• ই-পেপার

ইরানের দেশপ্রেম বনাম ইউনূস সরকারের দেশবিরোধিতা

লোকসংখ্যা বাড়ছে, মানুষ বাড়ছে না

মন্‌জুরুল ইসলাম
লোকসংখ্যা বাড়ছে, মানুষ বাড়ছে না

উচ্চশিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত চার সন্তান। ভালো উপার্জন, সামাজিক মর্যাদা সবই আছে। দেশ-জাতির জন্য অনেক কাজ করেছেন বলে মনে করেন! কিন্তু গর্ভধারিণী মায়ের অন্তিমকালেও তাঁর খবর নিতে পারলেন না। একাকী ঘরে অনাদর-অবহেলায় মৃত্যু হয় জননীর। লাশে পচন ধরে। আট বছরের ফুটফুটে রামিসাকে ধর্ষণ ও গলা কেটে হত্যা করেন আরেক শিশুর বাবা। তাকে সহায়তা করেন একজন নারী। তিনিও সন্তানের মা। বর্বর, হৃদয়বিদারক এ ধরনের বহু ঘটনা ঘটছে। এসব দেখলে, শুনলে ও ভাবলে মন ভেঙে যায়। আবার এর উল্টো চিত্রও আছে। রিকশায় ফেলে যাওয়া লাখ টাকা মালিককে ফেরত দেন হতদরিদ্র রিকশাচালক। নিজের চোখের আলো নেই, তার পরও অন্যের সন্তানদের বিনা পয়সায় লেখাপড়া করাচ্ছেন একজন। ভিক্ষার টাকা দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ঘটনাও আমাদের সমাজে ঘটেছে। আদমশুমারিতে দেখা যাচ্ছে, দেশের লোকসংখ্যা ক্রমাগতই বাড়ছে। একাত্তরে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় লোকসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। ৫৫ বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ কোটি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-লোকসংখ্যা তো বাড়ছে, দেশে  প্রকৃত মানুষ কি বাড়ছে?

বাংলাদেশে বিগত ৫৫ বছরে নতুন নতুন শহর গড়ে উঠছে। উঁচু ভবন নির্মিত হচ্ছে। শিক্ষার হার বাড়ছে, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার ও ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন ক্রমেই সামনে চলে আসছে। তা হলো আমরা কি সত্যিই মানুষের সংখ্যা বাড়াতে পারছি? শুধু মনুষ্য প্রজাতিতে জন্মগ্রহণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেই কি একটি জাতি উন্নত হয়? নাকি উন্নতির প্রকৃত মানদণ্ড মানবিক দেশপ্রেমিক, নৈতিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি? বর্তমান বাস্তবতা উদ্বেগজনক। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের নানান স্তরে হিংসা, বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা, প্রতারণা, স্বার্থপরতা এবং অমানবিক আচরণ ব্যাপকভাবে বাড়ছে। পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে, সামাজিক বন্ধন শিথিল হচ্ছে, রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা কমছে। দেশপ্রেম শুধু মুখে মুখে। ফলে লোকসংখ্যা বাড়লেও প্রকৃত অর্থে ‘মানুষ’ বাড়ছে বলে মনে হয় না। মানুষ হওয়া শুধু জৈবিক পরিচয়ের বিষয় নয়। মানুষ হওয়ার অর্থ মানবিক গুণাবলির বিকাশ। একজন মানুষ তখনই প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠেন, যখন তিনি অন্যের প্রতি সহমর্মী হন, সত্যবাদী হন, ন্যায়পরায়ণ হন এবং নিজের স্বার্থের বাইরে বৃহত্তর সমাজের কল্যাণ নিয়ে ভাবতে পারেন, দেশপ্রেমিক হন। মানুষের অস্তিত্ব শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সেই সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতা। কিন্তু আজকের সমাজে এ মূল্যবোধগুলো ক্রমেই ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। ফলে ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্র সবখানেই এক ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। তা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। বিকৃত চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটছে। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসার সুযোগ পাচ্ছে নষ্ট মানবসন্তান।

