• ই-পেপার

খেতাবের আড়ালে রাজনীতি

সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টা, প্রতিরোধ নয়, প্রতিবাদও করতে হবে

আহসান হাবিব বরুন
সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টা, প্রতিরোধ নয়, প্রতিবাদও করতে হবে
সংগৃহীত ছবি

রাষ্ট্রের সীমান্ত একটি দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক, কিন্তু মানুষের মর্যাদা তারও ঊর্ধ্বে। আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো এই বিশ্বাস যে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি সেই অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং কূটনৈতিক রীতিনীতি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কথিত ‘পুশ ইন’ নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতি, মানবাধিকার এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

বাংলাদেশের মানুষের কাছে সীমান্ত সংকট নতুন নয়। ভারতের তরফে সীমান্ত হত্যা, গুলি, আটক, নির্যাতন এবং বিভিন্ন সময়ে জোরপূর্বক প্রত্যাবাসনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের সম্পর্কের একটি অস্বস্তিকর অধ্যায় হয়ে আছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পুশ ইন বিতর্ক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ এখানে শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা নয়, সরাসরি মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রের মর্যাদার প্রশ্ন জড়িত।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠ। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (UDHR)-এর ১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব মানুষ মর্যাদা ও অধিকারে সমান। ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে খামখেয়ালি গ্রেপ্তার, আটক বা নির্বাসনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক চুক্তি (ICCPR)-এর ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিককে বহিষ্কার করতে হলে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে এবং তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।

আবার আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের অন্যতম মৌলিক নীতি নন-রিফাউলমেন্ট (Non-Refoulement) অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে এমন পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া যায় না, যেখানে তার নিরাপত্তা, অধিকার বা আইনগত অবস্থান মারাত্মকভাবে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তার সমাধান হতে হবে যৌথ যাচাই, কনস্যুলার যোগাযোগ এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে; সীমান্তে একতরফাভাবে ঠেলে দেওয়ার মাধ্যমে নয়।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের বর্তমান অবস্থানকে আরো বিব্রতকর করে তুলেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। সমালোচনা শুধু বাংলাদেশ থেকে আসছে না; ভারতের ভেতর থেকেও আসছে। পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন Association for Protection of Democratic Rights (APDR) প্রকাশ্যে বিএসএফের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছে এবং একে মানবাধিকারবিরোধী ও অসাংবিধানিক বলে আখ্যায়িত করেছে। সংগঠনটি ভারতের সংবিধানের ১৪ ও ২১ অনুচ্ছেদের আলোকে প্রশ্ন তুলেছে—যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কীভাবে কাউকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়?

এই সমালোচনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে আমি মনে করি। কারণ অভিযোগগুলো কোনো বিদেশি সরকার বা ভারতের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছ থেকে আসেনি; এসেছে ভারতের নিজস্ব নাগরিক সমাজ, মানবাধিকারকর্মী এবং গণতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলোর কাছ থেকে। ফলে এটি আর কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; বরং এটি ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গীকারের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।

এদিকে ভারত নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে পরিচয় দেয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। কিন্তু সীমান্তে যদি এমন আচরণের অভিযোগ ওঠে, যা সেই মূল্যবোধের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—ভারত কি তার ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে বাস্তব আচরণের সামঞ্জস্য বজায় রাখতে পারছে?

এখানে ভারতের নীতিনির্ধারকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা উপলব্ধি করা জরুরি। বাংলাদেশ এখন আর নব্বই দশক কিংবা একবিংশ শতাব্দীর শুরুর সেই বাংলাদেশ নয়, যাকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে দুর্বল অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হতো। গত দুই দশকে অর্থনীতি, অবকাঠামো, মানবসম্পদ, কৌশলগত অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে বঙ্গোপসাগর শুধু একটি জলরাশি নয়; এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন শক্তির ভারসাম্য গড়ে উঠছে। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্বিন্যাস, সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ এবং নৌ-বাণিজ্যের নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশকে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, তুরস্ক এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে। ফলে ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে পুরোনো মানসিকতা বা একতরফা প্রভাব বিস্তারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিচালনার চেষ্টা করে তবে তা কৌশলগতভাবে কখনোই ফলপ্রসূ হবে না।

