উচ্চশিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত চার সন্তান। ভালো উপার্জন, সামাজিক মর্যাদা সবই আছে। দেশ-জাতির জন্য অনেক কাজ করেছেন বলে মনে করেন! কিন্তু গর্ভধারিণী মায়ের অন্তিমকালেও তাঁর খবর নিতে পারলেন না। একাকী ঘরে অনাদর-অবহেলায় মৃত্যু হয় জননীর। লাশে পচন ধরে। আট বছরের ফুটফুটে রামিসাকে ধর্ষণ ও গলা কেটে হত্যা করেন আরেক শিশুর বাবা। তাকে সহায়তা করেন একজন নারী। তিনিও সন্তানের মা। বর্বর, হৃদয়বিদারক এ ধরনের বহু ঘটনা ঘটছে। এসব দেখলে, শুনলে ও ভাবলে মন ভেঙে যায়। আবার এর উল্টো চিত্রও আছে। রিকশায় ফেলে যাওয়া লাখ টাকা মালিককে ফেরত দেন হতদরিদ্র রিকশাচালক। নিজের চোখের আলো নেই, তার পরও অন্যের সন্তানদের বিনা পয়সায় লেখাপড়া করাচ্ছেন একজন। ভিক্ষার টাকা দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ঘটনাও আমাদের সমাজে ঘটেছে। আদমশুমারিতে দেখা যাচ্ছে, দেশের লোকসংখ্যা ক্রমাগতই বাড়ছে। একাত্তরে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় লোকসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। ৫৫ বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ কোটি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-লোকসংখ্যা তো বাড়ছে, দেশে প্রকৃত মানুষ কি বাড়ছে?
বাংলাদেশে বিগত ৫৫ বছরে নতুন নতুন শহর গড়ে উঠছে। উঁচু ভবন নির্মিত হচ্ছে। শিক্ষার হার বাড়ছে, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার ও ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন ক্রমেই সামনে চলে আসছে। তা হলো আমরা কি সত্যিই মানুষের সংখ্যা বাড়াতে পারছি? শুধু মনুষ্য প্রজাতিতে জন্মগ্রহণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেই কি একটি জাতি উন্নত হয়? নাকি উন্নতির প্রকৃত মানদণ্ড মানবিক দেশপ্রেমিক, নৈতিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি? বর্তমান বাস্তবতা উদ্বেগজনক। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের নানান স্তরে হিংসা, বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা, প্রতারণা, স্বার্থপরতা এবং অমানবিক আচরণ ব্যাপকভাবে বাড়ছে। পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে, সামাজিক বন্ধন শিথিল হচ্ছে, রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা কমছে। দেশপ্রেম শুধু মুখে মুখে। ফলে লোকসংখ্যা বাড়লেও প্রকৃত অর্থে ‘মানুষ’ বাড়ছে বলে মনে হয় না। মানুষ হওয়া শুধু জৈবিক পরিচয়ের বিষয় নয়। মানুষ হওয়ার অর্থ মানবিক গুণাবলির বিকাশ। একজন মানুষ তখনই প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠেন, যখন তিনি অন্যের প্রতি সহমর্মী হন, সত্যবাদী হন, ন্যায়পরায়ণ হন এবং নিজের স্বার্থের বাইরে বৃহত্তর সমাজের কল্যাণ নিয়ে ভাবতে পারেন, দেশপ্রেমিক হন। মানুষের অস্তিত্ব শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সেই সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতা। কিন্তু আজকের সমাজে এ মূল্যবোধগুলো ক্রমেই ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। ফলে ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্র সবখানেই এক ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। তা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। বিকৃত চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটছে। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসার সুযোগ পাচ্ছে নষ্ট মানবসন্তান।
মানুষ তৈরির অন্যতম স্কুল হলো পরিবার। সন্তানকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে তৈরি করার ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একসময় পরিবার থেকে সন্তানরা মা-বাবা, দাদা-দাদি বা নানা-নানির কাছ থেকে সততা, শ্রদ্ধাবোধ, সহানুভূতি ও সামাজিক আচরণ শিখত। বর্তমানে ব্যস্ততা, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন এবং পারিবারিক কাঠামো পরিবর্তনের কারণে সেই শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। অনেক পরিবারে সন্তানদের সফল হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়, কিন্তু ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয় না। ফলে