কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং ও এন্টারপ্রাইজ প্রযুক্তির বিকাশকে কাজে লাগিয়ে আগামী এক দশকে বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পে ভারতের মতো প্রতিষ্ঠিত আইটি শক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অর্জন করবে বলে প্রত্যাশা প্রকাশ করেছেন বিটোপিয়া গ্রুপের কর্মকর্তারা। তাদের মতে, দক্ষ মানবসম্পদ, উদ্ভাবন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকেই বিশ্বমানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে ‘ভিশন ২০৩০’ ঘোষণা করেছে বিটোপিয়া গ্রুপ। একই সঙ্গে নেতৃত্ব কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ এবং আগামী এক বছরের মধ্যে কর্মসংস্থান দ্বিগুণ করার পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে।
রবিবার (১২ জুলাই) ঢাকার ফোর্টিস ডাউনটাউন রিসোর্টে অনুষ্ঠিত বিটোপিয়া অ্যানুয়াল প্ল্যানিং (বিএপি) ২০২৬-২৭ সম্মেলনে এসব ঘোষণা দেওয়া হয়। দিনব্যাপী এ কৌশল নির্ধারণী সম্মেলনে গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদ, শীর্ষ নির্বাহী, সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), বিভাগীয় প্রধান এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। সম্মেলনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রতিটি ব্যবসা ইউনিটের কৌশলগত পরিকল্পনা, বার্ষিক বাজেট এবং কী পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর (কেপিআই) অনুমোদন করা হয়।
বিটোপিয়া জানায়, ‘ভিশন ২০৩০’-এর মূল লক্ষ্য বাংলাদেশকে এআইনির্ভর বৈশ্বিক প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমের অন্যতম অংশীদারে পরিণত করা। এ পরিকল্পনার আওতায় সফটওয়্যার উন্নয়ন ও আইটি আউটসোর্সিংয়ের পাশাপাশি এআই, ক্লাউড কম্পিউটিং, এন্টারপ্রাইজ সল্যুশন, বিজনেস অটোমেশন, ডেটা অ্যানালিটিকস ও ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আফ্রিকাসহ নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়।
বর্তমানে বিটোপিয়া গ্রুপের অধীনে ২২টি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। প্রায় পাঁচ হাজার পেশাজীবী এখানে কর্মরত রয়েছেন এবং বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশের গ্রাহকদের সফটওয়্যার উন্নয়ন, এন্টারপ্রাইজ সল্যুশন, ক্লাউড সেবা, আইটি আউটসোর্সিং, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও), ডিজিটাল মার্কেটিং এবং এআইভিত্তিক প্রযুক্তি সেবা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। গ্রুপটির বার্ষিক টার্নওভার বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৫০ কোটিরও বেশি।
সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা ছিল নেতৃত্ব কাঠামোর পুনর্গঠন। চেয়ারপারসন সাবিনা আক্তার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনির হোসেনকে বিটোপিয়া গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ম্যানেজিং ডিরেক্টর) হিসেবে ঘোষণা দেন। নতুন কাঠামোর আওতায় তিনি গ্রুপের কৌশল, বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির নেতৃত্ব দেবেন। অন্যদিকে সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সিইওরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা ও নির্ধারিত কেপিআই বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবেন।
নেতৃত্ব পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে সফটভেন্স আইটি লিমিটেডের সিইও হিসেবে মোহাম্মদ নাসির, জেনকোর সল্যুশনস লিমিটেডের সিইও হিসেবে জিসান আহমেদ এবং বিটোপিয়া লিমিটেডের সিইও হিসেবে গৌরব কৃষ্ণ গুপ্তকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আবদুল্লাহ আল আলামিনকে গ্রুপের চিফ মার্কেটিং অফিসার (সিএমও) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সম্মেলনে আগামী এক বছরের মধ্যে কর্মী সংখ্যা পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়। পাশাপাশি ‘বিটোপিয়া সিটি’ নামে একটি প্রযুক্তিনগরী গড়ে তোলার ধারণা উপস্থাপন করা হয়। এতে ডেটা সেন্টার, গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া এআইভিত্তিক জিপিইউ অবকাঠামো, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং ও ক্লাউড প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথাও জানানো হয়।
সমাপনী বক্তব্যে বিটোপিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, ‘বিটোপিয়ার লক্ষ্য শুধু একটি সফল ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান হওয়া নয়; বাংলাদেশ থেকে এমন একটি বিশ্বমানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যা একদিন ভারতের টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (টিসিএস) কিংবা ইনফোসিসের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হবে।’
তিনি বলেন, ‘ভিশন ২০৩০ কেবল একটি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নয়; এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতকে বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার। আমরা বিশ্বাস করি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, দক্ষ মানবসম্পদ, উদ্ভাবন ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের সমন্বয়ে একদিন বাংলাদেশও বিশ্ব প্রযুক্তি শিল্পে শক্ত অবস্থান তৈরি করবে।’
অনুষ্ঠান শেষে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কৌশলগত পরিকল্পনা, বাজেট ও কেপিআই সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। পরে ফটোসেশন, নেটওয়ার্কিং এবং র্যাফল ড্রর মধ্য দিয়ে সম্মেলনের সমাপ্তি ঘটে।