ভারতের উপলব্ধি করে জরুরি যে,প্রতিবেশী সম্পর্ক কখনো আধিপত্যের ভিত্তিতে টিকে থাকে না। ইতিহাস বলে, দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি এবং সমতা। সুতরাং ভারত যদি সত্যিই দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীল নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতে চায়, তাহলে তাকে প্রথমে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেই দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক নীতিগুলোর প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতির আরেকটি দিক দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সীমান্তে ভারতের অস্বাভাবিক তৎপরতা এমন এক সময়ে দৃশ্যমান হয়েছে, যখন বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে মালয়েশিয়া ও চীন সফরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত হয়েছে।

সময়গত এই মিলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে নানা বিশ্লেষণ ও আলোচনা দেখা যাচ্ছে। যদিও কোনো কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের পেছনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত মন্তব্য করা কঠিন, তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের অধিকার সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যাপার।

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং কৌশলগত প্রয়োজন বিবেচনা করেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনা করবে। কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা অন্য কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সমার্থক নয়। আধুনিক কূটনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হলো বহুমাত্রিক অংশীদারত্ব।

যদি ভারতে সত্যিই বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার নিয়ে কোনো অসন্তোষ থেকে থাকে, তাহলে তা বাস্তবতার সঙ্গে মোটেও  সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ বাংলাদেশ কোনো রাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ের অংশ নয়। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, আত্মমর্যাদাশীল এবং ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন রাষ্ট্র। তার পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হবে ঢাকার জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে; অন্য কোনো রাজধানীর প্রত্যাশার ভিত্তিতে নয়।

এখানে আরেকটি রাজনৈতিক বাস্তবতার কথাও উপেক্ষা করা যায় না। বিগত সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঢাকার নীতিগত অবস্থান নিয়ে দেশের ভেতরে বিস্তর বিতর্ক ছিল। সমালোচকদের একটি অংশের মতে, তৎকালীন সরকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন এক নীতি অনুসরণ করেছিল, যেখানে পারস্পরিকতার তুলনায় একতরফা ছাড় ও সুবিধা প্রদানের প্রবণতা বেশি দৃশ্যমান ছিল। ফলে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সেই বাস্তবতার পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অধিক ভারসাম্য ও বহুমাত্রিকতার প্রত্যাশা ভারতের কিছু নীতিনির্ধারক মহলে অস্বস্তির কারণ হয়ে থাকতে পারে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করেই পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবে—এটাই একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের স্বাভাবিক পথ।

এখানে আমি মনে করি, বাংলাদেশের জন্যও সীমান্ত পরিস্থিতি একটি নির্মম শিক্ষা। তাই শুধু প্রতিরোধ করলেই হবে না; আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে আরও শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। জাতিসংঘ, মানবাধিকার কাউন্সিল, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক ফোরামে তথ্য-প্রমাণসহ বিষয়টি তুলে ধরতে হবে। সীমান্তে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ নথিভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আবেগ নয়, তথ্যই শক্তি। অভিযোগ নয়, প্রমাণই গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে। আর নীরবতা কখনো মর্যাদা রক্ষা করে না; বরং অনেক সময় অন্যায়কে উৎসাহিত করে।

বাংলাদেশ সংঘাত চায় না, উত্তেজনাও চায় না। বাংলাদেশ চায় একটি মর্যাদাপূর্ণ, ভারসাম্যপূর্ণ এবং পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক সম্পর্ক। কিন্তু বন্ধুত্বের অর্থ কখনো নীরব আনুগত্য নয়। বন্ধুত্বের ভিত্তি হলো সমতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা।