মানুষ তৈরির অন্যতম স্কুল হলো পরিবার। সন্তানকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে তৈরি করার ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একসময় পরিবার থেকে সন্তানরা মা-বাবা, দাদা-দাদি বা নানা-নানির কাছ থেকে সততা, শ্রদ্ধাবোধ, সহানুভূতি ও সামাজিক আচরণ শিখত। বর্তমানে ব্যস্ততা, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন এবং পারিবারিক কাঠামো পরিবর্তনের কারণে সেই শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। অনেক পরিবারে সন্তানদের সফল হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়, কিন্তু ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয় না। ফলে তারা প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে জিততে শেখে, কিন্তু সহমর্মিতা শিখতে পারে না। পিতা-মাতা সন্তানদের নিয়ে কোচিং সেন্টারে ছোটেন গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়ার আশায়; মানুষ হওয়ার জন্য নয়। কর্মজীবী পিতা-মাতা টাকাপয়সা, মূল্যবান সম্পদ, সম্পত্তির দলিল রাখার আলমারি অনেক তালা দিয়ে সুরক্ষিত করে রাখেন। কিন্তু অনেক বেশি মূল্যবান ও সাধনার ধন প্রিয় সন্তানকে রেখে আসেন কাজের বুয়ার কাছে। বুয়ার কথাবার্তা, আচার-আচরণ, নৈতিকতার শিক্ষা নিয়েই শিশুটি বড় হয়। অবশ্য আমাদের সমাজব্যবস্থায় কর্মজীবী পিতা-মাতার জন্য এর কোনো বিকল্পও তেমন নেই।

পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে সমাজের দিকে তাকালে দিনদিন হতাশা বাড়ে। বর্তমান সমাজে মানুষের মূল্যায়ন হয় অর্থ, ক্ষমতা এবং বাহ্যিক সাফল্যের ভিত্তিতে। কে কত ধনী, কার কত সম্পদ, কে কত বড় পদে আছে এসবই মর্যাদার মানদণ্ড। এ প্রবণতা মানুষকে স্বার্থ ও আত্মকেন্দ্রিক করে তুলছে। সমাজের কল্যাণের চেয়ে ব্যক্তিগত লাভ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে মানবিকতা পিছিয়ে পড়ছে। সমাজমাধ্যম মানুষের যোগাযোগ সহজ করেছে, একই সঙ্গে বিভাজনও বাড়িয়েছে। ভুয়া তথ্য, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং অসহিষ্ণু আচরণ অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল জগতে ক্রমাগত সংঘাত ও উত্তেজনার পরিবেশ বাস্তব জীবনেও প্রভাব ফেলছে। প্রায় প্রতিটি মানুষ সন্তান, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে যতটা সময় দিচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় ব্যয় করছে ডিজিটাল দুনিয়ায়। ঘুম থেকে উঠেই হাতে স্মার্টফোন। ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও হাতে সেই স্মার্টফোন। অনেক পিতা-মাতা যখন ডিজিটাল দুনিয়ায় ব্যস্ত থাকেন, তখন সন্তানরা কাছে এলেও বিরক্ত হন।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতার ঘাটতি রয়েছে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত পরীক্ষাকেন্দ্রিক। শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করার জন্য প্রচুর চাপের মধ্যে থাকে। কিন্তু মানবিক মূল্যবোধ, নাগরিক দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা এবং সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার দিকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও মানবিক বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা একই হারে বাড়ছে না। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের কারণে মানবিক মানুষ তৈরি হচ্ছে না। সমাজে যখন বিভক্তি বাড়ে, তখন মানুষ অন্যকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করে। রাজনৈতিক, ধর্মীয় কিংবা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজন মানুষের মধ্যে পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস সৃষ্টি করে। এ অবিশ্বাস থেকে জন্ম নেয় ঘৃণা, বিদ্বেষ ও সহিংসতা।

এ ধরনের অবক্ষয় থেকে মুক্তি পেতে হলে সবাইকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। সেই ভাবনা ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। প্রথমত সন্তানের সঙ্গে প্রিয় সান্নিধ্যের সময় কাটাতে হবে। শুধু পড়াশোনার খবর নিলেই হবে না; তাদের চিন্তা, অনুভূতি ও সমস্যাগুলোও জানতে হবে। তাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হবে। তাদের সামনে মহান আদর্শ তুলে ধরতে হবে। সন্তানদের চরিত্র গঠনে পিতা -মাতাকে গাইড হিসেবে ভূমিকা রাখতে হবে। সন্তান চরিত্রহীন হলে পিতা-মাতাকেই প্রথমে তার দায়ভার বহন করতে হয়। দ্বিতীয়ত পরিবারের সব সদস্যের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানের সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। সন্তান যদি দেখে বাবা-মা একে অন্যকে সম্মান করছেন, বয়োজ্যেষ্ঠদের মর্যাদা দিচ্ছেন এবং গৃহকর্মীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করছেন, তাহলে সেও সেই শিক্ষা গ্রহণ করবে। সেই সঙ্গে সন্তানকে দানশীল হতে উৎসাহিত করতে হবে। সন্তানের মাধ্যমে অসহায় দরিদ্র মানুষকে দান করার শিক্ষা দিতে হবে। তৃতীয়ত সমাজমাধ্যম বা ডিজিটাল দুনিয়া থেকে যতটা সম্ভব সরে এসে পরিবারে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সামাজিক কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি এ ক্ষেত্রে সুফল রাখতে পারে। পরিবেশ সুরক্ষায় সামাজিকভাবে কাজ করতে হবে। এগুলো মানুষের মননশীলতা ও সহমর্মিতা বৃদ্ধিতে সৃজনশীল ভূমিকা রাখে।