তারা প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে জিততে শেখে, কিন্তু সহমর্মিতা শিখতে পারে না। পিতা-মাতা সন্তানদের নিয়ে কোচিং সেন্টারে ছোটেন গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়ার আশায়; মানুষ হওয়ার জন্য নয়। কর্মজীবী পিতা-মাতা টাকাপয়সা, মূল্যবান সম্পদ, সম্পত্তির দলিল রাখার আলমারি অনেক তালা দিয়ে সুরক্ষিত করে রাখেন। কিন্তু অনেক বেশি মূল্যবান ও সাধনার ধন প্রিয় সন্তানকে রেখে আসেন কাজের বুয়ার কাছে। বুয়ার কথাবার্তা, আচার-আচরণ, নৈতিকতার শিক্ষা নিয়েই শিশুটি বড় হয়। অবশ্য আমাদের সমাজব্যবস্থায় কর্মজীবী পিতা-মাতার জন্য এর কোনো বিকল্পও তেমন নেই।
পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে সমাজের দিকে তাকালে দিনদিন হতাশা বাড়ে। বর্তমান সমাজে মানুষের মূল্যায়ন হয় অর্থ, ক্ষমতা এবং বাহ্যিক সাফল্যের ভিত্তিতে। কে কত ধনী, কার কত সম্পদ, কে কত বড় পদে আছে এসবই মর্যাদার মানদণ্ড। এ প্রবণতা মানুষকে স্বার্থ ও আত্মকেন্দ্রিক করে তুলছে। সমাজের কল্যাণের চেয়ে ব্যক্তিগত লাভ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে মানবিকতা পিছিয়ে পড়ছে। সমাজমাধ্যম মানুষের যোগাযোগ সহজ করেছে, একই সঙ্গে বিভাজনও বাড়িয়েছে। ভুয়া তথ্য, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং অসহিষ্ণু আচরণ অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল জগতে ক্রমাগত সংঘাত ও উত্তেজনার পরিবেশ বাস্তব জীবনেও প্রভাব ফেলছে। প্রায় প্রতিটি মানুষ সন্তান, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে যতটা সময় দিচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় ব্যয় করছে ডিজিটাল দুনিয়ায়। ঘুম থেকে উঠেই হাতে স্মার্টফোন। ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও হাতে সেই স্মার্টফোন। অনেক পিতা-মাতা যখন ডিজিটাল দুনিয়ায় ব্যস্ত থাকেন, তখন সন্তানরা কাছে এলেও বিরক্ত হন।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতার ঘাটতি রয়েছে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত পরীক্ষাকেন্দ্রিক। শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করার জন্য প্রচুর চাপের মধ্যে থাকে। কিন্তু মানবিক মূল্যবোধ, নাগরিক দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা এবং সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার দিকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও মানবিক বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা একই হারে বাড়ছে না। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের কারণে মানবিক মানুষ তৈরি হচ্ছে না। সমাজে যখন বিভক্তি বাড়ে, তখন মানুষ অন্যকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করে। রাজনৈতিক, ধর্মীয় কিংবা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজন মানুষের মধ্যে পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস সৃষ্টি করে। এ অবিশ্বাস থেকে জন্ম নেয় ঘৃণা, বিদ্বেষ ও সহিংসতা।
এ ধরনের অবক্ষয় থেকে মুক্তি পেতে হলে সবাইকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। সেই ভাবনা ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। প্রথমত সন্তানের সঙ্গে প্রিয় সান্নিধ্যের সময় কাটাতে হবে। শুধু পড়াশোনার খবর নিলেই হবে না; তাদের চিন্তা, অনুভূতি ও সমস্যাগুলোও জানতে হবে। তাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হবে। তাদের সামনে মহান আদর্শ তুলে ধরতে হবে। সন্তানদের চরিত্র গঠনে পিতা -মাতাকে গাইড হিসেবে ভূমিকা রাখতে হবে। সন্তান চরিত্রহীন হলে পিতা-মাতাকেই প্রথমে তার দায়ভার বহন করতে হয়। দ্বিতীয়ত পরিবারের সব সদস্যের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানের সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। সন্তান যদি দেখে বাবা-মা একে অন্যকে সম্মান করছেন, বয়োজ্যেষ্ঠদের মর্যাদা দিচ্ছেন এবং গৃহকর্মীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করছেন, তাহলে সেও সেই শিক্ষা গ্রহণ করবে। সেই সঙ্গে সন্তানকে দানশীল হতে উৎসাহিত করতে হবে। সন্তানের মাধ্যমে অসহায় দরিদ্র মানুষকে দান করার শিক্ষা দিতে হবে। তৃতীয়ত সমাজমাধ্যম বা ডিজিটাল দুনিয়া থেকে যতটা সম্ভব সরে এসে পরিবারে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সামাজিক কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি এ ক্ষেত্রে সুফল রাখতে পারে। পরিবেশ সুরক্ষায় সামাজিকভাবে কাজ করতে হবে। এগুলো মানুষের মননশীলতা ও সহমর্মিতা বৃদ্ধিতে সৃজনশীল ভূমিকা রাখে।