আজকের বাস্তবতায় ভারতের জন্যও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে অনুধাবন করা। কারণ ইতিহাসের অন্যতম বড় শিক্ষা হলো—যে রাষ্ট্র সময়মতো পরিবর্তনকে বুঝতে ব্যর্থ হয়, শেষ পর্যন্ত সেই রাষ্ট্রই কৌশলগত ক্ষতির মুখোমুখি হয়।


পরিশেষে বলা যায়, পুশ ইন নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো কেবল সীমান্তের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে শক্তির প্রদর্শন নয়, প্রয়োজন আইনের শাসন, মানবিক মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক সম্মানের প্রতি আন্তরিক অঙ্গীকার।
বাংলাদেশের করণীয়ও স্পষ্ট। সীমান্তে সতর্কতা ও প্রতিরোধ যেমন অব্যাহত রাখতে হবে, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও সক্রিয়, সুসংগঠিত এবং তথ্যভিত্তিক প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। কারণ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা শুধু তার ভূখণ্ড রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে দৃঢ় ও সাহসী অবস্থান গ্রহণের মধ্যেও নিহিত। সুতরাং পুশ ইনের বিরুদ্ধে শুধু প্রতিরোধ নয়, প্রতিবাদও করতে হবে; এবং সেই প্রতিবাদ হতে হবে যুক্তি, প্রমাণ, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও জাতীয় আত্মমর্যাদার দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। অতএব যেকোনো মূল্যে সীমান্ত সংকটের সুষ্ঠু সমাধান করতেই হবে। 

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected] 
 

স্বপ্নের বাজেট, বাস্তবের দুঃস্বপ্ন : বাস্তবায়নের ব্যর্থতায় ডুবছে জাতির প্রত্যাশা

মৌসুমী ইসলাম
স্বপ্নের বাজেট, বাস্তবের দুঃস্বপ্ন : বাস্তবায়নের ব্যর্থতায় ডুবছে জাতির প্রত্যাশা
সংগৃহীত ছবি

প্রতি বছর সংসদে বাজেট পেশের দিনটি আসে বিশাল প্রতিশ্রুতি আর উচ্চাভিলাষী সংখ্যার ভার নিয়ে। কিন্তু অর্থবছর শেষে যখন হিসাব মেলানো হয়, তখন দেখা যায়, বরাদ্দের বিশাল অংশ কাগজেই রয়ে গেছে, মাঠে পৌঁছায়নি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটও এই পুরনো রোগ থেকে মুক্ত নয়। একজন উদ্যোক্তা, শিল্পনেতা ও নারী উন্নয়নকর্মী হিসেবে আমি মনে করি, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না—বাস্তবায়নের সংস্কৃতি বদলাতে হবে।

বাজেটের চ্যালেঞ্জ : যে বাধা পেরোনো যাচ্ছে না এবারের বাজেটে সরকারি ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বিপুল অংকে, কিন্তু রাজস্ব আহরণের বাস্তবতা সেই লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) ধারাবাহিক ব্যর্থতা, কর ফাঁকি রোধে কার্যকর পদক্ষেপের অনুপস্থিতি এবং সরকারি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এক দুষ্টচক্র।

•    রাজস্ব ঘাটতি : প্রতি বছর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২০-৩০% কম রাজস্ব আদায় হচ্ছে, যা বাজেটের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করছে।
•    ব্যাংকিং খাতের সংকট : খেলাপি ঋণের পাহাড় বাড়তেই থাকছে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না, আর বৃহৎ ঋণখেলাপিরা পার পেয়ে যাচ্ছেন।
•    মুদ্রাস্ফীতির চাপ : সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, নিত্যপণ্যের মূল্য আকাশছোঁয়া, অথচ বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর কাঠামো নেই।
•    বৈদেশিক মুদ্রার সংকট : রিজার্ভ সংকট এখনও কাটেনি, আমদানি নির্ভরতা কমানোর কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়।

