সাবেক স্পিকার, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছে জাতীয় সংসদ।
একজন প্রজ্ঞাবান সংসদীয় ব্যক্তিত্ব, সফল আইনজীবী, গণতন্ত্রে অবিচল আস্থাশীল রাজনীতিক এবং আপাদমস্তক ভদ্রলোক হিসেবে অভিহিত করেন সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা। সংসদে শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় তারা বলেন, জমির উদ্দিন সরকার শুধু একজন রাজনীতিক ছিলেন না, তিনি নিজেই ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান।
রবিবার (১২ জুলাই) জাতীয় সংসদ অধিবেশনের শুরুতে সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুর বিষয়টি সংসদকে অবহিত করেন স্পিকার। পরে তার মৃত্যুতে আনা শোক প্রস্তাব উত্থাপন এবং সেই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হয়।
আলোচনা শেষে মরহুমের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামান। এ সময় তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংসদ অধিবেশনের অন্যান্য কার্যসূচি স্থগিত রেখে অধিবেশন মূলতবি করা হয়। পরে সংসদ ভবনের ট্যানেলে নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ অন্যান্যরা অংশ নেন।
শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন একজন ‘সেলফ-মেড ম্যান’। নিজের মেধা ও পরিশ্রমে তিনি সুদূর যুক্তরাজ্য থেকে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করে দেশের আইন ও রাজনীতিতে অনন্য অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তিনি উত্তরবঙ্গ ও ঢাকা, উভয় স্থান থেকেই জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন এবং জীবনে কখনো নির্বাচনে পরাজিত হননি।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপোষহীন। সব সময় বলতেন, নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্রে পৌঁছানো যায় না। আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর অবিচল বিশ্বাস আজও অনুসরণীয়।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জমির উদ্দিন সরকার রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবনে সফল এবং বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি স্পিকার, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা যখন আইনি হয়রানির শিকার হতেন, তখন জমির উদ্দিন সরকার তাদের পাশে দাঁড়াতেন। আদালতে মামলা পরিচালনা করলেও কখনো পারিশ্রমিক নিতেন না। তিনি বলতেন, এটি তার নৈতিক দায়িত্ব। তার এই অবদান কোনো দিন ভোলার নয়।
তিনি আরো বলেন, স্পিকার হিসেবে তিনি সংসদকে প্রাণবন্ত করেছিলেন। আইন অঙ্গনে তিনি ছিলেন অনেকের শিক্ষক। মহান আল্লাহর কাছে তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন আপাদমস্তক একজন ভদ্রলোক। তাকে কখনো থ্রি-পিস স্যুট ছাড়া দেখা যেত না। তার ব্যক্তিত্ব, শিষ্টাচার ও সৌজন্য ছিল অনুকরণীয়। দীর্ঘ আইনজীবী জীবনে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তি, মক্কেল বা সহকর্মীর কাছ থেকে কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি।
তিনি বলেন, দলের প্রতি তিনি ছিলেন শতভাগ নিবেদিতপ্রাণ। বয়সের কারণে নিজে নির্বাচন না করে ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরকে মনোনয়ন দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তিনি নির্বাচন করলে নিশ্চিতভাবেই বিজয়ী হতেন।
তিনি আরো বলেন, প্রথা অনুযায়ী সাবেক স্পিকারদের যেভাবে জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়, জমির উদ্দিন সরকারকেও সেখানেই সমাহিত করা হবে। শারীরিকভাবে তিনি না থাকলেও সংসদেই চিরদিন থাকবেন।
প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন স্মৃতিচারণা করে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে দূর থেকে হ্যাট, কোট ও ছাতা হাতে কাউকে দেখলেই বোঝা যেত তিনি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। একজন আইনজীবী হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও পেশাদার।
আলোচনা শেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীরবিক্রম) বলেন, জাতি আজ একজন মহান রাজনীতিক, দক্ষ সংসদীয় ব্যক্তিত্ব এবং সাদা মনের মানুষকে হারিয়েছে। স্পিকার হিসেবে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সংসদ পরিচালনা করেছেন। তার বিরুদ্ধে কখনো কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি।
উল্লেখ্য, সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার রবিবার ভোর ৪টা ১৫ মিনিটে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সংসদ ভবনেও ছিল শোকের আবহাওয়া।