সংস্কার কার্যক্রম সঠিক পথে না এগোলে চলতি বছর শেষে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে যেতে পারে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এজন্য পাঁচ দিনের সফর শেষে সংস্থাটির একটি প্রতিনিধিদলের ঢাকা ছাড়ার আগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, রাজস্ব আয় বাড়ানোসহ পাঁচটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে বলা হয়, আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচির চুক্তি আগামী ডিসেম্বরে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনুমোদিত ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি কার্যত আর এগোচ্ছে না। এর পরিবর্তে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশ ৬ থেকে সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলারের নতুন একটি ঋণ কর্মসূচির প্রস্তাব দিয়েছে। ১২ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ সফরকালে আইএমএফের প্রতিনিধিদল সরকারের অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছে। বৈঠকে সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রাজস্ব আহরণ, বাজেট ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সুশাসন, খেলাপি ঋণ, ভর্তুকি, সরকারি ব্যয় এবং নতুন পে-স্কেলসহ অর্থনীতির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে। সফর শেষে গতকাল ঢাকা ছাড়ার আগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, রাজস্ব আয় বাড়ানো, সরকারের উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাতের সংকট দ্রুত সমাধানের ওপর জোর দিয়ে আইএমএফ একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যবাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চ আমদানি ব্যয়, ভর্তুকির চাপ এবং সীমিত রাজস্ব আহরণের কারণে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বেড়েছে। সংস্থাটির মতে, প্রবাসী আয় ইতিবাচক থাকলেও বৈদেশিক খাত এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়। অন্যদিকে খেলাপি ঋণ এবং দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থাপনা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে রয়েছে।
আইএমএফের মূল্যায়নে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে উঠে এসেছে সতর্কবার্তা। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে ২০২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন, ভর্তুকি সংস্কার এবং আর্থিক খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে মধ্যমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশেরও নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে গতকাল আইএমএফের প্রতিনিধদলটির সঙ্গে বিদায়ী বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়াই হচ্ছে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকার। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় সংস্কার বাস্তবায়ন করা হলেও তা হবে নির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকার ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে। তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার এমন কোনো দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে চায়নি, যা ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারের নীতিনির্ধারণের সুযোগকে সীমিত করে। একটি নির্দিষ্ট কর্মসূচির ভিত্তি নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং আগে চিহ্নিত নীতিগত বিষয়গুলোর ওপরই নতুন কর্মসূচি দাঁড়াবে। একই সঙ্গে আগের কর্মসূচির কয়েকটি কঠোর শর্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নমনীয়তা চেয়েছে সরকার। ঢাকায় অবস্থান করে আইএমএফের প্রতিনিধিদলটি সরকারের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শেষ করেছে।
আগামী নভেম্বরে সংস্থাটির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আবার ঢাকায় এসে চূড়ান্ত আলোচনা করবে। এর পর ডিসেম্বরে নতুন ঋণ কর্মসূচির চুক্তি সইয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, আগামী অক্টোবরে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে বাংলাদেশের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হবে। সেখানে কর্মসূচির কাঠামো, অর্থায়নের পরিমাণ, সংস্কারের সময়সূচি এবং অর্থ ছাড়ের রূপরেখা নিয়ে আরও অগ্রগতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এরপর নভেম্বরে আইএমএফের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসে চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনা করবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নতুন কর্মসূচির আওতায় অর্থায়নের পরিমাণ, সংস্কারের রূপরেখা এবং বাস্তবায়নের সময়সূচি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকার চাইছে এমন একটি কর্মসূচি, যা একদিকে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করবে, অন্যদিকে বাস্তবায়নযোগ্য হবে এবং ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারের জন্যও গ্রহণযোগ্য থাকবে।