মানবিক প্রজন্ম বা প্রকৃত মানুষ তৈরির ক্ষেত্রে সমাজ বা রাষ্ট্রেরও কিছু দায় আছে। এর জন্য মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে। এ উদ্যোগ নেওয়া চাই স্থানীয় পর্যায় থেকে। পাড়ামহল্লাভিত্তিক খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, পাঠচক্র, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সামাজিক সেবামূলক কর্মকাণ্ড মানুষকে একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত করে। যখন মানুষ একসঙ্গে কাজ করে তখন পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। উন্নত মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মানুষ গঠনে রাষ্ট্রের অনেক কিছু করতে হবে। প্রথমত শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিক মূল্যবোধের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত আইন ও বিচারব্যবস্থাকে এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে, যাতে অন্যায়ের দ্রুত বিচার হয় এবং ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পায়। মানুষ যেন রাষ্ট্রের রীতিনীতি, আইনের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে বাধ্য হয়। তৃতীয়ত গণমাধ্যমকে শুধু সংবাদ পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ইতিবাচক সামাজিক মূল্যবোধ প্রচারে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। চতুর্থত দুর্নীতি, বৈষম্য ও অন্যায় কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ অন্যায় যখন স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন মানবিকতাও দুর্বল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের মতো ধর্মপ্রাণ সমাজে ধর্মীয় শিক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সব ধর্মই মানুষকে ভালোবাসা, সহমর্মিতা, সততা ও ন্যায়বিচারের শিক্ষা দেয়। কিন্তু ধর্ম যদি শুধু আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকে এবং মানবিক আচরণে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। তাই ধর্মীয় শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় জরুরি। ধর্মের অপব্যাখ্যা, ধর্মকে ব্যবসায় পরিণত করার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। ধর্মান্ধ নয়, ধার্মিক মানুষ তৈরি করতে হবে। স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য ও ভীতি মানুষকে অপরাধ থেকে দূরে রাখে। মানবসন্তানকে মানবিক হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে, পবিত্র রাখে। সমাজে স্বীকৃতি দেয় সৃষ্টির সেবা জীব হিসেবে।

সে কারণে সন্তানকে মানুষ করার প্রারম্ভিক কাজটি ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। একটি মানবিক ঘর থেকে মানবিক সন্তান গড়ে ওঠে। মানবিক পরিবার থেকে মানবিক সমাজ এবং মানবিক সমাজ থেকে মানবিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। তাই পরিবর্তনের শুরুটা করতে হবে নিজের ঘর থেকেই। সন্তানকে শুধু বড় মানুষ নয়, ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যদি সমাজে সহমর্মিতা, শ্রদ্ধা ও ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়, যদি রাষ্ট্র মানবিক মূল্যবোধকে উন্নয়নের কেন্দ্রে স্থান দেয় তাহলেই লোকসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রকৃত মানুষের সংখ্যাও বাড়বে। কারণ একটি দেশের বড় সম্পদ তার জনসংখ্যা নয়, বড় সম্পদ তার মানবিক, বিবেকবান এবং মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ। শুধু সন্তান জন্ম দিয়ে জনসংখ্যা বাড়ালেই হবে না, সন্তানকে মানুষ করতে হবে। তা না হলে সন্তান বড় হবে, জনসংখ্যার তালিকা হবে। আর ভাগ্যহত পিতা-মাতাকে অযত্ন-অবহেলায় মরে পড়ে পচতে হবে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

[email protected]

স্বাস্থ্যসেবায় শহর-গ্রামের উচ্চবৈষম্য নিরসনের কর্মপরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর

এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান
স্বাস্থ্যসেবায় শহর-গ্রামের উচ্চবৈষম্য নিরসনের কর্মপরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর
সংগৃহীত ছবি

