কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের পূর্বাঞ্চলে ইবোলা প্রাদুর্ভাবের মধ্যে এক নবজাতকের মৃত্যু নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। জন্মের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে শিশুটি মারা যায়। পরে পরীক্ষায় জানা যায়, সে ইবোলায় আক্রান্ত ছিল। তার মৃত্যুর পর যে এতিমখানায় তাকে রাখা হয়েছিল, সেখানকার আরো ছয়জন শিশুকে ইবোলা রোগী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
মে মাসের শেষ দিকে বাসওয়াজা নামের ওই শিশুর মা মারা যান। এরপর নবজাতকটিকে পূর্ব কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশের বুনিয়া শহরে একটি গির্জা পরিচালিত এতিমখানায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে থাকা সিস্টাররা দ্রুত বুঝতে পারেন, শিশুটির জ্বর হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই তার অবস্থার অবনতি হয় এবং সে মারা যায়। পরে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়, তার মৃত্যু ইবোলার কারণে হয়েছে।
শিশুটির মৃত্যু এতিমখানাজুড়ে আতঙ্ক তৈরি করে। সেখানে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকেরা জানান, বাসওয়াজার মৃত্যুর পর আরো ছয় শিশুর মধ্যে ইবোলার উপসর্গ দেখা যায়। ৬৯ জন শিশুর সেই এতিমখানা থেকে আক্রান্ত ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে পরীক্ষায় পাঁচ শিশুর ফলাফল নেগেটিভ আসে। মঙ্গলবার তাদের হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। বুনিয়ার ইভানজেলিক্যাল মেডিকেল সেন্টারের আইসোলেশন ইউনিট থেকে বেরিয়ে আসার সময় শিশুদের স্বাগত জানান এতিমখানার সিস্টাররা। হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মীদের ধন্যবাদ জানান তারা।
আরো পড়ুন
বিশ্ববাজারে ফের বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম
তবে সব শিশু বাঁচেনি। এক বছরের কম বয়সী আরেকজন শিশুর শরীরেও ইবোলা ধরা পড়ে। 'শেরি' বা আদরের মেয়ে নামে পরিচিত ওই শিশুটি ছিল তিন এতিম বোনের একজন। বুধবার তার মৃত্যু হয়। ইভানজেলিক্যাল মেডিকেল সেন্টারের প্রধান ডা. ফ্রেডি কিবওয়ানা বলেন, চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
আক্রান্তদের মধ্যে সিস্টার ও সেবাকর্মীও
ইবোলা অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির বমি, মল, লালা এবং শরীরের অন্যান্য তরলের মাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে নবজাতক ও ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, মারা যাওয়া শিশুদের দেখাশোনা করেছিলেন এমন তিনজনের শরীরেও ইবোলা শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন সিস্টারও রয়েছেন।
বেলজিয়ামের ক্যাথলিক সিস্টারদের উদ্যোগে ঔপনিবেশিক আমলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই এতিমখানা। এখন সেখানে থাকা সিস্টাররা আক্রান্ত শিশু ও কর্মীদের জন্য নিয়মিত প্রার্থনা করছেন। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক সিস্টার বলেন, ইবোলার সঙ্গে নিজের নাম জড়িয়ে যাওয়ার ভয় এবং সামাজিক বৈষম্যের আশঙ্কা থেকেই তিনি পরিচয় গোপন রাখতে চান। তিনি বলেন, 'আমরা সিস্টার হলেও মানুষ। এই ঘটনা আমাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।'
জন্মের পর দুই সপ্তাহও বাঁচতে পারেনি বাসওয়াজা। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, চলমান প্রাদুর্ভাবে সে সবচেয়ে কম বয়সী ভুক্তভোগীদের একজন। এ পর্যন্ত কঙ্গোতে প্রায় ৬০০ জনের শরীরে ইবোলা শনাক্ত হয়েছে। রোগটিতে অন্তত ১১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গর্ভে থাকা অবস্থায়ও সংক্রমণের আশঙ্কা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, ইবোলা ভাইরাস শুধু রক্ত বা লালায় নয়, গর্ভের শিশুকে ঘিরে থাকা তরল ও প্লাসেন্টাতেও পাওয়া গেছে। এ কারণে ধারণা করা হচ্ছে, বাসওয়াজা হয়তো মায়ের গর্ভে থাকতেই সংক্রমিত হয়েছিল। আবার জন্মের সময়ও ভাইরাস তার শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সন্তান জন্মের পর মা যদি ইবোলায় আক্রান্ত হন, তাহলে বুকের দুধের মাধ্যমেও শিশুর শরীরে ভাইরাস যেতে পারে। কারণ বুকের দুধেও ইবোলার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
শিশুদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, চলমান প্রাদুর্ভাবে শনাক্ত হওয়া রোগীদের প্রায় ১৭ শতাংশই শিশু। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) সতর্ক করেছে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এই প্রাদুর্ভাব ২০১৪-১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার ভয়াবহ ইবোলা সংকটকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত কত শিশু মারা গেছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ছোট শিশুরা তুলনামূলকভাবে কম আক্রান্ত হলেও তাদের গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়া এবং মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী বান্ডিবুগিও ধরনের ইবোলা ভাইরাস শিশুদের ওপর ঠিক কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত গবেষণা নেই।
অপুষ্টি ও সংঘাত পরিস্থিতিকে আরো জটিল করছে
ইউনিসেফ জানিয়েছে, রোগের পাশাপাশি অঞ্চলটির দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যসংকট শিশুদের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ইতুরি প্রদেশে অপুষ্টির হার অত্যন্ত বেশি। একই সঙ্গে সব এলাকায় শিশুদের টিকাদান কার্যক্রমও সমানভাবে পরিচালিত হয় না। ২০২৩ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির হার ছিল ৫২ দশমিক ১ শতাংশ। এতিমখানায় থাকা অনেক শিশুই পূর্ব কঙ্গোর দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘাতের শিকার। তারা যুদ্ধ ও সহিংসতার কারণে পরিবার হারিয়েছে।
সম্প্রতি বুনিয়া সফর করা ইউনিসেফের স্বাস্থ্য জরুরি বিভাগের প্রধান ডগলাস নোবেল বলেন, আগে থেকেই দুর্বল স্বাস্থ্য অবস্থায় থাকা শিশুদের শরীরে ইবোলার মতো রোগ দ্রুত মারাত্মক আকার নিতে পারে।
শিশুদের জন্য বিশেষ মরদেহের ব্যাগ
সংক্রমণ ঠেকাতে মে মাসের শেষ দিকে বাসওয়াজাকে বিশেষ জলরোধী ও সিল করা মরদেহের ব্যাগে দাফন করা হয়। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ফেডারেশন জানিয়েছে, শিশুদের নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে দাফনের জন্য তাদের কাছে শিশুদের মাপ অনুযায়ী বিশেষ মরদেহের ব্যাগ সংরক্ষিত রয়েছে।
বর্তমানে স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিদিন এতিমখানাটি পরিদর্শন করছেন। তারা শিশু ও কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন এবং নতুন সংক্রমণ শনাক্তের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সেভ দ্য চিলড্রেনের জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বাবু রুকেঙ্গেজা বলেন, এই প্রাদুর্ভাব এমন একটি এলাকায় আঘাত হেনেছে, যেখানে আগে থেকেই মানবিক সংকট চলছে। তার ভাষায়, 'এই এতিমখানাই অনেক শিশুর শেষ আশ্রয়। তাই এখানে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।'