মানবিক প্রজন্ম বা প্রকৃত মানুষ তৈরির ক্ষেত্রে সমাজ বা রাষ্ট্রেরও কিছু দায় আছে। এর জন্য মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে। এ উদ্যোগ নেওয়া চাই স্থানীয় পর্যায় থেকে। পাড়ামহল্লাভিত্তিক খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, পাঠচক্র, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সামাজিক সেবামূলক কর্মকাণ্ড মানুষকে একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত করে। যখন মানুষ একসঙ্গে কাজ করে তখন পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। উন্নত মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মানুষ গঠনে রাষ্ট্রের অনেক কিছু করতে হবে। প্রথমত শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিক মূল্যবোধের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত আইন ও বিচারব্যবস্থাকে এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে, যাতে অন্যায়ের দ্রুত বিচার হয় এবং ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পায়। মানুষ যেন রাষ্ট্রের রীতিনীতি, আইনের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে বাধ্য হয়। তৃতীয়ত গণমাধ্যমকে শুধু সংবাদ পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ইতিবাচক সামাজিক মূল্যবোধ প্রচারে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। চতুর্থত দুর্নীতি, বৈষম্য ও অন্যায় কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ অন্যায় যখন স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন মানবিকতাও দুর্বল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের মতো ধর্মপ্রাণ সমাজে ধর্মীয় শিক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সব ধর্মই মানুষকে ভালোবাসা, সহমর্মিতা, সততা ও ন্যায়বিচারের শিক্ষা দেয়। কিন্তু ধর্ম যদি শুধু আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকে এবং মানবিক আচরণে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। তাই ধর্মীয় শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় জরুরি। ধর্মের অপব্যাখ্যা, ধর্মকে ব্যবসায় পরিণত করার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। ধর্মান্ধ নয়, ধার্মিক মানুষ তৈরি করতে হবে। স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য ও ভীতি মানুষকে অপরাধ থেকে দূরে রাখে। মানবসন্তানকে মানবিক হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে, পবিত্র রাখে। সমাজে স্বীকৃতি দেয় সৃষ্টির সেবা জীব হিসেবে।
সে কারণে সন্তানকে মানুষ করার প্রারম্ভিক কাজটি ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। একটি মানবিক ঘর থেকে মানবিক সন্তান গড়ে ওঠে। মানবিক পরিবার থেকে মানবিক সমাজ এবং মানবিক সমাজ থেকে মানবিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। তাই পরিবর্তনের শুরুটা করতে হবে নিজের ঘর থেকেই। সন্তানকে শুধু বড় মানুষ নয়, ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যদি সমাজে সহমর্মিতা, শ্রদ্ধা ও ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়, যদি রাষ্ট্র মানবিক মূল্যবোধকে উন্নয়নের কেন্দ্রে স্থান দেয় তাহলেই লোকসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রকৃত মানুষের সংখ্যাও বাড়বে। কারণ একটি দেশের বড় সম্পদ তার জনসংখ্যা নয়, বড় সম্পদ তার মানবিক, বিবেকবান এবং মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ। শুধু সন্তান জন্ম দিয়ে জনসংখ্যা বাড়ালেই হবে না, সন্তানকে মানুষ করতে হবে। তা না হলে সন্তান বড় হবে, জনসংখ্যার তালিকা হবে। আর ভাগ্যহত পিতা-মাতাকে অযত্ন-অবহেলায় মরে পড়ে পচতে হবে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন









