সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওকে ঘিরে সমালোচনার জেরে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকারা শুরু করেছেন অভিনব সংহতি। চার দশক আগে প্রেমের আবহে লেখা জনপ্রিয় গান ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হল আকাশে’ এখন শিক্ষিকাদের প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ঘটনার সূত্রপাত সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পালকে ঘিরে। গত ২৩ জুলাই তিনি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করেন। ভিডিওতে হালকা বাতাসে শাড়ির আঁচল উড়িয়ে ধীর পায়ে হাঁটতে দেখা যায় তাকে। পেছনে বাজছিল ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানটি।
ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাংশের সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। তবে এর পরপর ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষিকা এ গান ব্যবহার করে নিজেদের ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করতে শুরু করেন। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, কর্মস্থল কিংবা ব্যক্তিগত পরিবেশে ধারণ করা এসব ভিডিওর মাধ্যমে তারা বিউটি রাণীর প্রতি সংহতি প্রকাশ করছেন।
প্রতিবাদে অংশ নেওয়া শিক্ষকদের ভাষ্য, শিক্ষকতা একটি পেশা হলেও একজন শিক্ষক প্রথমত একজন মানুষ। দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত অনুভূতি, নান্দনিকতা ও সৃজনশীল প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। সেই স্বাধীনতাকে সম্মান জানাতে তারা এ উদ্যোগ নিয়েছেন।
ভিডিও পোস্ট করে মাদারীপুরের সহকারী শিক্ষিকা সামিয়া শিকদার লিখেছেন, ‘বিউটি রানী পাল ম্যাডামকে হেনস্তার চেষ্টা সফল হয়নি। আজ প্রতিটি সাহসী শিক্ষকই একেকজন বিউটি রানী পাল। আমরা মাথা নত করব না, সম্মান নিয়ে এগিয়ে যাব।’
কুমিল্লার শিক্ষিকা লায়লা নূর পিংকি এক পোস্টে বলেন, ‘ডিজিটাল এ প্রতিবাদ প্রমাণ করে দিল, যেখানে অন্যায় হবে সেখানেই শিক্ষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানাবে। আমাদের এ ঐক্য ধরে রাখতে হবে। সমালোচনা করুন, তবে তা হোক যৌক্তিক। আজাইরা সমালোচনার ফল তো দেখলেন? হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো সব শিক্ষকই বেরিয়ে এলেন। যেসব শিক্ষক কোনো দিন ভিডিও দিতেন না তারাও সাহস করে সামনে এসেছেন। আগামীকাল থেকে আবার আমাদের শ্রেণিকক্ষেই দেখা হবে।’
আরেক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে গানের ভিডিওর কারণে দেশবাসী অন্তত কিছুটা হলেও লায়লা, মামুন আর চাচাদের কটাক্ষপূর্ণ ভিডিও থেকে মুক্তি পেয়েছে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষকরা কিছুটা হলেও ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।’
পঞ্চগড়ের শিক্ষিকা ফেরদৌস লিখেছেন, ‘এরপর শাড়ি পরেই দিব শিক্ষকের সেই ভাইরাল নাচ!’ অন্যদিকে চট্টগ্রামের মতলব বাজারের শিক্ষিকা জয়ন্তী ভৌমিক প্রশ্ন তুলেছেন, ‘শিক্ষক যদি হাসেন, সমস্যা! সাজেন, সমস্যা! পরিপাটি থাকেন, সমস্যা! ভ্রমণে যান, সমস্যা! ছবি পোস্ট করেন, সমস্যা! তাহলে কি শিক্ষক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হওয়ার অধিকারটাও জমা দিতে হবে?’
শিক্ষকদের এ উদ্যোগকে অনেকে পেশাগত পরিচয়ের বাইরে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও পারস্পরিক সংহতির প্রকাশ হিসেবে দেখছেন। গত দুদিনে একই গান ব্যবহার করে হাজারো ভিডিও প্রকাশ পাওয়ায় বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জানা গেছে, ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানটি ১৯৮৭ সালের এক শ্রাবণে খুলনায় লিখেছিলেন গীতিকার ও সুরকার আশরাফ বাবু। দীর্ঘ সময় পর আরেকটি শ্রাবণে এসে সেই প্রেমের গানই নতুন অর্থ পেয়েছে। ভালোবাসার আবেগ ছাপিয়ে এটি এখন শিক্ষকদের সংহতি ও প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে।



































