বাংলা বদ্বীপের বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতে যে কৃষকরা কাজ করেন, ধৈর্য তাদের পরম শিক্ষা। বীজ বোনার দিনেই তারা বুঝে যান আগামী দিনের ফসলের ভবিষ্যৎ। ক্ষেতজুড়ে আগাছা রেখে সোনারঙা ধানের প্রত্যাশা যেমন অমূলক, দুটি প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের সমীকরণও ঠিক তেমনই।
বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থান আবার তেমনই এক সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক বছরের টানাপোড়েন ও অনাস্থার বরফ গলিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সম্পর্কের পথরেখা তৈরির সুযোগ এখন তৈরি হয়েছে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সামনে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক রদবদল ও নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে বেশ কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রকাশ্যে নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানানো, ফোনালাপ এবং আসন্ন সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টিকে নিছক ‘কূটনৈতিক প্রথা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি পুরনো অচলাবস্থা কাটিয়ে নতুন করে আলোচনার টেবিল সাজানোর একটি সুস্পষ্ট বার্তা।
দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশ যেন সরাসরি আলাপের চেয়ে ‘একে অপরকে নিয়ে’ মন্তব্য করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছে। ঢাকার রাজনৈতিক রূপান্তর, নয়াদিল্লির নিরাপত্তাকেন্দ্রিক উদ্বেগ এবং নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনার সুযোগে কূটনীতির বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা ও গুজবের গতিই ছিল বেশি।
দুই দেশেরই রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন কিছু পক্ষ রয়েছে, যারা পুরনো ক্ষত তাজা রেখে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে পছন্দ করে। প্রতিটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠককে এখানে ‘আত্মসমর্পণ’ বা প্রতিটি মতপার্থক্যকে ‘গোপন এজেন্ডা’ হিসেবে দেখার এক ধরনের প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। তবে পত্রিকার মুখরোচক শিরোনামের খোরাক জোগালেও এই দৃষ্টিভঙ্গি যে প্রতিবেশীর সঙ্গে সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে না—তা আজ স্পষ্ট।
বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন। লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত এই দেশ নিজের জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে কোনো পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করবে না—এটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম স্থলসীমান্ত ভাগ করে নেওয়া ভারতের ভৌগোলিক ও নিরাপত্তাজনিত কিছু উদ্বেগ থাকা অস্বাভাবিক নয়।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মূল সংকটের শুরু তখনই হয়, যখন কোনো এক পক্ষ নিজের জাতীয় স্বার্থকে অন্য দেশের ওপর শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার বলে মনে করে।
অথচ ইতিহাস, ভূগোল ও সংস্কৃতির দিক থেকে এ দুটি দেশের মধ্যকার সংযোগ অত্যন্ত গভীর। সীমানা তোয়াক্কা না করা নদ-নদী, যৌথ সাহিত্য, দেশভাগের স্মৃতিবাহী পরিবারগুলো এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—দুই দেশের সম্পর্কের মূল স্তম্ভ। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা ও সাধারণ মানুষের সংহতি ইতিহাসের এক চিরন্তন সত্য। তবে অতীতকে দীর্ঘমেয়াদি দেনা-পাওনার খাতা না বানিয়ে বরং সামনে এগিয়ে যাওয়ার আলো হিসেবে ব্যবহার করাই এখন সময়ের দাবি।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তীব্র সংঘাতের পরও বিশ্বমঞ্চে বন্ধুত্বের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর ফ্রান্স ও জার্মানির যৌথ উদ্যোগ ইউরোপের অন্যতম বিপজ্জনক তিক্ততাকে আজ সবচেয়ে শক্তিশালী অংশীদারত্বে রূপ দিয়েছে। একইভাবে ভিয়েতনাম ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের তিক্ত অতীতকে পেছনে ফেলে ভবিষ্যতের নতুন পথ তৈরি করেছে।
দক্ষিণ এশিয়াতেও এর ব্যতিক্রম নয়। ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধী যৌথ দূরদর্শিতার মাধ্যমে ইতিহাসের নতুন গতিপথ তৈরি করেছিলেন। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত—অন্ধ অনুসরণ নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা ও পারস্পরিক আস্থা।
অবশ্যই পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, বাণিজ্য ঘাটতি এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি সম্পর্কিত সংবেদনশীল ইস্যুগুলো রাতারাতি গায়েব হয়ে যাবে না। একটি পরিণত সম্পর্কের পরিচয় সমস্যার অনুপস্থিতিতে নয়, বরং সমস্যাগুলো কিভাবে সমাধান করা হচ্ছে—তার পরিপক্বতায়।
উগ্র বক্তব্য বা সাময়িক রাজনৈতিক আবেগের হাতে কূটনীতিকে জিম্মি হতে দেওয়া যাবে না। প্রতিটি সমঝোতাকে ‘দেশ বিক্রি’ বা প্রতিটি আলাপকে ‘দুর্বলতা’ হিসেবে দেখানোর মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
রাজনীতির চেয়ে ভূগোলের ধৈর্যই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। দুই দেশের সামনে এখন একে অপরকে ছাড় দেওয়ার নয়, বরং নিজ নিজ সার্বভৌম অবস্থান ধরে রেখে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে পরবর্তী অধ্যায় লেখার সুযোগ এসেছে।
বাংলায় একটি পরিচিত প্রবাদ আছে—‘যেমন বুনবে, তেমনই কাটবে’। সম্পর্কের বীজ আজ মাটিতে পড়েছে, আগামী দিনে এর ফসল কেমন হবে—তা নির্ভর করছে আজ ঢাকা ও নয়াদিল্লি কিভাবে তা যত্ন করে লালন-পালন করবে তার ওপর।