মানুষ তার মানবীয় দুর্বলতার কাছে আত্মসমর্পণ করে ভুল করে। পাপ করে ফেলে। কিন্তু ইসলামের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য তাওবার দরজা খোলা রেখেছেন। শুধু তাই নয়, কিছু আমল এমন রয়েছে, যার মাধ্যমে অতীতের গুনাহ শুধু মাফই হয় না; বরং আল্লাহ তা সওয়াবে রূপান্তর করে দেন। এটি আল্লাহর অসীম রহমত ও দয়ার এক অনন্য প্রকাশ। তবে এমনটা হবে তখনই, যখন বান্দা কিছু শর্ত পালন করতে পারবে। নিম্নে সেই শর্তগুলো তুলে ধরা হলো—
১. আন্তরিকভাবে তাওবা : কুফরি ও শিরকি গুনাহ সাধারণত অমার্জনীয় অপরাধ। এ অবস্থায় তাওবা না করে কেউ মারা গেলে, তার আর ক্ষমাপ্রাপ্ত হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু কেউ যদি মৃত্যুর আগে আগে নিজের অতীতের গুনাহের ওপর অনুতপ্ত হয়ে বাকি জীবন গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করে এবং তার ওপর অটল থাকে, তবে তাকে মহান আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন ইনশাআল্লাহ, উপরন্তু তার গুনাহগুলোকে সওয়াবে রূপান্তরিত করবেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তবে যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে; পরিণামে আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৭০)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরবিদরা লেখেন, যারা শিরক ও গুনাহ থেকে খাঁটি তাওবা করে, তাদের জাহান্নামে চিরকাল বাস করা দূরের কথা জাহান্নাম তাদের বিন্দুমাত্রও স্পর্শ করবে না; বরং আল্লাহ তাআলা তাদের অতীত গুনাহকে ভবিষ্যেক পুণ্য দ্বারা পরিবর্তিত করে দেবেন (অর্থাৎ যেহেতু অতীত কুফর ও গুনাহ ইসলামের বরকতে মাফ হয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে সৎকর্মের কারণে পুণ্য লিখিত হতে থাকবে, তাই জাহান্নামের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না) এবং এই পাপ মোচন ও পুণ্য লিখন এ কারণে যে আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল, তাই পাপ মোচন করে দেন এবং পরম দয়ালু, তাই পুণ্য স্থাপন করে দেন। (তাফসিরে মাআরিফুল কোরআন)
আর যারা আগে থেকে মুমিন, তাদেরও উচিত গুনাহ হয়ে গেলে মহান আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হয়ে খাঁটি অন্তরে তাওবা করা এবং বাকি জীবন সব রকম গুনাহ থেকে নিজেকে বিরত রাখার দৃঢ় সংকল্প করা। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, গুনাহ থেকে তাওবাকারী নিষ্পাপ ব্যক্তিতুল্য। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪২৫০)
এই হাদিস ইঙ্গিত দেয়, গুনাহ থেকে সত্যিকারের আন্তরিক তাওবা মানুষের অতীতকে মুছে দিয়ে নতুন সূচনা করার সুযোগ দেয়।
২. গুনাহ হয়ে গেলে নেক আমল করা : নেক আমল মন্দ কাজকে মুছে দেয়, তাই গুনাহ হয়ে গেলে আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবার পাশাপাশি নেক আমলে মনোযোগী হওয়া জরুরি। আশা করা যায়, মহান আল্লাহ গুনাহকে মিটিয়ে তা সওয়াবে রূপান্তর করবেন। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আবু যার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বলেছেন, ‘তুমি যেখানেই থাকো, আল্লাহকে ভয় করো, মন্দ কাজের পরপরই ভালো কাজ করো, তাতে মন্দ দূরীভূত হয়ে যাবে এবং মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ করো।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৮৭)
অর্থাৎ যেখানেই থাকো—প্রতিটি স্থান ও প্রত্যেক অবস্থায়, প্রকাশ্যে ও গোপনে, সুখে ও দুঃখে, সচ্ছলতায় ও সংকটে, জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে আল্লাহকে ভয় করো এবং কোনো মন্দ কাজ হয়ে গেলে তার পরপরই একটি ভালো কাজ করো; তা সেই মন্দ কাজকে মুছে দেবে। এর মানে হলো, যদি তোমার দ্বারা কোনো গুনাহ সংঘটিত হয়ে যায়, তাহলে তার পরপরই নামাজ, সদকা কিংবা যেকোনো সৎকাজ সম্পাদন করো। কারণ এসব নেক আমল সেই গুনাহের প্রভাব দূর করে এবং তা মুছে দেয়।
৩. বিপদ-আপদে ধৈর্য ধরা : বিপদ-আপদ মানুষের জীবনের অংশ। যদি কেউ বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করতে পারে, তবে মহান আল্লাহ তার গুনাহগুলোকে ক্ষমা করে দেন। হাদিস শরিফে এসেছে, আবু সাঈদ খুদরি (রা.) ও আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে কষ্ট-ক্লেশ, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি আসে, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে ফুটে, এসবের মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেন। (বুখারি, হাদিস : ৫৬৪১)
এখানে সরাসরি গুনাহগুলো সওয়াবে রূপান্তরিত না হলেও বিপদে পড়লে মুমিনের দোয়া-ইবাদত বেড়ে যায়, ফলে গুনাহ মাফের পাশাপাশি তার আমলনামাও ভারী হতে থাকে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হতে থাকে।
৪. মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা : আল্লাহকে ভালোবাসার জন্য রাসুল (সা.)-এর পথ অনুসরণ করা আবশ্যক। আর এই অনুসরণের মাধ্যমেই আল্লাহ ও তাঁর নবীর ভালোবাসা পাওয়ার পাশাপাশি গুনাহ মাফের সুযোগ পাওয়া যায়। ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার (নবীর) অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ মার্জনা করবেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৩১)
এখানেও পাপ মার্জনার পাশাপাশি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়, যা বান্দার আখিরাতের সফলতা অর্জনে সহায়ক। এমনিভাবে মহানবী (সা.)-এর ওপর বেশি দরুদ পাঠ করলেও বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
৫. নামাজের জন্য মসজিদে গমন : জামাতের সঙ্গে নামাজ পড়লে প্রতি কদমের বিনিময়ে গুনাহ মাফ ও মর্যাদা বৃদ্ধির ঘোষণা এসেছে। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জামাতের নামাজ ঘরের বা বাজারের নামাজ অপেক্ষা ২৫ গুণ বেশি সওয়াব রাখে। কারণ বান্দা যখন উত্তমরূপে অজু করে এবং একমাত্র নামাজের উদ্দেশ্যেই ঘর থেকে বের হয়, তখন প্রতিটি কদমের বিনিময়ে আল্লাহ তার একটি করে মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং একটি করে গুনাহ মিটিয়ে দেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪৭)