বাজেটের ফাঁকফোকর : যেখানে হারিয়ে যায় টাকা বাজেট বক্তৃতায় সুন্দর কথা, আর বাস্তব মাঠে পরিস্থিতি — এই দুয়ের মধ্যে যে গভীর খাদ তৈরি হয়েছে, তা এখন আর কোনো গোপন তথ্য নয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (ADP) মাত্র ৫০-৬০% বাস্তবায়িত হয় প্রতি বছর। খাত    বরাদ্দ  (প্রতিশ্রুতি)   বাস্তবতা (সমস্যা) স্বাস্থ্য খাত   GDP-র ১% এরও কম  বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় লাগামহীন ব্যয়।  শিক্ষা খাত    GDP-র ২% এর কাছাকাছি   মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। নারী উন্নয়ন  নামমাত্র বরাদ্দ। তৃণমূল নারী উদ্যোক্তারা বঞ্চিতই থাকছেন।  চিকিৎসা যন্ত্রপাতি  আমদানি নির্ভরতা অব্যাহত। দেশীয় উৎপাদনে কোনো প্রণোদনা নেই।  এসএমই খাত ঋণ সহজলভ্যতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে জামানত সংকটে আটকে থাকছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। 

প্রভাব : কে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি?বাজেটের দুর্বল বাস্তবায়নের মাশুল দিতে হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষদের — বিশেষত তৃণমূল নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে। নারী উদ্যোক্তাদের উপর প্রভাব AGWEB-এর মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি — তৃণমূল নারী উদ্যোক্তারা এখনও ব্যাংক ঋণ, প্রশিক্ষণ সুবিধা ও বাজার সংযোগ থেকে বঞ্চিত। বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক তহবিল ও নীতি সহায়তার ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে সেই সুবিধা তাদের কাছে পৌঁছায় না। মধ্যবর্তী স্তরের দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতায় এই সুযোগগুলো হারিয়ে যায়।

চিকিৎসা যন্ত্রপাতি শিল্পে প্রভাব MEDMEB-এর একজন নেতৃত্ব হিসেবে আমি দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি যে, বাংলাদেশে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি উৎপাদন ও রপ্তানি খাতে দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বাজেটে কার্যকর প্রণোদনা নেই। আমদানি শুল্ক কাঠামো এমনভাবে সাজানো যে দেশীয় উৎপাদনকারীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না।

শিল্প ও বাণিজ্যে প্রভাব PROMIXCO Group-এর মতো বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো আজ যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে, তা হলো — গ্যাস ও বিদ্যুতের অস্থির মূল্য, দক্ষ জনশক্তির অভাব এবং নীতি অনিশ্চয়তা। বাজেটে এই সমস্যাগুলোর সমাধানে কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ নেই।

দুর্বল বাস্তবায়ন: সংখ্যায় যখন বলা হয় গল্প বাজেট বাস্তবায়নের হার নিয়ে তথ্য-উপাত্ত বলছে এক বেদনাদায়ক সত্য। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অর্থ বছরের শেষ তিন মাসে ব্যয় হওয়া 'জুন মাসের উন্মাদনা' এখন যেন একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে — শুধু বাস্তবায়নের তাড়নায় টাকা ঢালা হয়, প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত না করেই।

•    ADP বাস্তবায়ন হার গড়ে মাত্র ৫৫-৬৫% — প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা অব্যবহৃত ফেরত যায়।
•    সরকারি প্রকল্পে মেয়াদ বৃদ্ধি ও ব্যয় বৃদ্ধি এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে — জবাবদিহির কোনো কাঠামো নেই।
•    সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর টাকা প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছানোর হার উদ্বেগজনকভাবে কম — তালিকায় ভুয়া নাম ও দুর্নীতি এখনও বড় সমস্যা।
•    ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ হয়, কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ডিজিটাল সেবার বাইরেই থাকে।

আমাদের দাবি ও সুপারিশ :

শুধু সমালোচনায় দায়িত্ব শেষ হয় না। একজন উদ্যোক্তা ও সমাজসেবক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, সুনির্দিষ্ট সংস্কার পদক্ষেপের মাধ্যমেই এই পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব:

