঋণ পাবেন না, যা সামগ্রিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা আনতে পারে। সরকারের উপস্থাপিত বাজেটে একদিকে করের বোঝায় জনগণ পিষ্ট হবে, অন্যদিকে ঋণের বোঝায় দেশ কাবু হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল বলেন, ‘বাজেটের আকার বিশাল হলেও বাজেট জনবান্ধবের পরিবর্তে দলীয়বান্ধব বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। উপস্থাপিত বাজেটে সরকার দলীয় ব্যবসায়ী, দলীয় সন্ত্রাসী আর চাঁদাবাজরা উপকৃত এবং সুবিধাভোগী হচ্ছে। সুতরাং এই সরকারকে জনবান্ধব সরকার বলা যায় না। এই সরকার পুরোপুরি দলীয়বান্ধব সরকার।’ জনবান্ধব বাজেট উপস্থাপন করতে না পারলে জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত বাজেট অনুসরণ করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ দেলাওয়ার হোসেনের পরিচালনায় বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে অনুষ্ঠিত সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ড. আব্দুল মান্নান, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ শামছুর রহমান প্রমুখ।
সভাপতির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন বলেন, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী জাতির প্রত্যাশিত নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের পরিবর্তে সরকার পুরনো ব্যবস্থার গতানুগতিক ধারার বাজেট উপস্থাপন করেছে। সরকারের উপস্থাপিত বাজেট গণবিরোধী ও লুটপাটের বাজেট। এই বাজেট জনগণকে শোষণ করার বাজেট। একজন সাধারণ নাগরিক একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে টিন সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক উপস্থাপন করার বিধান যুক্ত করে সরকার জনগণের পকেট কাটার বাজেট উপস্থাপন করেছে।
এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি ও মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য আবদুস সালাম, মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ড. মোবারক হোসেন, শাহীন আহমেদ খান, মহানগরী দক্ষিণের সহকারী প্রচার সম্পাদক আবদুস সাত্তার সুমন, সহকারী মিডিয়া সম্পাদক আশরাফুল আলম ইমনসহ মহানগরীর বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ।
সমাবেশ শেষে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেট থেকে এক বিক্ষোভ মিছিল পল্টন মোড় হয়ে বিজয়নগর প্রদক্ষিণ করে শেষ হয়। মিছিলে অংশগ্রহণকারী হাজার-হাজার বিভিন্ন শ্রেণিপেশার লোকজন সরকারের উপস্থাপিত বাজেট সংশোধন করে জনবান্ধব বাজেট ঘোষণা দাবি জানান।