রাষ্ট্রকে নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিয়েছে সংবিধান। সংবিধানের দুটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্য মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা যেন চিরকাল অধরা। জটিল নয়, সরলীকরণ করেও যদি বলা হয়, নিতান্তই ব্রাত্য দেশের স্বাস্থ্য খাত। যুগের পর যুগ নিজেই আক্রান্ত জটিল ও দুরারোগ্য রোগে। কখনো পরিকল্পিতভাবে স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন হয়নি। বৈষম্য ও বঞ্চনার চিত্র পদে পদে। শহুরে ও গ্রাম্য স্বাস্থ্য কাঠামোর মধ্যে বৈষম্য দূর হয়নি আজও। স্বাস্থ্যের নাজুক দশা কাটাতে চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধানের চোখে ‘স্বাস্থ্য কোনো সুবিধা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার’। এই নীতিকে রাজনৈতিক বয়ানে নয়, বাস্তবে রূপ দিয়ে একটি উন্নত ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ নীতি গ্রহণ করেছেন।

শহরের চেয়ে গ্রামে জনসংখ্যার হার বেশি। জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শহরের বসবাস করে ৩১ দশমিক ৬৬ শতাংশ মানুষ আর গ্রামে ৬৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। সংখ্যার দিক দিয়ে গ্রামে বসবাস করে ১১ কোটি ৬১ লাখ মানুষ। আর শহরে ৫ কোটি ৩৮ লাখ মানুষ। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ হেলথ ওয়ার্কফোর্স স্ট্র্যাটেজি ২০২৪’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশের মোট জনসংখ্যার ৬২ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করলেও দেশের মোট চিকিৎসক-নার্সের তিন-চতুর্থাংশই শহর এলাকায় সেবা দেন। প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা কর্মী থাকায় তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নিদারুণভাবে। 

গ্রাম ও শহরের এই স্বাস্থ্য বৈষম্য দূর করতে সুসংগঠিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগে স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের সংস্কার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও। যেখানে স্বাস্থ্য খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। অভিজাত শ্রেণি আর প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সরকারিভাবে সমান স্বাস্থ্যসেবা পাবে। ফিরবে সেবার সমতা। দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানায় সরকার। 

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে বেশ মনোযোগী সরকারপ্রধান তারেক রহমান গত মাসে সিলেটে এক সুধী সমাবেশে বলেন, ‘দেশে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এই ১ লাখের মধ্যে ৮০ শতাংশ থাকবে নারী স্বাস্থ্যকর্মী। এই মানুষগুলোর দায়িত্ব হবে গ্রামে গ্রামে, ঘরে ঘরে যাওয়া। শহরেও তারা থাকবে। তবে আমরা জোর দেব, গ্রামের মানুষের ওপরে বেশি। তারা বিশেষ করে পরিবারের নারীদের কাছে গিয়ে স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা চালাবে।’

দেশের স্বাস্থ্য খাতে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় রকমের মৌলিক পরিবর্তন আনতে চায় সরকার। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের আদর্শিক অবস্থান বজায় রেখে স্বাস্থ্যখাতে সুশাসন ফিরিয়ে এনে তৃণমূলের জনগোষ্ঠীর সেবাপ্রাপ্তি সহজ ও নির্বিঘ্ন করতে বড় রকমের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে সরকার এ ক্ষেত্রে সমস্যার গোড়ায় নজর দিয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো নিজেই নানা সংকটে ভারাক্রান্ত। শয্যা সংকটে গাদাগাদি করে চলছে চিকিৎসাসেবা। জনবল ও সরঞ্জাম সংকটেও সুফল পাচ্ছে না রোগীরা। সব রকমের ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে ধার-কর্য করে টাকার বিনিময়ে উপজেলা পর্যায়েও দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা পেতে বেসরকারি হাসপাতালে ছুটছেন রোগীরা।

কোন কোন ক্ষেত্রে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর বাহ্যিক ব্যবস্থাপনা ও সুযোগ-সুবিধা সাধারণ মানুষকে আকর্ষণ করতে পারছে না মোটেও। যাদের সাধ্য নেই তাঁরাই বাধ্য হয়েই কোনোমতে এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এসব হাসপাতালের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নৈতিক মান নিয়েও প্রশ্নের শেষ নেই। জনস্বার্থে এসব বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে সরকার একটি বিস্তৃত, সুচিন্তিত এবং সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সর বিদ্যমান অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটানোর মাধ্যমে গ্রাম শহরের স্বাস্থ্য বৈষম্য নিরসন করতে এরই মধ্যে ৫০ শয্যার ৪৯২টি উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রয়োজনীয় সব নির্দেশনা দিয়েছেন। এরইমধ্যে আটটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এতে করে গ্রামীণ পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা খাত আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ৫টি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যার শিশু বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ করার কাজ ছয় মাসের মধ্যে উদ্বোধনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি চীন-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে পাঁচটি বড় শহরে নারীদের জন্য ১ হাজার শয্যার আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পরিপূর্ণ মাতৃত্বকালীন সেবা, নিরাপদ সন্তান প্রসব, নবজাতক এবং শিশু স্বাস্থ্যসেবার নিরাপদ স্থানে পরিণত করতে ছক কষে এগোচ্ছে সরকার। 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমানও বলেছেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। সরকার সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। এখন থেকে সব মানুষ চিকিৎসাসেবা পাবেন তাদের প্রয়োজন অনুসারে, আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নয়। এমন স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলা হবে যেন কোনো ব্যক্তি চিকিৎসা নিতে গিয়ে সর্বস্বান্ত না হতে হয়।’ প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণীর বক্তব্য থেকেও পরিস্কার সরকার শহুরে সুবিধা গ্রামেও পৌঁছে দেওয়ার বাস্তব চিন্তাভাবনার প্রতিফলন ঘটাতে চাচ্ছে। 

প্রধানমন্ত্রীর জীবনসঙ্গী জানেন শহরে চিকিৎসক, হাসপাতাল আর  অ্যাম্বুলেন্স মেলে হাতের নাগালেই। কিন্তু গ্রামের ক্ষেত্রে এটি সহজ নয় মোটেও। সেখানে দূরত্ব ও ব্যয়ের বিবেচনায় ঘরেই সন্তান জন্ম দেন গ্রামীণ নারী। জরুরি অবস্থায় দ্রুত সেবা তাদের জন্য 'গরিবের ঘোড়ারোগ'। তিনি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূলভিত্তি ও স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তুলতে জোর দিয়েছেন। চলতি বছরের মার্চে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় ২৪ ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করা হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে।' 

সরকার যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) মডেল অনুসরণ করে একটি সমন্বিত ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার একটা জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়।’ তিনি বলেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে সবার জন্য যাতে ডাক্তার থাকে, সে ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে বড় রকমের পরিবর্তন করা হবে। এমনভাবে পরিবর্তন করা হবে একদিকে যেমন শয্যার পরিমাণ বাড়ানো হবে, তার চেয়ে সেবা বড় হবে যাতে করে শিশুদের ব্যাপারে চিকিৎসক থাকে, নারীদের ব্যাপারে চিকিৎসক থাকে, ফিজিওথেরাপির ব্যাপারে চিকিৎসক থাকে। একই সঙ্গে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোও ঢেলে সাজানো হবে। যেহেতু ডিজিজ বার্ডেন চেঞ্জ হয়েছে, অর্থাৎ আগে ছিল সংক্রামক রোগ, এখন লাইফস্টাইল ডিজিজ হচ্ছে, সে কারণে প্রতিটি জেলায় করোনারি কেয়ার ইউনিট, কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিটের মতো এ বিষয়গুলোর দিকে বর্তমান সরকার ব্যবস্থা নেবে।’ 

স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতের অচলায়তন ভাঙার মধ্যে দিয়ে একটি সমতাভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন শহর ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান উন্নত করতেও সহায়তা ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে সরকারকে বেশ কিছু বিষয় নিয়েও ভাবতে হবে। প্রথমত, উপজেলায় স্বাস্থ্যসেবাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে অর্থ বরাদ্দ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও পর্যাপ্ত জনবলও নিশ্চিত করতে হবে। কাঙ্ক্ষিত মানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে এসব বিষয়ে সর্বোচ্চ ফোকাস দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, চিকিৎসকদের গ্রামে অবস্থান করতে উৎসাহিত করতে হবে। নানা প্রতিকূলতায় সীমিত সাধ্যের মধ্যেও যারা চিকিৎসা ব্যবস্থা সচল রেখেছেন তাদের সাধুবাদ জানাতে হবে। তাদের জন্য ভালো বাসস্থান, নিরাপত্তা ও সন্তানদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার বন্দোবস্তসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার পরিধি বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, তাদের পেশাগত উন্নতির দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এসব অভাব বা দুর্বলতা দূর করতে পারলে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও বলেছেন, উপজেলা স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও বিকেন্দ্রীকরণে সরকার বদ্ধপরিকর। তিনি বলেছেন, ‘বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং উন্নত ল্যাব প্রায় সবকিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে এসে জেলা ও উপজেলা ভিত্তিক হাসপাতালগুলোর মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। শহর ও গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য দূর করে সেবার বিকেন্দ্রীকরণ বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। যদিও কাজটি এক মাস বা এক বছরে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, তবু সরকার ধাপে ধাপে এটি অর্জনের পথে রয়েছে।’ 