•    নারী উদ্যোক্তা তহবিল : তৃণমূল নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতমুক্ত ঋণ ও ডিজিটাল বাজার সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
•    দেশীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি উৎপাদন : আমদানি শুল্ক পুনর্বিন্যাস করে দেশীয় উৎপাদনকারীদের প্রণোদনা দিতে হবে।
•    ADP বাস্তবায়নে জবাবদিহি : প্রকল্প পরিচালকদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে বাস্তবায়ন হারকে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
•    এসএমই সংস্কার: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য একক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো (Single Window) তৈরি করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে।
•    সামাজিক নিরাপত্তা সংস্কার : ডিজিটাল পদ্ধতিতে সুবিধাভোগী যাচাই ও সরাসরি নগদ হস্তান্তর ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

বাজেট নয়, বাস্তবায়নই হোক প্রতিশ্রুতি :

বাজেট একটি দলিল, বাস্তবায়ন একটি সংস্কৃতি। যতদিন না আমরা এই সংস্কৃতি বদলাতে পারব — যতদিন না প্রতিটি টাকার হিসাব প্রকৃত সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত হবে — ততদিন লক্ষ কোটি টাকার বাজেটও শুধু কাগজের স্বপ্নই থাকবে। আমাদের দেশের নারী উদ্যোক্তারা, প্রান্তিক মানুষেরা, তরুণ উদ্যোক্তারা — তারা ভালো বক্তৃতা চান না, তারা চান কর্মসংস্থান, ঋণ, বাজার আর মর্যাদা। সরকারের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ — বাজেট ঘোষণা নয়, বাজেট বাস্তবায়নকেই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে নিন।

লেখক : সভাপতি, AGWEB ও MEDMEB এবং চেয়ারপারসন PROMIXCO Group। 

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে আমরা ৪ বছর ধরে লাল তালিকাভুক্ত : ড. জাহাঙ্গীর আলম

অনলাইন ডেস্ক
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে আমরা ৪ বছর ধরে লাল তালিকাভুক্ত : ড. জাহাঙ্গীর আলম
ছবি: কালের কণ্ঠ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে। এ নিয়ে কালের কণ্ঠ মাল্টিমিডিয়ার নিয়মিত আয়োজন দ্য বিজনেস রিভিউ শোতে কথা বলেছেন একুশে প্রদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম।

ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘কন্ট্রাকশন পলিসির সঙ্গে ফিসকাল পলিসির একটা সম্পর্ক আছে। ফিসকাল পলিসি যদি সঠিকভাবে পরিচালিত না হয় তাহলে শুধু কন্ট্রাক্ট শ্রেণি মনিটরি পলিসি দিয়ে দ্রব্যমূল্যকে স্বাভাবিক করা সম্ভব না। ইনফ্লেশনটা কমিয়ে আনা ডিফিকাল্ট। কারণ একদিকে আপনি সুদের হার বাড়িয়েছেন, বাড়িয়ে টাকা নিয়ে যাচ্ছেন ব্যাংকের খাতে। আরেক দিকে প্রায় এক লাখ কোটি টাকারও বেশি আপনি ব্যাংকের সিস্টেম থেকে নিয়ে গেছেন এবং বাজারে ছেড়েছেন। তো এই যখন হয় তখন উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে নির্বাপিত করা এটা খুব ডিফিকাল্ট হয়ে পড়ে। সবচাইতে বড় জিনিস হলো খাদ্য মূল্যস্ফীতি।’

এবারও কিন্তু খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৯.০৬ শতাংশ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গত মাসেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এখন খাদ্যমূল্যস্ফীতি গত চার বছর ধরে আমরা খুব উচ্চ পর্যায়ে দেখছি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে আমরা লাল তালিকাভুক্ত গত চার বছর ধরে। তো এমন একটা পরিস্থিতিতে উৎপাদন না বাড়িয়ে আপনি খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে নামিয়ে আনা এটা ডিফিকাল্ট। এখন গত বছর ২০২৪-২৫ সময়ে আমাদের যেই প্রবৃদ্ধি কৃষি খাতে সেটা ছিল ২.৪২ শতাংশ।

এই বছর যে প্রবৃদ্ধি ধারণা করা হচ্ছে এটা প্রাথমিকভাবে যেটা প্রকাশ করা হয়েছে আজকে আমি দেখলাম এটা ২.৭২ শতাংশ। এর মানে গত ৫৪ বছর ধরে আমরা যে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছি ৩ শতাংশ বা তার চাইতে ওপরে গড়ে লং টার্ম ট্রেন যেটা সেটা খুব কম এবং উৎপাদন যখন স্বাভাবিকভাবে প্রবৃত্তি অর্জন করা না হয় তখন বাজারে স্বাভাবিকভাবেই সরবরাহ কমে এবং সরবরাহ যখন কমে তখন মূল্যস্ফীতি বাড়ে। খাদ্যের ক্ষেত্রে এটা অত্যন্ত খুব জটিল। কারণ এটা শুধু আপনার যে উৎপাদন প্রবৃদ্ধি কম সেটা না।’

একুশে প্রদকপ্রাপ্ত এই কৃষি অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বাজার ব্যবস্থাকে কিন্তু আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। সরকারের নিয়ন্ত্রণে বাজার ব্যবস্থাটা নাই। বাজার ব্যবস্থাটা সম্পূর্ণভাবে আমাদের ব্যবসায়ী যারা আছেন তাদের হাতে। কারণটা বুঝতে হবে, সেটা হলো সরকার যে ইন্টারভিন করে, কি দিয়ে ইন্টারভিন করে? আমার মাত্র ২০ থেকে ২২ লাখ টন চাল থাকে গম থাকে এর বেশি না, সরকারের এর বেশি ক্যাপাসিটিও নাই। কিন্তু প্রাইভেট সেক্টরে সেটা এক কোটি টনেরও বেশি খাদ্যশস্য মজুদ থাকে, সুযোগ তাদের বেশি। কাজেই প্রাইভেট সেক্টরে যখন যেভাবে বাজারটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় তারা সেটা করতে পারে। সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারত যদি তাদের হাতে আরো বেশি আপনার ইন্টারভিন করার ক্ষমতা থাকত কিন্তু সরকারের হাতে এই ইন্টারভিন করার ক্ষমতা নাই।’

তিনি বলেন, ‘আরেকটি বিষয় হলো যে আন্তর্জাতিক মূল্য। আন্তর্জাতিক মূল্য মাঝখানে কিছুটা কমে গিয়েছিল। কিন্তু এখন এই আপনি যেটা বললেন, যে ইরান এবং ইউএস যেই যুদ্ধ শুরু হয়েছে এটার কারণে আবার পণ্যমূল্য বেড়ে গেছে। সবচাইতে বড় জিনিস হলো—যে উপকরণ যেমন সার, রাসায়নিক সার, তেল এগুলোর দাম বেড়ে গেছে এবং এগুলোর দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে সারা বিশ্বের উৎপাদন ২ শতাংশ হ্রাস পাবে এটাই আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই সব পণ্যের দাম কিন্তু বেড়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাচ্ছে। তো বাংলাদেশেও এটার প্রভাব পড়েছে। এখন হলো গরুর মৌসুম। এই সময়ে চালের দাম তিন থেকে চার টাকা প্রতিকেজি বেড়ে গেছে।’