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা; অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো.কম।
[email protected] 

জ্বালানি নিরাপত্তা থেকে জ্বালানি স্বাধীনতার পথে: বাজেটের করণীয়

অধ্যাপক সাকিব বিন আমিন
জ্বালানি নিরাপত্তা থেকে জ্বালানি স্বাধীনতার পথে: বাজেটের করণীয়
অধ্যাপক সাকিব বিন আমিন। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ এখন জ্বালানি নিরাপত্তা। গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলারের সংকট এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা আমাদের স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে যে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। বরং প্রয়োজন একটি বৈচিত্র্যময়, টেকসই এবং অর্থনৈতিকভাবে সহনশীল জ্বালানি ব্যবস্থা, যা বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলা করে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তা আজ আর শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিল্প প্রতিযোগিতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে জ্বালানি খাতে নেওয়া প্রতিটি নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। বাজেটে বৈদ্যুতিক যানবাহন, সৌরবিদ্যুৎ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর ও শুল্ক সুবিধার যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এসব উদ্যোগ কতটা সুসংগঠিত ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর।

আরো পড়ুন
নেহরুকে ছাড়িয়ে ভারতের দীর্ঘতম সময়ের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোদি

নেহরুকে ছাড়িয়ে ভারতের দীর্ঘতম সময়ের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোদি

 

বর্তমানে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন মিশ্রণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ৫.৪৯ শতাংশ। অথচ বহু বছর ধরে বিভিন্ন জাতীয় পরিকল্পনা ও নীতিমালায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। লক্ষ্য ছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ১০ শতাংশে উন্নীত করা, কিন্তু বাস্তবতা এখনো সেই লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে। এই ব্যবধান শুধু নীতিগত দুর্বলতার নয়; এটি বাস্তবায়ন সক্ষমতা, বিনিয়োগ পরিবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতিরও প্রতিফলন। একদিকে আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছি, অন্যদিকে বাস্তব বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি সেই অনুপাতে এগোয়নি। ফলে নীতি ও বাস্তবতার মধ্যে একটি স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়েছে, যা এখন দূর করা জরুরি।

বাংলাদেশে জ্বালানিতে আমদানিনির্ভরতা রয়েছে। এলএনজি, কয়লা এবং তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তাকে এখন শুধু জ্বালানি সরবরাহের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতা দেখিয়েছে যে,  আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা অর্থনীতিকে বহিরাগত ধাক্কার প্রতি আরো সংবেদনশীল করে তোলে। তাই জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এখন কেবল পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক প্রয়োজনও।

আরো পড়ুন
বৃক্ষরোপণে ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকার প্রণোদনা

বৃক্ষরোপণে ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকার প্রণোদনা

 

এ কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, বরং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তোলার একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যদি জাতীয় বাজেটে ধারাবাহিকভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো, গবেষণা, প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো যায়, তাহলে আগামী দশকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা উভয়ই শক্তিশালী করতে পারবে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়। সীমিত ভূমি সম্পদের কারণে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সবসময় সহজ নয়। কিন্তু শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক ভবন এবং আবাসিক স্থাপনায় রুফটপ সোলার দ্রুত সম্প্রসারণ করা সম্ভব। ইতোমধ্যে শিল্প খাতে এর সফল ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। নেট মিটারিং সম্প্রসারণ, সহজ অর্থায়ন এবং আমদানি শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে এই খাতকে আরো এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়াও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, বিদ্যুৎ হুইলিং সুবিধা এবং বিনিয়োগবান্ধব নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সহায়ক হবে।

আরো পড়ুন
ভোটের দায়িত্বে মারা গেলে পরিবার পাবে ১০ লাখ টাকা

ভোটের দায়িত্বে মারা গেলে পরিবার পাবে ১০ লাখ টাকা

 

একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন অত্যন্ত জরুরি। অতীতে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর বেশি জোর দেওয়া হলেও সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো সেই হারে উন্নত হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বৃহৎ পরিসরের সংযোজনের জন্যও শক্তিশালী গ্রিড অবকাঠামো অপরিহার্য। 

ভবিষ্যতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি। সৌর ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য উৎস সবসময় সমানভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে না। তাই ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম বা বিইএসএসে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এখনই যদি প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বৃহৎ পরিসরের সংযোজন এবং গ্রিডের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে। বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাটারি প্রযুক্তির খরচও দ্রুত কমছে। ফলে জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তিকে বৃহত্তর পরিসরে গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।

আরো পড়ুন
মারা গেছেন প্রখ্যাত তামিল চলচ্চিত্র পরিচালক ভারতীরাজা

মারা গেছেন প্রখ্যাত তামিল চলচ্চিত্র পরিচালক ভারতীরাজা

 

বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসারও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশে পরিবহন খাত আমদানিকৃত জ্বালানির অন্যতম বড় ভোক্তা। তাই ইভি ব্যবহারের বিস্তার, চার্জিং অবকাঠামো নির্মাণ এবং স্থানীয় ব্যাটারি শিল্পের বিকাশ জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে অবহেলিত ক্ষেত্র সম্ভবত জ্বালানি দক্ষতা। শিল্প, বাণিজ্য এবং আবাসিক খাতে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব। যে জ্বালানি ব্যবহারই করতে হয় না, সেটিই সবচেয়ে সস্তা, সবচেয়ে নিরাপদ এবং সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি। তাই জ্বালানি দক্ষতাকে বাজেটের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, কারণ সাশ্রয় করা জ্বালানিই সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং সবচেয়ে টেকসই জ্বালানি। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগের আর্থিক প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের তুলনায় দ্রুত পাওয়া যায়। ফলে এটি একই সঙ্গে ব্যয় সাশ্রয়, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত সুবিধা নিশ্চিত করতে পারে।

আরো পড়ুন
কেনিয়ায় ইবোলা কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, গুলিতে নিহত ১

কেনিয়ায় ইবোলা কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, গুলিতে নিহত ১

 

বাংলাদেশ আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন জ্বালানি নীতিতে সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থা, জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগ শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্য নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পূর্বশর্ত।

জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ সেই পরিবর্তনের ভিত্তি রচনা করতে পারে। আজকের বিনিয়োগই আগামী দিনের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি নির্ধারণ করবে। এখন প্রয়োজন সঠিক অগ্রাধিকার, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। যদি আমরা আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক অবকাঠামো এবং দক্ষ জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দিকে দৃঢ়ভাবে এগোতে পারি, তাহলে বাংলাদেশ শুধু জ্বালানি নিরাপত্তাই অর্জন করবে না; বরং জ্বালানি স্বাধীনতার দিকে একটি দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

লেখক: অর্থনীতি বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
জ্বালানি অর্থনীতি, জলবায়ু নীতি ও টেকসই উন্নয়ন গবেষক
 

পবিত্রতার আড়ালে অন্ধকার: মাদরাসা শিক্ষায় শিশু সুরক্ষার সংকট

প্রদীপ্ত মোবারক
পবিত্রতার আড়ালে অন্ধকার: মাদরাসা শিক্ষায় শিশু সুরক্ষার সংকট
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী ধারা হলো মাদরাসা শিক্ষা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাদরাসাগুলো ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা, নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের লক্ষাধিক শিক্ষার্থী মাদরাসায় শিক্ষা গ্রহণ করছে এবং পরবর্তীতে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। ফলে মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক ঘটনার আলোকে সম্পূর্ণভাবে মূল্যায়ন করা যেমন অযৌক্তিক, তেমনি এই ব্যবস্থার অভ্যন্তরে বিদ্যমান বাস্তব সমস্যাগুলোকে অস্বীকার করাও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়।

তবে একটি কঠিন বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদরাসাকেন্দ্রিক শিশু যৌন নির্যাতন, যৌন হয়রানি এবং বলাৎকারের একাধিক ঘটনা জনসমক্ষে এসেছে। গণমাধ্যম, আদালত এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে এমন বহু ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে, যা সমাজকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। এসব ঘটনা কেবল ফৌজদারি অপরাধ নয়; এগুলো ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা, মানবিকতা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পবিত্র সম্পর্কের প্রতি এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