ইরানের দেশপ্রেম বনাম ইউনূস সরকারের দেশবিরোধিতা

অদিতি করিম
ইরানের দেশপ্রেম বনাম ইউনূস সরকারের দেশবিরোধিতা

শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবলের মহাযজ্ঞ। দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। তিন স্বাগতিক দেশে ৪৮ দলের অংশগ্রহণে এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল প্রেমীদের আগামী দেড় মাস বুঁদ করে রাখবে। সবকিছু ভুলে ফুটবল উন্মাদনায় মাতবে গোটা বিশ্ব। ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে কে জিতবে তার চেয়েও আমার আগ্রহ ইরানের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের দিকে। ইরান এখন যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ। মার্কিন, ইসরায়েলের হামলায় দেশটিতে মানবতার চরম লঙ্ঘন হচ্ছে। নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে শিশুদের। ধ্বংস করা হচ্ছে হাসপাতাল। হাজারো মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে আজ নিঃস্ব। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের একতরফা হামলায় সহস্রাধিক নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তার পরও ইরান মাথানত করেনি। যখন বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে তখনো ইরানে শুরু হয়েছে নতুন করে মার্কিন হামলা। এরকম একটা সময় ইরান শেষ পর্যন্ত ফুটবল বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করবে কি না তা নিয়ে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। বিশেষ করে যখন বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ইরান সিদ্ধান্ত নেয় তারা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করবে। ইরান সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়, এটা ফিফা বিশ্বকাপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নয়। তাই তারা খেলবে। ইরান বলেছে, এটা শুধু একটি খেলা নয়, দেশের মর্যাদা এবং সম্মানের স্মারক। বিশ্ব দেখবে ইরানের দেশপ্রেম এবং দেশের প্রতি ভালোবাসা। প্রতিটি খেলায় বাজবে ইরানের জাতীয় সংগীত, উড়বে জাতীয় পতাকা। সারা বিশ্বে ইরান তার প্রিয় মাতৃভূমির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এই বিশ্ব আসরে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। কিন্তু আয়োজক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে রীতিমতো অবিচার করেছে। নজিরবিহীন আচরণ করা হচ্ছে ইরানের সঙ্গে। চলতি বছরের ১৬ জুন নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে ইরানের বিশ্বকাপ অভিযান। তবে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ভিসা জটিলতার কারণে উদ্বোধনী ম্যাচের মাত্র এক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাবে ইরান জাতীয় ফুটবল দল। ইরানি ফুটবল ফেডারেশনের মুখপাত্র আমির মেহদি আলাভি এক বিবৃতিতে জানান, ‘ফিফার নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, আমাদের পুরো দল একটি চার্টার্ড ফ্লাইটে করে যুক্তরাষ্ট্রে রওনা হবে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের মাত্র একদিন আগে আমরা আয়োজক শহরে পৌঁছাব। তবে পরবর্তী দুটি ম্যাচের জন্য আমরা খেলা শুরুর দুই দিন আগেই ভেন্যুতে উপস্থিত হব।’

বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য ইরানি ফুটবলাররা ভিসা পেলেও, দলটির এক ডজনেরও বেশি প্রশাসনিক ও ম্যানেজমেন্ট কর্মকর্তা মার্কিন ভিসা পাননি। ইরানের কোনো সমর্থক ভিসা পাননি। তারা মাঠে গিয়ে নিজেদের দলকে সমর্থন জানাতে পারবে না। চলমান এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের জের ধরে ইরান তাদের প্রাথমিক পরিকল্পনা বদলে অ্যারিজোনার টুসন শহরের পরিবর্তে মেক্সিকোর সীমান্তবর্তী শহর টিজুয়ানাতে বিশ্বকাপের মূল প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করেছে। মেক্সিকোতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত শনিবার জানান, তাদের ভিসার শর্ত অনুযায়ী দলকে ম্যাচের দিনই যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে হবে এবং একই দিনে দেশটি ত্যাগ করতে হবে। এত বাধা সত্ত্বেও ইরান খেলবে বিশ্বকাপে। এটি হবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম আসর, যেখানে আয়োজক দেশ এমন একটি দেশের দলকে স্বাগত জানাবে যার সঙ্গে তারা যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে সর্বশেষ বার্তায় বলা হয়েছে, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ ইরানের জন্য একটি গৌরবের বিষয়। তারা যেকোনো মূল্যে ইরানের স্বার্থে এই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করবে। এতসব প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে ইরান বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে। এটা ইরানের খেলোয়াড় এবং জনগণের দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সারা বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

এবার চলুন বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে নজর দিই। গত ৭ ফেব্রুয়ারি ভারত এবং শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বকাপ ক্রিকেট। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল তার যোগ্যতায় ক্রিকেটের এই বিশ্ব আসরে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। এটা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য গর্বের। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ কেবলমাত্র একটি টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ নয়, বরং দেশের সম্মান ও মর্যাদাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরা। দেশের গৌরবের পতাকা উঁচিয়ে ধরা। খেলার মাধ্যমে একটি জাতির ঐক্য এবং দেশপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়। সব দেশ এই সুযোগ পায় না। বাংলাদেশ পেয়েছিল। কিন্তু তখন ক্ষমতায় ছিল ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বর্তী সরকার। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন ইউনূসের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত আসিফ নজরুল। ঠুনকো এক অজুহাতে ইউনূস সরকার বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যা ছিল আত্মঘাতী এবং দেশের স্বার্থের পরিপন্থি। ড. ইউনূস এবং তার ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ওপর এই হঠকারী সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছিল। টাইগার পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তে বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণের ছিল না। এটি ছিল ইউনূস এবং আসিফ নজরুলের মতো অর্বাচীনদের দেশের ক্রিকেট ধ্বংস করার জন্য একটি নিম্নমানের কাজ। অনেকেই মনে করেন, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন বানচালের জন্য এটা ছিল অন্তর্র্বর্তী সরকারের একটি ষড়যন্ত্রের অংশ। সস্তা ভারত বিরোধিতা উসকে দিয়ে তারা দেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল। দেশে সৃষ্টি করতে চেয়েছিল বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি।

বিসিসিবি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সরকারকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আসিফ নজরুলের একগুঁয়েমির কারণে বোর্ড অসহায় হয়ে পড়ে। আর আসিফ নজরুলের পেছনে ছিল ড. ইউনূসের নীরব সমর্থন।

এখন ইরানের বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিশ্বকাপে না খেলার ইস্যুটি আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আমাদের সামনে এখন তুলনা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ইরান যদি আক্রমণকারীর দেশে গিয়ে খেলতে পারে তাহলে বাংলাদেশকে কেন ভারতে খেলতে যেতে দেওয়া হলো না? এটা কি আদৌ দেশপ্রেম নাকি দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়া? বাংলাদেশে ক্রিকেট অত্যন্ত জনপ্রিয় খেলা। এই একটি খেলায় আমরা বিশ্বমান অর্জন করেছি। গত মঙ্গলবার দীর্ঘ একুশ বছর পর অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশ নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। এরকম একটি সম্ভাবনাময় দলকে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়া শুধু ভুল নয়, অপরাধ। বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডের নব নির্বাচিত সভাপতি তামিম ইকবাল বলেছেন, বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত ক্রিকেটের ক্ষতি করেছে। বিএনপি সরকার এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ইরানের সিদ্ধান্তের পর বাংলাদেশ কেন বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করতে পারেনি তা তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারা দেশপ্রেমের মুখোশ পরে দেশের ক্ষতি করেছে তা জানার অধিকার জনগণের আছে। ইউনূস সরকারের দেড় বছরে দেশপ্রেমের ফতোয়া দিয়ে দেশবিরোধী বহু কাজ হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অসম বাণিজ্য চুক্তি, দুর্নীতি দমনের নামে বেসরকারি খাতকে পঙ্গু করে দেওয়া এবং হামের টিকা কেলেঙ্কারি তার কিছু প্রমাণ মাত্র। দেশের মানুষ মনে করে, ইউনূস সরকারের দেড় বছরের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করার জন্য একটি বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করা দরকার। দেশের কী কী ক্ষতি ইউনূস সরকার করেছে তা চিহ্নিত করা প্রয়োজন। যেন ভবিষ্যতে কেউ ক্ষমতা নিয়ে সবক্ষেত্রে এভাবে দেশের সর্বনাশ করতে না পারে।