একজন শিক্ষক কেবল পাঠদানকারী নন; তিনি একজন অভিভাবক, পথ প্রদর্শক ও আদর্শ নির্মাতা। সেই শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি যখন একটি শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন চালায়, তখন তা শুধু একটি ব্যক্তিগত অপরাধে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশেষত ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘটিত এ ধরনের অপরাধ সমাজে আরো গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, কারণ মানুষ এসব প্রতিষ্ঠানকে নৈতিকতার নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত।

তবে একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্বীকার করা প্রয়োজন, যৌন নির্যাতন কোনো একক শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা নয়। সাধারণ বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসিক প্রতিষ্ঠান, ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, এতিমখানা, এমনকি পারিবারিক পরিবেশেও শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা যৌন সহিংসতার শিকার হয়। তাই সমস্যাটিকে শুধুমাত্র “মাদরাসার সমস্যা” হিসেবে চিহ্নিত করলে প্রকৃত সমস্যার গভীরে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। মূল সমস্যা হলো ক্ষমতার অপব্যবহার, জবাবদিহিতার অভাব, নীরবতার সংস্কৃতি এবং শিশু সুরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা।

তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, মাদরাসাকেন্দ্রিক ঘটনাগুলো কেন বিশেষভাবে আলোচিত হয়? এর অন্যতম কারণ হলো দেশের বহু মাদরাসা আবাসিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং স্বাধীন তদারকির ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ এবং অন্ধ আনুগত্যের সংস্কৃতিও সমস্যা সৃষ্টি করে। ফলে কোনো শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হলেও ভয়, সামাজিক লজ্জা, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা কিংবা প্রতিষ্ঠানের চাপের কারণে সহজে অভিযোগ জানাতে পারে না।

বিশ্বব্যাপী শিশু অধিকার বিষয়ক গবেষণাগুলো দেখায় যে, অধিকাংশ যৌন নির্যাতনের ঘটনা অপরিচিত ব্যক্তির দ্বারা নয়; বরং পরিচিত, বিশ্বাসভাজন এবং কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। এ বাস্তবতা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষকে বিশ্বাস করে এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে মানসিকভাবে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে শিশু সুরক্ষাকে শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় নীতিতে পরিণত করা জরুরি। প্রতিটি মাদরাসায় বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী এবং অভিভাবকদের জন্য যৌন নির্যাতন প্রতিরোধবিষয়ক সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আবাসিক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত তদারকি, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, অভিযোগ গ্রহণের স্বাধীন কাঠামো এবং প্রয়োজনে মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু একাডেমিক যোগ্যতা নয়, নৈতিকতা, আচরণগত ইতিহাস এবং পেশাগত উপযুক্ততাও গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তা প্রতিষ্ঠান রক্ষার নামে গোপন করা যাবে না। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। কারণ অপরাধ আড়াল করা মানে অপরাধকে উৎসাহিত করা এবং ভবিষ্যতে আরো শিশুদের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া।

এখানে আলেম সমাজ, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং মাদরাসা পরিচালনা কমিটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামসহ বিশ্বের সব প্রধান ধর্মই শিশু নির্যাতন, শোষণ ও অবিচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। ফলে ধর্মের নামে অপরাধীকে রক্ষা করা বা প্রতিষ্ঠানের সুনামের অজুহাতে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া প্রকৃত ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থী। বরং সত্য প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা।

গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। একদিকে অপরাধকে আড়াল করা যাবে না, অন্যদিকে কয়েকজন অপরাধীর কারণে পুরো মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা বা একটি বৃহৎ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে দোষারোপ করাও সমাধান নয়। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক আলোচনা, গঠনমূলক সমালোচনা এবং কার্যকর সংস্কার উদ্যোগ।

পরিশেষে বলা যায়, মাদরাসা শিক্ষা বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান মানুষের নৈতিক বিকাশের কথা বলে, সেখানে যদি শিশু নির্যাতন বা বলাৎকারের মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়, তবে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, সমগ্র সমাজের জন্য লজ্জার বিষয়। এই কলঙ্ক দূর করার একমাত্র পথ হলো সত্যকে স্বীকার করা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা প্রদর্শন করা, শিশুদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এবং একটি জবাবদিহিমূলক ও মানবিক শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তোলা। কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিচয় তার ভবন, পাঠ্যক্রম বা সুনামে নয়; বরং সেখানে অধ্যয়নরত প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং মানবিক অধিকার সুরক্ষিত থাকার মধ্যেই নিহিত।

লেখক : কলামিস্ট ও জনসংযোগ প্রধান, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।